ভূতের গলির নির্মাতা

প্রকাশিত: ৫:৫৩ অপরাহ্ণ, মার্চ ২৪, ২০২৪

ভূতের গলির নির্মাতা

 

মজিদ মাহমুদ

 

শহীদুল জহিরের গল্প নিয়ে কিছু বলার ঝুঁকি কমে আসছে। তাঁর মৃতু্র বেশ কিছুটা সময় পার হওয়ার পরেও পাঠকের আগ্রহের ভাটা পড়ছে না। তিনি লেখার জন্য খুব বয়স পেয়েছিলেন বলা চলে না। আবার লেখক হিসেবে কমও নয়। একজন লেখক কেবল তার জীবদ্দশাতেই লেখক। তার বেশিবাঁচা আর কমবাঁচা সাহিত্যের বিবেচনা নয়। শহীদুল জহির যা লিখেছিলেন তা তো তাঁর জীবদ্দশাতেই। এখন তাঁর লেখা ভালো কিংবা মন্দ বললে সাহিত্যের উৎপাদন বাড়ানো যাবে না। তবে ভালো কিছু হলে বাংলা সাহিত্যের ধারার সঙ্গে সংযুক্ত করা সম্ভব হবে।
বেঁচে থাকতে জহিরের তেমন পরিচয় ছিল না। তাঁর সহকর্মীরাও অনেকে জানতেন না। বাংলায় যারা গল্প উপন্যাস পড়েন তারাও না। কিন্তু কেন? বলা হয়ে থাকে শহীদুল জহির লোকাড়ালে থাকতে ভালো বাসতেন। লেখকের ধ্যানভঙ্গ করে বাইরে আসা পছন্দ করতেন না। কিন্তু এ কথা ডোলে সাধাই না। শহীদুল জহির নিভৃতচারী ছিলেন কিংবা শহীদুল জহির অপরিচিত ছিলেন- মোটেও না। জহির রীতিমতো ক্ষমতা কাঠামোর সঙ্গে ছিলেন। ক্ষমতার রাজনীতি এবং রাজনীতির সাহিত্যের সঙ্গে তিনি ঘনিষ্টভাবে জড়িয়ে ছিলেন। তবে এই ঘনিষ্টতা তাঁর সচেষ্ট কিনা সেটা ভিন্ন প্রশ্ন। ক্ষমতা দখল করা আর ক্ষমতার মধ্যে এসে পড়া নীতিগত আলাদা হলেও প্রয়োগের দিক দিয়ে এক। এখন প্রশ্ন, জহির কিভাবে ক্ষমতার সঙ্গে ছিলেন? এক নম্বরে বলা যায়, তিনি সরকারের সর্বোচ্চ পদে চাকরী করতেন। যেখান থেকে নিজেকে সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়া সম্ভব। যে পদকে উপেক্ষা করা যায় না। আর এ পদাধিকারীকেও উপেক্ষা করা যায় না। ফলে শহীদুলও উপেক্ষিত ছিলেন না। প্রকাশ মাধ্যমের যে অংশটির সমিহ লেখকরা প্রত্যাশা করেন জহির মরার আগেই তাদের সমিহ আদায় করতে পেরেছিলেন। লিটলম্যাগ কর্মীরা তাঁর কথা বলতেন। তাঁর লেখা নিয়ে বিতর্ক করতেন। তাঁর ভাষা নিয়ে প্রশ্ন তুলতেন। তিনি যে ক্ষমতাবান লেখক মরার আগেই স্বীকৃতি আদায় করে নিয়েছিলেন। আর নিয়েছিলেন তার প্রমাণ, ‘প্রথম আলো’ তাঁর লেখার কদর করতেন! কারণ, যা কিছু ভালো, তার সঙ্গে প্রথম আলো!! সুতরাং বলা যায়, শহীদুল জহিরের ভালোটা মিডিয়া টাইকুনরা চিনতে পেরেছিলেন। আর প্রকাশস¤্রাজ্যের যুগে, সত্য গোপনের যুগে অন্তত শহীদুল জহিরকে মিডিয়া সন্ত্রাসের শিকার হতে হয়নি। দুশ কপির লিটলম্যাগ আর প্রচার সংখ্যার শীর্ষের ‘প্রথম আলো’ কেউ তাঁকে উপেক্ষা করতে পারেনি। তাঁর লেখা ছাপার জন্য তাঁর লেখা পড়ার জন্য ঢাকা কেন্দ্রিক লেখকপাড়ার এলিটরা হামলে পড়তো। তিনি যে ক্ষমতা কেন্দ্রের সঙ্গে ছিলেন, তার আরেকটি প্রমাণ তাঁর মরার বছর না ঘুরতেই তাঁকে নিয়ে লেখকপাড়ার কমবেশি সবাই ব্যস্ত। এমনকি কিছুটা প্রতিযোগিতা বললেও ভুল হবে না। কারা শহীদুল জহিরের কথা আগে বলে ইতিহাসের পাঠ হয়ে থাকবে। কারা তার জীবদ্দশায় বলেছিল? কারা তাঁর মৃত্যুর পরে কত আগে তাকে নিয়ে সক্রিয় হয়েছিল। এ সব আগ্রহ থেকে সতর্ক মন্তব্য করা যায়, তাহলে কি সত্যিই শহীদুল জহির আমাদের সাহিত্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হতে চলেছে? আমরা ক্রমান্বয়ে এ আলোচনায় প্রবেশ করবো।
প্রথমেই তাঁকে নিয়ে এখন আলোচনার যে ঝুঁকির কথা বলেছিলাম তার দুএকটা কারণ বলি। কারণ, এখন জহিরকে নিয়ে আমাদের আবেগ উৎপাদনের কাল। একটা কিছু সৃষ্টির জন্য তো আগে আবেগ দরকার। আবেগ ও উত্তেজনা ছাড়া কোনো কিছু সৃষ্টি হয় না। জহিরের সৃষ্টির মূল্য-নির্ধারণেও এখন একটি আবেগ সংগঠিত হচ্ছে। দুএকটি ভিন্ন মত, ভিন্ন মূল্যায়ন এখন এই আবেগের তোড়ে ভেসে যাবে। আবেগ থিতিয়ে আসলে আমরা বুঝবো, কাল জহিরকে কতটুকু জায়গা দিয়েছে। দেয়া না দেয়া আমাদের কিছু এসে যায় না। কে জহির আর কে শহীদুল কাল তা বিচার করে না। নামহীন গোত্রহীন কোনো চরণ- যা মানুষের অভিজ্ঞতা ধারণ করেছিল। বর্তমানকালের মানুষের প্রয়োজনে তা কাজে আসে কাল তাকে বয়ে নিয়ে চলে। শহীদুলের অভিজ্ঞতা নিয়ে একটু স্নেহবর্জিত আলোচনা করলে স্বাস্থ্যকর হতে পারে। সবখানেই ভেজাল তেলের খাবার বেড়েছে। গৃহিনীরা কম তেলের রান্না ভুলতে বসেছে। সাহিত্যের স্বাস্থ্যরক্ষা করতে হলেও এই তেলমারাটা বন্ধ করতে হবে। অবশ্য শহীদুলের জন্য তেলমারার কিছু নেই। শহীদুল সশরীরে আর কারো ভালোমন্দ করতে পারবেন না। শহীদুল যেখানে বসতে পারবেন না সেখানে বসাতে যাওয়ার অপচেষ্টা যেন আমরা না করি। আমাদের সাহিত্য-সমালোচনার ধারা যেন এমন না হয়, যা কিছু পপুলার তা-ই খারাপ; যার সঙ্গে জনগণ নেই তা-ই ভালো। জনগণকে নিয়ে লিখলেই তা জনসাহিত্য হয় না। জনগণের রুচির সঙ্গে প্রকৃত লেখক পাল্লা দিতে পারেন না। প্রকৃত লেখক থাকেন নিজের ভেতর। কেউ তাকে দেখতে পায় না। শহীদুল জহির ঠিক তেমন ছিলেন। আমার আগের কথার সঙ্গে এ কথার কিছুটা বিরোধ আছে। এই যে, শহীদুল জহিরকে সব পপুলার মাধ্যমই ধরতে চেষ্টা করেছেন। শহীদুল জহিরও সেই পপুলার মাধ্যমকে ব্যবহার করেছেন। কিন্তু তাদের রুচি মাফিক, তাদের চাহিদা মাফিক পণ্য তৈরি করে তিনি সাপ্লাই দেননি। তাঁর কুঠির শিল্পের ইতিহাসকে তিনি বাড়তে দেননি। সারাদিন ধরে সারা বছর ধরে, ভূতের গলির অন্ধকারে বসে তিনি যে তাঁত বুনতেন; দিনশেষে তাই তিনি বিক্রি করতেন। শিল্পীকে বিসর্জন দিয়ে দুসের পাটালি গুড় সামনে রেখে খারাপ গুড় তিনি বিক্রি করেননি। সুন্দরী হলেই তো সবাই পাটালি বানাতে পারেন না। পাটালি বানাতে হলে শিল্পী হতে হয়। আর এ ক্ষেত্রে নরেন্দ্রনাথ মিত্রের ‘রস’ গল্পটি পাঠ্য। আবারো বলছি, শহীদুল জহিরের লেখা এলিট পাড়ায় আলোচনায় ছিল বলে; শীর্ষ প্রচার মিডিয়া জায়গা ছেড়ে দিয়েছিল বলে তিনি তার অংশ ছিলেন এমন নয়। সে দায় ছিল মিডিয়ার, সে দায় ছিল সাহিত্যের প্রপাগানডিস্টদের। জহির তাঁর নিজের লেখাকে মিডিয়ার নখর থেকে রক্ষা করতে পেরেছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন, এ যুগে একজন সত্যিকারের লেখকের বড়শত্রু মিডিয়া, বিশেষ করে আকাশ মিডিয়া। তাই তিনি ভাষাকে এমনভাবে গেঁথে তুলেছিলেন; বাক্যকে বাক্যের মধ্যে, শব্দকে শব্দের মধ্যে এমনভাবে প্রবিষ্ট করে দিয়েছিল; যাতে টেলিস্ক্রিপ্ট তাকে ধারণ করতে না পারে। অবশ্য তাঁর মরার পরে শুনতে পাচ্ছি- কারা যেন তাঁর সাহিত্যের চিত্ররূপ দিতে যাচ্ছে। এগুলো অবশ্য ভিন্ন কাজ। টেলিভিশনের জন্য স্ক্রিপ্ট সাহিত্য রচনা করা আর শহীদুল জহিরের রচনার চিত্ররূপ দেয়া এক কাজ নয়। এ ধরনের কাজ যারা করতে চান- তাদের মধ্যেও একটি শিল্পী-মন থাকে। তারা শিল্পীর খাতিরে তা করতে চান। বাণিজ্য তাদের মাথায় থাকে না। আজকে মিডিয়া থেকে সাহিত্যকে রক্ষা করতে হবে। শহীদুল জহির তা করেছিলেন।
শহীদুল ছিলেন শিল্পী। যিনি তাঁত বুনতে পারেন। পটালিগুড় বানাতে পারেন। ভূতের গলির সুখ দুঃখের সুতা তাঁর মাকুতে গেঁথে নিতে পারেন। ভূতের গলি তাঁর হার্ডির ওয়েসেক্স। ভূতের গলি তাঁর ডি’আরবাভিলেজ। ভূতের গলি তাঁর কাহারপল্লী। হাঁসুলীবাঁকের উপকথা। ঢোঁড়াইচরিত মানস। তাই বলে হার্ডির অদৃষ্টবাদে জহিরের বিশ্বাস নেই। যাদের কথা বলছি, তারা সবাই ছিল প্রান্তিক। ক্ষয়ের হাত থেকে লেখক তাদের রক্ষা করতে চেয়েছেন। তারা রক্ষা না পেলে আমরা তাদের কথা জানছি কি করে। রাজরাজড়ার ইতিহাসের পাশে কী অক্ষয় দাঁড়িয়ে আছে ডোমপুত্র নিতাইচরণ। ঢোঁড়াই জীবনীকার সতীনাথ ভাদুড়ী। কিন্তু একটি আরবান ভিলেজ নিয়ে এই বুঝি প্রথম কাজ হলো। ডি’আরবাভিলেজ নয়; আরবান ভিলেজ। সত্যিই তো ভূতের গলি ছিল। ভূতের গলি আছে। একেবারে ঢাকার কলিজার ভিতরে তার বাস। তার ভাষা, তার সুখ দুঃখ, তার সামষ্টিক কণ্ঠস্বর- সব আলাদা। আমাদের ঘরের পাশে এমন সব অক্ষয় গল্প ফুটে আছে; এমন একজন বয়াতি আছেন জহির বয়াতি। হয়তো আলাদা নয়। শহীদুল জহির তাকে আলাদা করে সৃষ্টি করেছেন। ভূতের গলির একা কোনো অস্তিত্ব নেই। মহল্লাহ বান্দর, আব্দুল হালিমের মা, ইন্দুর-বিলাই আর লেখক একাকার হয়ে আছেন সে সব গল্পে। নায়ক কেবল একজন, তার নাম ভূতের গলি। ভূতের গলি ছিল এবং ভূতের গলি থাকবে। ভূতের গলির সুখ দুঃখ স্বপ্ন অভিযাত্রা তাই একটি বিশেষ এলাকার বিশেষ সময়ের প্রকাশ হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলা কথা সাহিত্যের এই ধারণাটি জহির আবিষ্কার করেছেন-মোটেও না। এর ছিটেফোটা রকমফের বাংলা উপন্যাসের অনেকখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। হতে পারে এ ধারায় সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ অগ্রগণ্য। কুমুরডাঙ্গা ভূতের গলি। কুমুরডাঙ্গার মানুষের একত্রে বাঁচতে চাওয়া সমবায়ী অস্তিত্বের প্রকাশ। কিন্তু কুমুরডাঙ্গার আখ্যান, কুমুরডাঙ্গার প্লট নির্মাণ, কুমুরডাঙ্গার ভাষা ভূতের গলির সঙ্গে খাপ খায় না।
তবে এ কথা ঠিক গল্পের ইতিহাস মানে ভাষার ইতিহাস। ভাষা নেই তো গল্পও নেই। ভাষা যেমন গল্প তেমন। প্রতিটি নতুন গল্পের জন্য নতুন ভাষা তৈরি করতে হয়। যা রবীন্দ্রনাথের জন্য সত্য, তা ওয়ালীউল্লাহ-ইলিয়াসের জন্যও সত্য। ইলিয়াস স্বপ্নের ব্যাখার জন্য যে ভাষা তৈরি করেন। ভূতের গলিতে তা অচল। ভূতের গলির ভাষা একটা ভাষার সমুদ্র- মোগল-নবাবী-ব্রিটিশ হয়ে আরবি-ফারসি-উর্দু হয়ে হাজার বছরের বাংলার মধ্য দিয়ে আজকের বাংলায় মিলিত হয়েছে। রাজধানীর সুবাদে কত জায়গার, কত দেশের মানুষ এখানে এসে মিলিত হয়েছে। তাদের মিলত, তাদের বিচিত্র শব্দ, তাদের ডাইলেক্টস, তাদের এ্যাকসেন্ট তৈরি করেছে কুকনি, তৈরি করেছে কানজি তৈরি করেছে ক্রিওল। রূপ নিয়েছে মুখের বুলিতে। অর্ধ-সহ¯্রাব্দের ভাষা অথচ অবহেলিত। হতে পারেনি স্ট্যান্ডাডাইজ; হতে পারেনি মানভাষা। কেন হতে পারেননি? এর উত্তর কি আমরা জানতে চেয়েছি? আমরা কোন ভাষা ব্যবহার করছি? আমাদের গদ্যের ভাষা কি? ফোর্ট উইলিয়াম? উইলিয়াম ক্যারি? কোলকাতা? শান্তিপুর? গদ্য না থাকলে তো গল্প থাকে না। আধুনিক গল্প, আধুনিক উপন্যাস ঔপনিবেশিক চাইল্ড। উপনিবেশির রাজধানী কোলকাতা। সেই কোলকাতায় নদিয়া-শান্তিপুর। সেই শান্তিপুরের ভাষা, আমাদের গল্পের ভাষা। কিন্তু আমাদের মুখের ভাষা কি তাই? আমাদের মুখের ভাষা কি শক্তিশালী সাহিত্য রচনার উপযোগী নয়? চাই সেই ভাষার শক্তিশালী লেখক। শহীদুল সেই শক্তিশালী লেখক। ভূতের গলিতে যার জন্ম। ভূতের গলির ভাষাকে কি অসম্ভব দক্ষতার সঙ্গে সাহিত্যে ব্যবহার করলেন। বললেন, ভূতের গলির আলাদা জীবন রয়েছে। সেই জীবন প্রকাশিত তার ভাষার মধ্যে। বললে কি অত্যুক্তি হবে, শহীদুল গল্প লেখেননি। শহীদুল ভাষা লিখেছেন। ভাষার মধ্যে ধরা পড়েছে ভূতের গলির ইতিহাস। ভূতের গলির ধর্ম-সংস্কৃতি-মুক্তিযুদ্ধ। শহীদুল জহির বুঝি দুশ বছরের বাংলা গদ্যকে চ্যালেঞ্জ করলেন। বাংলা গদ্যের আটোসাটো ক্লাসিকরূপটি তিনি ছুঁড়ে ফেললেন। বাংলা গদ্যের কৃত্রিম ঔপনিবেশিক রূপটিকে তিনি বিদায় জানালেন। বললেন, দেখ এটি ভূতের গলির ভাষা। এটি দাগেস্তানের রাসুল গামজাতভের ভাষা। এটি আভির উপজাতির ভাষা। ভাষা না থাকলে কি মানুষ থাকে? মানুষের ইতিহাস তো ভাষার ইতিহাস। মানুষের স্টাইল তো ভাষার স্টাইল। ভাষার শ্লেষ, ভাষার বাকপ্রতিম, বাগধারা, স্ল্যাং- শহীদুল সব হরহর করে বলে যান। রাশ টানেন না। সংক্ষেপ করেন না। ‘গোয়ার মধ্যে বাম্বু ডোকায়ে দেন।’ জহির জানতেন স্ল্যাং মানে সংহতি। স্ল্যাংয়ের ভেতর দিয়ে একই প্রজাতির মানুষ চেনা যায়। জহির একই কথা ঘুরে ঘুরে বলেন। বিস্তারিত বলেন। যতভাবে বলা যায় ততভাবে বলেন। কিন্তু পাঠকের বিরক্ত উৎপাদন করেন না। যেন তার ভাষার জালে মুগ্ধ হয়ে পাঠক আটকে থাকেন। হ্যান্স অ্যান্ডারসন যেভাবে রূপকথা বলেন। মার্কেস যেমন শত বছরের নীরতার কথা বলেন। ঠিক তেমন করেই এগিয়ে চলে শহীদুলের ভাষা। জহিরকে কী গাব্রিয়েল মার্কেজ কিছুটা আপ্লুত করেছিলেন? কিছুটা আবিষ্ট করেছিলেন? ‘মুখের দিকে দেখি’ বইটিতে কী তিনি সেই আল্লাদ গোপন রাখতে পারেননি? মার্কেসকে কী একটু বেশি প্রশ্রয় দিয়েছিলেন? বিশেষ করে জুলির জন্য চানমিয়ার সেই চেস্টিটি বেল্ট বানানোর গল্প। অবশ্য মার্কেসও এ গল্পের উদ্গাতা নয়। মার্কেসও ধার নিয়েছেন এক পার্দির কাহিনি থেকে। জহির ধার নিয়েছেন গাব্রিয়েল মার্কেস থেকে। মার্ক লিখিত শতাব্দীর সুসমাচার থেকে। চাঁনমিয়ার বান্দরের দুধ খাওনের ঘটনাটিও বাংলা উপন্যাসে নতুন নয়। হিস্পানি জাদুবাস্তবতায় বিষয়টির কদর বেড়েছে। আমাদের নানী দাদীর কিচ্ছাতে বহুকাল ধরে আছে। ইউরোপী কায়দায় ওয়ালীউল্লাহ কিছু কিছু করে তার কাহিনিতে ঢুকিয়েছিলেন। ইলিয়াস খোয়াবনামায় যাচ্ছেতাইভাবে ব্যবহার করেছিলেন। শতাব্দীর সাবঅলটার্ন ইতিহাস বর্ণনায় গড়ে তুলেছিলেন নতুন এক মেটাফরের জগৎ। কাহিনির এইসব মুন্সিয়ানা বিবেচনায় কেউ কারো নাহি জিনে সমানে সমান। তবু ভাষা বিবেচনায় জহিরকে আমি কয় নাম্বার বেশি দিতে চাই। আমি বলছি এই জন্য, আমরা বললে কেউ বলতে পারেন তোমার রুচির সঙ্গে আমরা নেই বাপু। তারচেয়ে একা বলাই ভালো। যাদের কথা বলেছি তাদের ভাষায় ডাইলেক্টস থাকলেও তাদের ভাষার গঠন ছিল ক্ল্যাসিক। পুরনো ধরনের দামী। ক্যারীবাবু যে স্টাইল গড়ে তুলেছিলেন, সে স্টাইলে। যে দোষে রামরাম বসু আশীর্বাদ থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন, সে কারণে আমরা ‘আলালী’কে গুরুচণ্ডালী দোষ দিয়ে থাকি; সেই একই কারণে জহির আমাদের কাছে নমস্য। জহিরের ভাষা কেবল গুরুচ-ালী নয়- গুরুবান্দরী। আর সেখানেই জহিরের শক্তি। জহির এই শক্তিটি টের পেয়েছিলেন। তাই জিলাপীর মতো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পাঠককে খাওয়াতে চেয়েছিলেন। মাঝখান থেকে কামড় দেবার উপায় নেই। বহুরকম সম্বন্ধপদ দিয়ে বহুরকম অব্যয় দিয়ে বাক্যের ভাঁজে ভাঁজে তিনি তাঁর গল্পকে লুকিয়ে রাখেন। চাঁনমিয়া বান্দরের দুধ খায়। চাঁনমিয়া গাড়িচুরি করে। চাঁনমিয়া জুলির সঙ্গে প্রেম করে। কিডনাপ করে। ভূতের গলির মধ্যে বেবাক জিনিস ঢুকিয়ে দেন তিনি। সমকালীন রাজনীতি। রাঘববোয়লপুত্রদের গাড়িচুির। সমকালীন রাজনীতি অর্থনীতি কিছুই বাদ যায় না একরত্তি উপন্যাসে। ভাষা ছাড়া আর কিছুই চেনা মনে হয় না। আর ভাষা যেহেতু চেনা সেহেতু জহিরকে খুব আপনার লোক মনে হয়। জহির একটা লুপ্তপ্রায় ভাষাকে এখানে সাহিত্যের ভাষা করে তুলেছেন। কিংবা লুপ্ত হওয়ার হাত থেকে একটি ভাষাকে কিছু সময়ের জন্য রক্ষা করেছেন। তবে ঢাকার রাস্তাঘাটে, বাসট্যাম্পুতে কানপাতলে নতুন ডাইলেক্টেসের ধুকপুকানি টের পাওয়া যায়। শহীদুল বুঝি সেটা সময় মতো শুনেছিলেন। কোলকাতার আশপাশ থেকে আহরিত ভাষার মতো ঢাকাতেও কিছু একটা গড়ে উঠতে যাচ্ছে কিনা। কিংবা আলালের মতো একটি সম্ভাবনার মৃত্যুর দলিল হয়ে থাকবে?
এবার শহীদুল জহিরের দুএকটি গল্প বানানোর কায়দা নিয়ে আলোচনা করি। ‘ইন্দুর-বিলাই’ লিখবার সময় জব্বর একটি নকশা এঁকেছিলেন শহীদুল জহির। বাড়ি বানাইতে নকশা লাগে জানি; গল্প লিখতে নকশা লাগে- এ অভিজ্ঞতা আমাদের খুব বেশি নেই। তবে যারা নকশা এঁকে গল্প লেখেন তারা যে কামেল গল্পকার তা আমরা বুঝতে পারি। নকশার প্রবর্তন নতুন না হলেও বিরল তো বটেই। গল্পকার রবিবাবু এই বিদ্যা জানতেন। প্রভাতকুমার, পরশুরামও দুএকটি ক্ষেত্রে তা করেছিলেন। তাদের নকশার সঙ্গে শহীদুল জহিরের মিল নেই। তাদের আর্কিটেকচারাল ডিজাইন আলাদা। তাঁরা প্রতœনকশাকে তাদের গল্পে উপাদান হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। তাঁরা নকশা অনুযায়ী গল্প লেখেননি। এ ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের ‘গুপ্তধন’ গল্পটি পাঠক দেখে নিতে পারেন। কিন্তু শহীদুল জহির আলাদা। ‘ইন্দুর-বিলাই খেলা’ কেমন তা বোঝাতে যেয়ে প্রথমেই তিনি একটি ডিজাইন দেন। সেখানে ইন্দুর-বিলাইয়ের ছবি থাকে। তারা খেলায় কি রীতি মেনে চলে তা নকশা আকারে উপস্থাপন করা হয়। ইঁদুর-বিড়াল খেলার ধারণা নতুন নয়। মানুষ হয়েও আমাদের ইঁদুর দৌঁড়াতে হয়। জীবনানন্দের সেই অসাধারণ ‘বিড়াল’ কবিতায় এই খেলার সূক্ষè বর্ণনা আছে। দার্শনিক শ্রীমতভগবতে আছে। বিড়ালের পেটে ইঁদুর হুড়রে বলে হেসে ওঠে খিল কেটে কেটে। কে যে কার শিকার এ গল্প গীতায় মানায়। জহির সে পথে যান নি। জহির এক বিরাট শিশু। জহির এক মুগ্ধ কিশোর। তাঁর রয়েছে গল্প বলার এক অসম্ভব নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি শিশুর মতো ঘটনাগুলি তুলে ধরেন। তাঁর গল্পে তাঁর উপস্থিত এক শিশুতোষ লিপ্ততায়। জহির তাঁর গল্পে ভূতের গলিতে নতুন আসা শিশু। তার মানে ইন্দুর-বিলাই খেলায় সে নিশ্চিন্ত ইঁন্দুর। যারা ইঁন্দুর তারা যুগযুগ ইন্দুর। তারা ভাবে এটিই জগতের নিয়ম। তাই প্রশ্ন বৃথা। তাই প্রতিবাদ রীতিবিরোধী। এ ধরনের গল্পে শহীদুল জহির বাংলা গল্পের আটসাট রীতিকে প্রথম পর্যুদস্ত করেছেন। ছোটগল্পের রাবীন্দ্রিক সংজ্ঞার মধ্যে তাঁকে আর বেঁধে রাখা যায় না। এ গল্পে তিনি কিছু কেসস্টাডি তুলে দিয়েছেন। এক দুই করে সাতটি নমুনা দিয়েছেন ইন্দুর-বিলাই খেলার। তারপর আরেকটি নকশা দিয়ে শেষ করেছেন। কিন্তু এ খেলার যে শেষ নেই। খেলোয়াড় বদল হয় কিন্তু খেলা জারি থাকে। বিলাই খেলা ছেড়ে যেতে পারে কিন্তু ইন্দুর পারে না। বিড়াল খেলতে চাইলে ইন্দুরকে খেলতে হয়।
জহির শতবর্ষের বাংলা ছোটগল্পের প্যাটার্নের মধ্যে প্রথম পরিবর্তন আনলেন। তাঁর এই প্যাটার্নের পরিবর্তন বাংলা গল্পের সংজ্ঞাকে নতুন করে নির্ধারণের দাবি রাখে। তাঁর প্যাটার্ন বাংলা গল্পের নতুন ভবন নির্মাণের সম্ভাবনাকে আরো বাড়িয়ে দেয়। তবে ছোটপ্রাণ ছোটব্যথাকে তিনি ভোলেননি। শেষ হয়েও শেষ হয় না। দক্ষিণ মৈশুন্দি ভূতের গলির গল্প অনন্ত। সুহাসিনীর বকুলের গল্প অনন্ত। সুহাসিনীর লালপিপড়া বকুলদের খেয়ে যায়। আকালু আবার বিয়ে করে।
‘এই খেলার শেষ নাই, খেলোয়াড়ের শেষ আছে; খেলোয়াড় খেলা ছেড়ে যায়, কিন্তু খেইল জারি থাকে। উল্লেখ্য যে, বালকদের খেলার ক্ষেত্র, বিভিন্ন কারণে, যেমন : বুইড়া হয়ে গেলে বা মরে গেলে অথবা খেলতে খেলতে ক্লান্ত বা বিরক্ত হয়ে গেলে কিংবা জীবনে হঠাৎ দরবেশি ভাব দেখা দিলে, কেবল বিলাইরা খেলা ছেড়ে যেতে পারে, ইন্দুররা পারে না; বিলাই খেলতে চাইলে ইন্দুরকে খেলতে হবে।’