মাতৃভাষায় সদর অন্দর

প্রকাশিত: ৯:৩২ পূর্বাহ্ণ, মে ৩১, ২০২১

মাতৃভাষায় সদর অন্দর

কাজী নুসরাত সুলতানা

সে একটা সময় ছিল যখন মাতৃভাষার অধিকার রক্ষার জন্য একত্র হয়ে আমরা, এই পূর্ববঙ্গের বাঙ্গালীরা, প্রতিবাদের একটা শক্ত দেয়াল তৈরী করেছিলাম। সে দেয়ালে আছড়ে পড়ে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গিয়েছিল বিরুদ্ধবাদীদের সমস্ত প্রচেষ্টা; আমরা প্রতিষ্ঠা করেছিলাম আমাদের ভাষার মর্যাদা। সেই যে পথ কাটা হল, বলা হয় সংগ্রামী সেই পথ বেয়ে এগিয়ে এসেই আমরা অর্জন করেছি একটি স্বাধীন রাষ্ট্র, আমাদের বাংলাদেশ। কিন্তু তারপর কি হল! একটা স্বাধীন রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাভাষার মর্যাদা কি সত্যিই প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি আমরা? শ্রদ্ধার আসনে কি বসাতে পেরেছি আমরা বাংলাভাষাকে? বলা যেতে পারে – কেন নয়? আমরা তো সংবিধানে লিখেছি যে বাংলা হবে রাষ্ট্রভাষা! কথা বলছি বাংলায় বাড়িতে, আপিসে; বাংলায় লেখা গল্প, কবিতা, উপন্যাসও তো আসছে প্রচূর একুশের বইমেলায়! মুক্তবুদ্ধির চর্চা তো হচ্ছে, প্রকাশও পাচ্ছে তা প্রবন্ধে, গবেষণাপত্রে; ব্যান্ডদলের ছেলেরাও তো গান বাঁধছে বাংলাতেই; তারপরেও এই আক্ষেপ কেন?
হ্যাঁ, তারপরেও আক্ষেপ। এতকিছুর পরেও বলব আমরা মর্যাদা দিচ্ছি না আমাদের মাতৃভাষার; অশ্রদ্ধায়, অবহেলায় আটপৌরে শাড়ীজামার মত ফেলে রেখেছি অন্দরে। নইলে আজ ভাষা আন্দোলনের আধশতকেরও বেশী বছর পর একুশের বইমেলার বিপনীতে দাঁড়িয়ে ক্রেতার জিজ্ঞাসা শুনতে হয়, “ইংরেজী কবিতার বই আছে বাচ্চাদের জন্য?” প্রশ্নটা মাথায় হাতুড়ি পেটায়। তবু শান্ত স্বরে বলি, “না, ওগুলো পাবেন নিউ মার্কেটে”। যিনি আমার কাছে ইংরেজী ছড়ার বই চেয়েছিলেন তিনি সাধারণ মধ্যবিত্ত সমাজেরই মানুষ। সেই জন্যেই বোধহয় অস্থানে বাক্যব্যয় করেছিলেন। কারণ উচ্চবিত্তের কেউ হলে জানতেন ও ধরণের বই কোথায় পাওয়া যায়। যাইহোক প্রশ্নটি হাতুড়ি পেটানো বন্ধ করলেও পিছু ছাড়ছেনা আমার। খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে আমার মাথার পোকাগুলোকে নাড়িয়ে দিচ্ছে বারবার। আমি শিক্ষাদর্শনের একজন নগন্য শিক্ষক ; সেজন্যই বোধহয় আমার এই অবস্থা।
আপাতদৃষ্টিতে প্রশ্নটা সোজাসরল হলেও আমার কাছে এর তাৎপর্য বেশ গভীর বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। আচ্ছা প্রশ্নটি এবং প্রশ্নকর্তার প্রেক্ষিত একটা বক্তব্যে প্রকাশ করলে কি দাঁড়ায়?
একজন সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষ একুশের বইমেলা থেকে তাঁর শিশুর জন্য ইংরেজী ছড়ার বই কিনতে চাইছেন।
পাঠক পাল্টা প্রশ্ন করতে পারেন – তাতে হলটা কি? বেশ। তাহলে আরো কিছু প্রশ্নের উত্তর খোঁজা যাক। কে, কি বই খুঁজছেন? একজন সাধারণ মধ্যবিত্তের মানুষ শিশুতোষ ইংরেজী বই খুঁজছেন। অনুমান করা যেতে পারে তাঁর শিশুটি ইংরেজী মাধ্যম প্রাক-প্রাথমিক অথবা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ে। পাকিস্তানী ঔপনিবেশিক কালেও ইংরেজী-মাধ্যম বিদ্যালয় ছিল কিছু। সে সব বিদ্যালয়ে উচ্চবিত্তের ও কিছু উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সন্তানেরা পড়ত। এখন গন্ডি বি¯তৃত হয়েছে অনেকখানি। একটা গুণগত পরিবর্তন বৈকি ! কিন্তু সে পরিবর্তন কি ভালর দিকে হয়েছে? সে আলোচনায় আসছি পরে। আরেকটা প্রশ্ন: কোথায় খুঁজছেন? উত্তর: একুশের বইমেলায়। এ থেকে কি এটা অনুমান করা নিতান্তই অসঙ্গত হবে যে ওই ভদ্রলোক একুশে ফেব্র“য়ারি এবং একুশের বইমেলার তাৎপর্য সম্যক ভাবে অবগত নন? এটাইবা কিসের লক্ষণ! ঐ ঘটনাটি থেকে আমি দুটি প্রকল্প তৈরী করতে চাই।
১। বাঙ্গালীর মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ অর্জনের পর বর্তমানে প্রাক-প্রাথমিক পর্যায় থেকে ইংরেজী মাধ্যমে পড়ালেখা করানোর হার বেড়ে গেছে পাকিস্তান-পর্যায়ের চেয়ে অনেক অনেক গুণ বেশী।
২। বর্তমানের বাংলাদেশের বেশীরভাগ মানুষ একুশে ফেব্রুয়ারির ইতিহাস ও তাৎপর্য সম্বন্ধে সম্যকভাবে অবগত নন।
প্রকল্প প্রনয়নের পর গবেষকের দায়িত্ব প্রকল্পটিকে প্রতিষ্ঠিত করা। প্রথম প্রকল্পের ক্ষেত্রে আসি। এটিকে প্রতিষ্ঠিত করতে আমাকে বিশেষ বেগ পেতে হবে না। যে কেউই ইচ্ছে করলে এটা করতে পারবেন। দৈবচয়নের মাধ্যমে দেশের কিছু শহরের বর্তমানের স্কুলগামী শিক্ষার্থীর সংখ্যা, ইংরেজি-মাধ্যম বিদ্যালয়ের সংখ্যা ও সেসব বিদ্যালয়ে পাঠরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা সংগ্রহ করে সেগুলোর সঙ্গে পাকিস্তান-কালের শেষের দিকের যেকোন বছরের ওগুলোর সংখ্যার তুলনা করে হার বের করলে যে ফল পাওয়া যাবে তাতে ঐ প্রকল্প প্রতিষ্ঠিত হবে বলেই মনে করি। অর্থাৎ প্রমানিত হবে যে মাতৃভাষার জন্য প্রাণপন সংগ্রাম করা বাঙ্গালীর বর্তমানের এক বিশাল ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ তাঁদের শিশু সন্তানদের মাতৃভাষা বাদ দিয়ে ইংরেজিভাষার মাধ্যমে লেখাপড়া করাচ্ছেন ; তাও রীতিমত প্রতিযোগিতা করে। সুতরাং একথা বলা বোধ হয় ভুল হবে না যে শিক্ষার বাহন হিসেবে বাংলাভাষাকে মর্যাদা না দেয়ার বরং ইংরেজিভাষাকে মর্যাদা দেয়ার ব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠা করা গেছে।
এবার পাঠক বলতে পারেন, হ্যাঁ, তাই তো হওয়া উচিত, ভালই তো করছেন তাঁরা। আজকাল ভাল করে ইংরেজি না শিখলে কি চলবে? আর ভাল করে শিখতে হলে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলেই পড়া উচিত !
এবারে তাহলে আমার জিজ্ঞাসাটির উত্তর খুঁজি – সে কি অর্থাৎ শিশুদেরকে ইংরেজি-মাধ্যম বিদ্যালয়ে পড়ানোর আগ্রহের আতিশয্য কি আমাদেরকে ভালোর দিকে নিয়ে যাচ্ছে?
বর্তমান বিশ্বে ইংরেজি ভাষার গুরুত্ব এবং আমাদের ইংরেজি শেখার প্রয়োজনীয়তাকে খাটো করে দেখার কোন উপায় নেই। কিন্তু শিশুর শিক্ষার মাধ্যম হবে কোন ভাষা- এ সম্পর্কে শিক্ষাদার্শনিক ও শিক্ষামনোবিজ্ঞানীদের সিদ্ধান্ত অনুধাবন করা প্রয়োজন বলেও মনে করি। আমি এখন কয়েকজন দেশীবিদেশী বিশেষজ্ঞের এ সংক্রান্ত বক্তব্য উপস্থাপন করে তাঁদের যুক্তি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করব। তবে তার আগে আল-কোরআনে বিধৃত মহান আল্লাহতায়লার একটি বক্তব্য উল্লেখ করতে চাই। তিনি বলছেন,
আমি প্রত্যেক রসুলকেই তার স্বজাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছি, তাদের কাছে পরিষ্কার করে ব্যাখ্যা করার জন্য (১৪:৪)।
এই বাক্যটি থেকে আমি এই বুঝি যে, প্রত্যেক ভাষাই গুরুত্বপূর্ণ এবং কোন বিষয় পরিষ্কারভাবে বোঝা অথবা বোঝানোর উপযুক্ত মাধ্যম হচ্ছে মাতৃভাষা।
আমাদের দেশীয় শিক্ষাদার্শনিকদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ অন্যতম। রবীন্দ্রনাথ তাঁর শিক্ষা সম্বন্ধীয় নানা প্রবন্ধে শিশুশিক্ষার মাধ্যম মাতৃভাষা হওয়া উচিত অথবা ইংরেজি এ নিয়ে বিস্তারিত এবং যৌক্তিক আলোচনা করেছেন। কেবল ‘শিক্ষার হেরফের’ প্রবন্ধটি পড়লেও আমরা কিছুটা ধারণা করতে পারব যে যেসব শিশুকে লেখাপড়া শেখার সুচনাকালে মাতৃভাষার মাধ্যমে শেখার সুযোগ না দিয়ে বিদেশীয় ভাষায় শিখতে বাধ্য করছি তাদের কত বড় ক্ষতি আমরা করছি। কয়েকটি পঙতি উল্লেখ করছি:-
“অত্যাবশ্যক শিক্ষার সহিত স্বাধীন পাঠ না মিশাইলে ছেলে ভালো করিয়া মানুষ হইতে পারে না–বয়োপ্রাপ্ত হইলেও বুদ্ধিবৃত্তি সম্বন্ধে অনেকটা পরিমাণে বালক থাকিয়াই যায়।
কিন্তু দুভাগ্যক্রমে আমাদের হাতে কিছুমাত্র সময় নাই। যত শীঘ্র পারি বিদেশীয় ভাষা শিক্ষা করিয়া, পাস দিয়া, কাজে প্রবিষ্ট হইতে হইবে। কাজেই শিশুকাল হইতে ঊর্ধ্বশ্বাসে, দ্রুতবেগে, দক্ষিণে বামে দৃকপাত না করিয়া, পড়া মুখস্থ করিয়া যাওয়া ছাড়া আর কোন-কিছুর সময় পাওয়া যায় না।”
পাঠক বলতে পারেন, একশ বছরের আগে রবীন্দ্রনাথ কি বলে গিয়েছিলেন তা আজকের এই উন্নততর জীবনচর্যার প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে কোনভাবেই কি মেলানো সম্ভব? আমি বলব, সত্যিই কি আমরা খুব একটা এগিয়েছি সামাজিক জীবন চর্চার ক্ষেত্রে? বস্তুগত ক্ষেত্রে অভাবিতপুর্ব পরিবর্তন ঘটেছে বটে, কিন্তু মানুষ হিসেবে উন্নত, মার্জিত অবস্থানে কি আমরা আমাদেরকে নিয়ে যেতে পেরেছি? বস্তুগত যে পরিবর্তন দৃশ্যমান তাও আমরা আমাদের সৃষ্টি দিয়ে বিশেষ গড়িনি; ধার করে এনেছি অন্যের কাছ থেকে। তাই বলছি, রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর মত অবস্থানে বিশ্বাসী অন্যান্ন শিক্ষাদার্শনিকদের মূল বক্তব্যকে যদি ভিত্তি ধরে সময়ের দাবী অনুযায়ী পরিমার্জন করতে করতে অগ্রসর হয়ে আসতাম তাহলে আমরা আমাদের প্রতি প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের জন্য যুগোপযোগী শিক্ষাদর্শন বিনির্মান করতে পারতাম। আমরা তা করিনি। বরং বিজাতীয় ধ্যানধারনাকে তার ভাষা-সংস্কৃতিসহ আমাদের মাটিতে প্রথিত করে অগ্রসরমানতার পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করতে ব্যাপৃত থেকেছি। ফলে রবীন্দ্রনাথ তাঁর কালের শিক্ষার্থীদের যে দুর্ভোগ প্রত্যক্ষ করেছিলেন, বর্তমানের আমাদের দেশের ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষাগ্রহণ করা পঁচানব্বই শতাংশ শিক্ষার্থীর বেলায়ই তা প্রজোয্য বলে মনে করি।
একটা কথা এখানে প্রণিধান করতে অনুরোধ করি ; আমি শিশুর শিক্ষারম্ভের কালের কথা বলছি,বিদ্যালয়ের শিক্ষার কালের কথা বলছি, বিদ্যালয়-পরবর্তীকালের কথা নয়। এই সময়ের শিক্ষা মাতৃভাষায় না হলে আমরা চিন্তাশক্তিতে বলীয়ান শিক্ষার্র্থী পাব না। চিন্তাশক্তিতে বলীয়ান না হলে আত্মশক্তিতে গরীয়ান মানুষ গড়ে ওঠেনা। আর কেবল বলিষ্ঠ আত্মশক্তিসম্পন্ন মানুষই পারেন সমাজে অবদান রাখতে, সমাজের উন্নয়নে স্বাক্ষর রাখতে।। টি.পার্সি নান শিক্ষার সংঙ্গা দিতে গিয়ে সমাজে অবদান রাখতে পারার যোগ্যতাকে শিক্ষিত মানুষের অন্যতম বৈশিষ্ট্য বলে নির্ধারণ করেছেন। আমি মনে করি তা যথার্থই বটে।
প্রাণীজগতের সদস্যদের মধ্যে মানুষকেই সবচেয়ে বেশী শিখতে হয়। অর্থাৎ মানুষের সহজাত আচরণের পরিমান সবচেয়ে কম। এক মানুষ আরেক মানুষের কাছ থেকেই শেখে সব চেয়ে বেশী। ভাষা তৈরী করে মানুষ এই প্রক্রিয়াকে সহজতর ও কার্যকর করেছে। প্রত্যেক প্রাণীরই ভাষা আছে। কিন্তু মানুষের বুদ্ধিবৃত্তি অনেক উন্নততর পর্যায়ের হওয়ায় তার ভাষাকে সে অনেক জটিল, সমৃদ্ধ ও বৈচিত্রপূর্ণ করে তুলতে পেরেছে; অবশ্যই ধীরে ধীরে। তাছাড়া শিশুর ভাষা আয়ত্ব করার বুদ্ধিবৃত্তিক সাংগঠনিক ক্ষমতাও অভাবনীয়। শিশু যে ভাষা-পরিবেশে জন্ম গ্রহন করে, সে ভাষাতেই প্রথম কথা বলে এবং অচিরেই সে সেই ভাষাতেই তার সগৌরব অস্তিত্বের জানান দেয়। সুতরাং বলা যায় মাতৃভাষা বা প্রাথমিক ভাষার উপর শিশুর অধিকার যেমন স্বাভাবিক তেমনি সে ভাষাতে বুৎপত্তি অর্জনও তার জন্য সহজতর।
শিশুর ভাষার বিকাশের সঙ্গে চিন্তাশক্তির বিকাশের একটা গভীর সংযোগ আছে। আমাদের দেশে আমাদের শিক্ষার্থীদের ভাষাশিখনসংক্রান্ত যোগ্যতা-অযোগ্যতা, সমস্যা-সম্ভাবনা ইত্যাদি নিয়ে তেমন কোন নীতিনির্ধারণী গবেষণা হয়েছে বলে আমার জানা নেই (কযধঃবসধহ অৎধ ইবমঁস-এর ঞযব খহমঁধমব উবাবষড়ঢ়সবহঃ ড়ভ ঈযরষফৎবহ ব্যাতীত, যেখানে গবেষক ০ থেকে ৩ বছর বয়সী শিশুর ভাষাবিকাশের ধারার একটি সযতœ পর্যবেক্ষণপ্রসুত বিবরণ উপস্থাপন করেছেন) । তাই পশ্চিমী গবেষকদের শরণাপন্ন হতে হচ্ছে। শিক্ষামনোবিজ্ঞানী প্যাভলভ(১৯৫২), লিউব্লিনস্কায়া(১৯৫৭) লুরিয়া এবং ইউদোভিচ (১৯৫৯), পিয়াজেঁ(১৯৬১), ভিগোৎসকি ( ১৯৬২) থেকে শুরু করে স্পেনসার(১৯৮৮), লাইলে(১৯৯৩), হাউইশের(১৯৯৪), ড্যানিয়েল(১৯৯৬) নানা ধরণের গবেষণা করে চিন্তা করার ক্ষমতা অর্জনের সঙ্গে ভাষার যে একটা যোগাযোগ রয়েছে তা আমাদেরকে জানিয়েছেন। তাঁরা যা বলেছেন তার মূল কথা হল :
 ভাষার ব্যবহার শিশুকে বিভিন্ন বস্তুর মধ্যে তুলনা করতে সক্ষম করে, তুলনাপ্রক্রিয়ার জন্য যুক্তি ব্যবহারের প্রয়োজন হয়; যে শিশু ভাষা ব্যবহার করে না বা করতে পারে না, তার বিভিন্ন বস্তুর মধ্যে পার্থক্য করার যোগ্যতা থেকে যায় কেবল প্রত্যক্ষ অনুভুতির স্তর (ঢ়বৎপবঢ়ঃঁধষ ষবাবষ) পর্যন্ত অথবা প্রাথমিক উদ্দীপনা স্তর (ভৎরংঃ ংরমহধষরহম ংুংঃবস) পর্যন্ত।
 ভাষা অর্জনের মাধ্যমে শিশুর মৌলিক মানসিক প্রক্রিয়াগুলোর পুন:সংগঠন ঘটে থাকে। শব্দ বা বা ভাষার এককগুলো এইভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে দাঁড়ায় যা বাস্তবতা সম্পর্কে চিন্তার সঠিকতা দান করে এবং মনোযোগের, স্মৃতির, কল্পনার, চিন্তার ও কর্মের নতুন আকার গঠন করে মানসিক ক্রিয়া গঠন করে।
 মায়ের ব্যবহৃত প্রথম শব্দগুলো, যখন তিনি বিভিন্ন বস্তু দেখান এবং শব্দ উচ্চারণ করে সেগুলোর নাম বলেন তখন তা শিশুর মানসিক প্রক্রিয়া গঠনে অদৃশ্য অথচ নিশ্চিত ভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।
 শব্দের মাধ্যমে শিশু তার বস্তু-প্রত্যক্ষণকে সাধারণীশ্রেণীভূক্ত ও অপরিবর্তনীয় করে তোলে এবং শব্দের ব্যবহার সুসংগত ও প্রভেদক স্মৃতির বিকাশের নতুন নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করে।
 সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে উপযুক্ত ভাবে ভাষা ব্যবহার করতে পারার যোগ্যতা একটি হাতিয়ার স্বরূপ।
 বুদ্ধিমত্তা হচ্ছে শিক্ষা বা নির্দেশ থেকে উপকৃত হওয়ার ক্ষমতা যেখানে ভাষার থাকে একটা শক্তিশালী ভূমিকা। ভাষা হচ্ছে শিখনের হাতিয়ার এবং ধীশক্তির সহায়িকা। শিক্ষার ক্ষেত্রে বোধশক্তি ও জ্ঞানকে ব্যবহার করতে পারার যোগ্যতা অর্জন করার জন্য ভাষা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
 মৌখিক ভাষা যে কেবল সাধারণ যোগাযোগ রক্ষার কাজ করে তা নয়; এর মাধ্যমে চিন্তা, জ্ঞান এবং কৌশলেরও চর্চা হয়। কথা বলার কার্যকর যোগ্যতা নির্ভর করে নির্দিষ্ট মনোযোগ ও নিয়মিত অনুশীলনের উপর।
 শিক্ষার্থীর যুক্তি ব্যবহারের ও অনুমান করার যোগ্যতা বাধাগ্রস্ত হওয়ার প্রধানতম কারণ হচ্ছে শ্রেণীকক্ষে মৌখিক ভাষা ব্যবহারের সুযোগ কম থাকা।
 কথোপোকথনের মাধ্যমেই শিশুরা তাদের চিন্তাকে সংগঠিত করে এবং ধারণাকে কেদ্রীভূত করে।

বিভিন্ন গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফলের এই চৌম্বক বিষয়গুলো অনুধাবন করলে এ সিদ্ধান্তে পৌঁছতেই হয় যে ভাষা ব্যবহার করার দক্ষতার সঙ্গে বুদ্ধিমত্তা বিকাশের সম্পর্ক নীবিড়। প্রকৃতপক্ষে ভাষার একক,অর্থাৎ শব্দগুলো শিশুর কাছে কেবল এক একটি ধ্বনি মাত্র নয়। শব্দের মাধ্যমে শিশু এক মাস বয়স থেকেই শ্রেণীকরণের মত বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া ব্যবহার করে তার পরিবেশের উপর আধিপত্য বিস্তার করা শুরু করে। অর্থাৎ শিশুর চিন্তার প্রক্রিয়া শুরু হয় তার প্রথম ভাষা বা মা-বাবার কাছ থেকে শোনা ভাষার মাধ্যমে। ০-৩ বছর বয়স পর্যন্ত শিশু চিন্তা করার কৌশলগুলো রপ্ত করে। অর্থাৎ ভাষার যে উপাদান ও কৌশলগুলো আয়ত্ব করলে সে, অনুকুল পরিবেশ পেলে, উন্নত বুদ্ধিসম্পন্ন জীব হিসেবে চিন্তাপ্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে তা অর্জন করে নেয়। বিভিন্ন দেশে করা গবেষণার মাধ্যমে এটা জানা গেছে যে শিশুর ভাষা বিকাশের ধারা বিশ্বের গড় শিশুর মধ্যে একই ধরণের; এখানেও ‘নর্মাল কার্ভ’বা ‘স্বাভাবিক বক্রতা’-এর বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়। তবে কম বেশী হওয়ার কারণ হিসেবে কিছু ক্ষেত্রে শারীরিক সমস্যা চিহ্নিত করা গেলেও বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই ভাষা-পরিবেশের অনুকুলতা বা প্রতিকুলতার প্রভাবে ঘটে বলে প্রতীয়মান হয়।
এ বিষয়গুলো উল্লেখ করার কারণগুলো বলছি এখন। ইংরেজি-মাধ্যম শিশুশিক্ষালয়গুলোতে আড়াই থেকে তিন বছর বয়সী শিশুদেরকে ভর্তি করা হয়। এ ক্ষেত্রে বাঙ্গালী শিশুর যে সমস্যা হয় তা হল, হয় তাদেরকে চিন্তা করতে হয় বাংলায় পরে বলতে বা লিখতে হয় ইংরেজীতে অথবা ইংরেজীতে চিন্তা করার কৌশল আয়ত্ব করে উদ্দীপনায় সাড়া দিতে হয়। উভয় ক্ষেত্রেই স্বাভাবিকের চেয়ে সময় অনেক বেশী লেগে যায়। আমি বলব সময় নষ্ট হয়, ফলে জ্ঞান অর্জনের গতি শ্লথ হয়ে যায়। আরো একটি ব্যাপার ঘটে। তা হল, বেশীরভাগ শিক্ষার্থীই চিন্তা করার প্রচেষ্টা গ্রহন করা থেকে বিরত থাকে, কেবল মুখস্ত করে কাজ চালায়। ফলে অর্জিত তথ্য জ্ঞানে পরিণত হয়না; তথ্য জ্ঞানে পরিণত না হলে তা আত্মস্থ হয়না; জ্ঞান আত্মস্থ না হলে তার উচ্চতর প্রয়োগ সম্ভব হয় না; উচ্চতর পর্যায়ে প্রয়োগ করতে না পারলে নতুন জ্ঞানসৃষ্টি বা উচ্চতর প্রেক্ষিত থেকে জ্ঞানের সমন্বয় সাধন সম্ভব হয় না; আর চিন্তায় অথবা কর্মে এমনটি করতে না পারলে মানব সমাজে অবদান রাখা যায় না – যা একজন শিক্ষিত ব্যক্তির প্রধান বৈশিষ্ট্য বলে শিক্ষাদাশর্নিকেরা চিহ্নিত করেছেন। ফলে বেশীর ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থী মানুষ না হয়ে যন্ত্র হয়ে থেকে যায়, অথবা বলা যায় স্বার্থসর্বস্ব উন্নাসিক ব্যক্তি হিসেবে গড়ে ওঠে। দেশ ও জাতি তার কাছ থেকে তেমন কিছু পায় না। ‘দিবে আর নিবে মিলিবে মিলাবে’ এই সত্য তার কাছে কোন অর্থ বহন করে না। হয় তারা ইংরেজি ভাষাভাষি দেশে চলে যায় অথবা ‘নিজ দেশে পরবাসী’ হয়ে যান্ত্রিক জীবন যাপন করে। পাঠক এবার প্রশ্ন করতে পারেন, বাংলা মাধ্যমে লেখাপড়া করা মানুষেরা কি সবাই সার্থক জীবনের অধিকারী হয়েছেন? না, অবশ্যই নয়। যাঁরাই সক্রিয় ভাবে চিন্তার চর্চার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বিদ্যার্জনের ঊষাকালে, তা তিনি আরবি, ইংরেজি অথবা বাংলা মাধ্যমের শিক্ষার্থী হোন না কেন, সার্থক জীবন তাঁদের কাছে অনাবি®কৃতই থেকে যাবে। রবীন্দ্রনাথের কথায়, ‘বয়:প্রাপ্ত হইলেও বুদ্ধিবৃত্তি সম্বন্ধে সে অনেকটা পরিমাণে বালক থাকিয়াই যায়’; তার ‘গ্রহনশক্তি, ধারণশক্তি, চিন্তাশক্তি স্বাভাবিক নিয়মে বললাভ করে’ না
তাই প্রশ্ন করি: সাধ করে আমাদের সন্তানদেরকে ঐ ক্ষতির সম্মূখীন করার কি কোন প্রয়োজন আছে? দেই না কেন তাকে জীবনের অন্তত প্রথম বারোটা বছর স্বাভাবিক স্বছন্দ বিচরণ করতে মাতৃভাষার আকাশ-বাতাস-নদী-কন্দরে! তারপর অর্থাৎ ষষ্ঠশ্রেণী থেকে ইংরেজি ভাষাটা শেখাই দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে, সঠিক ও সক্রিয় পদ্ধতি অনুসরণ করে, কার্যকরভাবে, অইংরেজিভাষাভাষী উন্নত দেশগুলোতে যেভাবে করে (অবশ্য দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ইংরেজি কোন শ্রেণী থেকে শুরু করা উচিত সে বিষয়ে মতভিন্নতা রয়েছে এবং সেটা নির্ভর করে দেশ বিশেষের নীতি ও সুযোগ-সুবিধার উপর।)। বিদ্যালয়ের বাকী চারটি বছরও তারা মাতৃভাষার মাধ্যমেই জ্ঞানচর্চা করতে থাকুক সাবলীল, স্বাভাবিক গতিতে। পরের পর্যায় থেকে ইংরেজি ভাষা শিক্ষার মাধ্যম হলে হতে পারে। এরকম ব্যবস্থাই ছিল ঊনিশ’সাতচল্লিশ থেকে একাত্তর পর্যন্ত (বেশীরভাগ সময়ই অবশ্য তৃতীয় শ্রেণী থেকে ইংরেজিভাষা শেখানো হোত)।
আবার রবীন্দ্রনাথের কথা স্মরণ করি, তিনি বলেছেন আগে বাংলাভাষার পত্তন হতে হবে, তার পর শুরু করতে হবে ইংরেজিভাষার গাঁথুনী। আমাদের দেশের ঐ রকম শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে পড়াশোনা করে আসা ব্যক্তিবর্গ যে সেবা প্রদান করেছেন দেশ ও দশের জন্য তাকেতো এখনও আমরা স্মরণ করি শ্রদ্ধাভরে। এঁদের অনেকে এখনও সেবা দিয়ে চলেছেন সার্থকভাবে Ñ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, অপিসে, আদালতেÑ চাকরি জীবনের শেষের দিকে। কেবল দেশে নয়; আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলেও তাঁরা দক্ষতার সঙ্গেই কাজ করেছেন। পরবর্তীকালের ইংরেজি মাধ্যমে লেখাপড়া করা ব্যক্তিবর্গের শতকরা কতজন ঐ অবস্থানে আছেন অথবা আসার পথে আছেন? পরিসংখ্যান নিলে ফলাফল ঋণাত্মকই হবে বলে আমার বিশ্বাস। এটাকে দেশের সম্পদের ক্ষয়ই বলব আমি।
প্রাথমিক পর্যায় থেকে মাতৃভাষার পরিবর্তে ইংরেজিভাষাকে শিক্ষার বাহন করায় যে কেবল সম্পদের ক্ষয় হচ্ছে তা নয়, মানসিকতারও ক্ষয় হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা জানছে, তাদের যে মাতৃভাষা, তার শিক্ষার বাহন হবার যোগ্যতা নেই, আপিস-আদালতে মর্যাদা নেই; অর্থাৎ সদরে বিচরণ করার দক্ষতা নেই। এ অবস্থায় সে ভাষার প্রতি তার শ্রদ্ধাবোধ জন্মাবে কি করে! ভাষা একটি জাতির পরিচয়ের মৌল উপাদানগুলোর অন্যতম। এ গুরুত্বপূর্ণ মৌলের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রাখতে না পারার ফলে শিশুর মনটি ছোট হয়ে যাবে বৈকি! কোন কারণে মা অথবা বাবার প্রতি আস্থা হারানোয় শিশু যেমন দন্দ্বে ভোগে এও অনেকটা সেরকম।
যে কোন দেশের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আদি জনগোষ্ঠি নানাবিধ সমস্যার ঘেরাজালে আবদ্ধ। ভাষার প্রতিবন্ধকতা তাদের মধ্যে অন্যতম। কারণ বৃহত্তর জনগোষ্ঠির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে মাতৃভাষা তাদের কোন কাজে আসেনা। অথচ সামাজিক জীবন যাপনের জন্য বৃহত্তর জনগোষ্ঠির সঙ্গে মেলা তাদের একান্ত প্রয়োজন। তবু আমার মতে শিক্ষাকালের অন্তত: প্রাথমিক স্তর পর্যন্ত যার যার মাতৃভাষায় লেখাপড়া করার সুযোগ তাদের পাওয়া উচিত। দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে বাংলা ও তৃতীয় ভাষা হিসেবে ইংরেজি তৃতীয় শ্রেনী থেকে পড়ানো যেতে পারে। আমার মনে হয় তৃতীয় শ্রেনী থেকে শুরু করলেও বাংলা শিখতে তাদের বেশী বেগ পেতে হবে না কারণ সমাজে তারা এ ভাষা শেখার জন্য অনুকুল পরিবেশ পাবে, যেমন বাঙ্গালীর সন্তান ইংল্যান্ড বা আমেরিকায় পায় ইংরেজি শেখার। ফলে তাকে ষষ্ঠশ্রেনী থেকে বাংলা মাধ্যমে লেখাপড়া করতে হলে খুব একটা অসুবিধেয় পড়তে হবে না; ততটুকুও নয় যতটুকু হয়েছিল আমাদের পূর্বপুরুষদের বৃটিশ শাসনকালে ষষ্ঠশ্রেনী থেকে ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশুনো করতে গিয়ে। যাইহোক, আমাদের আদিবাসী বন্ধুদের জন্য এর চেয়ে ভাল বিকল্প এই মূহূর্তে আমার চোখে আর পড়ছে না।
আমি বলেছিলাম শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়-পরবর্তী পর্যায় থেকে ইংরেজি মাধ্যমে লেখাপড়া করতে পারে। করতে পারে, যেমন আমরা করেছি। কিন্তু, না করতে হলেই ভাল হয়। কারণ কোন আত্মমর্যাদাসম্পন্ন দেশের নাগরিকদের তেমন করতে হয়না। তারা নিজেদের
মাতৃভাষাতেই লেখাপড়া করে প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চস্তর পর্যন্ত। ‘আন্তর্জাতিক বাজারে টিঁকে থাকার জন্য প্রাক-প্রাথমিক পর্যায় থেকেই ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশুনো করতে হবে’ এ বক্তব্য আমার মতে খ্ঁোড়া অজুহাত বই আর কিছু নয়। এ অজুহাত হীনমন্যতারই বহি:প্রকাশ। আর এ হীনমন্যতা আপন ঐতিহ্য সম্বন্ধে অজ্ঞতার ফল। আমরা জানিনা যে আমাদেরও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল, আজকে যাকে বিশ্ববিদ্যালয় বলা হয় সেই পর্যায়ের, গৌড়-পান্ডুয়ায়; ছিল সোমপুর বিহার, শালবন বিহার এবং নালন্দা। ঐ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কেবল জ্ঞানের চর্চা হোত না, রীতিমত গবেষণা করে জ্ঞান সৃষ্টি করা হোত চিকিৎসাবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা ও এ ধরণের অন্যান্ন বিষয়ে। এসব প্রতিষ্ঠানে জ্ঞানচর্চার মাধ্যম ছিল সংস্কৃত, পালি এবং পালি থেকে বিবর্তিত হয়ে আসা দেশীয় ভাষাইÑ যে ভাষা থেকে উৎপত্তি হয়েছে বাংলাভাষার। তবে দু:খের বিষয় শিক্ষার ভাষা ব্যবহারের সে ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সম্ভব হয়নি; প্রথমে ধাক্কা খেয়েছে ফার্সির কাছে, পরে ইংরেজির কাছে। কিন্তু তার চেয়েও বড় দু:খের কথা হল দেশ স্বাধীন করেও আমরা আমাদেরকে ইংরেজিভাষার আধিপত্য থেকে মুক্ত করতে পারিনি; অন্যরকম এক রাজভাষা হয়ে আমাদের উপর সে চেপেই বসে রয়েছে। তার একটি কারণ তো হীনমন্যতা, আরেকটি অর্থনৈতিক দৈন্য। দুটোরই কারণ আবার জ্ঞানের অভাব, জ্ঞান ব্যবহারে যোগ্যতার অভাব। আর আগেই বলেছি, জ্ঞান ব্যবহারের যোগ্যতার অভাব ঘটে প্রধানত: ভাষা ব্যবহারে দক্ষতার অভাব থেকে।
এবারে পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে: বর্তমানে জ্ঞানভান্ডারের সিংহভাগ তো ইংরেজি ভাষাতেই বিধৃত। ইংরেজি না জানলে সেখানে প্রবেশের অধিকার পাবো কি করে? ইংরেজি শিখবনা অথবা শেখাবনা তা তো বলিনি। বরং কেবল পড়তে-লিখতে নয়, বলতেও (যেটা আমাদেরকালে বিদ্যালয়ে করা হোত না) শেখাতে হবে ভাল করে; দক্ষ শিক্ষকের দ্বারা, সঠিক পদ্ধতির মাধ্যমে, অন্যান্ন বিষয়ের মত একটি বিষয় হিসেবে, দ্বিতীয় ভাষা রূপে। (তবে বিষয় শেখানো এবং ভাষা শেখানো এক নয়। ভ্ষাা শেখানোর জন্য সময় বরাদ্দ অনেক বেশী রাখা দরকার যাতে প্রচূর ও নিয়মিত বিভিন্ন কৌশলের অনুশীলন করানো সম্ভব হয়। সে আলোচনা এখানে নয়।) আমার আপত্তি প্রথমত: বিদ্যালয়ের সমস্ত বিষয় শেখানোর মাধ্যম হিসেবে ইংরেজিভাষা ব্যবহারে; দ্বিতীয়ত: শিশুশ্রেণী থেকে ইংরেজি পড়ানোয়। উদয় নারায়ণ সিং বলেন, আন্তর্জাতিক ভাবে বিশেজ্ঞগণ নানা পরীক্ষার মাধ্যমে এ বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন যে মাতৃভাষার মাধ্যমেই শিক্ষার্থী সবচেয়ে ভাল শেখে। এ. কে. জালালউদ্দিন বলেন, শিশুরা, বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষাস্তরের, হয়ত মাতৃভাষা ছাড়া অন্য ভাষায় প্রত্যয় বা ধারণা আয়ত্ত্ব করতে অসুবিধা বোধ করে; তবে তারা খাপখাইয়ে নেয়। এখানে দুটি বিষয় প্রনিধানযোগ্য। প্রথমত: তাঁরা জেনেছেন যে শিক্ষার্থীদের পক্ষে মাতৃভাষা ছাড়া অন্য ভাষায় ধারণা আয়ত্ত করা অসুবিধাজনক; দ্বিতীয়ত: তাঁরা এও জেনেছেন যে ব্যবস্থা অন্যরকম হলে শিক্ষার্থীরা খাপখাইয়ে নিয়ে কাজ চালায়। এই দ্বিতীয় বিষয়টি নিয়ে আমার আপত্তি রয়েছে। জীবনের বহু ক্ষেত্রে আমাদেরকে খাপখাইয়ে চলতে হয় সন্দেহ নেই। কিন্তু তাতে করে অনেক ক্ষেত্রে যে মানসিক স্বাছন্দ্য বিনষ্ট হয় তাও তো অবিদিত নয়। সুতরাং জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে স্বছন্দ বিচরণের সুযোগ থাকতেও আমাদের শিশুদের জন্য কষ্টকর ব্যবস্থাপত্র প্রদান কি যুক্তিযুক্ত? জালালউদ্দিন আরো বলেন, তৃতীয় শ্রেণী এবং তার উপর থেকে দ্বিতীয় ও তৃতীয় ভাষার প্রচলন করা আদর্শ হবে। তিনি লক্ষ্য করেছেন যারা ইংরেজি-মাধ্যমে লেখাপড়া করে তারা মাতৃভাষার সাহিত্যসম্পদের স্বাদ গ্রহনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত থেকে যায়। অথচ, ভাষা-অভিজ্ঞতার বৃহত্তর অংশ আসে সাহিত্য পাঠ থেকে। অর্থাৎ তিনি যা বলতে চাচ্ছেন তা হল পাঠ্য বইয়ের বাইরে গল্প-কবিতার বই না পড়লে শিক্ষার্থীরা ভাষা ব্যবহারে দক্ষ হয়ে উঠতে পারে না। মাতৃভাষায় যারা লেখাপড়া করে তাদের পক্ষে এ কাজ সহজতর, ইংরেজি-মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের জন্য তা প্রায় অসম্ভব। এর কারণ হিসেবে রবীন্দ্রনাথ নানা প্রাঞ্জল বক্তব্য রেখেছেন তাঁর ‘শিক্ষার হেরফের’ প্রবন্ধে। তাঁর মতে বয়স অনুযায়ী বিষয়বস্তুসমৃদ্ধ সুখপাঠ্য বই প্রচূর পরিমানে পড়লেই কেবল ভাষা ও বুদ্ধি পরিপক্কতা লাভ করে। সেটা সম্ভব কেবল সে ভাষার মাধ্যমেই যে ভাষায় ব্যক্তির জন্মাবধি রয়েছে সচ্ছন্দ বিচরণ। শুধু ভারত নয়, এশিয়ার অন্যান্ন দেশও শিক্ষার মাধ্যম ইংরেজি হবে না মাতৃভাষা এ নিয়ে চিন্তিত এবং বিব্রত। চিন্তিত কারণ দ্বিভাষী দক্ষতা গড়ে তোলা হচ্ছে শিখন-দক্ষতা খর্ব করার বিনিময়ে; প্রমান আছে, পরিসংখ্যানগতও এবং সাধারণ তথ্যগতও, যা ইংঙ্গিত করে যে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে মাতৃভাষা শ্রেষ্ঠ। বিব্রত কারণ, মাতৃভাষার মাধ্যমে লেখাপড়া না করানোর ফলে একচতুর্থাংশ গ্রামীন শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে তৃতীয় শ্রেণীতে ওঠার আগেই। তাই শিখন-দক্ষতায় সাবলীল করা এবং ইংরেজি ভাষাতেও দক্ষ করার উপায় হিসেবে জোনাথান মালিকসি বলেন, মাতৃভাষার মাধ্যমে পড়াও কিন্তু ইংরেজি ভাষা শেখানোর জন্য ব্যাপক ব্যবস্থা রাখ।
আবারও জ্ঞানভ্ন্ডারের কথায় আসি। বর্তমানে জ্ঞানবিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসমূহ ইংরেজি ভাষাতে বিধৃত এবং ইংরেজিভাষী দেশসমূহের গ্রন্থাগারগুলোতে সযতেœ সংরক্ষিত সন্দেহ নেই। কিন্তু আমাদের শিক্ষানবীশ সন্তানদেরকে ইংরেজি ভাষা শিখে সেসব জ্ঞান অর্জন করতে হবে কেন? জাপান বা চীনদেশে অথবা ফ্রান্সে তো তা করতে হয় না! সেসব দেশে তো সরকারি নীতির আনুকুল্যেই যেকোন দেশের জ্ঞানের মনিমানিক্য দেশীয় ভাষায় রূপান্তর ঘটিয়ে সংরক্ষণ করা হয়েছে এবং উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের সন্ধান পেলেই ভাষান্তর ঘটানো হচেছ অনবরত! নবীন শিক্ষার্থীকে কষ্ট করতে হয়না, সময় নষ্ট করতে হয় না:; প্রবীন প্রজন্ম সদা প্রস্তুত তাদের সেবায় সরকারের সহায়তায়। আমাদের দেশে সেরকম একটা অনুবাদ সংস্থা গড়ে তুলল না কেন কোন সরকার ! তার কারণটি বোধহয় আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে কি কি করতে হবে, কোন কোন ক্ষেত্রকে প্রাধান্য দিতে হবে সে সম্পর্কে সচেতনতার বেশ খানিকটা অভাব। অনেকেই হয়ত বলবেন, কজনেই বা পড়বে তার জন্য অত পয়সা খরচ করে একটা সার্বক্ষনিক অনুবাদ সংস্থা গঠন করার কি দরকার! কেন দরকার সেটা জাপান যদি বুঝে থাকে, ফ্রান্স যদি বুঝে থাকে, আমরা কেন বুঝিনা! জাতির আত্মোন্নয়নের জন্য মোটেও সহায়ক নয়, এমন বিষয়েও তো বিদেশীদের নকল করছি আমরা । তবে এ বিষয়টি, যেটি জাতির মননকে আলোকিত করতে পারে সেটির নকল করিনা কেন? আমি এখানে কেবল উচ্চস্তরের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞাবিজ্ঞানের বই অথবা গবেষণামূলক প্রবন্ধের কথা বলছিনা; ঐ স্তরের পাঠক গবেষকের সংখ্যা অল্পই হয়ে থাকেন (যদিও এ স্তরের প্রয়োজনের বিষয়টি সংখ্যার হিসাবে বিবেচ্য হওয়া উচিত নয়)। আমি বারো বছরের বিদ্যালয় শিক্ষা অর্থাৎ উচ্চ মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত বিভিন্ন বয়সের শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনের বিষয়টি বিবেচনা করতে চাই এই প্রবন্ধে। শিশু শ্রেণী থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশের স্তর অনুযায়ী, দেশীয় সাহিত্য তো বটেই মাতৃভাষায় বিশ্বসাহিত্য, ইতিহাস,বিজ্ঞান ইত্যাদির বইয়ের প্রচূর সরবরাহ থাকা দরকার। আমাদেরকে অবশ্যই শিশু-কিশোরদের উপযোগী ইতিহাস, বিজ্ঞান এসব বিষয়ের বই লিখতে হবে সুখপাঠ্য বাংলা ভাষায়। উন্নত দেশগুলোতে তাদের নিজস্ব ভাষায় এ কাজ অনেক আগেই শুরু হয়েছে। লেখার কাজে, অন্য ভাষায় লেখা উন্নত মানের বইগুলো সাহায্যও আমরা, অনুমতি সাপেক্ষে, অনায়াসেই নিতে পারি অথবা ভাষান্তর ঘটাতে পারি। সরকারি পর্যায়ে নীতি থাকাটাই হল প্রথম শর্ত। সুতরাং অনুবাদ সংস্থার জন্য অর্থ বিনিয়োগ করার ক্ষেত্রে যদি পাঠক সংখ্যাটি বিবেচ্য বিষয় হয়, তাহলে বলা যায় এ ক্ষেত্রে সংখ্যা নগন্য হবার কথা নয়।
আবারো হোঁচট খেতে হল। আমাদের দেশে প্রথম শ্রেণী থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা নগন্য হবার কথা নয় বটে জনসংখ্যার পরিমান বিচারে, প্রকৃত সংখ্যা নগন্যই। এ ক্ষেত্রেও আমরা বহু পেছনে পড়ে আছি যেকোন উন্নত এবং বেশীরভাগ উন্নয়নশীল দেশের চেয়ে। এক্ষেত্রে আমাদের ঐসব দেশের নকল করা উচিত ছিল। ইসলামি, গনতন্ত্রী অথবা সমাজবাদী যে পরিচয়ের সরকারই হোকনা কেন তার ফরজ বা আবশ্যিক এবং প্রাথমিক দায়িত্ব হল রাষ্ট্রের নবীন নাগরিকদের বারো বছরের বিদ্যালয়শিক্ষা নিশ্চিত করা। সে ক্ষেত্রে একবিংশ শতাব্দিতে দাঁড়িয়ে আমরা দেখছি যে প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যও আমাদের নাগালের বাইরে রয়ে গেছে। বিলাস-ব্যসনের এত রকম উপকরণ আমরা ছড়িয়ে দিয়েছি সারা দেশময়, আর শিক্ষা ছড়াতে পারলাম না, এটা কি কোন কাজের কথা হল! অর্থের নয়, প্রয়োজন ছিল সদিচছার এবং উদ্যোমের; সেটারই অভাব ছিল। তার বদলে ছিল সামন্ত্রতান্ত্রিক ও ঔপনিবেশিক মনোভাব, সবাইকে সমান না ভাবতে পারার মানসিকতা। তাই সার্বজনীন শিক্ষা বাস্তবায়িত হয়নি; না পাকিস্তানকালে না বাংলাদেশকালের এতগুলো বছরে।
এখানে আর একটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই। এই পঁত্রিশ/ছত্রিশ বছরে সরকার অনেক নতুন প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করেছে, যদিও একশ ভাগ সাক্ষরতা অর্জনের লক্ষের ধারেকাছেও পৌঁছতে পারেনি, কিন্তু একটিও মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন করেছে কিনা সন্দেহ! তার বদলে যা করেছে তা হল, বেসরকারিভাবে প্রতিষ্ঠিত মাধ্যমিক বিদ্যলয়ের শিক্ষকদের বেতনের একটা বড় অংশ সরকারি কোষাগার থেকে প্রদান করে দায়িত্ব এড়ানো। দায়িত্ব এড়ানো বলছি এ জন্য যে, বেশ অল্প ব্যয়ে ও আয়াসে সরকার বাহবা নিতে পেরেছে। এতে শিক্ষক সমাজ উপকৃত হয়েছেন এবং মান সম্মত মাধ্যমিক বিদ্যলয়ের অভাব কিছুটা মিটেছে সন্দেহ নেই। কিন্তু এটুকু করে থেমে যাওয়ায়, নতুন বিদ্যালয় স্থাপন না করায় যেসব সমস্যা হয়েছে তার একটি হল: কারিগরি বিদ্যালয় স্থাপিত না হওয়া। বেসরকারি ভাবে যেসব বিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছে তার সবই সাধারণ বিদ্যালয়, কারিগরি নয়। কারিগরি বিদ্যালয় স্থাপন করতে অনেক বেশী অর্থের প্রয়োজন হয় যা বেসরকারি আয়োজনে সংগ্রহ করা অত্যন্ত কষ্টকর। ফলে তা হয়নি। অথচ প্রতিটি উপজেলায় বরং থানায়, একটি করে কারিগরি বিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয় থাকা উচিত। এতে করে যাদের উচ্চশিক্ষা গ্রহন না করলেও চলে অথবা নানা সংগত কারণে সম্ভব নয় তারা জীবন-জীবিকার সঙ্গে সম্পর্কিত শিক্ষা লাভ করে উপার্জনের যোগ্য হয়ে যেতে পারে, বাড়ি ছেড়ে বেশী দূরে না গিয়েও। সে কাজটি হয়নি; দক্ষ শ্রমশক্তির যোগান আসেনি।। এ দায়িত্বটি সরকারের নেয়া উচিৎ ছিল অথচ নেয়নি। তাই বলছি সরকার দায়িত্ব এড়িয়েছে। বেসরকারি উদ্যেক্তাদের বেশীরভাগই টাকা লগ্নি করার সময় মাথায় রাখেন অল্প ব্যয়ে অধিক লাভের কথা। ফলে উপজেলা পর্যায়ে কারিগরি বিদ্যালয় স্থাপিত হয়নি কিন্তু ইংরেজি-মাধ্যম কিন্ডারগর্টেন গড়ে উঠেছে অনেক। গভীরভাবে ভেবে দেখবার বিষয় বটে!
আমার এতগুলো কথার অবতারণার উদ্দেশ্য একটাই: এ কথা বোঝানো যে আমাদের কেউ কেউ জেনে-বুঝে, কেউ কেউ না জেনে নিজের মাতৃভাষার প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করছি, সদরে বিচরণের অনুপযুক্ত বলে রায় প্রদান করছি, যা নিতান্তই গর্হিত কাজ হচ্ছে; লাভের চেয়ে নানা রকম ক্ষতিরই কারণ হচ্ছে বেশী।
দ্বিতীয় প্রকল্পটির অর্থাৎ একুশে ফেব্র“য়ারির তাৎপর্য বিষয়ে আসি এবার। আমাদের পূর্বসুরীগন, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ এ দাবী কেন তুলেছিলেন? কারণ তাঁরা বুঝেছিলেন আমাদের মাতৃভাষাটি, এ অঞ্চলের বৃহত্তর জনগোষ্ঠির মুখের ভাষাটি রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা না পেলে সদরে বিচরণের অধিকার হারাবে; তাকে কেবল অন্দরের অধিবাসী হয়ে থাকতে হবে। আর কেবল অন্দরের অন্ধ ঘরে বন্দী থাকলে তার উন্নতি তো ঘটবেই না বরং স্বাস্থ্যহানী হতে হতে একদিন মৃত্যুমুখেও পতিত হতে পারে। অনেকেই বলতে পারেন, ‘ না, তা কেন হোত। আমাদের দেশেরই আরো আরো ভাষা আছে না অন্ত:পুরবাসী; তারা কি মরে গেছে?’ না, তারা মরেনি বটে। কিন্তু সেসব আদিজনগোষ্ঠির ভাষার সঙ্গে বাংলাভাষার একটা পার্থক্য রয়েছে। বাংলাভাষার তখনই যা ছিল, এসব ভাষার এখনও তা গড়ে ওঠেনি। যখন ভাষার মর্যাদা রক্ষার দাবীতে বাঙ্গালী সোচ্চার হয়েছিল সে সময়েই বাংলাভাষার ভাণ্ডারে ছিল এক সমৃদ্ধ সাহিত্যসম্পদ; ছিল বাংলা ছাড়িয়ে বিশ্বসভায় তার সগৌরব উপস্থিতি। তবে আমরা কেন, এক স্বাধীন দেশের নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও পিছিয়ে পড়ার মত হীনতাকে মেনে নেব! তাই আমরা লড়াই করে, রক্ত দিয়ে রক্ষা করে ছিলাম আমাদের মাতৃভাষার মর্যাদা; মাথানত করিনি অন্যায়ের কাছে, দমননীতির কাছে। সেই চেতনাকে সজীব রাখতেই, সর্বস্তরে মাতৃভাষা ব্যবহারের প্রচেষ্টাকে অব্যাহত রাখতেই শুরু হয় ২১শে ফেব্র“য়ারিতে স্মরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন এবং তারই ধারাবাহিকতায় বাংলা একাডেমীর বইমেলা। অর্থাৎ বাংলায় বই পড়া, লেখা ও প্রকাশনার ক্ষেত্রে জোয়ার জাগানোই এই বইমেলার মূল উদ্দেশ্য। এখানে এসে এক ব্যক্তির ইংরেজি শিশূতোষ বই খোঁজার ঘটনা কি ২১শে-এর চেতনা সম্বন্ধে অজ্ঞতার প্রতিই ইঙ্গিত করে না? মধ্যবিত্ত শ্রেণী ঐ ব্যক্তিকে দৈবচয়নের মাধ্যমে আহরিত নমুনা হিসেবে ধরে নিয়ে যদি বলি যে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর তরুণ সদস্যদের মধ্যে (নিুবিত্ত অংশের কথা ছেড়েই দিলাম) একুশ সম্পর্কে সচেতনতা খুবই কম তা হলে কি বিশেষ ভুল বলা হবে? তবে ব্যক্তিকে দোষ দেওয়া চলে না। দোষ গোষ্ঠির, গোষ্ঠির প্রতিনিধিত্বকারী ব্যক্তিবর্গের। আমরাই আমাদের জনসাধারণকে এ বিষয়ে জ্ঞানবান করে তুলতে পারিনি আজও, স্বাধীনতার পঁত্রিশ বছর পরেও।
একুশের চেতনা ভালবাসার চেতনা – নিজের ভাষা-সংস্কৃতিকে, নিজস্ব পরিচয়ের অস্তিত্বকে, নিজস্ব সম্মানবোধকে ভালবাসার চেতনা; এসবকে সমুন্নত রাখার আকাংঙ্খার প্রতি ভালবাসার চেতনা; সে আকাংঙ্খাকে সমূলে উপড়ে ফেলার প্রচেষ্টাকে প্রতিহত করার সংগ্রামের অনুকুলে সাহসী মনোভাবের প্রতি ভালবাসার চেতনা। সচেতন ভাবেই হোক অথবা অসচেতন ভাবেই হোক – ঐ রকম ভালবাসায় উজ্জীবিত হয়েই কি আমরা জ্বলে উঠিনি বাহান্নর একুশে ফেব্র“য়ারিতে! আজ কোথায় সে চেতনা! আমরা পারিনি পরবর্তী প্রজন্মের অন্তরে জ্বালিয়ে তুলতে সে আগুন। হোকনা মাত্র হাজার বছরের, তবুতো গড়ে উঠেছে এক স্বতন্ত্র, স্বকীয় সাংস্কৃতিক ধারা, বাঙ্গালী সংস্কৃতি। আমরা মিলব-মেলাব বটে, কিন্তু মাথা কেন নুইয়ে দেব মুড়োনোর জন্য! না দেব না – চিৎকার করে বলব – দেবনা! কিন্তু গলায় জোর আনতে হলে যে খুঁটিতে জোর চাই। সে জোর আসবে সমৃদ্ধ অর্থনীতির মাধ্যমে। অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করতেও প্রয়োজন আত্মসম্মানবোধের, প্রয়োজন আত্মশক্তির, যে শক্তি জোরে আমরা বলতে পারব – ‘নিজ হাতে গড়া মোর কাঁচা ঘর খাসা’। তবে ‘খাসা’ বলে আত্মতুষ্টিতে ভুগব না – আরো ভাল করার প্রচেষ্টা অব্যহত রাখব অবশ্যই।
সচেতনতা থেকেই আসে শ্রদ্ধাবোধ। শ্রদ্ধাবোধ জোগান দেয় শক্ত মাটির ভিত, সে ভিতের ওপর দাঁড়িয়েই দুহাত ঊর্ধমুখী করে বলা চলে, আমি আকাশ ছুঁতে চাই। পায়ের তলায় যদি মাটিই না থাকে তো দাঁড়াব কি করে! অতীতে আমরা অনেক কিছু ভাল কাজ করেছি, এখনও আমাদের অনেকেই নানা ভাল কাজ করছেন, আগামীতে আমরা আরো অনেক ভাল কাজ করব, এই জানাটুকু, এই বিশ্বাসটুকু একজন মানুষকে সার্থক জীবন গড়ার প্রতি অগ্রসর হবার প্রেরণা জোগায়। একটি শিশু এই জ্ঞান পায়, এ বিশ্বাসে বলীয়ান হয় গৃহ, বিদ্যালয় ও সামাজিক নানা কর্মকান্ডের, নানা প্রচেষ্টার সমবায়ে। ইংরেজি-মাধ্যম বিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচীতে ঐ উপাদান থাকে না বললেই চলে। বরং বিজাতীয় ভাষা ও সাংস্কৃতিক উপাদানের প্রচূরতা এবং সেগুলোকে মহীয়ান করে উপস্থাপনের প্রবনতা লক্ষ্য করা যায়। ফলে নিজের মূর্ত ও বিমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জাগার সম্ভাবনা অংকুরেই বিনষ্ট হয়ে যায়। গোড়া কেটে আগায় জল ঢালার মত অবস্থার সৃষ্টি হয়।
ব্যাক্তিমানুষ কেবল নিজস্ব সত্তাকেই ভালবাসে। শিশুর বিকাশধারা লক্ষ্য করলে এর প্রমান পাওয়া যায়। শিশুর ভালবাসার বলয় প্রথম দিকে কেবল নিজের চারদিকে আবর্তিত হয়। ধীরে ধীরে তার সত্তার পরিধি বি¯তৃত হয়ে একে একে মা-বাবা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবকে অন্তর্ভুক্ত করে। এর পর আসতে পারে পাড়াপ্রতিবেশী। আমরা তাঁদেরকে বলি মহৎ ব্যক্তি যাঁরা পাড়া/মহল্লা, গ্রাম/শহর, জেলাকে নিয়ে দেশের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করতে পারেন। যাঁরা পারেন সত্তার পরিধিকে বি¯তৃত করতে করতে বিশ্বের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে তাঁদেরকেই বলি মহামানব। আগেই বলেছি, এর সুচনা কিন্তু নিজস্বত্তা থেকেই। নিজের প্রতি যার আস্থা আছে, বিশ্বাস আছে সেই পারে অন্যকে আপন করে নিতে। নিজের ঐতিহ্যকে মূল্য দিতে না পারলে অন্যের ঐতিহ্যকেও প্রকৃত মূল্য দেওয়া সম্ভব নয়। একটা শ্রদ্ধামিশ্রিত ভয়ের ভাব তৈরী হতে পারে মনে যা আত্মসম্মানবোধের অনুকুল নয় মোটেও। সেরকমটিই ঘটেছে আমাদের বেলায় ইংরেজি ভাষা ও সং®কৃতির প্রতি মনোভাবের ক্ষেত্রে। আমাদের বিশ্বাস জন্মেছে, সদরে অভিবাদন পাবার যোগ্যতা আছে কেবল ইংরেজি ভাষা ও ইংরেজদের সংস্কৃতির আর বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির স্থান অন্দরে। সবলের প্রতি চিরাচরিত আকর্ষণের ফলেই হয়ত ঘটছে এমন। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন,“ জ্ঞানশিক্ষা নিকট হইতে দূরে, পরিচিত হইতে অপরিচিতের দিকে গেলেই তাহার ভিত্তি পাকা হইতে পারে।”ভাষার বেলাতেও তাই। মাতৃভাষা ভাল করে রপ্ত করলে অন্য ভাষা আয়ত্ত করা সহজতর হয়।
আমরা কি কোনও দিন পারব হীনমন্যতার এ নিগড় ভেঙ্গে বাইরে বেরিয়ে আসতে! আমরা কি স্বীকার করব না যে আমাদের ভাষা-সংস্কৃতি মোটেও দূর্বল নয়! আমরা কি প্রমান করব না যে বাংলাভাষারও আছে সদরে কার্যকর ভাবে বিচরণ করার যোগ্যতা!

ছড়িয়ে দিন