মাঠ পর্যায়ে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির যথাযথ বাস্তবায়ন হচ্ছে না

প্রকাশিত: ৯:০৩ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৩, ২০১৭

মাঠ পর্যায়ে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির যথাযথ বাস্তবায়ন হচ্ছে না

মাঠ পর্যায়ে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির যথাযথ বাস্তবায়ন হচ্ছে না
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিসমূহের লক্ষ্য হওয়া উচিত দারিদ্র্যের তীব্রতা হ্রাস নয়, বরং সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে দারিদ্র্যাবস্থা থেকে মুক্তি দেয়া। কর্মসূচির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সাথে সরকারের ঘোষিত ‘ভিশন ২০২১’-এর সমন্বয় প্রয়োজন। বিদ্যমান এনএসএসএসের গাইডলাইন অনুযায়ী মাঠ পর্যায়ে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির যথাযথ বাস্তবায়ন হচ্ছে না। সেজন্য অর্থ সাহায্যের পরিমাণ বৃদ্ধির পাশাপাশি দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে আয়বৃদ্ধিমূলক কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্তি ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। বিশেষ নজর দিতে হবে সমতলের আদিবাসীদের দিকে। কর্মসূচির উপকারভোগী নির্বাচন, পরীবিক্ষণ ও জবাবদিহিতার প্রক্রিয়ায় জনঅংশগ্রহণ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিতে হবে। ১৩ ডিসেম্বর ২০১৭ দিনব্যাপী ঢাকার সিরডাপ ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স সেন্টারে ওয়ার্ল্ড ভিশন ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সহায়তায় খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ-এর সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বার্ষিক সম্মেলন-এ বক্তারা এসব সুপারিশ তুলে ধরেন। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এ সম্মেলনের উদ্বোধন ঘোষণা করেন সরকারের খাদ্যমন্ত্রী এডভোকেট মো. কামরুল ইসলাম এমপি। ‘খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ’ ও ‘পিকেএসএফ’-এর চেয়ারম্যান ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উদ্বোধনী অধিবেশনে সম্মানীয় অতিথি ছিলেন সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক (কর্মসূচি) ও অতিরিক্ত সচিব আবু মোহাম্মদ ইউসুফ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিকল্পনা ও কর্মসূচি) এম খালিদ মাহমুদ, বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের প্রতিনিধি এম ম্যানফ্রেড ফার্নহোলজ্ ও বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ। এ অধিবেশনে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসুচির বাস্তবায়ন ও নীতি সংক্রান্ত বিষয়ে সম্পাদিত গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্য-বিশ্লেষণ ও সুপারিশ তুলে ধরেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়রে উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আসিফ শাহান। সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশনের আলোচ্য বিষয় ছিল সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা ও সুপারিশ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়রে উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী মারুফুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ অধিবেশনে প্রধান অতিথি ছিলেন মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কাজী রওশন আক্তার। এতে সম্মানীয় অতিথি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. এম এম আকাশ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব শেখ আতাহার হোসেন ও মন্ত্রী পরিষদ বিভাগের সামাজিক নিরাপত্তা শাখার ফোকাল মোহাম্মাদ শহীদুল ইসলাম। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ-এর প্রকল্প ব্যবস্থাপক ইফসুফ আলী। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির নীতিগত সীমাবদ্ধতা ও বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতার আলোকে নাগরিক সংলাপ শীর্ষক তৃতীয় অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন খাদ্য অধিকার বাংলাদেশের ভাইস চেয়ারম্যান মুহম্মদ হিলালউদ্দিন। এ অধিবেশনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন এমপি। এতে বিশেষ ও সম্মানীয় অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন যথাক্রমে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আরফিন আরা বেগম ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইডিএম এ- ভিএস-এর পরিচালক অধ্যাপক ড. মাহবুবা নাসরীন। সম্মেলনের সকল অধিবেশন সঞ্চালনা ও দিনব্যাপী আলোচনার সার-সংক্ষেপ উপস্থাপন করেন খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ-এর সাধারণ সম্পাদক ও ওয়েভ ফাউন্ডেশন-এর নির্বাহী পরিচালক মহসিন আলী। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বিষয়ে কর্মরত বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আগত উপকারভোগী নারী-পুরুষ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিগণ বিভিন্ন অধিবেশনে তাদের মতামত তুলে ধরেন।
সম্মেলনে খাদ্যমন্ত্রী এডভোকেট মো. কামরুল ইসলাম বলেন, সরকারের অধীনে বর্তমানে ১৪৫টি সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কার্যকম পরিচালিত হচ্ছে। সরকার চেষ্টা করছে সবগুলো কর্মসূচির সমন্বয়সাধনের জন্য। সে লক্ষ্যেই জাতীয় সামাজিক সুরক্ষা কৌশল বা এনএসএসএস। বর্তমান সরকার একটি ভিশনারি সরকার, আমরা যথাযথভাবেই মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হতে চাই, সেজন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার বিকল্প নেই। ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, সরকারের একার পক্ষে সবকিছু করা সম্ভব নয়। টেকসই উন্নয়ন অর্জন করতে হলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করতে হবে, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে উন্নয়ন কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। আবু মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন, সরকার সবসময়ই সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি বৃদ্ধিতে তৎপর রয়েছে। গত বছর বিধবা ভাতা পেয়েছেন ৩১ লক্ষ ৫৫ হাজার নারী, যা এ বছরে ৩৫ লক্ষ ছাড়িয়ে গেছে। বিভিন্ন অনগ্রসর জনগোষ্ঠী, হিজড়া, চা বাগানের শ্রমিক, যারা বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে কর্মহীন থাকে তাদের জন্যও সরকারের নানামুখী প্রকল্প রয়েছে। এম খালিদ মাহমুদ বলেন, সরকার এনএসএসএসের কার্যক্রম মাত্র দু’বছর হলো শুরু করেছে, এর সার্বিক সাফল্য দেখতে হলে আমাদের আরো অপেক্ষা করতে হবে। তবে এজন্য সরকার ও এনজিওদের সম্মিলিত প্রয়াস জরুরি। ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, দারিদ্র্য ও ক্ষুধামুক্ত প্রকৃত মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে উন্নীত হতে হলে সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সেজন্য উচ্চ পর্যায়ের ব্যবসায়ী ও যারা অধিক কর প্রদান করে থাকেন তাদেরকে এসব ক্ষেত্রে বিনিয়োগে আগ্রহী করে তুলতে হবে। ড. কাজী মারুফুল ইসলাম সকল পক্ষের সমন্বয়সাধনের মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিসমূহ সফলভাবে বাস্তবায়নের উপর গুরুত্ব আরোপ করে বলেন, নারীদের কর্মসংস্থান, দুর্নীতি রোধ ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় এ কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কাজী রওশন আক্তার বলেন, ভিজিডি কর্মসূচির পাশাপাশি গার্মেন্টসে কর্মরত শিশুকে দুগ্ধদানকারী মায়েদের জন্যও ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম ও গাজীপুওে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। নীতিমালা অনুযায়ী কাজ করলে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সমন্বয়হীনতা থাকার কথা নয়। এজন্য দরকার বাস্তবায়নকারীদের সততা ও আন্তরিকতা। ড. এম এম আকাশ বলেন, দেশের দারিদ্র্য মানচিত্র বিবেচনায় নিয়ে বরাদ্দ দিতে পারলে স্বল্প সম্পদের অপেক্ষাকৃত সুষ্ঠু বণ্টন সম্ভব হবে। স্থানীয় দরিদ্র মানুষকেই তাদের উপকারভোগী নির্বাচনের দায়িত্ব দিতে হবে, তাহলেই প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে কর্মসূচির সুফল পৌঁছাবে। মোবাইলে সরাসরি অর্থ প্রদানসহ প্রযুক্তির অধিকতর ব্যবহার এ প্রক্রিয়াকে আরো সহজতর করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। শেখ আতাহার হোসেন বলেন, বর্তমানে শিওর ক্যাশের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা সরাসরি উপবৃত্তির অর্থ পাচ্ছে। জনপ্রতিনিধি, সরকারি কর্মচারী ও এনজিওÑ এ তিন পক্ষের সমন্বয় ঘটলে সকল কর্মসূচিই সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব। মোহাম্মাদ শহীদুল ইসলাম বলেন, এনএসএসএসের সফল বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রণালয়কে ৫টি ক্লাস্টারে ভাগ করা হয়েছে। বর্তমানে সরকার জাতীয় ডাটাবেজ তৈরি করছে, এটি সম্পূর্ণ হলে এমআইএসের মাধ্যমে সঠিক উপকারভোগী নির্ণয় করা সহজতর হবে। সরকার আগামী বছর থেকে উপকারভোগীদের সরাসরি অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা চালু করতে যাচ্ছে, ফলে সমস্যার দ্রুত নিষ্পত্তির পাশাপাশি জবাবদিহিতার ক্ষেত্রও সম্প্রসারিত হবে। সম্মেলনের সার-সংক্ষেপ তুলে ধরে মহসিন আলী বলেন, ‘সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী’ নামটাই অধিকার বিষয়টিকে আড়াল করে। প্রতিবছর বরাদ্দ ও উপকারভোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও উপকারভোগী নির্বাচনে মিস টার্গেটিং এখনও আছে। যেখানে এনজিও কাজ করছে সেখানে কর্মসূচির বাস্তবায়ন অপেক্ষাকৃত ভালো। সরাসরি টাকা প্রদান এবং বস্তাবন্দী ভিজিডি চাল প্রদানের ফলে দুর্নীতি কিছুটা কমেছে। যদিও সরকারি মনিটরিং ব্যবস্থা যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। নগর দরিদ্রদের জন্য কর্মসূচি নেই। এ প্রেক্ষিতে এনএসএসএস-এর প্রথম পর্বের সময়কালের লক্ষ্য অর্জন সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ।