ভ্রমণ সাহিত্যে ভিন্নধারার প্রবর্তক সৈয়দ মুজতবা আলী

প্রকাশিত: ৩:০৬ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ২৯, ২০১৭

ভ্রমণ সাহিত্যে ভিন্নধারার প্রবর্তক সৈয়দ মুজতবা আলী

সৌমিত্র দেব

নিতান্ত বিপদে না পড়লে আমি আপন গাঁ ছেড়ে যেতে রাজি হইনে। দেশ ভ্রমণ আমার দু’চোখের দুশমন। তাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন আপন ভূমির গান গেয়ে ওঠেন। তখন আমি উদ্বাহু হয়ে নৃত্য আরম্ভ করি।’ এ কথাটি বলেছিলেন বাংলাদেশের ভ্রমণ সাহিত্যে ভিন্নধারার প্রবর্তক সৈয়দ মুজতবা আলী। তিনি সুযোগ পেলেই বলতেন, ভ্রমণে তার কোনো আগ্রহ নেই। কিন্তু সেটা ছিল নিছকই তার বিনয়। জন্মের পর থেকেই তিনি ভ্রমণ করেছেন। সারাজীবনই ছিলেন এ ব্যাপারে অক্লান্ত। জন্ম পর্যটক এই লেখক কোথাও বেশি দিন থিতু হতে পারেননি। কর্মজীবনেও কোথাও স্থায়ী হননি। ভ্রমণ বিমুখতায় রবীন্দ্র্রাথের দোহাই দিলেন বাস্তবে তার শিষ্য মুজতবা আলী। দুজনই ভ্রমণকে খুব গুরুত্ব দিয়েছেন। তাদের লেখক জীবনে এবং রচনা শৈলীতেও পড়েছে তার গভীর প্রভাব। ভ্রমণ তার শুধু কায়িক ছিল না, মানস ভ্রমণেও মুজতবার তুলনা ভার। তিনি দেশে কোনো কিছুর বর্ণনা দিতে গেলেই সেখানে অবলীলায় বিদেশি প্রসঙ্গ টেনে আনেন। আবার কায়রোয় বসে তার প্রাণ কাঁদে চারটে আতপ চাল, উচ্ছে ভাজা, সোনা মুগের ডাল, পটোলভাজা আর মাছের ঝোলের জন্য।

মুজতবা দাবি করেছেন, শুধু ভ্রমণের আনন্দ উপভোগের জন্য কখনো বাড়ি ছেড়ে বের হননি। যেটুকু গেছেন তা দায়ে পড়ে। কথার মধ্যে কিছুটা সত্যতা আছে। তার জন্ম হয়েছিল সিলেটের করিমগঞ্জ মহকুমায়। যা এখন ভারতের অন্তর্ভুক্ত। স্কুলজীবন কেটেছে সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও সিলেটে। বাবার বদলির চাকরির কারণে এটা ঘটেছে। তারপর পড়াশোনা করতে গেছেন শান্তিনিকেতনে। চাকরির জন্য গেছেন আফগানিস্তানে। উচ্চশিক্ষার জন্য গেছেন জার্মানি ও মিসরে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। কিন্তু উসিলা যা-ই থাকুক তার রক্তে যে ভ্রমণের নেশা-সেটা তিনি গোপন করবেন কিভাবে। সেসব অভিজ্ঞতাই এসেছে তার ভ্রমণ সাহিত্যে। আনন্দের ভাগ থেকে পাঠককেও বঞ্চিত করেননি তিনি। তার রচনাবলির প্রায় সর্বত্রই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ভ্রমণ বিররণ। তবে নির্ভেজাল ভ্রমণ সাহিত্যের বই দেশে-বিদেশে, জলে-ডাঙায়, চাচা কাহিনী, মুসাফির প্রভৃতি।

মুজতবা আলীর লেখা প্রথম বইটিই ছিল ‘দেশে-বিদেশে’। এটি ১৯৪৮ সালের মার্চ মাস থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় কলকাতার ‘দেশ’ পত্রিকায়। সম্পাদক সাগরময় ঘোষ তার সম্পাদকের বৈঠকে গ্রন্থে ‘দেশে-বিদেশে’র বৈশিষ্ট্য নিয়ে একটি সুন্দর স্মৃতিচারণ করেছেন। তিনি একে ভ্রমণ কাহিনি বলেই অভিহিত করেছেন। শ্রীঘোষ তার অফিসের কক্ষে সদ্যপাওয়া ‘দেশে-বিদেশে’র পা-ুলিপি গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়তেন। তখনো সেটি দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়নি। আড্ডার বন্ধুরা তার এই মনোযোগে বিরক্ত হতেন। একজন কথাশিল্পী এক দিন বলেই বসলেন, ‘রাবীন্দ্রিক হাতের লেখা যে বিরাট পা-ুলিপিটার ওপর আপনি এতক্ষণ হুমড়ি খেয়ে পড়ে ছিলেন সে বস্তুটি কী জানতে পারি?’ -‘ভ্রমণ কাহনী।’ আমার কথা শুনে সব্যসাচী-সাহিত্যিক গাল্পিক সাহিত্যিককে একটু ভরসা দেবার সুরে বললেন, ‘যাক বেঁচে গেলেন। উপন্যাস তো নয়। উপন্যাস হলেই ভয়- আবার একজন প্রতিদ্বন্দ্বী দেখা দিল।’ আমি বললাম, ‘নাই বা হলো উপন্যাস। এ লেখার জাতিপাঁতি স্বতন্ত্র। উপন্যাসের ধারেকাছে লাগে না।’ দশ জোড়া বড় বড় চোখে এক রাশ বিস্ময় ভরা প্রশ্ন জেগে উঠল- ‘লেখকটি কে?’ -‘আপনারা চিনবেন না। সৈয়দদা।’ লেখকরা যাকে সেদিন চিনতে পারেননি। প্রথম লেখা ভ্রমণ কাহিনি দিয়েই মুজতবা আলী বাংলা সাহিত্যে তার আসনটি পাকা করে নিয়েছিলেন।

সৈয়দ মুজতবা আলীর প্রথম গ্রন্থ ‘দেশে-বিদেশে’ বাংলা ভ্রমণসাহিত্যের এক অভিনব সংযোজন। এই বইটির মাধ্যমে তিনি যে রচনাশৈলী প্রবর্তন করেন, তা আজো পাঠককে ধরে রেখেছে।

কী আছে এই বইটিতে? দুই খন্ডে প্রকাশিত দেশে বিদেশের প্রথম খন্ড হচ্ছে কলকাতা থেকে রেলপথে কাবুল যাত্রার এক চমৎকার বিবরণ। ট্রাভেলগের ভঙ্গিতে লেখক সেখানে তুলে ধরেছেন তার যাত্রাপথের সঙ্গী বিচিত্র সব চরিত্র, যারা একই সঙ্গে অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ, মানবিকতায় দৃষ্টান্ত, আবার আনন্দ দানে সক্ষম। চলার পথে তিনি যেসব এলাকা অতিক্রম করেন সেসব অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য, পোশাক-আশাক, সংস্কৃতি, কৌতুকবোধ কোনো কিছুই তার সরস কলমে বাদ পড়েনি। শুরু হয়েছে কলকাতার ফিরিঙ্গি সহযাত্রীকে নিয়ে। পরে তা বিস্তৃত হয়েছে পশ্চিম ভারতের বিভিন্ন মানুষের সংস্পর্শে, বিশেষ করে পাঞ্জাব ও পেশোয়ারের পথের শিখ সর্দারজি ও পাঠান সহযাত্রীদের কথা।

দ্বিতীয় খন্ড অন্যরকম। প্রথম খন্ড পড়ে যারা ধারণা করবেন ‘দেশে-বিদেশে’ হচ্ছে একটি ভ্রমণকাহিনি, দ্বিতীয় খন্ডে তাদের হোঁচট খেতে হবে। সেখানে কোনো ভ্রমণবৃত্তান্ত নেই। আছে লেখকের নতুন কর্মস্থল আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা। সেখানকার প্রগতিশীল শাসক আমানুল্লাহর আধুনিক আফগানিস্তান গঠনের স্বপ্ন, মোল্লাতন্ত্রের বিরোধিতা, প্রতিবিপ্লবে আমানুল্লার পতন তথা আফগানিস্তানের উত্থান-পতনের বিবরণ। তিনি কাবুলে মানুষের সহজ সরল জীবনযাত্রা, চলন-বলন, খাওয়া-দাওয়ায় যে ঐতিহ্য- সব কিছুই নিপুণ শিল্পীর মতো তুলে ধরেছেন।

‘দেশে-বিদেশে’ কোনো বাস্তব বিবর্জিত কাহিনি নয়। এটা লেখকের আফগানিস্তানবাসীর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ফসল। ১৯২৭ সালে তিনি আফগানিস্তানের শিক্ষা বিভাগে চাকরি লাভ করেন। কাবুলের কৃষি বিজ্ঞান কলেজে মাসিক দু’শ’ টাকা বেতনে ফরাসি ও ইংরেজি ভাষার প্রভাষক নিযুক্ত হন। বছর না যেতেই কাবুলের শিক্ষা বিভাগ মুজতবা আলীর জার্মান ভাষায় গভীর জ্ঞানের পরিচয় পেয়ে তার বেতন বাড়িয়ে তিনশ’ টাকা করেন। এতে পাঞ্জাবী শিক্ষকরা ঈর্ষাকাতর হয়ে শিক্ষামন্ত্রীর কাছে গিয়ে বলেন, সৈয়দ মুজতবা আলীর ডিগ্রি হচ্ছে বিশ্বভারতীর। সেটা কোনো স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়। জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, আপনাদের সনদে পাঞ্জাব গভর্নরের দস্তখত আছে। আমাদের এই ক্ষুদ্র রাষ্ট্রেও গভর্নরের অভাব নেই। কিন্তু মুজতবা আলীর সনদে দস্তখত করেছেন স্বয়ং বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আর তিনি পৃথিবীর কাছে সারা প্রাচ্য দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন।

তবে আফগানিস্তানের পটভূমিতে শুধু দুই খন্ড ‘দেশে-বিদেশে’ নয়, ‘শবনমের’ মতো কালজয়ী উপন্যাসও লিখেছেন মুজতবা আলী। তার বিভিন্ন রচনায় ঘুরেফিরে এসেছে আফগানিস্তানের প্রসঙ্গ। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, এই অভিজ্ঞতা প্রকাশে তিনি সময় নিয়েছেন অনেক বেশি। কিশোর বয়সে হাতে লেখা ‘কুইনিন’ পত্রিকার মাধ্যমে যার সাহিত্যচর্চার হাতেখড়ি, তিনি পরিণত বয়সে রীতিমতো গ্রন্থ রচনা করেছেন। এর আগে তার যে পাঁচটি প্রবন্ধের সন্ধান পাওয়া গেছে, সেগুলো ঠিক মুজতবা সাহিত্যের প্রতিনিধিত্ব করেন না। লক্ষণীয়, রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশায় তার কাছ থেকে উৎসাহ পাওয়ার পরও মুজতবা আলী সাহিত্যচর্চার ব্যাপারে কিছুটা কুণ্ঠিত ছিলেন।

রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর ‘দেশে-বিদেশে’ প্রকাশিত হয় এবং সাহিত্যাঙ্গনে তিনি এই বইটি দিয়েই অক্ষয় প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। বাস্তব অভিজ্ঞতার কারণে ‘দেশে-বিদেশে’র একটি প্রামাণ্য মূল্যও আছে। তবে লেখক একে সন তারিখ দিয়ে তথ্য ভারাক্রান্ত করতে চাননি। সন তারিখ না দিয়ে তিনি একে প্রতীকী করে তোলার ব্যাপারে বেশি আগ্রহী ছিলেন। দেশ, সমাজ ও মানুষের বিবরণ এলেও এর কাহিনি হয়ে গেছে কালনিরপেক্ষ। তবে এতে রস ক্ষুণœ না হয়ে আরো বেড়েই গেছে বলা চলে। তার ভাষায় বৈদগ্ধ্য আছে, পান্ডিত্য আছে। কিন্তু সেটা অহেতুক জটিলতা সৃষ্টি করে না। সে কারণে সাধারণ গল্প-উপন্যাস যখন পাঠকের কাছে একঘেঁয়ে মনে হচ্ছিল তখন এ রকম রম্য বর্ণনায় তত্ত্বকথা ও ভ্রমণের আনন্দ পেয়ে পাঠক বইটি লুফে নেয়।

‘দেশে-বিদেশে’র মধ্যে লেখক কখনো সিলেটি, কখনো বাঙালি, কখনো ভারতীয় আবার কখনো বিশ্ব নাগরিক। হাস্যরস আর বিদ্রƒপ দুটোর মিশ্রণে তৈরি হয়েছে তার মজলিশি ভাষা। ‘দেশে-বিদেশে’ গ্রন্থের অনেক চরিত্র তাদের আত্মমহিমায় পাঠকের হৃদয়ে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে, এদের মধ্যে একজন হচ্ছেন মৌলভী জিয়াউদ্দীন। কাবুলে তিনি মুজতবা আলীর সহকর্মী ছিলেন। তার অকালমৃত্যুতে রবীন্দ্রনাথ এতটাই ব্যথিত হয়েছিলেন যে, তার জন্য তিনি একটি মর্মস্পর্শী কবিতা রচনা করেছিলেন।

মুজতবা আলী সেই কবিতা বিশ্বভারতীর অনুমতিক্রমে তার গ্রন্থে সংযুক্ত করেছেন। মনে পড়ে সেই কাবুলী মহিলার কথা। যিনি নিঃসঙ্গ লেখককে দেখে স্নেহশীলা হয়ে তার স্বামীকে বলেছিলেন, ‘বাচ্চা গমমী খুরদ’ অর্থাৎ ছেলেটির মনে সুখ নেই। তবে সব চরিত্রকে ছাপিয়ে উঠেছে লেখকের গৃহভৃত্য আবদুর রহমান। তার সরলতা ও সেবাপরায়ণতা পাঠকের হৃদয়কেও জয় করে নেবে। গ্রন্থের শেষে লেখক এই আবদুর রহমানের চেহারাই এনেছেন। তার বর্ণনায়, ‘মনে হলো চর্তুদিকে বরফের চেয়ে শুভ্রতর আবদুর রহমানের পাগড়ি আর শুভ্রতম আবদুর রহমানের হৃদয়।’ সাগরময় ঘোষের উৎসাহে দেশ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশের পরপরই সেটা বিপুল পাঠকপ্রিয়তা পায়। রচনাটি বই আকারে প্রকাশের অনুরোধ জানিয়ে পাঠকরা চিঠি লিখতে শুরু করেন। শেষে নিউ এজ পাবলিশার্স থেকে ১৯৪৯ সালের অক্টোবরে এটি বই আকারে প্রকাশিত হয়। তবে বইটির প্রথম সংস্করণে লেখকের নাম মুদ্রিত হয়েছিল ড. সৈয়দ মুজতবা আলী। কিন্তু অচিরেই তিনি তার সাহিত্যিক পরিচিতিকে বেশি গুরুত্ব দিতে ডক্টরেটের ভার মুক্ত হন। ১৯৫০ সালে তিনি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এই বইটির জন্য নরসিংহ দাস পুরস্কার লাভ করেন।

১৩ সেপ্টেম্বর বুধবার ছিল বাংলা সাহিত্যের বিশিষ্ট লেখক সৈয়দ মুজতবা আলীর ১১৩তম জন্মদিন। এ উপলক্ষে রাজধানীর হোটেল লেকশোরে অনুষ্ঠিত লেখকের ১১৩ তম জন্মদিনে  এই লেখাটি  পাঠ রা হয় ।