মাতৃ-সাধক নজরুল

প্রকাশিত: ৮:৫৫ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১৭, ২০২১

মাতৃ-সাধক নজরুল

 

সোমঋতা মল্লিক
“১৯৩০ সালের মে মাসে আমার সর্বাগ্রজ বুলবুল-এর মৃত্যু হল। তখন এই শিশুর বয়স তিন-চার বছরের বেশি নয়। পিতৃদেব এই শিশুকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। বুলবুলের একটি ছবি এখনও আমাদের বাড়িতে আছে। পিতৃদেব এই ছবিটির তলায় নিজের হাতে লিখে রেখেছিলেন: ‘উড়ে চলে গেছে বুলবুল, শূন্য এ স্বর্ণ পিঞ্জর’। বুলবুলেরই মৃত্যুতে তিনি লেখেন বিখ্যাত গান – ‘শূন্য এ বুকে পাখি মোর ফিরে আয়’- যা প্রখ্যাত শিল্পী জ্ঞানেন্দ্র প্রসাদ গোস্বামীর প্রসাদে আজ সর্বজনবিদিত। এই বুলবুলের মৃত্যু এবং অতঃপর আমার মাতৃদেবীর স্বাস্থ্যহানি – এই দুটি পারিবারিক ব্যাপার আমার পিতৃদেবকে অস্থির এবং পাগল-প্রায় করে তুলেছিল। তিনি শান্তি খুঁজছিলেন। যাঁরা আমাদের পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিলেন, তাঁরাই জানেন পিতৃদেেবের এই সময়কার মানসিক অবস্থার কথা। যোগাসনে বসে যোগাভ্যাস করতেন, প্রায়ই যেতেন দক্ষিনেশ্বরে, আমরাও যেতুম সঙ্গে কখনও-কখনও। বাড়িতে অনেক সময় কাটাতেন আমার মাতামহী গিরিবালাদেবীর ঠাকুরঘরে। একবার আমরা তখন শ্যামবাজার স্ট্রীটে থাকি- একদিন গ্রীষ্মকালের এক সন্ধ্যায় কাউকে কিছু না জানিয়ে পিতৃদেব ভাবের ঘোরে দক্ষিনেশ্বরে গিয়ে উপনীত হয়েছিলেন। কবি নজরুলের এই অশান্ত এবং ভক্তমনের ছবি, সঙ্কলিত গানগুলি।”- নজরুল ‘সুরসঞ্চয়নে’র দ্বিতীয় খন্ডটিতে কাজী নজরুল ইসলামের কনিষ্ঠ পুত্র কাজী অনিরুদ্ধ প্রধানত: নজরুলের শ্যমাবিষয়ক গানগুলির স্বরলিপি করেন। নজরুলেরই একটি জনপ্রিয় গানের প্রথম কলি অনুসারে এর নাম রাখেন ‘বল্ রে জবা বল্’। এই কাজটি করার প্রসঙ্গে কাজী অনিরুদ্ধ উক্ত স্মৃতিচারণা করেছেন। নজরুলের শ্যামা-সঙ্গীত প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেছেন- “নজরুলের শ্যামা-সঙ্গীতগুলির সুরগত বিশেষত্ব সহজেই দৃষ্টি আকর্ষন করে। বাঙলা দেশের মানুষের কানে ও মনে শ্যামা- সঙ্গীতের একটি সুরগত টাইপ বা নকশা বা ঢঙ বাসা বেঁধে আছে। অথচ নজরুলের শ্যামা-সঙ্গীতের সুরে সেই বিশেষ টাইপ বা ঢঙটি নেই। এগুলিতে রাগ সঙ্গীত এবং মার্গ-সঙ্গীতের প্রভাব প্রবল এবং প্রবল বলেই প্রথম রেকর্ড করার সময় প্রচলিত রীতি অনুযায়ী খোল না বাজিয়ে পাখোয়াজই বাজানো হয়েছিল। অবশ্য খাঁটি শ্যামা-সঙ্গীতের ঢঙ এ নজরুল যে সঙ্গীত রচনা করেননি, এমনও নয়। গানের রচনা রীতির দিক থেকে বিচার করলে কিন্তু নজরুলের শ্যামা-সঙ্গীতকে রামপ্রসাদ-কমলাকান্তের কাছাকাছিই মনে হবে। শ্যাম, শ্যামা, উমাকে অবলম্বন করে তিনি ভক্তের আকুতি ও আবদারকে একদিকে যেমন ফুটিয়েছেন, অপরদিকে তাঁদের নামিয়ে এনেছেন পারিবারিক জীবনের মধুময় বন্ধনের ক্ষেত্রে। শব্দচয়নের বেলায় তিনি ঘরোয়া ও পরিচিত শব্দকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। এমনকি ছন্দের ক্ষেত্রেও তিনি বাঙালির প্রিয় ও পরিচিত শ্বাসাঘাত-প্রধান ছন্দকেই মুখ্য করে তুলেছেন।
বিচিত্র ধরনের তাল সৃষ্টির দিকে এবং পরিচিত তালের মধ্যে বৈচিত্র্য সাধনের দিকে নজরুলের সাধনার অন্ত ছিলনা। তালফেরতা দিয়ে তালের বৈচিত্র্য তিনি আনয়ন করেছেন কিন্তু তিনি বোধহয় তাল ছাড়া সুর এবং গানের কলির প্রারম্ভে বা কোন স্তবকের শেষে pause খুব পছন্দ করতেন। বর্তমান সুর-সঞ্চয়নের তিন ও পাঁচ-সংখ্যক গান দুটি কিংবা এক-সংখ্যক গানের প্রারম্ভিক কলির পর Pause বিশেষভাবে লক্ষ্য করবার বিষয়। তেমনি, সমবেত সঙ্গীতে তিনি যে Arrangement করে দিয়েছেন, তাতে গানের ভাব এবং গায়নভঙ্গীর মধ্যে সুন্দর সামঞ্জস্য এসেছে।”
গোবিন্দ গোপাল মুখোপাধ্যায় তাঁর ‘শাক্ত পদাবলীর কবি নজরুল’ শীর্ষক রচনায় কাজী নজরুল ইসলামের মাতৃ সাধনার কথা চমৎকারভাবে ব্যক্ত করেছেন। তিনি লিখেছেন – “কাজী নজরুল ইসলামের মহা মৌনের অতলে ডুব দিলে শুনতে পাওয়া যাবে শুধু মাতৃ নামের ঝঙ্কার। তিনি স্বভাবে ও স্বরূপে মাতৃ-সাধক বা পরম শাক্ত। প্রথম জীবনে দেশ মাতৃকারূপে এই জননীই তাঁর ধ্যান-জ্ঞান আরাধনার বিষয় ছিলেন এবং শেষের দিকে বিশ্ব-মাতৃকা বা জগজ্জননী রূপে তিনিই তাঁর আরাধ্যা হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর অন্তর্জীবনের এ পরিণতির খবর হয়ত অনেকে রাখেন না, গীতি-সুরকার বা কবি-গায়ক নজরুলের অন্তরালে সাধক নজরুলের অস্তিত্বের কথা অনেকেই জানেন না। তিনি শক্তি তত্ত্ব বা মাতৃ স্বরূপের নব ভাষ্যকার। চমকে যেতে হয় তাঁর হিন্দুশাস্ত্রে গভীর অনুপ্রবেশ দেখে।…
এই নিখিলের আরাধ্যা মহাশক্তিকে তাঁর নানা বিভাগে বন্দনা করেছেন কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ‘দেবীস্তুতিতে’। মূলে যিনি আদ্যাশক্তি পরমা কুমারী তাঁর মুখ্য তিনটি বিভূতি বা বিভাব: মহা কালী, মহা লক্ষ্মী, মহা সরস্বতী। মহা কালী রূপে তাঁর প্রথম আবির্ভাব মধুকৈটভনাশের জন্য বিষ্ণুকে উদ্বোধিত করতে। কাজী নজরুল মধু ও কৈটভকে চিনেছেন অধৈর্য্য ও অবিশ্বাসরূপে। তাঁর এ ব্যাখ্যা যেমন অভিনব, তেমনি আকর্ষনীয়। তেমনি মহিষাসুরকে তিনি দেখেছেন ক্রোধের প্রতীকরূপে, যাঁর বিনাশ সাধন করেন মহালক্ষ্মী এবং জগতে এনে দেন শান্তি সুষমা, সুখ সমৃদ্ধি।
আর শেষে কাম ও লোভরূপী শুম্ভ-নিশুম্ভকে বধ করেন সরস্বতী তাঁর জ্ঞানের প্রোজ্জ্বল খড়গ দিয়ে। – তখন
‘মা যে আমার কেবল জ্যোতি’
এবং ‘সেই পরম শুভ্র জ্যোতির্ধারায়
নিখিল বিশ্ব যায় ডুবে যায়।’
এই পরম অনুভবে কবি আত্মহারা। আমাদের শ্রী শ্রী চণ্ডীতে মায়ের এই তিন মূল বিভবের বিস্তৃত পরিচয় দেওয়া হয়েছে। মধুকৈটভাদি দৈত্য বা অসুরের নানা আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যাও প্রাচীনকালে প্রচলিত ছিল এবং আধুনিক যুগেও ‘সাধন-সমর’ প্রভৃতি গ্রন্থে দেখতে পাওয়া যায়। বাংলা দেশের এই মহা দুর্দিনে কবির এই অভিনব শাক্তপদাবলী এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করে এনেছে।”
ভক্তিমূলক সঙ্গীত রচনার পাশাপাশি ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতবর্ষে নিপীড়িত-নির্যাতিত মানুষকে জাগরিত করার জন্য মানবতাবাদী, অসাম্প্রদায়িক কবি নজরুল তাঁর গান-কবিতায় মাতৃ-শক্তির আরাধনা করেছেন। ‘আগমনী’ কবিতাটি সম্পর্কে ‘উপাসনা’ সম্পাদক শ্রী সাবিত্রী প্রসন্ন চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন- “নজরুল সেই সময় বন্ধুবর আফজল প্রবর্তিত ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় কবিতা ও গান লিখতে আরম্ভ করেন। ঠিক একই সঙ্গে লিখতে আরম্ভ করেন আমার কাগজ ‘উপাসনা’ মাসিক পত্রিকায়ও। নজরুলের এক বিশিষ্ট দিকের কবিতা ‘শাতিল আরব’ যখন মোসলেম ভারতে প্রকাশিত হয়- প্রায় ঠিক সেই সময়ে হিন্দুর দেব- দেবী নিয়ে প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় উপাসনায়- দুর্গোৎসব বিষয়ে-
‘এ কি রণবাজা বাজে ঘন ঘন’
এই কবিতাটির একটি ক্ষুদ্র ইতিহাস আছে।
শুনেছিলাম নজরুল রামায়ণ, মহাভারত, গীতা ও চণ্ডী নিয়ে পড়াশুনো করছেন। আমি একরকম চ্যালেঞ্জ করেই বলেছিলাম লেখ দেখি দুর্গাসুরের যুদ্ধ নিয়ে। যুদ্ধের পরিবেশ সৃষ্টি হওয়া চাই। এই কবিতা লিখে নজরুল তখনকার সাহিত্যিক সমাজকে সত্যই বিস্মিত করেছিলেন।”
রমা চৌধুরী ‘সাধক কবি নজরুল’ শীর্ষক রচনায় লিখেছেন- “দেশের গৌরব, পরম শ্রদ্ধেয় কাজী নজরুল ইসলাম প্রকৃতপক্ষে সাধক। পুণ্যভূমি ভারতবর্ষের পুণ্যশ্লোক সাধকদের মতোই তিনিও জগতের ও জীবনের অন্তর্নিহিত সত্যকে উপলব্ধি করার সাধনায় জীবন উৎসর্গ করে ধন্য হয়েছিলেন। তাঁর ধর্ম-দর্শনমূলক কাব্যাকৃতির প্রতি পংক্তিতে-পংক্তিতে এই সত্যটি প্রকটিত হয়ে রয়েছে মধুরতম মহিমায়। কী স্থির বিশ্বাসভরে, কী ধীর আনন্দ উচ্ছ্বসিত অন্তরেই না তিনি বরংবার বলেছেন গভীর ভাবাবেগের সঙ্গে:
(মা) একলা ঘরে ডাকবো না আর
দুয়ার বন্ধ করে।
(তুই) সকল ছেলের মা যেখানে
ডাকবো মা সেই ঘরে।।
কিংবা
আয় অশুচি আয়রে পতিত,
এবার মায়ের পূজা হবে।
যেথা সকল জাতির সকল মানুষ
নির্ভয়ে মা’র চরণ ছোঁবে।
কী অপূর্ব এই সার্বজনীন উদার অভাব। এই তো হল প্রকৃত ভারতীয় ভাবধারার অনুসরণ- ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে ব্রহ্মকে, জীবের মধ্যে শিবকে উপলব্ধি করা, আরাধনা করা, সেবা করা।”
পরিশেষে বলাই যায়, সাবিত্রীপ্রসন্ন চট্টেপাধ্যায়ের লেখা যেন আমাদের সকলের মনের কথা। তিনি যথার্থই লিখেছেন নজরুল সম্পর্কে – “ধর্মে মুসলমান হয়ে তিনি জাতিতে মানুষ, তাই তাঁর পক্ষে শ্যাম ও শ্যামা-সঙ্গীত এত সুন্দর ও নিখুঁত করে লেখা সম্ভব হয়েছে।তাঁর তৃষিত মন ছুটে বেড়িয়েছে সুন্দরের সন্ধানে, অপরূপ দর্শন প্রত্যাশায় যেখানে তার সামান্যমাত্র চিহ্নও দেখেছেন- সেখানেই তিনি তাকে দুহাতে তুলে নিয়ে নিজের ভাণ্ডার ভরেছেন।…
এই যে নজরুল আপনাকে সকলের মধ্যে বিলিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর প্রানের প্রাবল্যে, হৃদয়ের মাধুর্যে এই তো মানুষের সবচেয়ে বড় ধর্ম, বড় আদর্শের কথা।”
তথ্য ঋণ: শতকথায় নজরুল, কল্যাণী কাজী সম্পাদিত
নজরুল স্মৃতি, বিশ্বনাথ দে সম্পাদিত
সোমঋতা মল্লিক, নজরুল সঙ্গীতশিল্পী এবং সভাপতি, ছায়ানট (কলকাতা)

ছড়িয়ে দিন

Calendar

November 2021
S M T W T F S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930