মহামারী বনাম ক্ষুধা-কোন পথে বিশ্ব

প্রকাশিত: ১২:১৯ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১০, ২০২১

মহামারী বনাম ক্ষুধা-কোন পথে বিশ্ব

 

 

আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা অক্সফাম এর রিপোর্ট অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় এ বছর বিশ্বে দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতিতে পড়া মানুষের সংখ্যা ছয় গুণ বেড়েছে। সদ্য প্রকাশিত ‘দ্য হাঙ্গার ভাইরাস মাল্টিপ্লাইস’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে সংস্থাটি বলছে, বিশ্বে করোনায় রোজ যত মানুষ মারা যাচ্ছে, এর চেয়ে বেশি মারা যাচ্ছে ক্ষুধায়। করোনায় যেখানে মিনিটে ৭ জনের মৃত্যু হচ্ছে সেখানে ক্ষুধায় মারা যাচ্ছে ১১ জন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কোন পথে সমাধান আসবে? মহামারী থেকে যেমন মানুষকে বাঁচাতে হবে তেমনি ক্ষুধা থেকেও তাদের বাঁচাতে হবে। করোনা মহামারী থেকে মানুষ বাঁচানোর উপায় নিয়ে গত দুই বছর ধরে চলছে পরীক্ষা –নিরীক্ষা। করোনা মহামারী থেকে বাঁচাতে গেলে কঠোর লকডাউন আর ঢিলাঢালা লকডাউনে কোন মতে জীবিকা বাঁচে কিন্তু সংশয়ে পড়ে যায় জীবন। এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষায় হিমশিম খাচ্ছে বিশ্বের তাবৎ বাঘা বাঘা দেশ।

 

তাই জীবন বাঁচানো এবং জীবিকা বাঁচানো এ দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা বর্তমান সময়ের বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জে পড়ে ইতিমধ্যে অনেক মূল্যবান প্রাণ ঝরে পড়েছে। কি উপায় আছে আমাদের সামনে? একমাত্র টিকাই কি উপযুক্ত সমাধান? কিন্তু টিকাই একমাত্র হতে পারছে না। টিকা নিয়ে আবারও মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা কি সমাধান? এখনো পুরোপুরি বলা যাচ্ছে না। পুরো বিষয়টা নিয়ে গবেষণা চলছে তো চলছেই। আমাদের দেশের সরকার নানাভাবে চেস্টা করে যাচ্ছে , তবে ১৫ দিনের খাবারের ব্যবস্থা করে ঘরে বসিয়ে লকডাউন কি কার্যকর করা যায় ? এই বিষয়টি অনেকেই বলছেন কিন্তু বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না । তাই লকডাউন, কড়া লকডাউন, কঠোর লকডাউন, সর্বাত্মক লকডাউন ইত্যাদি নানা কথা বলেও কোনোটাই বাস্তবে সফল করা যাচ্ছে না। ধনী দেশগুলো নাগরিকদের সহায়তা দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে সবকিছু খুলে দেয়ার কথা ভাবছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু ফলাফল যে ভয়াভহ হবে তা কিন্তু আঁচ করা যায়। তাহলে করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে চলমান লড়াইয়ে জয় পেতে হলে দায়িত্ব নিতে হবে সরকার থেকে জনগণ–সবাইকে।

 

 

 

সম্প্রতি এক গবেষণায় জানা গেল, দেশে নতুন করে প্রায় আড়াই কোটি মানুষ দরিদ্র হয়েছে। দেখা যাচ্ছে সমাজ বা ব্যক্তি জীবনে কিছু ঘটলেই, আয়ের উৎস সামান্য বাধাগ্রস্ত হলেই এবং দুর্ঘটনা, স্বাস্থ্যহানি বা অসুখবিসুখ হলেই সে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যায় কারণ তারা একেবারে প্রান্তিকে অবস্থান করে। দেশের মাথাপিছু আয় বাড়া তাদের রক্ষা করতে পারে না। করোনার কারনে মানুষের আয়ের উৎস ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে গিয়ে পর্যায়ক্রমে সে সর্বস্বান্ত হয়ে গেছে। এই শ্রেণির সাধারণত সঞ্চয় থাকে না। যা সঞ্চয় ছিল ইতিমধ্যে তা ভেংগে খাওয়া শেষ। এখন বেশীর ভাগ প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষ ধার-দেনা করে কোনমতে জীবিকা চালাচ্ছে। প্রান্তিক পর্যায়ের ব্যবসা-বাণিজ্য, দোকানপাট—এগুলোকে টিকিয়ে রাখতে অর্থায়ন প্রয়োজন। দুঃখজনক হলেও সত্য, প্যাকেজে থাকা সত্ত্বেও এই অর্থ সবার কাছে যেতে পারেনি, কারণ বিবিধ। এরই মধ্যে আরেকটি নতুন প্যাকেজ কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র এবং মাঝারী খাতের জন্য ঘোষিত হয়েছে। ২০২১-২০২২ অর্থ বছরের মধ্যে ২০,০০০ কোটি টাকার প্যাকেজ বাস্তবায়ন করার জন্য ব্যাংকগুলোকে। আবার ব্যাংকেও প্রচুর তারল্য জমে আছে। এখন ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের হাতে যেন প্রণোদনার অর্থটা যায়, তা নিশ্চিত করতে ব্যাংকগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। অবশ্য ক্ষুদ্র শিল্পে ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকাররা টাকা আদায়ের ব্যপারর সংশয়ে থাকেন। সে ক্ষেত্রে সরকার যদি সুদ প্রণোদনা ছাড়াও মুল্ধনের কিছুটা রিস্ক বহন করে তবে ব্যাংকগুলো

 

 

এধরনের ঋণ দিতে উৎসাহী হতে পারে। মানুষের কাছে টাকা যাওয়াটাই হলো এখন বড় সমাধান। বেকার মানুষের হাতে নগদ টাকা দিন এবং ক্ষুদ্র ব্যাবসায়ীদের প্রণোদনা দিন । ব্যবসায়ীদের জন্য রিলিফের চেয়ে প্রণোদনা অনেক ভালো। তাদের ব্যবসাটা যেন চালিয়ে যেতে পারে সেদিকে নজর রাখতে হবে। তা না করে ঢালাওভাবে লকডাউন দিলে লাভ হবে না। করোনা মহামারি হয়তো আমরা একসময় অতিক্রম কররো, কিন্তু মানুষের সমাজ ও জীবনে যে ক্ষত হচ্ছে তা শুঁকাতে কতদিন লাগবে তা বলা মুশকিল। ১৯৩০ সালের মহামন্দার প্রভাব দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কাল পর্যন্ত গড়িয়ে ছিল। করোনার প্রতিরোধব্যবস্থা গ্রহণ যেমন কাম্য, তেমনি সামাজিক ক্ষত যেন দীর্ঘকাল বয়ে বেড়াতে না হয় সেই ব্যবস্থাও নিতে হবে। এই ব্যবস্থা হলো জীবন ও জীবিকার সর্বোচ্চ সমন্বয়। এদিকে নতুন ভ্যারিয়েন্টকে নিষ্ক্রিয় করার ব্যাপারে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা নিয়েও রয়েছে, সন্দেহ, প্রশ্ন। আবার ভ্যাকসিনের জোগান নিয়েও সৃষ্টি হয়েছে অনিশ্চয়তা। তাহলে আমাদের বাঁচার উপায় কী? আপাতত একটাই উপায়- তা হলো আমাদের শুভ বুদ্ধির উদয় হওয়া, স্বাস্থবিধি মেনে চলা এননভাবে যেন নিজের তো না ই, অন্যেও যেন ক্ষতির কারণ না হয়ে দাড়াই। সমাজের বিত্তবানরা এগিয়ে আসুন মানুষের সহায়তায় যেমনটি করেছিলেন ২০২০ সালে । ক্ষুধা এবং মহামারী দুটোকেই সংগে নিয়ে বাঁচতে হবে। দুটোই আমাদের অগ্রাধিকার। একটা ছেড়ে দিলে আরেকটা আমাদের বিপযস্ত করে ফেলবে। নীতি নির্ধারকদের দায়িত্ব অনেক বেশী। সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে এই কাজে অন্তভুক্ত করতে হবে। তা না হলে মহামারী আর ক্ষুধা কোনটাই আমাদের রেহাই দেবে না।।

 

ব্যংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

ছড়িয়ে দিন