ভ্রমণ বিষয়ক দ্বাদশ আলোচনা ও স্লাইড প্রদর্শন আকর্ষণ ছিলেন আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বল

প্রকাশিত: ১১:০৮ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ২৪, ২০১৯

ভ্রমণ বিষয়ক দ্বাদশ আলোচনা ও স্লাইড প্রদর্শন আকর্ষণ ছিলেন আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বল

কলকাতা প্রতিনিধি

“সে দিন ছৌ নাচের বিষয় ছিল মহিষাসুরমর্দিনী। দুর্গার নাচের ছন্দে-তালে আমি বিস্মিত। দর্শকরা মোহিত। নাচ শেষ হল। শিল্পীরা ধড়াচুড়ো ছাড়লেন। দুর্গার ভূমিকায় যিনি নাচছিলেন, তাঁর সঙ্গে আলাপ হল। নাম বললেন মহম্মদ গিয়াসুদ্দিন। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এমন নজির, ভাবা যায় না” – বলছিলেন বিশিষ্ট ভূ-পর্যটক ও ভ্রমণ-লেখক পীযূষ রায়চৌধুরী। ট্রাভেল রাইটার্স ফোরাম আয়োজিত ভ্রমণ বিষয়ক দ্বাদশ আলোচনাচক্র ও স্লাইড প্রদর্শন। শনিবার ভ্রমণপিয়াসীদের এক মনোজ্ঞ সন্ধ্যা উপহার দিল ফোরাম।

বাংলা আকাদেমিতে আয়োজন করা হয়েছিল ওই সন্ধ্যা। আলোচনাচক্রে প্রথম বক্তা ছিলেন পীযূষ রায়চৌধুরী, বিষয় ছিল ‘পুরুলিয়ার সাতকাহন’। ভূ-পর্যটক হলেও পীযূষবাবুর আত্মিক যোগ পুরুলিয়ার সঙ্গে। শুরু করলেন রাঢ় বঙ্গের এই জেলার জন্মকাহিনি দিয়ে। বরাদ্দ সময় ছিল বেশ কম। তারই মধ্যে পুরুলিয়ার সংস্কৃতি নিয়ে সংক্ষিপ্ত মনোগ্রাহী আলোচনা করলেন পীযূষবাবু। তাঁর বক্তব্যে উঠে এল ছৌ, ঝুমুর, টুসু, ভাদুর প্রসঙ্গ। বললেন বাঁধনি পরব, শিকার পরবের কথা। সারা রাত্রিব্যাপী যাত্রাপালায় সীতারূপী অভিনেতার কাণ্ডকারখানার কাহিনি শুনিয়ে শ্রোতাদের মধ্যে হাসির হুল্লোড় তুললেন। আলোচনার ফাঁকেই পীযূষবাবু তাঁর সুরেলা কণ্ঠে শুনিয়ে দিলেন অংশুমান রায়ের গাওয়া সেই বিখ্যাত গানের দু’ কলি – দাদা পায়ে পড়ি রে, মেলা থেকে বউ এনে দে – সত্যিই যে এ ধরনের মেলার অস্তিত্ব পুরুলিয়া জেলায় আছে সে তথ্য জানাতে ভুললেন না পীযূষবাবু। আলোচনার একেবারে শেষ লগ্নে এল পুরুলিয়ার দারিদ্র্যের প্রসঙ্গ। কালী দাশগুপ্তের সেই বিখ্যাত গান ‘চল মিনি আসাম যাব, দ্যাশে বড় দুখ রে’-এর দু’ কলি শুনিয়ে পীযূষবাবু বললেন, পরিবর্তন হয়, পরিবর্তনেরও পরিবর্তন হয়। কিন্তু একটা জিনিস পুরুলিয়ায় অপরিবর্তনীয়। তবে জেলার মরদগুলো আজ আর কাজের সন্ধানে আসামের চা বাগানে যায় না, যায় কাছেপিঠের কয়লাখনি অঞ্চলে, কিংবা সুদূরের কেরল বা কর্নাটকে।

আলোচনাচক্রের দ্বিতীয় বক্তা ছিলেন খ্যাতনামা ভ্রমণ-লেখক ও পরিবেশবিদ হীরক নন্দী। হীরকবাবুর বিষয় ছিল ‘জঙ্গলের কাব্য’ – জঙ্গল নিয়ে বাংলা সাহিত্যে কী রকম চর্চা হয়েছে তা নিয়ে আলোচনা। তিনি নিজে কী ভাবে বাংলা সাহিত্যে জঙ্গল পেয়েছেন সে কথা শোনালেন। তিনি আলোচনা করে দেখালেন, আগে বাংলা সাহিত্যে জঙ্গলের কাহিনি বলতে ছিল মূলত শিকারের কাহিনি, এখন তা ক্রমশই জঙ্গল সংরক্ষণের সাহিত্যে পরিণত হচ্ছে। তাঁর আলোচনার অনেকটাই দখল করে ছিল বিভূতিভূষণের প্রসঙ্গ। তারই মাঝে উঠে এল জিম করবেট, কেনেথ এন্ডারসন, শিবশংকর মিত্র, বুদ্ধদেব গুহ, মহাশ্বেতা দেবী এবং হালফিলের জগন্নাথ ঘোষের অবদানের কথা।

এ বারের দ্বাদশ আলোচনাচক্রের অন্যতম আকর্ষণ ছিলেন বাংলাদেশ ট্রাভেল রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বল। তাঁর বক্তব্যের বিষয় ছিল ‘বাংলাদেশের ভ্রমণ আলেখ্য’। উজ্জ্বল নিজেও একজন ভূ-পর্যটক, সাইকেলে বিদেশ পাড়ি দিয়েছেন, হিচহাইকিং করেছেন, পায়ে হেঁটে বাংলাদেশ ঘুরেছেন। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। এই পুরুলিয়া থেকে তিনি পর্বতারোহণের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। বাংলাদেশের ভ্রমণ ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে উজ্জ্বল অকপটে স্বীকার করলেন, তাঁর দেশের ভ্রমণসাহিত্য কলকাতা তথা এ-পার বাংলার মতো অত সমৃদ্ধ নয়। তিনি জানালেন, বাংলাদেশের নব প্রজন্ম ভ্রমণে খুবই উৎসাহী। এখন দেশের দিকে দিকে নানা ভ্রমণসংস্থা গড়ে উঠছে। কিন্তু তাঁর মতে, যত ভ্রমণসংস্থা গড়ে উঠছে সেই অনুপাতে লেখা কিন্তু তত হচ্ছে না। বাংলাদেশে বেড়ানোর বেশ কয়েকটি জায়গার কথা উঠে এল উজ্জ্বলের আলোচনায়। ভ্রমণের দিক থেকে দুই বাংলাকে আরও কাছে আনতে ট্রাভেল রাইটার্স ফোরামকে ভ্রমণ বিষয়ক কিছু প্রস্তাব দিলেন উজ্জ্বল।

দশ মিনিটের বিরতির পর অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে ছিল বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী ও আলোকচিত্রশিল্পী দিবাকর দাসের স্লাইড প্রদর্শন ‘অজয়ের রূপকথা’। দিবাকর দাসের স্লাইডে ছিল তিনটি জিনিসের সমাহার – প্যাস্টেল ও অ্যাক্রেলিক মাধ্যমে তাঁর আঁকা অজয়ের ছবি এবং তাঁর তোলা অজয়ের আলোকচিত্র। পাশাপাশি তাঁর কাব্যময় ধারাভাষ্য শ্রোতা-দর্শকদের মোহিত করে রাখল। দিবাকর শোনালেন অজয়ের ইতিহাস, অজয় নামের উৎপত্তি নিয়ে নানা কাহিনি, অজয়ের প্রবাহপথের কথা, কোথায় এর সূচনা, কোথায় এর আত্মবিসর্জন। দিবাকর দেখালেন ছয় ঋতু বারো মাসে ভোর থেকে রাত পর্যন্ত অজয়ের রূপ পরিবর্তনের ছবি, অজয়ের পাড়ে উৎসবের ছবি, অজয়-নির্ভর জীবিকার ছবি। ভাঙন ধরা নদীর কাহিনি শুনিয়ে কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিক যে অজয়কে বাংলা সাহিত্যে অমর করে রেখে গেছেন, সেই অজয়কে আরও ভালো ভাবে চেনার, ভালো ভাবে দেখার, ভালো ভাবে বোঝার সুযোগ হল দিবাকরের স্লাইড প্রদর্শনে। অনুষ্ঠানের শেষ ৫০ মিনিট দর্শককুলকে এক অনাবিল আবেশে মজিয়ে রাখলেন দিবাকর দাস।

রবীন্দ্রনাথের ‘কবে আমি বাহির হলেম তোমারি গান গেয়ে’ গেয়ে এ দিন অনুষ্ঠানের প্রথামাফিক সূচনা করেন পম্পা শূর। পুষ্পস্তবক দিয়ে অতিথিদের বরণ করা হয় এবং সম্মাননা প্রদান করা হয়। ফোরামের মুখপত্র ‘ভ্রমী’র সর্বশেষ সংস্করণে প্রকাশিত পাঁচটি শ্রেষ্ঠ লেখাকে পুরস্কৃত করা হয়। পুরস্কৃত লেখকদের নাম ঘোষণা করেন ‘ভ্রমী’র অন্যতম সম্পাদক বিপ্লব বসু। পুরস্কার দেন বাংলাদেশ উপ হাইকমিশনের রাজনৈতিক কাউন্সিলর শাহনাজ আখতার রানু। ফোরামের কার্যকলাপ ও এই অনুষ্ঠানের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেন সংস্থার সাধারণ সম্পাদক রথীন চক্রবর্তী। অনুষ্ঠান শেষে সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ দেন ফোরামের সভাপতি রতনলাল বিশ্বাস। বাংলাদেশ ট্রাভেল রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বল দু’ দেশের মধ্যে ভ্রমণ বিষয়ক যে প্রস্তাব দেন, তা বিবেচনা করার আশ্বাস দেন রতনবাবু। সমগ্র অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন প্রতাপকুমার মণ্ডল এবং ডাঃ অশোক কুমার ঘোষ।