মধু নিয়ে কিছু অমধুর কথা

প্রকাশিত: ১০:৩১ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ৬, ২০১৮

মধু নিয়ে কিছু অমধুর কথা

রোকসানা  লেইস 

কুয়াশার আদর লেগে আছে পৃথিবীর গায়ে। সাদা চাদর মুড়ি দিয়ে আছে তখনও ঘুম ভাঙ্গেনি ভালো করে পৃথিবীর। চোখ মেলে তাকাতে ইচ্ছে করছে না আমারও। চোখ আধো খোলা আমার ঘরের ভিতর অরো বেশী ছায়াছায়া অন্ধকার। তবু লেপের ওম সরিয়ে কাঠের মেঝেতে পা রাখতেই গা জুড়ে শীত কাটা জাগে। গরম লম্বা হাতের জামাটা গলায় ঢুকিয়ে। বাইরে এক ছুটে পুকুর পারে। দুধের সরের মতন পরত পরে আছে পুকুরের জলের উপর। যেন জ্বাল দেয়া হচ্ছে বিশাল উনুনে পুকুরের জল। ধূঁয়া উঠছে ।
আধখোলা চোখে ঘুম পৃথিবীর রূপ দেখতে দেখতে পানিতে হাত ভিজাই। মুখ ধুয়ে ফেলি। মুখের ভিতর থেকে ধূয়া বের হয়। যেন পেটের ভিতর একটা উনুন জ্বলছে। ভিতরটা জ্বাল হচ্ছে আর ধূঁয়া বেরুচ্ছে।
বন্ধুদের সাথে পাল্লা দিয়ে মুখ দিয়ে পেটের ভিতরের ধূয়া কে কত বেশী বের করতে পারি; খেলাটা খেলতে খেলতে এক ছুটে চলে যাই, দুতলায়, মাঝের ঘরে।
ঘরে ঢুকতেই দরাজ কণ্ঠ আদরে ডাকেন। মাইজি আইছো। আও.. হা করো।
কাছে গিয়ে মুখ হা করি। একমুখ মিষ্টি রস মুখের ভিতর পরতে থাকে।
সকাল বেলাটা মিষ্টি মধুর হয়ে উঠে মধুর আস্বাদনে।
আর্য়ুবেদি, ভেষজ আদি ধনন্তরি ওষুধ মধু খাওয়ানো সকাল বেলার রুটিন চাচাজানের। সুফিবাদী, ফকিরি মতবাদের সাথে জটি বুটি সহজ জীবনের শক্তি নিজে যেমন সঞ্চয় করেন। তেমনি আমাকেও দান করেন।
প্রতি সকালে এক মুখ মধু খাওয়া শরীরের জন্য ভালো। স্বাস্থের একটা ভীত রচনা করে। বিষুদ্ধ নির্ভেজাল মধু। এতসব বোঝার বয়স ছিল না। তবে মধুর মিষ্টি স্বভাবে আকৃষ্ট হয়ে, ঠিক প্রতি সকালে খালী পেটে এক মুখ মধু খাওয়ার জন্য হাজির হয়ে যেতাম চাচাজানের ঘরে।
মধুর সাথে সম্পর্ক কবে থেকে যেন কমে গিয়েছিল। ভালো মধু পাওয়া যেত না। মৌয়ালীরা মৌচাক ভেঙ্গে যে মধু আনে জানা গেল তাতে তারা নানা কিছু মিশ্রণ দেয় মধু আর মধু থাকে না। বাজার ঘুরে আমাদের কাছে আসতে আসতে মধু নকল চিনির সিরায় বা অন্য কিছুতে মাখামাখি হয়ে যায়। ফুলের রেনু থেকে মৌমাছির তোলা মধুর সঞ্চয় শুধু নয়।
সেবার মনে হয় প্রথম রপ্তানী মেলা হচ্ছে ঢাকায়। দেখলাম বাক্স বন্দী মৌমাছি। বোতল বন্দী অনেক মধু। লোকজনের গা বেয়ে মৌমাছিরা চলাচল করছে। কোন ভয় নেই হুল ফোটানোর বিকার নেই মধু চাষ হচ্ছে। কয়েক বোতল মধু কিনে ছিলেন আব্বা।
এর অনেক বছর পর এক টিন মধু ঘরে রাখা হয়েছে। মধু নাকি সুন্দরবন থেকে এসেছে। বেশ দাম দিয়ে কেনা হলো। বাচ্চা তখন ছোট বাচ্চাদের জন্য মধু ঘরে রাখা খুব জরুরী।
কয়েকদিন পর এক সন্ধ্যায় সব যখন শুনশান চুপচাপ টেলিভিষনের অনুষ্ঠান দেখছি। খাবার ঘরে যেন বোমা ফাটার শব্দ হলো। তড়িঘড়ি গিয়ে দেখা হলো। মধুর টিন ফেটেছে। ঘরভর্তি মধু ছড়ানো। মধু ছিল না দানা দানা চিনির আকর ছিল কে জানে। খাওয়া হয়নি সব ফেলে দিয়েছিলাম। দেশে এরপর মনে হয় আর কখনো মধু কিনি নাই।
বিদেশে আসার পর মধুর বোতল ঘরে রাখাটা নতুন করে শুরু হলা। কত রকমের বোতল সাজানো বাজারের সেলফ জুড়ে। নানা আকৃতির নানা দামের। চাচাজানের মতন বাচ্চাদের মুখে এক মুখ মধু ঢেলে দেয়ার সুযোগটা বেশ উপভোগ করতাম।
এবছর শুরু সময় মোটে তিনদিন সুস্থ থাকলাম। তারপর প্রচুর জ্বর, কাশি, গা ব্যাথা, চোখ জ্বালা ক্রমাগত চলছে। চার পাঁচদিন প্রিয় ন্যাচারেল রেমেডি মধু, আদা কমলা, লেবু আর চিকেন স্যূপ খেয়ে চিকিৎসা চালিয়ে দিলেও সেদিন ভাবলাম যাই ডাক্তার দেখিয়ে আসি ডাক্তার বলল, অভার দ্যা কাউন্টারের ওষুধ যা হেল্প করবে এন্টিবায়টিক দিয়েও সে রকমই আস্তে ধীরে ভালো হবে। তাড়াতাড়ি ভালো হওয়ার কোন সুযোগ নেই। ইচ্ছে হলে ওষুধ খেতে পারো না খেলেও এক সময় ভালো হয়ে যাবে।
বাড়ি যেয়ে প্রচুর আদা হলুদ, মধু খাও।
ডাক্তার একগাদা ওষুধ লিখে দিল না বলে খুশি হলাম। তেমন কিছু নয়। ভাইরাস জ্বর ওষুধ খেলে এক সপ্তাহ না খেলে সাতদিন চলবে তো সাতদিনই চলুক।
বরঞ্চ মজা পেলাম ডাক্তার আমার নিজস্ব রেমেডি রেসিপি আমাকে ধরিয়ে দিল।
খুব বেশি জনপ্রিয় হচ্ছে এখন আমাদের দেশের কবিরাজী এখানে।
জ্বর গায়ে শুয়ে থাকা ছাড়া কিছু করার নেই। একদিন অনেকটা স্যূপ জ্বাল করে রেখেছি। অনেকটা আদা লেবু কেটে রেখেছি। রাতে ঘুমানোর আগে দুধে হলুদ জ্বাল দিয়ে এক কাপ উষুম গরম দুধ আর সকালে এক চামুচ মধু মুখে দিয়ে খানিক পরে দু গ্লাস পানি। মাঝে মাঝে চুমুকে চুমুকে স্যুপ খাওয়া।
এছাড়া নিরন্তর শুয়ে থাকা। মাথা ভর্তি নানা চিন্তা। আজব সব এডভাঞ্চার গল্প। অথচ লিখার শক্তি পাচ্ছি না। ল্যাপটপখানা চোখের সামনে পৃথিবীর তাবদ খবরা খবর তুলে আনছে। চোখ রেখে সময় কাটছে মন্দনা। যে সময়টুকু ঘুমাতে ইচ্ছা করে না। তখন চোখ রাখি ল্যাপটপের স্ক্রীনে। আমার ঘরে আর কারো আসা নিষেধ। ভাইরাস চট করে ধরে ফেলবে বলে দরজা বন্ধ। দুদিন পর পর বিছানা চাদর সব তুলে ধুতে দিচ্ছি আর নিয়মিত গোসল করছি। যদিও আমার একটা ভিডিও তৈরি করে পাঠানোর কথা ছিল এক জায়গায় কিন্তু চোখমুখ আর গলার অবস্থা নিয়ে সে ব্যাপারে কিছু করতে চেয়েও করতে পারলাম না। কদিন ক্রমাগত ঘুম দিয়ে এখন শুধুই শুয়ে থাকা। সময় কাটানোর জন্য,এ কদিনে অনেক গুলো মুভি দেখে ফেললাম।
নানা গল্প সত্য গল্প আজব গল্প ফ্যান্টাসি থেকে রোমান্টিক।
কোন বাছবিচার ছাড়া দেখতে থাকলাম। পৃথিবীতে মানুষের আজব চিন্তাধারা।
একটা ডকুমেন্টারি পেলাম মধু নিয়ে। মধু নিয়ে আছি তাই বিষয়টা বেশ মনোযোগ দিয়ে দেখলাম।
সারা পৃথিবী ব্যাপী মধুকে স্বাস্থের জন্য নাম্বার ওয়ান উপকারি একটি খাদ্য হিসাবে দেখা হয়। প্রতিটি দেশে মধু স্বাস্থের শক্তি হিসাবে ব্যবহার করে আসছে প্রাচিনকাল থেকে।
চিনির যত অপকারিতা। মধু সেগুলো থেকে মুক্ত। বরং শরীরের জন্য ভালো। এনার্জি বোষ্ট করার জন্য এক চামুচ মধু প্রতিদিন সব রকম রোগ থেকে দূরে রাখে।
উত্তর আমেরিকা, ইউরাপে চিনির বদলে মধু ব্যবহার শুরু হয় অনেকদিন থেকে। নানারকম ব্রেড, কেক, বিস্কিট মিষ্টি ব্যবহার করে যে সব খাদ্য তৈরি করা হয় সে সব খাদ্যে চিনির পরিবর্তে মধু ব্যবহার শুরু হয় । কারখানাগুলোতে টন টন মধু সাপ্লাই করা হয়। মধু দামে একটু বেশী কিন্তু স্বাস্থ সচেতন মানুষ মধু ভালো বলে, কিনতে কার্পণ্য করে না। অনেকে চা মধু দিয়ে খান।
কোন কারণ ছাড়া অনেক মৌমাছি মরা যায় প্রতি বছর আমেরিকায়। শীত এবং পরিবেশের বিপর্যয় থেকে মৌমাছি রক্ষা করার জন্য এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে মধু চাষীরা। তাদের এ প্রচেষ্টা কষ্ট সাধ্য এবং ব্যয়বহুলও।
মধুর চাহিদার ব্যবসা যখন রমরমা চাহিদার চেয়ে রপ্তানী অপ্রতুল। সে সময় কন্টেইনার ভর্তি মধু নিয়ে চাইনিজ জাহাজ আসে দাম অনেক কম তাদের। ব্যবসায়ীরা কম দামের মধু পেয়ে কিনে নিতে থাকে। এবং ব্যবহার করে তাদের খাবার তৈরিতে। আমেরিকার আসল মধু বিক্রেতাদের ব্যবসায় মন্দা দেখা দেয়। কারন মৌমাছি যতটুকু উৎপাদন করতে পারে তার চেয়ে বেশী যোগান তারা দিতে পারছে না। এদিকে চাহিদা বাড়ছে প্রতি নিয়ত। আর চাইনীজদের মতন কম দামেও তারা দিতে পারছে না মধু।
চাহিদার চেয়ে বেশি সরবারহ কম দামে আসতে লাগল চায়না থেকে মধু। দামে কম বলে ব্যসায়ীরা কিনে নিতে থাকল। আমেরিকার মধু ব্যবসায়ীরা বুঝতে পারছে না। এত কম দামে কি ভাবে তারা সরবারাহ করছে।
সরকার বলছে তোমরা মৌমাছির উৎপাদন বাড়াও।

নব্বই সনের শেষের দিকে আবিস্কার হয় চায়না থেকে আসা মধু আসল মধু নয়; কর্ন সিরাপ, আখ এবং ভুট্টার রস মিশানো মধু তারা বিক্রি করছে। মিশেল দেয়া নকল মধু চাইনিজরা বিক্রি করছে কম দামে। তাদের এই মিশানো ধরে ফেলার সাথে সাথে তারা নতুন করে অন্য কিছু মিশাতে শুরু করে যা পরীক্ষা করে ধরা কঠিন হয়ে যায়। হানির এডালটারি নিয়ে বিশাল বিশাল গবেষনা চলে। মধুর বৈধতা যাচাই করতে “পরাগ বিশ্লেষণ” এবং “আণবিক পরীক্ষার” একটি নতুন, অত্যাধুনিক বিজ্ঞানের উদ্ভাবন ঘটে। যেন দড়ি টানাটানি চলতে থাকে বৈধ আর অবৈধ ধরার। এরা এগিয়ে গেলে ওরাও নকলের ব্যবহার এমন ভাবে করে যে পার্থক্য বোঝা মুশকিল।

দুহাজার সাত থেকে দুহাজার চৌদ্দ সময় পর্যন্ত পরীক্ষা করে যখন তাদের মিশেল দেয়া মধু বাতিল করা হয় ততদিনে প্রকৃত মধু ছাড়া অনেক খাদ্য তৈরি হয়েছে বিক্রি হয়েছে। মানুষ নানা রকম রোগে আক্রান্ত হয়ে গেছে। আসল মধু বিক্রেতার বানিজ্য নষ্ট হয়েছে। আর নকল ব্যবসা রমরমা আয়ে উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছে গেছে।
নকলের জন্য চাইনিজদের সরবরাহ বাতিল করা হলে পরের বছর মালয়েশিয়া থেকে বিপুল পরিমান চালান আসল। সব লেবেল কাগজ বদলে ফেলেও চায়ানার মধু বিক্রি চলতে লাগল অন্য পথে আমেরিকার বাজারে। সহজেই এশিয়ার অন্যান্য দেশ থেকে তাদের পণ্য শনাক্ত করে সরবরাহ করতে থাকে।
ইউএস হানি ইন্ডাসট্রির আমদানী কৃত মধু কেনার দায়িত্ব পায় উনিশ বছরের স্টিফিনি গিসভা। জার্মানির এই মেয়ে ক্লোরমফেনিকোল যুক্ত মধু কেনা শুরু করে, যা এক ধরনের এন্টিবায়টিক। মানুষের শরীরের জন্য খারাপ। পুরো মধু ব্যবসায় জড়িত প্রতিটি মানুষ এই বিষয়টি দ্বারা ক্ষতি গ্রস্ত হয়।
যখন দু হাজার ছয়ে এই অনৈতিক প্রসেস সম্পর্কে জানা হয়। ইনল্যান্ড সিকিউরিটি তাকে গ্রেফতার করার জন্য আদালতে। ঠিক সে সময় সে ওয়ানওয়ে টিকেট করে এয়ারপোর্টে অপেক্ষা করছে প্লেনে চড়ে জার্মান পালিয়ে যাওয়ার। অল্প সময়ের মধ্যে তাকে গ্রেফতার করা হয়। ম্যানেজার ও গ্রেফতার হয়। কিন্তু মধুর উপর বিশ্বাস তত দিনে নষ্ট হয়ে গেছে মানুষের মনে।
মধু একটি বিশুদ্ধ বস্তকে ক্ষতিকর করে এভাবে বাজারে চালু করা চাইনীজদের উপর মেজাজটা খারাপ হলো ভীষণ ডকুমেন্টারিটা দেখে।
এক দিকে যেমন ভালো এবং সঠিক থাকার চেষ্টা করছে কেউ অন্য দিকে সেখানে অবৈধ্ ক্ষতিকর বিষয়গুলো ঢুকিয়ে দেয়ার অপচেষ্টাও চলছে। আমরা কি জানি কতটা বিশুদ্ধ খাদ্য আমরা পাচ্ছি।
রোটেন নামের সিরিজটা আমার প্রিয় হয়ে গেল।
তবে অনেক কিছু জানছি কিন্তু এ থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় কি।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

লাইভ রেডিও

Calendar

May 2024
S M T W T F S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031