‘মহাকালিক অগ্রযাত্রায় কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন’

প্রকাশিত: ৭:৫৩ অপরাহ্ণ, জুন ১৫, ২০১৮

‘মহাকালিক অগ্রযাত্রায় কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন’

কামরুল ইসলাম

মানুষের জন্ম যেস্থানে হোক না কেন, বিশ্ব পরিমণ্ডল অবারিত। লেখক সেই অবারিত স্থানের ভেতর জীবনের আত্মিক প্রকাশ ঘটান। সর্বমানবচিত্তের যোগ স্থাপনই প্রত্যেক লেখকের প্রধান প্রচেষ্টা থাকে। আর এ কারণে লেখক দার্শনিকরা ভৌগোলিক ও কালের সীমা অতিক্রম করে মহাকালের অগ্রযাত্রার পথিক হয়ে যান। এই সাধনা কঠোর তপস্যার, সকলেই অতিক্রম করতে পারে না। যারা পারে, তখন তাঁদের অন্তরের অখণ্ডরূপে নিয়ত প্রকাশ পায় শিল্পের।
সৃষ্টি সাধনায় মহীয়সীরূপে সমকালে সেলিনা হোসেন প্রতিনিধিত্ব করছেন। তাঁর জন্মদিনের অনুভব উপলব্ধি করতে গিয়ে ‘ স্বদেশে পরবাসী’ গ্রন্থটি পড়ে বোঝার চেষ্টা করছি। উনিশটে প্রবন্ধ স্থান পেয়েছে। এই গ্রন্থটা সংগ্রহ করেছিলাম ১৯৯৩ সালে। কৌতূহল ছিল, কথাশিল্পীর ভাবনা কি? তার পরিচয় অনুভবের। উৎসর্গ অধ্যাপক কবীর চৌধুরী। ডিসেম্বর ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত। তখন কি অনুভব করেছিলাম, তা এখন মনে নেই। তবে গ্রন্থটি পুনরায় পুর্নপাঠে কোথা হতে এতো আলো জ্বেলে দিল, তা ভেবে অভিভূত হয়ে যাই। ভূমিকায় লিখলেন, ‘ মূলত কথাসাহিত্য আমার ক্ষেত্র। প্রবন্ধে যা লিখেছি তা একান্তই মুহূর্তেক ভাবনার ছিটেফোঁটা বহিঃপ্রকাশ। সেখানে কোনো বড়ো ক্যানভাস নেই, আছে ছোট পরিসরে টুকরো টুকরো আঁচড়- যাকে বড়ো ক্যানভাসে একত্র স্থাপন করলে একজন সৃজনশীল লেখকের মানস-ভুবন রঙেরেখায় চিত্রিত হয়।’ ‘ সৃজনশীল লেখক প্রবন্ধ না লিখলে নিজের মানসকে পাঠকের সামনে খুলে দিতে পারেন না।’ এই ভাবনা লিখলেন ১৯৯৩ সালে। বইটির প্রথম প্রকাশ ১৯৮৫ সালে। গ্রন্থের প্রথম প্রবন্ধ স্বদেশ পরবাসী। কী অপূর্ব বর্ণনা! ‘ একজন লেখক তাঁর সাহিত্য ভাবনাকে রাষ্ট্র, সমাজ,মানুষ এবং দেশজ প্রকৃতির মধ্যে ছড়িয়ে দিয়ে রাখেন। সে শেকড় চলে যায় গভীর থেকে গভীরে, তিনি অনবরত সেখান থেকে রস শোষেণ।এই শোষার মধ্যে লেখক থেকে লেখকে পার্থক্য আছে। যিনি যতো গভীর করে আত্মস্থ করেন তিনি তত বড় শিল্পী। ‘ এই প্রত্যয় ব্যক্ত করতে গিয়ে কবিগুরুর প্রসঙ্গের সাথে আপন অনুভব মিলিয়ে নেবার প্রচেষ্টা করেছেন । এসেছে পটুয়াখালি, টেকনাফ, শাহপরী দ্বীপ, সমুদ্র, জাফলং, পাহাড়, ঝর্না, কাপ্তাই হৃদ, কান্তজ মন্দির,রাঙামাটি, পাহাড়ের সৌন্দর্যসহ নানারকম অন্তর অনুভূতি। স্বদেশকে এমন করে তুলে আনলেন, আমি কখন যেন এসব ভূখণ্ডে প্রবেশ করেছি। আর লেখকের সত্য উপলব্ধি সকল লেখকের জন্য, বিশেষ করে নবীন লেখকের জন্য অতি প্রযোজ্য।’ পরিশ্রমবিমুখতার ফলে ক্ষমতার অপচয়ই এখন আমাদের সাহিত্যিক পরিমণ্ডলে জলবায়ু। ভবঘুরে জীবনযাপনে যেমন ধৈর্য্য, পরিশ্রম, সহিষ্ণুতার প্রয়োজন- গদ্যের ভূখণ্ডও তেমনি পরিশ্রমী, কর্মঠ এবং শিল্পিত হাত চায়। ছন্দ থাক আর না থাক দু’চার লাইন গদ্য-কবিতা ছাপিয়ে রাতারাতি নাম কেনার অপচেষ্টা বেদনাদায়ক। ‘ এই নির্মম সত্য উচ্চারণ একজন প্রকৃত লেখকই করতে পারেন।
প্রত্যকটি প্রবন্ধে আছে তুলনা প্রতিতুলনা, যুক্তির পারঙ্গমতা। যতই পড়ছি, ততই আমার নিজস্ব দৈন্য অবস্থা বুঝতে পারি। নিসর্গের বিন্যাসে উপন্যাসের প্রসঙ্গে ইউরোপের সভ্যতার প্রসঙ্গ, বাংলার উৎপাদন প্রক্রিয়া, গ্রাম জীবন স্থান পেয়েছে।১৯৪৭ এর পর বাংলাদেশের উপন্যাস প্রসঙ্গে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, শওকত ওসমান, আলাউদ্দীন আল আাজাদ,সরদার জয়েনউদ্দিন, আবু ইসহাকসহ সেসময়ের লেখকদের উপন্যাস নিয়ে আলোচনা করেছেন। উপন্যাসের কাঠামো বর্ণনা করে অনাগত লেখকের প্রতি আহবান, তাই আমরা একজন টগবগে তরুণের অপেক্ষায় আছি, আলেকজান্ডারের মতো যে অবলীলায় উপন্যাস নামক ঘোড়াটির মতিগতি বুঝবে।’ ‘ সে ছোটা স্বকীয় ক্ষমতা এবং আসুরিক পরিশ্রমের বিচক্ষণ যাত্রা।’ এই বিচক্ষণ প্রত্যাশা সকলের জন্য।
কবিগুরুর ‘ সাহিত্যের বিচারক’ প্রবন্ধে যে অনুভব, সেই অনুভব নানামাত্রিকতায় লেখকের লেখায় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। ‘ জগতের উপর মনের কারখানা বসিয়াছে এবং মনের উপরে বিশ্বমনের কারখানা- সেই উপরের তলা হইতে সাহিত্যর উৎপত্তি।’
সাহিত্যর গতি বিচিত্র, তা যেন জড়ত্বের দ্বারা বিশ্ববোধের লোপ না ঘটে। সৌন্দর্যের প্রকাশে লেখকের প্রজ্ঞা অতি আবশ্যক। যেকথা কবি কীটস বহুবছর আগে বলেছেন, Truth is beauty, beauty is truth. তা যে সর্বকালে সমানভাবে প্রযোজ্য। সফোক্লিপসের ইদিপাসের আর্তনাদ, আমার জন্য নয়নমুগ্ধকর বিশ্ব কোথায়? রোমিও জুলিয়েটের জুলিয়েট যখন বলেন,
O, I have brought the mansion of a love,
But not possess’d it, and thought I am sold
not yet enjoyed.
প্রেমের এই মর্মবাণী লেখকের অন্তরে কম্পন বয়ে আনতে পারে। রাষ্ট্র সমাজের ভেতর লেখকের বসবাস, কাল পরিক্রমায় যা পাই, তা লেখকের ভাণ্ডার থেকে পাই।
সেলিনা হোসেন নানাভাবে উপলব্ধির জগতকে প্রকাশ করেছেন প্রবন্ধে। লিখেছেন, সেতুবন্ধন, অলিখিত জীবনের ভাষ্যকর, দাজাই ওসামুর শিল্পভুবন, ভূমিকা:অগ্রজের, ঘরগেরস্থিতে নোনাজল, প্রসঙ্গ: সেইসময়, শুধু কিছু কথা, আব্বাসউদ্দীন: বহমান নদী, একমেরুতে বসতি, সোনালি ভুবন, ল্যাতিন আমেরিকার উপন্যাস, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিকাশ: শিল্পসাহিত্যের ভূমিকা, উপন্যাসের দিগ্বলয়: স্বপ্ম ও বাস্তব, ছোটগল্পের সংকট, শিল্পের খনন: লেখকের দায়, সংস্কৃতি ও নৈতিকতা, সংস্কৃতি ও সাধারণ মানুষ।
মুক্তচিন্তা ও বোধের প্রখরতায় প্রত্যেকটি প্রবন্ধ বিশেষ মর্যাদা বহন করছে।
কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন লিখছেন অনবদ্য, একইভাবে লেখক শিল্পীর অনুপ্রেরণা দিয়ে চর্চাকে প্রসারিত করছেন। অপরিমেয় সৃজনশীল শক্তিতে তাঁর সাহিত্যকর্ম দেশ বিদেশে বহুভাষায় অনূদিত হয়েছে। এই প্রচেষ্টার সাধক তিনি। বিশ্ব সভায় তাঁর সৃজনকর্ম মহাকালের অগ্রযাত্রাকে ঐশ্বর্য দিয়েছে।
বঙ্গীয় সাহিত্য সংস্কৃতি সংসদ বিশ্বব্যাপী যে পথের সূচনা করেছে, তা সম্ভব হয়েছে, তাঁর মতো ধ্যানস্থ শক্তির দৃঢ় প্রত্যয়ে। আর অনুভব করি, কবিগুরুর ভাবনায়, সূর্যের ভিতরের দিকে বস্তুপিণ্ড আপনাকে তরল-কঠিন নানাভাবে গড়িতেছে, সে আমরা দেখিতে পাই না, কিন্তু তাহাকে ঘিরিয়া আলোকের মণ্ডল সেই সূর্যকেই কেবল বিশ্বের কাছে ব্যক্ত করিয়া দিতেছে। এইখানে সে আপনাকে কেবলই দান করিতেছে, সকলের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করিতেছে। মানুষকে যদি আমরা সমগ্রভাবে এমনি করিয়া দৃষ্টির বিষয় করিতে পারিতাম, তবে তাহাকে এইরূপ সূর্যের মতোই দেখিতাম। দেখিতাম, তাহার বস্তুপিণ্ড ভিতরে ভিতরে ধীরে ধীরে নানা স্তরে বিন্যস্ত হইয়া উঠিতেছে, আর তাহাকে ঘিরিয়া একটি প্রকাশের জ্যোর্তিমণ্ডলী নিয়তই আপনাকে চারি দিকে বিকীর্ণ করিয়াই আনন্দ পাইতেছে।সাহিত্যকে মানুষের চারি দিকে সেই ভাষাররচিত প্রকাশমণ্ডলীরূপে একবার দেখো। এখানে জ্যোতির ঝড় বহিতেছে, জ্যোতির উৎস উঠিতেছে, জ্যোতির্বাষ্পের সংঘাত ঘটিতেছে।’ সাহিত্যের এই পথরেখা চিনতে পারলেই বিশ্ব সাহিত্যের দ্বার বোঝা যায়। ‘ এই বিশ্বসাহিত্যে আমি আপনাদের পথপ্রদর্শক হইব এমন কথা মনেও করিবেন না। নিজের নিজের সাধ্য অনুসারে এ পথ আমাদের সকলকে কাটিয়া চলিতে হইবে।… গ্রাম্য সংকীর্ণতা হইতে নিজেকে মুক্তি দিয়া বিশ্বসাহিত্যের মধ্যে বিশ্বমানবকে দেখিবার লক্ষ্য আমরা স্থির করিব, প্রত্যেক লেখকের রচনার মধ্যে একটি সমগ্রতাকে গ্রহণ করিব এবং সেই সমগ্রতার মধ্যে সমস্ত মানুষের প্রকাশচেষ্টার সম্বন্ধ দেখিব, এই সংকল্প স্থির করিবার সময় উপস্থিত হইয়াছে।’ কবিগুরু ‘ বিশ্বসাহিত্য’ প্রবন্ধে উপরোক্ত কথা বলে আমাদের চলার পথ চিনিয়ে দিয়েছেন। কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন বিশ্বসাহিত্যের মহাকালের অগ্রযাত্রায় স্থান করে নিয়েছেন। এই গর্বিত ইতিহাসের সাথে কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের জন্মদিন বাংলা সাহিত্যের সম্ভাবনা পরম উদবোধনে বিশ্বসাহিত্যকে শক্তিশালী করছে। সমকালের বাংলা সাহিত্যের তিনিই Mother of Literature.
কালের এই অগ্রযাত্রা কালজয়ী হোক।