মহকালের পথপ্রদর্শক কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

প্রকাশিত: ১১:৩৭ পূর্বাহ্ণ, মে ১১, ২০১৯

মহকালের পথপ্রদর্শক কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর


কামরুল ইসলাম

কবির আগমন মহাকালকে নির্দেশ করে। যুগ যুগ ধরে বঙ্গশ্চ অঞ্চলে আধিপত্যবাদ চরম শীর্ষে পৌঁছে যায়। তার সঠিক অনুধাবন ও উপলব্ধি করেছিলেন রাজা রামমোহন রায়। বেদের অনুবাদের মাধ্যমে জাতি বর্ণভেদের বিরুদ্ধে যুক্তি উপস্থাপন করে তিনি বাঙালির বঙ্গসমাজের ভিত্তি স্থাপন করেছেন। কবিগুরু তাইতো বলেন, ‘আমরা সমস্ত বঙ্গবাসী তাঁহার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী, তাঁহার নির্মিত ভবনে বাস করিতেছি।’ কবিগুরুর পিতামহ থেকে বাবা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর রামমোহনের ব্রাহ্মসমাজের ভাবনায় জীবন অতিবাহিত করেছেন। কবিগুরুও একই পথের পথিক হলেন। মহাপুরুষদের যে পথ, সেই পথের পথিক হলেন তিনি। ফলে তাঁর ভাবনা ও কর্মের মধ্যে মহর্ষির প্রভাব নানাভাবে লক্ষ্য করা যায়। অনায়াসে বলতে পারেন,
‘অহঙ্কার চূর্ণ করো, প্রেমে মন পূর্ণ করো,/
হৃদয় মন হরণ করি রাখো তব সাথ হে।’

কবিগুরু তপোবনের সাধনায় বিশ্বকে বাঙালির বিশ্বভাবনায় শান্তির পথ অন্বেষণ করেছেন। অনায়াসে কবি বলতে পারেন, ‘ হে অনন্ত বিশ্বসংসারের পরম এক পরমাত্মন, তুমি আমার সমস্ত চিত্তকে গ্রহণ করো তুমি সমস্ত জগতের সঙ্গে সঙ্গে আমাকেও পূর্ণ করিয়া স্তব্ধ হইয়া রহিয়াছ, তোমার সেই পূর্ণতা আমার দেহে-মনে, অন্তরে-বাহিরে, জ্ঞানে-কর্মে ভাবে যেন প্রত্যক্ষ করতে পারি। আমি আপনাকে সর্বতোভাবে তোমার দ্বারা আবৃত রাখিয়া নীরবে নিরভিমানে তোমার কর্ম করিতে চাই।’ এই অনুভব কবির।
বিশ্বের দেশে দেশে কত হানাহানি রক্তপাত, মানবিক বিপর্যয়। ‘সেখানে বিজ্ঞান আছে, বাহুবল আছে, অর্থবল আছে, বুদ্ধিবল আছে, কিন্তু তার দ্বারা মানুষ রক্ষা পায় না। স্বাজাত্যর শিখরের উপর চড়ে বিশ্বগ্রাসী লোভ যখন মনুষ্যত্বকে খর্ব করতে স্পর্ধা করে,রাষ্ট্রনীতিতে নিষ্ঠুরতা ও ছলনার সীমা থাকে না, পরস্পরের প্রতি ঈর্ষা এবং সংশয় যখন নিদারুণ হিংস্রতায় শান দিতে বসে, তখন মানবের ধর্ম আঘাত পায় এবং মানবের ধর্মই মানুষকে ফিরে আঘাত করে।’ (মানুষের ধর্ম)
বিশ্বে যদি আমরা দৃষ্টিনিবদ্ধ করি, তাহলে একই চিত্রের নৃশংসতা, মানবিকতার উপর চরম আঘাত বর্তমান অবধি । কবি বিশ্বমানবমনের ঐক্য চেয়েছেন।
মানবসত্য’ প্রবন্ধে কবি বলেন, ‘ আমাদের জন্মভূমি তিনটি, তিনটিই একত্র জড়িত। প্রথম পৃথিবী। মানুষের বাসস্থান সর্বত্র।’… মানুষের দ্বিতীয় বাসস্থান স্মৃতিলোক। অতীতকাল থেকে পূর্বপুরুষদের কাহিনী নিয়ে কালের নীড় সে তৈরী করেছে।.. স্মৃতিলোকে সকল মানুষের মিলন। বিশ্বমানবের বাসস্থান–এক দিকে পৃথিবী আর-এক দিকে সমস্ত মানুষের স্মৃতিলোক।… আর তৃতীয় বাসস্থান আত্মিকলোক। সেটাকে বলা যেতে পারে সর্বমানবচিত্তের মহাদেশ। অন্তরে অন্তরে সকল মানুষের যোগের ক্ষেত্র এই চিত্তলোক।’ কবিগুরুর ভাবনার ভেতর মহামানবের চিরায়ত বাণী।
কবি অনুভব করেছেন ‘ সর্বজনীন জনশিক্ষায়’। জনগণের ঐক্য মিলনে, সত্য প্রেমে। কবি যখন দেখেন নৃশংসতা, তখন বলে ওঠেন, ‘পৃথিবীতে প্রচণ্ডের মধ্যে, সংঘাতের মধ্যে, শান্তির যে অভ্যুদয় দেখি আদিযুগে, তাই দেখি মানুষের ইতিহাসেও। উদ্দাম নিষ্ঠুরতা আজ ভীষণাকার মৃত্যুকে জাগিয়ে তুলছে সমুদ্রের তীরে তীরে; দৈত্যরা জেগে উঠছে মানুষের সমাজে, মানুষের প্রাণ যেন তাদের খেলার জিনিস। মানুষের ইতিহাসে এই দানবিকতাই কি শেষ কথা? মানুষের মধ্যে এই-যে অসুর এই কি সত্য? ‘ মানবিক বিপর্যয়ের দিনেও কবি অনুভব করেছেন মহাপুরুষের, যিনি শান্তির বাণী নিয়ে কঠিন পরিস্থিতি অতিক্রম করতে পারেন। কবি সত্যের পথে থেকেছেন, অন্যায়ের বিপক্ষে শক্তিশালীরূপে অবস্থান নিয়েছেন।
কবিগুরুর ভাবনা শান্তির, যা মহাকালের পথে অগ্রসর হয়। কবি দার্শনিক প্রজ্ঞায় সর্বমানবকে সত্য জ্ঞানে অনন্তরূপে মিলনবন্ধনে আবদ্ধ করতেই চেয়েছেন। এ এক দার্শনিক অভিব্যক্তি।
কবিগুরুর জন্মদিন তাৎপর্যময় হোক। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠিত হোক।

Calendar

March 2021
S M T W T F S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031  

http://jugapath.com