মাফ পেলেন না জামায়াত নেতা আজহারুল ইসলাম

প্রকাশিত: ১০:৪৫ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ৩১, ২০১৯

মাফ পেলেন না জামায়াত নেতা  আজহারুল ইসলাম

মাফ পেলেন না জামায়াত নেতা এটিএম আজহারুল ইসলাম ।
সর্বোচ্চ আদালতের চূড়ান্ত রায়েও যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া সাজা বহাল রইলো । একাত্তরে রংপুর অঞ্চলের এই ত্রাসকে ফাঁসিকাষ্ঠেই যেতে হবে।

জামায়াতের সাবেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আজহার একাত্তরে ছিলেন ইসলামী ছাত্র সংঘ রংপুর জেলা কমিটির সভাপতি এবং আলবদর বাহিনীর রংপুর শাখার কমান্ডার।

সে সময় তার নেতৃত্বেই বৃহত্তর রংপুরে অপহরণ, নির্যাতন, হত্যা ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল বলে এ মামলার বিচারে উঠে আসে।

প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন চার বিচারকের আপিল বেঞ্চ বৃহস্পতিবার মাত্র এক মিনিটে রায়ের সংক্ষিপ্তসার জানিয়ে দেয়।

এই বেঞ্চের অন্য তিন সদস্য হলেন- বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী, বিচারপতি জিনাত আরা এবং বিচারপতি মো. নুরুজ্জামান।

প্রায় পাঁচ বছর আগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে তিন অভিযোগে এটিএম আজহারের মৃত্যুদণ্ড এবং দুই অভিযোগে মোট ৩০ বছরের কারাদণ্ড হয়েছিল।

২০১০ সালে যুদ্ধাপরাধের বহু প্রতীক্ষিত বিচার শুরুর পর আপিলে আসা এটি অষ্টম মামলা । এবার এর ওপরে ওপর চূড়ান্ত রায় হলো।

নিয়ম অনুযায়ী আসামি এই রায় পর্যালোচনার আবেদন করতে পারবেন। তাতে সর্বোচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত না বদলালে আসামি রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাইতে পারবেন। তাতেও তিনি বিফল হলে সরকার সাজা কার্যকরের পদক্ষেপ নেবে।

একাত্তরে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ২০১২ সালের ২২ অগাস্ট মগবাজারের বাসা থেকে আজহারকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরের বছর ১২ নভেম্বর অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তার যুদ্ধাপরাধের বিচার। বৃহস্পতিবার আপিল বিভাগে রায় ঘোষণার সময় তিনি ছিলেন গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে।

২০১৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর আজহারুল ইসলাম কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে হাত উঁচিয়ে বিচারকদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, এটা ফরমায়েশি রায়। আমি নির্দোষ। আল্লাহর আদালতে আপনাদের বিচার হবে ইনশাল্লাহ।

আর বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম নেতৃত্বাধীন তিন বিচারপতির ট্রাইব্যুনাল তাদের রায়ে বলেছিল, যে ঘৃণ্য অপরাধ আজহারুল ইসলাম করেছেন, মৃত্যুদণ্ড ছাড়া অন্য কোনো সাজায় তার সুবিচার হয় না।

এ মামলার দ্বিতীয় অভিযোগে রংপুরের বদরগঞ্জ থানার মোকসেদপুর গ্রামে গুলি চালিয়ে ১৪ জনকে হত্যা, তৃতীয় অভিযোগে বদরগঞ্জের ঝাড়ুয়ারবিলের আশেপাশের গ্রামে এক হাজার চারশর বেশি হিন্দু গ্রামবাসীকে গুলি চালিয়ে হত্যা এবং চতুর্থ অভিযোগে কারমাইকেল কলেজের চারজন অধ্যাপক ও একজন অধ্যাপকের স্ত্রীকে দমদম ব্রিজের কাছে নিয়ে গুলি করে হত্যার ঘটনায় জড়িত থাকার দায়ে আজাহারকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় ।

এছাড়া রংপুর শহর এবং আশেপাশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অসংখ্য নারীকে ধরে এনে টাউন হলে আটকে রেখে ধর্ষণসহ শারীরিক নির্যাতনে সহযোগিতার দায়ে তাকে দেওয়া হয় ২৫ বছরের কারাদণ্ড।

এ মামলার প্রথম সাক্ষী ছিলেন একজন বীরাঙ্গনা, যাকে আরও অনেকে নারীর মত টাউন হলে ধরে নিয়ে গিয়েছিল আজহার ও পাকিস্তানি বাহিনী, করা হয়েছিল ধর্ষণ। তার জন্য ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তুরিন আফরোজ।

তবে আইনে ক্ষতিপূরণের বিষয়টি স্পষ্টভাবে বলা না থাকায় ট্রাইব্যুনাল এ মামলায় বীরাঙ্গনাদের ক্ষতিপূরণের আদেশ দেয়নি। তার বদলে রাষ্ট্রকে বীরাঙ্গনাদের স্বীকৃতি ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিতে বলা হয় রায়ে।

ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, বীরাঙ্গনাদের আত্মত্যাগকে বিবেচনায় নিয়ে তাদের ত্যাগ ও কষ্টকর অভিজ্ঞতার ইতিহাসকে স্কুল-কলেজের পাঠ্যপুস্তকে যুক্ত করতে সরকারের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া উচিৎ, যাতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস জানতে পারে। যাতে বীরঙ্গনাদের আত্মত্যাগ, পাকিস্তান দখলদার ও তাদের সহযোগী রাজাকার, আল বদর ও আল শামসের যৌন সন্ত্রাসসহ বর্বর ধ্বংসযজ্ঞ সম্পর্কে তারা জানতে পারে।

সেই রায়ে বলা হয়, আমরা মনে করি, রাষ্ট্রের উচিৎ আর দেরি না করে এই বীরাঙ্গনাসহ সকল বীরাঙ্গনাকে যথাযথভাবে ক্ষতিপূরণ প্রদান ও পুনর্বাসন করা। কারণ তারা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক ঘোষিত এবং সম্মানিত বীরাঙ্গনা। সমাজে তাদেরকে গ্রহণ, স্বীকৃতি এবং সম্মানিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের মতো তারাও জাতির অহঙ্কার।

২০১৪ সালের ১০ অক্টোবর বীরাঙ্গনাদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল। এরপর আদালতের এই পর্যবেক্ষণ এলে ২০১৫ সালের ২৯ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে বীরাঙ্গনাদের মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি মেলে।

নিয়ম অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্ট এই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশের পর তা ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হবে। সেটি হাতে পেলে মৃত্যু পরোয়ানা জারি করবে ট্রাইব্যুনাল।
পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশের ১৫ দিনের মধ্যে রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন করতে পারবে আসামিপক্ষ। তবে রিভিউ যে আপিলের সমকক্ষ হবে না, তা যুদ্ধাপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা আবদুল কাদের মোল্লার ‘রিভিউ’ খারিজের পূর্ণাঙ্গ রায়েই স্পষ্ট করা হয়েছে।

রিভিউ আবেদনের নিষ্পত্তি হয়ে গেলে এবং তাতে মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকলে আসামিকে তা আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার সুযোগ দেওয়া হবে। তিনি স্বজনদের সঙ্গে দেখাও করতে পারবেন।

রাষ্ট্রপতির ক্ষমার বিষয়টি ফয়সালা হয়ে গেলে সরকার কারা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে।

এটিএম আজহারুল ইসলামের জন্ম ১৯৫২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি রংপুর জেলার বদরগঞ্জ উপজেলার বাতাসন লোহানীপাড়া গ্রামে। বাবার নাম নাজির হোসাইন, মা রামিসা বেগম।

১৯৬৮ সালে রংপুর জিলা স্কুল থেকে মেট্রিক পাস করে পরের বছর তিনি ভর্তি হন রংপুর কারামাইকেল কলেজে। একত্তরে বাঙালি যখন মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, আজহার তখন জামায়াতের সেই সময়ের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের জেলা কমিটির সভাপতি হিসাবে আলবদর বাহিনীর রংপুর শাখার কমান্ডার।

বাঙালির মুক্তি সংগ্রাম দমনে পাকিস্তানি বাহিনীকে সহযোগিতা দিতে শীর্ষ জামায়াত নেতাদের তত্ত্বাবধানে এই সশস্ত্র দলটি গড়ে তোলা হয়।

পাকিস্তানি বাহিনী সে সময় রংপুর টাউন হলকে নির্যাতন কেন্দ্রে পরিণত করে এবং বৃহত্তর রংপুরের বিভিন্ন জায়গা থেকে স্বাধীনতার পক্ষের লোকজনকে ধরে এনে সেখানে নির্যাতন করা হয়।

রংপুরের মুক্তিযোদ্ধাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আজহার সে সময় ৭০ জন আল-বদর সদস্যের একটি বাহিনীর নেতৃত্ব দিতেন। তিনি মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের স্বজনদের তথ্য সংগ্রহ করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে দিতেন এবং তাদের হত্যা, আটকে রেখে নির্যাতনে অংশ নিতেন।

১৭ আগস্ট আল বদর বাহিনী সারা দেশেই সভা-সমাবেশ করে। রংপুর সদরে আল বদর বাহিনীর সেই সভা হয় এটিএম আজহারুল ইসলামের সভাপতিত্বে, যা জামায়াতের মুখপত্র দৈনিক সংগ্রামেও আসে।

১৬ ডিসেম্বর স্বাধীনতাযুদ্ধে বাংলার বিজয়ের আগে আগে আজহার দেশত্যাগ করেন এবং চলে যান সৌদি আরবে।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হওয়ার পর আজহার আবার দেশে ফেরেন এবং ১৯৮০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করেন।

জিয়াউর রহমানের আমলে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হওয়ার পর দলের বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেন আজহার। ১৯৯১ সালে তিনি ঢাকা মহানগর জামায়াতের আমিরের দায়িত্ব পান এবং ২০০৫ সালে কেন্দ্রীয় কমিটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হন।

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ যুদ্ধাপরাধ মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর কিছুদিনের জন্য ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন আজহার। ২০১২ সালের ২২ অগাস্ট তিনিও একই অভিযোগের মামলায় গ্রেপ্তার হন।

আপিল বিভাগে যুদ্ধাপরাধ মামলায় এর আগের ৭টি রায়ের মধ্যে ৬ টিতে জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, দুই সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কাদের মোল্লা ও মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, দলটির শুরা সদস্য মীর কাসেম আলী এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসি কার্যকর হয়েছে।

আপিল বিভাগের আরেক রায়ে জামায়াতের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের রিভিউ আবেদনেও তাতে কোনো পরিবর্তন আসেনি।

ছড়িয়ে দিন