মাতৃভাষার উৎস সন্ধান : ভাষা সংরক্ষণ প্রসঙ্গ

প্রকাশিত: ১:৪২ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০২১

মাতৃভাষার উৎস সন্ধান : ভাষা সংরক্ষণ প্রসঙ্গ

মাসুদুল হক
আমাদের মাতৃভাষার উৎস সন্ধান করতে গিয়ে দেখা যায় এশিয়া ও ইউরোপের ভাষাগুলোর অদ্ভুত যোগসূত্র রয়েছে।আমরা বাংলায় বলি ‘স্বপ্ন’। হিন্দি উর্দুসহ উপমহাদেশের বেশ কয়েকটি ভাষাতে স্বপ্নকে ‘স্বপ্ন’ই বলে, তবে উচ্চারণে একটু ভিন্নতা লক্ষণীয়।লক্ষ করলে দেখা যাবে ইউরোপের কয়েকটি দেশের ভাষায় ‘স্বপ্ন’কে যে শব্দে চিহ্নিত করা হয়,তার সঙ্গে আমাদের বাংলার অবিশ্বাস্য মিল রয়েছে।যেমন, ‘ংড়হ'(রাশিয়ান ),ংড়হমব(ফ্রেন্স) ংড়মহড়(ইটালিয়ান),ংড়হযড়(পুর্তগিজ),ংঁবহড়(স্পেনীয়),ঝধঢ়হরং(লাটভিয়ান),ংড়সহর(কাতালোনিয়ান),ঝধঢ়হঁড়ঃর(লিথুনিয়ান),ংড়সহরঁস(ল্যাটিন),ংাধঢ়হধ(সংস্কৃত),ংড়হধৎ(গ্যালিশিয়ান)। কি অদ্ভুত মিল তাই না? এরকম অনেক শব্দ আছে যা ইউরোপ এবং এশিয়ার (বিশেষভাবে উপমহাদেশে) অনেক ভাষাতেতা প্রায় একই রকম। তবে উচ্চারণ একটু ভিন্ন। এটুকু বুঝা যায় যে কোথায় যেন একটু মিল আছে, যেন অদৃশ্য এক সুতায় শব্দগুলো একই জায়গায় বাঁধা আছে!
রাশিয়াতে আগুনকে ‘আগোন’ শব্দে অভিহিত করা হয়। ভাষার উৎসের সন্ধানের দিকে তাকালে দেখা যায় যে, সুদূর অতীতে রুশ, বাংলা, ইংরেজিসহ পৃথিবীর অনেক ভাষা একই মায়ের গর্ভ থেকে উৎপত্তি হয়েছে। সেই মা-ভাষাটি হচ্ছে সংস্কৃত ভাষার আদি রূপ। কালের আবর্তে ভাষাগুলোর পরিবর্তন ঘটলেও অনেক সংস্কৃত শব্দ এইসব ভাষায় এখনো রয়ে গেছে।
রুশ ভাষায় ব্যবহৃত শব্দে অনেক বাংলা /সংস্কৃত শব্দের সন্ধান এবং মিল খুঁজে পাওয়া যায়। যেমন দভা(দুই),ত্রি(ত্রি অথবা তিন),চিতেরি(চতুর্থ), পিয়াচ(পাঁচ), সেস্ত(ছয়), স্তো (শত),নভি(নুতন) ঝিভই(জীবিত), মিওরতিভি(মৃত),ঝিজিন(জীবন), মঝগ(মগজ), ভদভা (বিধবা), মিয়াসা (মাংস),গরলা(গলা) আরও অনেক শব্দ। জার্মান ভাষাতেও অনেক সংস্কৃত/বাংলা শব্দ রয়েছে। যেমন,সভাই(দুই),অক্ট(আট),ফুনফ(পাঁচ), দ্রাই(তিন), মান(মানুষ), মিসুং(মিশ্র),ভিডভে(বিধবা) , ইনেরে(অন্তরে),নামে(নাম),নাসে(নাসা/ নাক),
কাইনে(কোনো), খারাকটার(চরিত্র),দু(তুই) ইত্যাদি।
হিটলার জার্মানদের খাঁটি আর্য জাতি হিসেবে মনে করতেন, সেজন্য তার নাৎসি বাহিনীর জন্য ‘ঝধিংঃরশধ’ নামে আর্যদের একটা পবিত্র বিশেষ চিহ্ন (মনোগ্রাম) ব্যবহার করতো। ভারতবর্ষের সনাতন ধর্মাবলম্বীরা হাজার হাজার বছর ধরে সেই বিশেষ পবিত্র চিহ্নটি ‘স্বস্তিকা’ চিহ্ন নামে ব্যবহার করে আসছে। এটি মূলত আর্যদের একটি পবিত্র ধর্মীয় চিহ্ন।
গবেষণায় উঠে এসেছে যে প্রায় ৭০০০ বছর আগে রাশিয়ার উরাল পর্বতমালার উপত্যকায় এবং এর আশেপাশে এক উন্নত, বুদ্ধিমান ও শক্তিশালী পশুপালক গোষ্ঠী বাস করতো। যাদেরকে আমরা আর্য জাতি নামে জানি। তারা যে ভাষায় কথা বলতো সেটি ছিলো বর্তমান সংস্কৃত ভাষার আদি একটি রূপ, (আদি ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা)। একসময় এই আর্যরা ইউরোপ, পারস্য, মধ্যপ্রাচ্য এবং আরও পরে আমাদের এই উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। আর সেজন্যেই এশিয়া ও ইউরোপের একটি বড় অংশ জুড়ে এদের ভাষার প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। বিশ্বে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৪৪৫টি ভাষা ইন্দো-ইয়োরোপীয় ভাষা পরিবারের সদস্য। পৃথিবীর প্রায় ৪৬% মানুষ ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষায় কথা বলে। বিশ্বের বড়(অর্থাৎ যে ভাষায় বহু মানুষ কথা বলে) ২০টি ভাষার মধ্যে ১২টি ভাষাই এই ভাষা পরিবারের সদস্য। এই ভাষাগুলো হলো স্প্যানিশ, ইংলিশ, পর্তুগিজ, রাশিয়ান, জার্মান, ফ্রেঞ্চ, ইটালিয়ান, বাংলা, হিন্দি, উর্দু, মারাঠি, ও পাঞ্জাবি। এছাড়া মাঝারি এবং ছোট অনেক ভাষা আছে যেগুলো এই ভাষা পরিবারের সদস্য।
পৃথিবীর প্রাচীন ভাষাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন ভাষা হিসেবে ধরা হয় সংস্কৃত ভাষাকে। আদি সংস্কৃত ভাষার বয়স প্রায় ৭০০০ বছর। আর বর্তমান সংস্কৃত ভাষাও প্রায় ৫০০০ বছর পুরনো। আর জীবিত ভাষাগুলোর মধ্যে তামিল (আদি তামিল) ভাষা সবচেয়ে প্রাচীন, বয়স প্রায় ৫০০০ বছর। অন্য পুরনো ভাষাগুলোর মধ্যে মিশরীয় (৪৬০০ বছর), গ্রীক (৩৫০০ বছর), চীনা (৩৩০০ বছর), আরবী(৩০০০ বছর), হিব্রু (৩০০০ বছর), ল্যাটিন(২৭০০ বছর) ও ফার্সি (২৬০০ বছর) ভাষা পুরনো।
বাংলা ও ইংরেজি শব্দেও অনেক মিল লক্ষণীয়, তার কিছু উদাহরণ:
নাম – ঘধসব, নাসিকা –ঘড়ংব, মানুষ–গধহ, পথ – চধঃয, দ্বার –উড়ড়ৎ, মিশ্র – গরী, মধ্যম –গবফরঁস, মহা –গবমধ, দন্ত(দাঁত) –উবহঃধষ, ত্রি (তিন)–ঞযৎবব, আট –ঊরমযঃ, ঘাস –এৎধংং, সমিতি –ঈড়সসরঃঃবব, মন – গরহফ, বমি –ঠড়সরঃ, জংগল–ঔঁহমষব, লাখ –খধপ, শৃগাল –ঔধপশধষ, স্বর্প – ঝবৎঢ়বহঃ,অক্ষ –অীরং, গো –ঈড়,ি অনামিকা –অহড়হুসড়ঁং, ধাম –উড়স, অগ্নি –ওমহরঃব, বাহন – ঠধহ, মুষিক – গড়ঁংব,পদ(পা)– ঋড়ড়ঃ, চন্দন –ঝধহফধষ,হৃদয় –ঐবধৎঃ,সমান –ঝধসব প্রভৃতি।
এই যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভাষার সঙ্গে আমাদের মাতৃভাষার যে মিল, তার তুলনামূলক পর্যালোচনা অব্যাহত রাখলে আমাদের মাতৃভাষার উৎস সন্ধানের কাজটি সহজতর হবে। এই উৎস সন্ধানে ভাষার সংরক্ষণের বিষয়ে মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। কেননা, নানা মাত্রিক অবক্ষয় ও অভিঘাতে আমাদের ভাষা পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে। এ কারণে ভাষা সংরক্ষণের দিকে আমাদের লক্ষ রাখতে হবে।সিলেটের শ্রমঙ্গলের চাবাগানে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের ভাষা সমীক্ষা করে দেখা গেছে, সেখানকার নৃগোষ্ঠী ভাষার শব্দের সঙ্গে বাংলা শব্দের অনেক মিল রয়েছে। যেমন, বাংলা ‘চাঁদ’ শব্দটি সাদরী ভাষায় ‘চান্দা’, মু-ারী ভাষায় ‘চাঁদমেনারে’, উরিয়া ভাষায় ‘চান্দা’,সাঁওতালী ভাষায় ‘চান্দা’, মণিপুরী ভাষায়’চান্দগো’ শব্দে চিহ্নিত হয়। এর কারণ একই ভাষা পরিবার; ভৌগোলিক অবস্থান;ধর্ম, সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি; পারিপার্শ্বিক ঘটনা ও অবস্থা। পেশা ও অর্থনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের ভাষার আদান-প্রদান যেমন ঘটেছে ;তেমনি সংস্কৃতি, রাজনীতি, অর্থনীতি ও ধর্মীয় ইত্যাদি নানা কারণে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা বিলুপ্তির সঙ্কটে পড়েছে।নৃগোষ্ঠী ভাষার পরিবর্তন ও বিলুপ্তির কারণ হিসেবে ক্ষেত্রসমীক্ষায় উঠে এসেছে :
১.এক গোত্রের সঙ্গে অন্য গোত্রের বিয়ের ফলে মূল ভাষার পরিবর্তন ঘটেছে।
২. সামাজিক, জাতিগত, আর্থ-রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কারণে মূল ভাষার পরিবর্তন ঘটেছে এবং মিশ্র ভাষার সৃষ্টি হচ্ছে। এই মিশ্র ভাষাটি ধীরে ধীরে জনসাধারণের বহু ব্যবহারের ফলে মূল ভাষাই হারিয়ে যাচ্ছে।
৩. মিশ্র সাংস্কৃতিক চর্চার ফলে ভাষার রূপান্তর ঘটছে।
৪. প্রভাবশালী ভাষার আগ্রাসন, যোগাযোগ মাধ্যম ও মূলধারার সংস্কৃতির প্রকাশ ও বিকাশে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের ভাষা বিলুপ্ত হচ্ছে।
৫. প্রাকৃতিক পরিবেশের পরিবর্তনের কারণে নৃগোষ্ঠীসমূহের ভাষা বিপন্ন হচ্ছে।
৬. কৃত্রিম বস্তুজগৎ ও তার প্রভাবে তৈরি হওয়া নতুন নতুন সামগ্রীর ব্যবহার নৃগোষ্ঠীর ভাষায় অভিঘাত ফেলছে।
৭. নৃগোষ্ঠী সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার লিখিত রূপ নেই বলে, তাদের ভাষা ক্রমান্বয়ে বিলুপ্ত হচ্ছে।
৮. মাতৃভাষায় শিক্ষাব্যবস্থা ও নিজস্ব বর্ণমালা না থাকার কারণে নৃগোষ্ঠী ভাষা তার বৈভব ও সক্ষমতা হারাচ্ছে।
৯. নৃগোষ্ঠীসমূহের ভাষার মিশ্রণে নতুন ভাষারীতি তৈরির কারণে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষার গতিপ্রবাহ ও বৈশিষ্ট্য প্রাণ হারাচ্ছে।
১০. ধর্ম পরিবর্তন এবং সাংস্কৃতিক রূপান্তরের কারণে নৃগোষ্ঠীর ভাষা বিলুপ্ত হচ্ছে।
এই বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে আমরা উপলব্ধি করতে পারছি মানুষের অস্তিত্ব, সংস্কৃতি ও জীবনপ্রবাহ অক্ষুন্ন রাখতে ভাষা সংরক্ষণের বিকল্প নেই। সেই প্রেক্ষাপটে ভাষা সংরক্ষণ বিষয়ে আলোকপাত প্রয়োজন।
ভাষা সংরক্ষণ কী
ভাষা সংরক্ষণ হ’ল ভাষার অস্তিত্ব হারিয়ে যাওয়ার হাত থেকে ভাষাকে রক্ষা করার প্রয়াস। কোনো ভাষা যখন তরুণ প্রজন্মকে আর শেখানো হয় না , তখন সে ভাষা হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকে; সেইসঙ্গে যখন ভাষার অনর্গল বক্তা (সাধারণত বয়স্ক) মারা যায়,সেক্ষেত্রে ভাষা হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরী হয়।
ভাষা যে কোনো সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ; কারণ এটি মানুষকে যোগাযোগ করতে এবং তাদেরকে প্রকাশ করতে সক্ষম করে তোলে। যখন কোনো ভাষা মরে যায়,তার মধ্য দিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সংস্কৃতিটির একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হারিয়ে ফেলে, এমনকি তা অনুভবের চেতনাও হারিয়ে যায়। এ বিষয়টি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি দুর্বল দিক; তাই ভাষা সংরক্ষণে বিশেষ মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন।
জাতিসংঘের শিক্ষা, বৈজ্ঞানিক ও সাংস্কৃতিক সংস্থা ইউনেস্কো-র “অ্যাটলাস অফ ল্যাঙ্গুয়েজস অফ দ্য রিপোর্টার অব ডিস্পিয়ারিং” -এ প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায় যে, বিশ্বব্যাপী এখনো আনুমানিক ,৭০০০টি কথ্যভাষা আছে,তবে বিশ্ব জনসংখ্যার অর্ধেক লোক মাত্র আটটি প্রধান ভাষায় কথা বলে।(১)
প্রায় ৩০০০ এরও বেশি ভাষা ১০০০০এরও কম লোক দ্বারা কথিত হচ্ছে। এসআইএল(ঝওখ)ইন্টারন্যাশনাল গবেষণা করে দেখিয়েছে যে ৪১৭টি ভাষা বিলুপ্তির পথে রয়েছে।(২) ভাষার সুরক্ষা মূলত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষারই কাজ। যেমন , ব্লু শিল্ড ইন্টারন্যাশনালের সভাপতি কর্ল ভন হ্যাবসবার্গ বলেছেন, “আজ, আমরা প্রতি ছয় সপ্তাহে বিশ্বে একটি ভাষা হারিয়ে ফেলছি। প্রায় ৬৮০০টি ভাষা রয়েছে, কিন্তু বিশ্ব জনসংখ্যার ৯৬ শতাংশই ১০০ ভাগ ভাষার মাত্র ৪ শতাংশ ভাষাতে কথা বলে এবং বিশ্বের মাত্র চার শতাংশ মানুষ ৯৬ শতাংশ ভাষায় কথা বলে । এই চার শতাংশ বড় ভাষার জনগোষ্ঠী ও তাদের ভাষা কোনো ঝুঁকির মধ্যে নেই। তবে আমাদের জানা মতে ৯৬শতাংশ ভাষাই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ঐ ভাষা ও ভাষাভাষী গোষ্ঠী বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির মতো বসবাস করছে। “(৩)
ভাষা বিপন্ন বা বিলুপ্তির কারণ
কোনো ভাষা বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পরবার বিভিন্ন ধরনের কারণ রয়েছে। যেমন, যখন কোনো ভাষা জাতি বা সম্প্রদায়ের শিশুদের শেখানো হয় না;অনন্ত বেশি সংখ্যক শিশু ঐ নির্দিষ্ট ভাষা শেখা থেকে বঞ্চিত হলে। ঐ ভাষার সাবলীল বক্তা শুধুমাত্র প্রবীণ সদস্যগণ হয়ে উঠলে,তাদের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে ভাষাটিও মারা যায়।
উল্লেখ্য শুধু শিশু বক্তারাই কোনো ভাষার বেঁচে থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করতে যথেষ্ট নয়। শিশুরা যে ভাষায়কথা বলে তাদের যদি অন্য কোনো জায়গায় স্থানান্তরিত করা হয়, যেখানে ঐ ভাষা চর্চিত হয় না, তখন ভাষা বিপন্ন হযে পড়ে। রাজনৈতিক এবং সামরিক অস্থিরতাও ভাষাকে বিপন্ন করতে পারে।(৪) জনগণ যখন তাদের বাড়ি-ঘর ছেড়ে নতুন জায়গায় যেতে বাধ্য হয়, তখন তাদের ঐ স্থানের সঙ্গে খাপ খাইযে নিতে ঐ অঞ্চলের ভাষা শিখতে হয় এবং তারা তাদের পূর্বের ভাষাকে হারিযে ফেলতে থাকে। একইভাবে, যখন কোনো দেশ বা অঞ্চল আক্রান্ত হয়, জনগণ আক্রমণকারীদের ভাষা শিখতে বাধ্য হতে পারে। যেমন, পাকিস্তান শাসনের ফলে আমরা উর্দু ভাষা চর্চায় বাধ্য হচ্ছিলাম।
একটি ভাষা নি¤œœ স্তরের সামাজিক শ্রেণীর সঙ্গেও যুক্ত থাকতে পারে। ৫) এ ক্ষেত্রে অনেক সময় দেখা যায়, সচেতন পিতা-মাতা তাদের শিশুদের ঐ ভাষাভাষী নিম্ন শ্রেণী থেকে দূরে রাখতে উৎসাহিত করেন। এই ঘটনার ফলে এক বা দুটি প্রজন্মের মধ্যেই ভাষাটি সহজেই হারিয়ে যেতে পারে।

ভাষা সংরক্ষণের গুরুত্ব
যখন কোনো ভাষা মরে যায়, তখন ঐ জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতির মধ্যকার জ্ঞান,শিক্ষা,চিন্তা হুমকির মধ্যে পড়ে এবং উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত ঐ জ্ঞান নতুন প্রজন্ম এবং স্থানীয় ভাষা চর্চাকারীদের মধ্যে আর সঞ্চারিত হয় না। প্রতিটি ভাষা মারা যাওয়ার সাথে সাথে ভাষাবিজ্ঞান, নৃবিজ্ঞান, প্রাগৈতিহাসিক এবং মনোবিজ্ঞানের তথ্য, উৎসগুলো বৈচিত্র হারাতে থাকে।(৬)।তাই ভাষা সংরক্ষণের গুরুত্ব অনস্বীকার্য।
ভাষা সংরক্ষণের উপায়
কোনো ভাষা সংরক্ষণের সর্বোত্তম উপায় সম্পর্কে বিভিন্ন ধারণা রয়েছে। একটি উপায় হ’ল তরুণ প্রজন্ম বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে ভাষায় কথা বলতে উৎসাহিত করা, তার ফলে তারা তাদের সন্তানদেরও ভাষা শেখাবে।কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে, এই প্রক্রিয়াটি বাধাগ্রস্থ হয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগ মধ্যমে কর্পোরেট পুঁজি উদ্বোধিত সবল ভাষার আগ্রাসনে। রাজনীতি, অর্থনীতি,সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মতো অনেকগুলো উপাদান রয়েছে যা প্রায়শই ভাষার ক্ষতি করে চলছে এবং এর বেঁচে থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য এই প্রতিটি কারণকে নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠছে।
ভাষা বিলুপ্তি ও সংরক্ষণ সম্পর্কিত বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে ইন্টারনেট ব্যবহার করা যেতে পারে। ইন্টারনেট অনুবাদ, ক্যাটালগ তৈরি ও সংরক্ষণ এবং ভাষাসমূহে তথ্য-উপাত্ত ও এর সার্বিক বিচরণে ব্যবহৃত হতে পারে। পডকাস্টের মতো নতুন প্রযুক্তিগুলো ভাষার কথ্য সংস্করণের সংরক্ষণে ব্যবহার করা যেতে পারে এবং লিখিত নথিতে ভাষার আদি সাহিত্য ও ভাষাতত্ত্ব সম্পর্কে তথ্য সংরক্ষণ করে ভাষার বিলুপ্তি ঠেকানো সম্ভব হতে পারে।
উল্লেখ্য স্থানীয় সাহিত্য এবং ভাষাতত্ত্ব সম্পর্কে তথ্য সংরক্ষণের জন্য লিখিত নথিপত্রের ব্যবহারই যথেষ্ঠ নয়। কোনো ভাষা লিখিত থাকার মানেই এই নয় যে এটি বেঁচে থাকবে। বই বা পা-ুলিপি আকারে লিখিত তথ্যগুলোর ক্ষেত্রে অ্যাসিড সমস্যার কারণে বই ধ্বংস হতে পারে, এছাড়া বাঁধাই , পরিবেশগত সমস্যা এবং সর্বোপরি সুরক্ষাও উদ্বেগের বিষয় হতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে ভাষার কথ্য সংস্করণগুলোর অখ-তা রক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহার করা জরুরি। মৌখিক ইতিহাস রেকর্ডে ব্যবহৃত একই কৌশলগুলির মাধ্যমে অনেক কথ্যভাষা সংরক্ষণ সম্ভব হয়েছে। সংরক্ষণবিদরা ভিডিও রেকর্ডিংসহ রিল-টু-রিল অডিও টেপ রেকর্ডিং এবং ভাষার কথ্য তথ্যগুলো রেকর্ড করতে পডকাস্টের মতো নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে সফল হয়েছেন।তবে মাথায় রাখতে হবে নতুন প্রযুক্তিও ঝুঁকিপূর্ণ। অডিও টেপ রেকর্ডিং বা ভিডিও টেপের মতো নির্দিষ্ট মিডিয়াা শোনার বা দেখার প্রযুক্তি যদি কোনো কারণে হারিয়ে যায় তবে সংরক্ষণের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবে।
নেটিভ আমেরিকানদের অস্তিত্ব রক্ষায় সেখানে গড়ে ওঠা প্রশাসনিক সংস্থা “জাদুঘর ও সংরক্ষণাগার” স্থাপনের জন্য যে রেফারেন্স গাইড প্রকাশ করেছে, তাতে ব্যাখ্যা করা হয়েছে কেন দীর্ঘমেয়াদী ভাষা সংরক্ষণের চেষ্টার প্রয়োজন।(৭) কী সংরক্ষণ করতে হবে এবং কেন? গাইডে সে বিষয়ে ব্যবহারিক পরামর্শ দেয়া হয়েছে। একটি ভাষার সংগ্রহস্থল কী, কীভাবে এটি তৈরি করতে হয় এবং কীভাবে ভাষাগোষ্ঠীকে সে প্রচেষ্টায় জড়ানো যাবে –সে প্রসঙ্গেও আলোকপাত রয়েছে।
নানা দেশ ও সংস্কৃতির ভাষা সংরক্ষণের অভিজ্ঞতার আলোকে বোঝা যায় মাতৃভাষার উৎস সন্ধান,চর্চা, প্রসার ও বিকাশে ভাষা সংরক্ষণএবং প্রযুক্তির ব্যবহার অনিবার্য।
তথ্যনির্দেশ
১. “খধহমঁধমব চৎবংবৎাধঃরড়হ: টঘঊঝঈঙ-ঈও”. জবঃৎরবাবফ ২০০৭-০৬-১০.
২. “ঊঃযহড়ষড়মঁব: খধহমঁধমবং ড়ভ ঃযব ডড়ৎষফ”. জবঃৎরবাবফ ২০০৭-০৬-১০.
৩. ওহঃবৎারবি রিঃয কধৎষ াড়হ ঐধনংনঁৎম (এবৎসধহ) রহ জচ-ঙহষরহব, ১৮ ঙপঃড়নবৎ ২০১৮.
৪.ঋড়ঁহফধঃরড়হ ভড়ৎ ঊহফধহমবৎবফ খধহমঁধমবং”. জবঃৎরবাবফ ২০০৭-০৬-১০.
৫.”খধহমঁধমব চৎবংবৎাধঃরড়হ: টঘঊঝঈঙ-ঈও”. জবঃৎরবাবফ ২০০৭-০৬-১০.
৬.”খধহমঁধমব চৎবংবৎাধঃরড়হ: টঘঊঝঈঙ-ঈও”. জবঃৎরবাবফ ২০০৭-০৬-১০.
৭.”অঘঅ জবভবৎবহপব এঁরফব ভড়ৎ ঊংঃধনষরংযরহম অৎপযরাবং ধহফ জবঢ়ড়ংরঃড়ৎরবং” (চউঋ). জবঃৎরবাবফ ২০১০-১২-০৭.

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি
অষনবু, গধৎশ. ঝঢ়ড়শবহ ঐবৎব: ঞৎধাবষং অসড়হম ঞযৎবধঃবহবফ খধহমঁধমবং. ইড়ংঃড়হ: ঐড়ঁমযঃড়হ গরভভষরহ ঈড়সঢ়ধহু, ২০০৩.
অুবৎ, অ. ঔ. ষধহমঁধমব,ঞৎঁঃয ধহফ খড়মরপ. খড়হফড়হ: চবহমঁরহ ইড়ড়শং,২০০১
ইৎধফষবু, উধারফ ধহফ গধুধ ইৎধফষবু, বফরঃড়ৎং.খধহমঁধমব ঊহফধহমবৎসবহঃ ধহফ খধহমঁধমব গধরহঃবহধহপব. খড়হফড়হ: জড়ঁঃষবফমবঈঁৎুড়হ, ২০০২.
ঈযধঃঃবৎলর,ঝঁহরঃর কঁসধৎ.কড়ষশধঃধ:জঁঢ়ধ ধহফ ঈড়সঢ়ধহু,২০০২
ঈৎুংঃধষ, উধারফ. খধহমঁধমব উবধঃয. টহরঃবফ করহমফড়স: ঈধসনৎরফমব টহরাবৎংরঃু চৎবংং, ২০০০.
উধষনবু, অহফৎব.ি খধহমঁধমব রহ উধহমবৎ. খড়হফড়হ: ঞযব চবহমঁরহ চৎবংং, ২০০২.
ঘবঃঃষব, উধহরবষ ধহফ ঝুঁধহহব জড়সধরহব. ঠধহরংযরহম ঠড়রপবং: ঞযব ঊীঃরহপঃরড়হ ড়ভ ঃযব ডড়ৎষফ’ং খধহমঁধমবং. ঙীভড়ৎফ: ঙীভড়ৎফ টহরাবৎংরঃু চৎবংং, ২০০০.
সেন, সুকুমার:ভাষার ইতিবৃত্ত, কলকাতা: আনন্দ পাবলিশার্স, ২০১৩

Calendar

March 2021
S M T W T F S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031  

http://jugapath.com