মার্কিন নির্বাচনের চূড়ান্ত গতিপথ

প্রকাশিত: ১২:২৭ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ৩, ২০২০

মার্কিন নির্বাচনের চূড়ান্ত গতিপথ

-লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরী
আর কিছুক্ষণ পর ৩ নভেম্বর এর যাত্রা শুরু হবে আমেরিকার। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কোটি কোটি নাগরিক আজ ডেমোক্রেট প্রার্থী জো বাইডেন অথবা রিপাবলিকান দলের মনোনীত প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হোয়াইট হাউসের জন্য মনোনীত করবে। যুক্তরাষ্ট্রের এবারের নির্বাচনকে পৃথিবীর অভিজ্ঞ নির্বাচন বিশ্লেষকরা বিবেচনা করছে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ইস্যুভিত্তিক নির্বাচনের প্রতীক হিসেবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ৪৬তম এই অধ্যায়ের মূল বিষয় ডোনাল্ড ট্রাম্প আর জো বাইডেন নয়। মার্কিন জনগন দীর্ঘ দিন তাকিয়ে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অধিকার ও অর্থনৈতিক বিষয়ক সম্পর্কগুলোর দিকে। বিষয়টির সূত্রপাত হয়েছিলো ২০১৬ সালের মার্কিন নির্বাচনের সময়। ডোনাল্ড ট্রাম্প এর তীব্র বিরোধীদের সমালোচনার মুখেই ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৬ সালে বিজয়ী হয়ে হোয়াইট হাউসের দ্বায়িত পেয়েছিলেন সেই নির্বাচনে। বিগত চার বছর ট্রাম্পের শাসনামলে ট্রাম্প বিরোধী মনোভাব চলমান থেকেছে আমেরিকার শহরে শহরে। গণমাধ্যম এই বিষয়ে সবচেয়ে এগিয়ে ছিলো। এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দেখা গিয়েছে গণমাধ্যমের বিপরীতে কঠোর অবস্থান নিতে। চলমান নির্বাচনের ক্যাম্পেইনও ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নীতির পরিবর্তন ঘটাননি।
এদিকে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ট্রাম্পের নানাবিধ সমালোচনার মধ্য দিয়েই তার নির্বাচনের নীতিমালা নির্ধারণ করেছেন। জো বাইডেন এর রানিং মেট কামালা হারিস প্রতিটি অঙ্গরাজ্যে ট্রাম্পের তীব্র সমালোচনায় বক্তব্য রেখেছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক প্যান্সকে নিয়েই গোটা সময় দাপিয়ে বেড়িয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গ রাজ্যগুলো। নির্বাচনী বক্তব্যের প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখা যায় ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেকে দাবি করেছেন একজন অরাজনৈতিক ব্যাক্তি হিসেবে। তাকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বিবেচনা করছেন একজন পপুলিস্ট, আইসোলেশনিস্ট, ন্যাশনালিস্ট নেতা হিসেবে। তবে ট্রাম্প মার্কিন জনগনের কাছে বারবার দাবি করেছেন তিনি মার্কিন স্বার্থকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন বিগত চার বছর। মেইক আমেরিকা গ্রেট এগেইন শ্লোগান ডোনাল্ড ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি। পাশাপাশি মার্কিন জিডিপির ৩৩.১ এ উন্নতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় সফলতা হিসেবে দেখেছেন আমেরিকার ৪৫তম এই প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেছেন তিনি নির্বাচনের প্রতিশ্রুতির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। হোমল্যান্ড সিকিউরিটির জন্য বর্ডার ওয়াল নির্মাণের ব্যাপারে ট্রাম্প কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। মেক্সিকোর সাথে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবধান নয় বরং অবাধে মাদক পাচার ও অভিবাসীদের ঢল ঠেকানোর জন্যই ট্রাম্পের নীতি মার্কিন জনগনের আস্হা অর্জন করেছে। আমেরিকার ইতিহাসে এটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বিগত শত শত বছর মেক্সিকোর সীমান্ত দিয়ে আমেরিকার ভূখন্ডে অবাধ মাদক পাচার ট্রাম্পের শাসনামলে চরম বাঁধার মুখে পরে। মানব পাচার বন্ধেও ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক ভূমিকা রেখেছেন বিগত চার বছর। অভিবাসন আইন পরিবর্তন করে তিনি সমালোচনার মুখেও পরেন। সেই সুযোগে ডেমোক্রেট প্রার্থী বাইডেন মার্কিন জনগনকে প্রতিশ্রুতি দেন এই আইনকে পূন:প্রতিষ্ঠা করার। অভিবাসন আইনকে বাইডেন সহজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্প সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন ট্র্যাড-ওয়ার অথবা বানিজ্য যুদ্ধের বিষয়টি। চিনের সাথে বানিজ্য যুদ্ধে যে কোন উপায়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক ও সচেতন ভূমিকা পালন করার কথা বলেছেন ট্রাম্প। এজন্য আমেরিকার শ্রম বাজার ও শ্রমিকদের অগ্রাধিকার এর প্রতি তিনি শক্তিমান ভূমিকা রাখার পক্ষে। মার্কিন উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য এবারে তিনি তার কাজকে আরোও এগিয়ে নিতে চান। নির্বাচনের আরেকটি বড় প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে মার্কিন অর্থনীতিকে তিনি প্রাধান্য দিয়েছেন। তিনি নির্বাচিত হলে আমেরিকার অর্থনীতিকে তিনি আরোও সমৃদ্ধশালী করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। জো বাইডেনকে তিনি কঠোর সমালোচনা করতে গিয়ে বলেছেন বামপন্থী ঘুমন্ত ব্যাক্তি। বারবার বাইডেনকে তিনি একজন ঘুমন্ত মানুষ হিসেবে মন্তব্য করেছেন।
২০১৬ মার্কিন নির্বাচনে ৬৯.২ শতাংশ নাগরিক ভোটে অংশগ্রহণ করেছিলেন। বিশ্ব মহামারীর এই কঠিন পর্যায়ে ২০২০ নির্বাচনে ভোটারের সংখ্যা পূর্বের থেকে অনেক কমে যাবে। ইলেকট্ররাল ভোটের ৫৩৮তে ট্রাম্পকে অন্তত ২৭০টি ভোট পেতে হবে পুনরায় নির্বাচিত হতে হলে। এছাড়াও জনগনের সরাসরি ভোটে নির্ধারিত হবে আগামী চার বছর আমেরিকার রাজনীতি ও হোয়াইট হাউস পরিচালনার সকল জল্পনা-কল্পনা।
১৮২৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আমেরিকার ডেমোক্রেট দল এবং ১৮৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল রিপাবলিকান দল। রিপাবলিকান পার্টির অন্য একটি নাম গপ (GOP)। যার অর্থ হলো গ্রান্ড ওল্ড পার্টি। ৭৪ বছর বয়সী ডোনাল্ড ট্রাম্প জন্মগ্রহণ করেছেন কুইনস অঙ্গরাজ্যে ১৯৪৬ সালের ১৪ জুন। আর নির্বাচনের প্রচারণায় ট্রাম্প নিজেকে দাবি করেছেন একজন ইয়ং ম্যান হিসেবে। তাকে বিভিন্ন সময়েই রসালো কৌতুক পরিবেশন করতে দেখা গিয়েছে প্রচারণার মঞ্চে। অন্যদিকে ৭৮ বছর বয়সী জো বাইডেন জন্মগ্রহণ করেছিলেন পেনসেলভানিয়ার স্ক্রানটনে। তার ছেলে হান্টার বাইডেন ও মেয়ে নাওমি অ্যাসলে বাইডেন। জো বাইডেন ১৯৭৭ সালে দ্বিতীয় বিয়ে করেন। তার স্ত্রী জিলের সাথে তার পরিচয় ঘটেছিল ১৯৭৫ সালে। এদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্ম হয়েছিল এক ধনী পরিবারে। তার বাবার ১৯৭১ সালে রিয়াল স্টেট এর ব্যাবসা ছিলো।
২০২০ মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণায় ডেমোক্রেট প্রার্থী জো বাইডেনের পাশে অনেকবার লক্ষ্য করা গিয়েছে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সমর্থন ও প্রচারণা। প্রেসিডেন্ট ওবামা জো বাইডেনকে একজন সঠিক মানুষ হিসেবে বিবৃতি দিয়েছেন। আমেরিকার জনগনের জন্য স্বাস্থ্য নীতির পক্ষে দুই নেতাকে বারাক ওবামার হেলথ কেয়ার এর প্রসঙ্গ উল্লেখ করা হয়েছে বক্তব্যে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণায় সাবেক কোন প্রেসিডেন্ট এর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়নি। আর কয়েক ঘন্টা পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন শুরু হচ্ছে। মার্কিন নির্বাচনের চূড়ান্ত গতিপথ নির্ধারণ হবে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ এই ভোটে। মহামারীর কবলে বিবর্ন এই পৃথিবীর থমকে থাকা সময়ে বিশ্বের ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের এই নির্বাচন মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক অনন্য স্মৃতি। নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফলের দিকে তাকিয়ে গোটা পৃথিবীর জনগন। সভ্যতার এই যাত্রা সফল হোক মানব কল্যানে, মানব ইতিহাস নির্মানে। ধ্বংস নয় এগিয়ে যাওয়া, সেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুদ্ধ নয় শান্তি সেই কথা উচ্চারণ করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। জো বাইডেন উদার ডেমোক্রেট ধারার প্রবর্তণের পক্ষে। আর বিশ্ববাসী অপেক্ষায়।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

Calendar

April 2021
S M T W T F S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
252627282930  

http://jugapath.com