মদনমোহন কলেজের ইতিকথা

প্রকাশিত: ৯:৫৯ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ৩০, ২০২১

মদনমোহন কলেজের ইতিকথা

মো গোলাম ঈমান আলী 

শ্রীহট্ট শহরের সমৃদ্ধ এলাকা দাড়িয়াপাড়াতে বসবাস ছিল অনেক সনাতন ধর্মাবলম্বী পরিবারের । তন্মধ্যে ছিল একটি সাহা সম্প্রদায়ের ধন্যাঢ্য পরিবার, সাধারণত সনাতন ধর্মাবলম্বী সাহা’রা ব্যবসা-বাণিজ্যে জীবিকা নির্বাহ করেন । এই পরিবারের দুলালচন্দ্র দাস ছিলেন এক বুদ্ধিদীপ্ত ব্যবসায়ী মানুষ । অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ ভাগে দুলালচন্দ্রের জন্ম । পরিবারের বিষয়-সম্পত্তি ও ব্যবসায় পরিচালনা তাঁর ওপরই ন্যাস্ত ছিল । ব্যবসায়ী দুলালচন্দ্র দাসের দু-সন্তান ছিল । জ্যেষ্ট সন্তান মদনমোহন দাস এবং কনিষ্ঠ সন্তান আরাধন দাস । এই মদনমোহন দাসের নামানুসারেই শ্রীহট্টের লামাবাজারের মদনমোহন কলেজ । আজীবন চিরকুমার আরাধন দাস অকৃতদার ছিলেন ।
দুলালচন্দ্র দাসের জ্যেষ্ঠপুত্র মদনমোহন দাস ছিলেন প্রখর মেধাবী ও বুদ্ধিদীপ্ত এক লোক । ছাত্রাবস্থায় তাঁর মেধার পরিচয় মেলে বিভিন্ন ঘটনাক্রমে । শ্রীহট্ট শহরের হজরত শাহ্‌জালাল (রহঃ) দরগাহ্ সংলগ্ন, দরগা্হ্ মহল্লা স্কুল (পরবর্তীতে বিপিনচন্দ্র পালের শ্রীহট্ট জাতীয় বিদ্যালয়ে একীভূত) থেকে মদনমোহন দাস ১৮৬৮ খ্রিস্টাব্দে মাইনর বৃত্তি (অধুনা, অষ্টম শ্রেণী সমতুল্য) লাভ করেন । পরবর্তীতে তিনি সুরমা তীরবর্তী শ্রীহট্ট সরকারি হাইস্কুল (অধুনা, সিলেট সরকারী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়) থেকে ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দে কৃতিত্বের সঙ্গে এন্ট্রান্স (মাধ্যমিক সমতুল্য) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন । এসময়ে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এন্ট্রান্স পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতো । এন্ট্রান্স পরীক্ষা পাশের পর মদনমোহন দাস পৈতৃক বিষয়াদি দেখাশোনায় মনোযোগী হন । এভাবে বছর কয়েক চলেও যায় । ব্রিটিশ শাসনাধীন, পরাধীন ভারতবর্ষে সরকারী চাকুরী পাওয়া খুব কঠিন ছিল । তবে মদনমোহন দাসের জীবনে চাকরির সে সুযোগও আসে । নবগঠিত আসাম প্রদেশের শ্রীহট্ট কালেক্টরেট অফিসে ল্যান্ড রেভিনিউ শাখায় ক্লার্ক হিসেবে ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে তাঁর চাকুরী স্থায়ী হয় । ১৮৮৭ সালের ১৭ই মে মদনমোহন দাস ‘শ্রীহট্ট ল কাস’-এ দুবছর মেয়াদি ‘ল’ লেকচার-এ অংশগ্রহণ করেন । খুব সম্ভবতঃ বর্তমানে আইন কলেজের সমমানের প্রতিষ্ঠান হিসেবেই ‘শ্রীহট্ট ল কাস’ খ্যাত ছিল । সিলেট শহরের ‘রতনমণি লোকনাথ টাউন হল’এ প্রবীন আইনজীবীদের পরিচালনায় ‘শ্রীহট্ট ল কাস’ তার কার্যনির্বাহ সম্পাদন করতো বলে জানা যায় ।
মদনমোহন দাসের জন্মসাল কত ছিল তার লিখিত কোনো প্রমানিক নিদর্শন পাওয়া যায় নি, তবে তাঁর মৃত্যু তারিখ যে ২৬শে জানুয়ারী ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দ এটা নির্দ্বিধায় স্বীকার্য, চিরন্তন সত্য, এ প্রসঙ্গে পরে আসছি । পূর্বে উল্লিখিত হয়েছে ১৮৬৮ খ্রিস্টাব্দে মদনমোহন দাস ‘মাইনর বৃত্তি’ লাভ করেন । সে সময়কার ‘মাইনর’ বর্তমান অষ্টম শ্রেণির সমপর্যায় । সে হিসেব অনুসারে ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দে তাঁর এন্ট্রাস পরীক্ষা পাশ নিঃসন্দেহে যৌক্তিক এবং এ সংক্রান্ত সনদপত্র মদনমোহন দাসের পৌত্র বর্তমান সিলেটের দাড়িয়াপাড়া নিবাসী শ্রীসুখেন্দুবিকাশ দাস (জন্ম ১৯৩০ খ্রি.)- মহোদয় এর নিকট সংরক্ষিত আছে । তৎকালীণ এন্ট্রাস পরীক্ষা বর্তমানের স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষার সমতুল্য । সেই বিবেচনায় একজন এসএসসি পরীক্ষার্থীর বয়স সাধারণত ১৫ বছর হয়ে থাকে । তাই ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৫ বছর বিয়োগ করলে ১৮৫৬ সালকে মদনমোহন দাসের জন্মসাল হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে ।
ব্যক্তিগত জীবনে মদনমোহন দাস তিনটি বিয়ে করেছিলেন । প্রথম পক্ষের স্ত্রী’র গর্ভে তাঁর তিন পুত্রসন্তান এবং এক কন্যাসন্তান ছিল । প্রথম পক্ষের সন্তানেরা হলেন মোহিনীমোহন দাস (১৮৮৯-১৯৪৪ খ্রি.), যোগেন্দ্রমোহন দাস (১৮৯৪-১৯৮৬ খ্রি.), সৌরিন্দ্রমোহন দাস এবং এক কন্যা (নাম জানা যায় নি)। দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী’র গর্ভে এক পুত্র প্রফুল্লচন্দ্র দাস ও অপর দুই মেয়ে জন্মগ্রহণ করেন । তৃতীয় পক্ষের স্ত্রী’র গর্ভে কেবল দুই কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ করেন ।
উল্লেখ্য যে, মদনমোহন দাসের প্রথম পক্ষের সুযোগ্য সন্তান মোহিনীমোহন দাস এন্ট্রাস পাশের পর তাঁর পৈতৃক ব্যবসায় দেখাশোনা করতেন । তাঁর ভাই যোগেন্দ্রমোহন দাস ইন্টারমিডিয়েট পাশ করার পর কিছুদিন রাজা গিরিশচন্দ্র হাই স্কুলে শিক্ষকতা করেন । এই দুই ভাইয়ের বদান্যতায় এবং মুরারিচাঁদ কলেজের তৎকালীণ ইংরেজী বিভাগের নিবেদিতপ্রাণ অধ্যাপক প্রমোদচন্দ্র গোস্বামীর আন্তরিক প্রচেষ্টায় শ্রীহট্ট শহরের লামাবাজারে মদনমোহন দাসের এই উত্তরসুরি প্রদত্ত এক বিঘা ভূমি, টিনশেড্ একটি ঘর ও নগদ বারো হাজার টাকার ওপর যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয় তার নাম ‘মদনমোহন কলেজ’। কলেজটি চালু হয় ১৯৪০ সালের ২৬শে জানুয়ারী । প্রয়াতঃ মদনমোহন দাসের পুত্র মোহিনীমোহন দাস ও যোগেন্দ্রমোহন দাস তাঁদের পিতার স্মৃতি রক্ষার্থে যে ভূমি ও নগদ অর্থ দান করেন তার আনুষ্ঠানিক দলিল সম্পাদিত হয় ব্রিটিশ ভারতবর্ষে ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দের ১৫ই জুলাই । ছয়পৃষ্ঠা ব্যাপী সম্পাদিত দলিলে দাতা হিসেবে মোহিনীমোহন দাস ও যোগেন্দ্রমোহন দাসের স্বাক্ষর রয়েছে এবং ট্রাস্টি হিসেবে যারা স্বাক্ষর করেন তারা হলেন সর্বশ্রী রায়বাহাদুর প্রমোদচন্দ্র দত্ত (চুনারুঘাটের মিরাশী গ্রাম নিবাসী আসাম রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী), বসন্তকুমার দাস (শ্রীহট্টের বরগঙ্গা বা বুরুঙ্গা নিবাসী আসাম আইন পরিষদের স্পিকার ও মন্ত্রী), রায়বাহাদুর বৈকুণ্ঠনাথ ভট্টাচার্য । উক্ত দলিলে সাক্ষী হিসেবে স্বাক্ষর করেন বৈদ্যনাথ মুখার্জি, প্রমোদচন্দ্র গোস্বামী (প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ : মদনমোহন কলেজ, শ্রীহট্ট) ও রাজকুমার ভট্টাচার্য ।
ছবিটি সিলেটের লামাবাজারে মদন মোহন কলেজের সেই পুরাতন কলেজ লাইব্রেরী বিল্ডিং ও কলেজ গেট, যা অধুনা বিলুপ্ত ।।

ছড়িয়ে দিন

Calendar

October 2021
S M T W T F S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31