মাহে রমজানঃ আসুন সবকিছুতেই সংযমী হই

প্রকাশিত: ১০:৩৪ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ১৩, ২০২১

মাহে রমজানঃ আসুন সবকিছুতেই সংযমী হই

 

আনোয়ার ফারুক তালুকদার

দেখতে দেখতে আরেকটি রমজান এসে কড়া নাড়ছে আমাদের দরজায়। করোনা মহামারীতে এটি দ্বিতীয় রমজান। এবারও রমজানের শুরুতে কঠোর লকডাউনের নির্দেশনা রয়েছে। আজ থেকে সামনের আট দিন কঠোর লকডাউন। জরুরী প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে যাওয়া যাবে না। ঘরের মধ্যে থেকে মহামারীর বিস্তার রোধ করতে হবে। করোনা মহামারীর বিস্তার ঠেকাতে জনসমাগম/জনস্রোত বন্ধ করা দরকার। এবারের করোনা ঢেউয়ে কেউই নিরাপদ না। সুতরাং ধনী-গরীব, ছোট-বড় সবাইকে মানতে হবে লকডাউন। নিজের জন্য এবং অন্যের জন্য। এখানেই আবারও ‘মানুষ মানুষের জন্য’ বাক্যটির যথার্থতা প্রমানের সময়। কোনভাবেই উদাসীনতা দেখানো যাবে না। যদি বাঁচতে চান এবং বাঁচাতে চান তাহলে অবশ্যই করোনা বিধি-নিষেধ মানতে হবে। রমজানের এটাও একটা শিক্ষা । সংযমী হওয়া। বাইরে বের হওয়া থেকে নিজেকে বিরত রাখা। অন্যকে বিরত রাখতে সহায়তা করা। নিজের প্রয়োজন অতিরিক্ত পণ্য ক্রয় না করে অন্যকে পণ্য ক্রয়ে সহায়তা করা। বেশী বেশী পণ্য কিনে মজুদ করে রাখার কোন যৌক্তিকতা নেই । সরকারি –বেসরকারি তথ্য মোতাবেক দেশে পর্যাপ্ত পণ্যসামগ্রী মজুদ আছে। বেশী বেশী পণ্য কিনলে বাজারে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সেই সুযোগে পণ্যের দাম বাড়িয়ে বেশী মুনাফা লাভের ফাঁদ পেতে বসে। যা কোন ভাবেই কাম্য নয়। মানুষের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে ব্যবসা করা কোন ধর্মই সাপোর্ট করে না। দেশে দেশে ধর্মীয় আচার অনুস্টানের সময় বরং ব্যবসায়ীরা বেশী বেশী ছাড় দেয়। চলতে থাকে ডিসকাউন্টের ছড়াছড়ি। সারা বছর সাধারণ মানুষ অপেক্ষা করতে থাকে উৎসবের সময় ডিসকাউন্ট নিয়ে বেশী কিনবে বলে। অথচ আমাদের দেশে ব্যাপারটা উল্টো। রোজা, ঈদ, পূজা পার্বণে দ্বিগুণ থেকে তিনগুন পর্যন্ত দাম নিতে দেখা যায়। এই অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটা প্রয়োজন। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের তকমা লাগাতে চলছি অথচ মানসিকতা যদি স্বল্পোন্নতই থেকে যায় তাহলে উন্নয়ন থেকে আমরা কি শিক্ষা নিলাম, ভেবে দেখা প্রয়োজন। বিভিন্ন সরকারী-বেসরকারী উদ্যোগ কাগজে –কলমে দেখা যায়। খোলা বাজারে পণ্য বিক্রি করে টিসিবি চেস্টা করে যাচ্ছে মানুষকে কিছু স্বস্তি দিতে। কিন্তু বিশাল জনগোষ্ঠীর দেশে এটা নিতান্ত অপ্রতুল। দুর্নীতি আমাদের অনেক কিছুই গ্রাস করে রেখেছে। দুর্নীতি রোধ করা গেলে মানুষকে আরো বেশী স্বস্তি দেয়া যেত। দুর্নীতির প্রতি “জিরো টলারেন্স” মুখে মুখে না বলে বাস্তবে এর প্রমাণ দেখালে এবং প্রকৃত দুর্নীতিবাজদের শাস্তির আওতায় আনলে দুর্নীতি কমতে বাধ্য। দুর্নীতি করে পার পাওয়া যায়না এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। এটা রোজারও শিক্ষা। রমজানের রোজা আমাদের যেমনিভাবে আত্মিক শুদ্ধতা দান করে, তেমনি সামাজিক অসমতা, দুর্নীতি দূর করে সাম্য-মৈত্রী, ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ববোধে উদ্বুদ্ধ করে। সমাজে যারা বিত্তবান, সামর্থ্যবান , খাবারের অভাব তাদের স্পর্শ করতে পারে না। ক্ষুধার যন্ত্রণা যাদের বোধগম্য নয়, রোজা তাদের সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত যাবতীয় পানাহার থেকে বিরত রেখে, অনাহারীদের অপরিমেয় দুঃখ-কষ্ট উপলব্ধি করানো হয়। এই উপলব্ধির মাধ্যমে সামর্থ্যবানরা সমাজের অসহায়, হতদরিদ্র, দুর্বল, পীড়িত তথা নিরন্ন মানুষের মুখে খাবার তুলে দেবে এটাই রোজার শিক্ষা। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, আমাদের অনেকেই রোজার এই তাৎপর্য বুঝতে অক্ষম। ফলে আমরা নিজেরা নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত থাকি। এর বাস্তব প্রমাণ আমাদের চোখের সামনেই সদা সর্বদা বিরাজমান। করোনাভাইরাসের মতো মহামারীর সময়েও আমরা অনৈতিক কর্মকাণ্ড করে যাচ্ছি। দুর্নীতি করতে অনেকেরই বাঁধ সাধে না। তাদের কাছে এই পৃথিবীর যা কিছু পার সব গ্রাস করে নাও। যেন এ জগতেই তার সব শেষ। সরকারি ত্রাণ গরিবদের না দিয়ে নিজের ঘরে জমা করছে। অথচ আল্লাহ এ ব্যাপারে কঠোর নিষেধ করে বলেছেন, ‘তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অন্যের অর্থ-সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৮৮) । সবকিছুর হিসাব একদিন দিতেই হবে। তাই আসুন রোজা থেকে শিক্ষা নেই, সংযমী হই এবং অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল হই।

ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক