মায়াবতী

প্রকাশিত: ১:২০ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০১৮

মায়াবতী

শেলী সেনগুপ্তা
আজ সৈকত রহমানের খুব আনন্দের দিন। তার আঁকা একটা ছবি আন্তর্জাতিক পুরষ্কার এর জন্য মনোনিত হয়েছে। কিছুক্ষণ আগে খবর পেয়েছে। খবরটা বন্ধুমহলে ছড়িয়ে পড়েছে। ও জেনেছে এক বন্ধুর মুখে। দু’দিন মেইল চেক করা হয় নি। হলে হয়তো গতকালই জানতে পারতো। একটু পর পর ফোন রিসিভ করতে করতে একরকম ক্লান্ত হয়ে গেছে। সন্ধ্যায় সবাই বাসায় আসতে চায়। ওর আমন্ত্রনের জন্য কেউ বসে নেই । নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিয়েছে আজ সন্ধ্যেটা ওরা সৈকতের বাসাতে কাটাবে।
বন্ধুরা যখন বিয়ে করে বছর পঁয়ত্রিশের সৈকত একা থাকে। বন্ধুরা যখন দুই এক সন্তানের দায়িত্বশীল বাবা হয়ে গেছে তখনও সৈকত অবিবাহিত জীবন যাপন করছে। শহরের প্রাণকেন্দ্রে দু’বেডরুমের ফ্ল্যাটে থাকে, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে ডিজাইনার হিসেবে মোটা বেতনে কাজ করছে। বছরে দু’একবার বিদেশে যাওয়া হয়।
সুযোগ পেলেই বন্ধুরা ওর ফ্ল্যাটে আড্ডা বসায়। ও সানন্দে আপ্যায়ন করে। সব ধরনের পানীয়, আর খাবারের সরবরাহ থাকে। গভীর রাতে সবাই আনন্দ করতে করতে ফিরে যায়। পরদিন ওর বাসায় স্বল্পকালীন পরিচালক এসে সব কিছু পরিষ্কার করে দেয়। সব মিলিয়ে ভালই আছে।
আজ যারা ওকে অভিনন্দন জানালো তারাই আজ সন্ধ্যার প্রোগ্রাম ঠিক করে নিয়েছে। সৈকতের কিছুই যেন বলার নেই।

একে একে সব বন্ধুরা আসছে। প্রায় সবার আগে ফুল। ভালোই লাগছে। তারপরও কেমন যেন আনমনা। চোখের সামনে ভাসছে ছবিটা। এক নারী, নীল শাড়ি পরা, পায়ে আলতা, কপাল বিশাল টিপ, ঠোঁট লাল, একমাথা কোঁকড়ানো চুল ঘাড় ছুঁয়ে কোমর পর্যন্ত নেমে এসেছে। আলতা রাঙ্গানো পা জলের মধ্যে চুবিয়ে আনমনে আকাশ দেখছে। ঠোঁটে মৃদু হাসি কিন্তু চোখদু’টিতে যেন বেদনা নাও ভাসছে। এছবি ওর মনের মধ্যে অনেক আগেই আঁকা হয়ে ছিলো, কিন্তু ক্যানভাসে আসেনি। হঠাত শান্তিনিকেতনে একটা প্রদর্শনি আর প্রতিযোগিতার কথা শুনে আঁকলো। এতোদিন মনের মধ্যে যে জমাট কান্নাটা লুকিয়ে ছিলো, তা বাইরে এলো। ছবিটা এঁকেই পাঠিয়ে দিয়েছে। প্রতিযোগিতায় ছবিটা প্রথম হয়েছে। এটাসহ প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়া সব ছবির প্রদর্শনি হবে। আগামি মাসে যেতে হবে। সেই কবে ফিরেছে নিজের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে আর কখনো যাওয়া হয় নি। এবার যাবে।

বন্ধুরা হৈ চৈ করছে। সবাই তুমুল আড্ডা জুড়ে দিয়েছে। সবার হাতে হাতে রঙ্গীন পানীয়। টেবিলে অনেক ধরণের খাবার সাজানো, সেদিকে কারো মন নেই , সবাই নিজের মতো পানীয় ঢেলে নিচ্ছে আর গল্পে মশগুল হয়ে আছে।

সৈকত বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে, জিনের গ্লাসে ছোট ছোট চুমুক দিচ্ছে আর ভাবছে। বেশ ছিলো এতো দিন। সব কিছু থেকে দূরে , নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে ব্যস্ত ছিলো। এতো দিন প্রেম,সংসার, সন্তান, এসব নিয়ে ভাবে নি। শান্তিনিকেতন থেকে ফেরার পর ওর জীবনটা একবারেই বদলে গেছে। বাবা মা মারা গেছেন, বড় ভাই সম্পত্তির ভাগ হিসেবে ওকে কিছু টাকা দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেছে। ও আর পেছন ফিরে দেখেনি। চুপচাপ বাড়ি থেকে বের হয়ে এসেছে। এভাবে পেছনে ছেড়ে আসা যেন ওর চরিত্রের সাথে মিশে গেছে। সব বন্ধন নিজের অজান্তেই খুলে গেছে। এই ফ্ল্যাটটা কিনে নিজের মতো বসবাস করছে।
আজ চোখের সামনে শান্তিনিকেতনের দিনগুলো ছবির মতো ভেসে উঠছে। সব পেছনে ছেড়ে এসেও কি মুক্ত হতে পেরেছে স্মৃতির ভার থেকে?
মেঘলা বিকেল,মায়ার সাথে প্রথম দেখা। শান্তিনিকেতনের পাশের গ্রামে বেশ সম্পন্ন পরিবারের বঊ। সে বাড়ির ছোট বঊ মায়া। মায়ার ভাসুরের ছেলেকে পড়াতো সৈকত। পড়াতে পড়াতে মায়ার সাথে দেখা। মাঝে মাঝে কথা,তাও সবার চোখ বাঁচিয়ে। চমৎকার একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছিলো। হয়তো এটাকে প্রেম বলে। এখন তাই মনে হচ্ছে। মায়ার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সৈকতের সময়ের হিসেব ভুল হয়ে যেতো। দু’জনেই সুযোগ খুঁজতো কাছে আসার। মায়ার কাছে যাওয়ার জন্য সৈকত নিজেই সে পরিবারের সাথে গভীরভাবে মিশে গিয়েছিলো। সবার আস্থা অর্জন করে যখন তখন সে বাড়িতে যেতো। ওর জন্য ছিলো অবারিত দ্বার। কখনো ভর দুপুরে, সন্ধ্যায় সবার আড়ালে ওরা কখন যে নিজেদের আবিষ্কার করতে শুরু করলো বুঝতেই পারে নি। সৈকতের চেয়ে পাঁচ ছয় বছরের বড় মায়ার সাথে গড়ে ওঠা সম্পর্কটা বেশ তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করছিলো সে। ওর টনক নড়লো যখন মায়া জানালো , সে সন্তান সম্ভবা, এবং সে সন্তান সৈকতের। মাথায় বাজ পড়লো। সে জানতে চাইলো,
ঃ কি করে সম্ভব?
ঃ কেন সম্ভব নয়?
ঃ তোমার স্বামী থাকতে তুমি কি  করে বলো এই সন্তান আমার?
ঃ তার সাথে আমার শারীরিক সম্পর্ক নেই, কখনোই হয় নি।
ঃ মানে কী? কি বলছো তুমি?
ঃ ঠিকই বলছি, সে পুরুষত্বহীন।
ঃ তাহলে তুমি বিয়ে করলে কেন তাকে?
ঃ আমি গরীব ঘরের মেয়ে , তারা সবকিছু গোপন করে আমাকে এনেছে।
ঃ এখন তুমি আমার কাছে কি চাইছো?
ঃ তুমি আমাকে বিয়ে কর, আমি তাকে পৃথিবীর আলো দেখাতে চাই।
ঃ আমাকে একটু সময় দাও।
সৈকত সেদিন মায়াদের বাড়ি ছাড়লো, শুধু সে বাড়ি নয়, সে শান্তিনিকেতন থেকে চুপচাপ ঢাকা চলে এলো। এসেই নিজের সাথে যুদ্ধ শুরু করলো। প্রতি মুহুর্তে হেরে যাচ্ছে। চোখের সামনে বার বার মায়ার মুখটা ভেসে উঠছে। যতবার দায়মুক্ত হতে চাইছে , ততবার নিজেকে খুব ছোট মনে হচ্ছে। বাসায় মন টেকে না, বন্ধুদের সাথে গল্প করে ভালো লাগে না। সবসময় সে অস্থির হয়ে আছে। ঢাকায় ভাল লাগছে না, তাই এক বন্ধুর সাথে মুন্সীগঞ্জে ওর বোনের বাড়িতে বেড়াতে গেলো। সেখানেই ভালো লাগছে না। বন্ধুকে বললো ফিরে যাওয়ার কথা।
দু’দিন থাকার পর যেদিন ফিরবে সেদিন হঠাত করে বন্ধুর বোন সিঁড়ি থেকে পরে গেলো। পড়েই অজ্ঞান। ওরা ছোটাছুটি করে ওকে হাসপাতালে নিয়ে গেলো। ডাক্তার খুব যত্ন নিয়ে দেখছে, জানা গেলো বন্ধুর বোন চার মাসের অন্তসত্তা ছিলো , এবং গর্ভপাত হয়ে গেছে। বোন তখনও কিছু বলতে পারে না, কিন্তু ওর ভগ্নিপতির কান্না দেখে সৈকতের চোখে জল এসে গেলো। বুঝতে চেষ্টা করলো, এটাই কি তবে পিতৃত্ব? ওর বুকের মধ্যে কেউ যেন কেঁদে কেঁদে উঠছে। মায়ার কান্নাভেজা চোখদু’টি ওকে ডাকছে। শেষদিন ওর হাতটা নিয়ে মায়া নিজের পেটে রেখেছিলো। ওদের সন্তানকে স্পর্শ করাতে চেয়েছিলো। সৈকত বুঝতে পারেনি, মায়ার ভালোবাসা বুঝতে পারে নি। পালিয়ে এসেছে। পালিয়ে এসে দায়িত্ব এড়াতে চেয়েছিলো।

ফিরে গেলো শান্তিনিকেতনে, পরদিনই মায়াদের বাড়ি গেলো, সারা বাড়ি থমথমে। মায়াকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। ওর ছাত্রকে ডাকলো। সে পড়তে চাইলো না। মন খারাপ খুব। কারণ কাকীমনি একমাস আগে মারা গেছে। কেউ যেন ওর কানে গরম সিসে ঢেলে দিয়েছে। নিজেকে অনেক কষ্টে সামলে নিলো।
হোস্টেলে নিজের রুমে ফিরে এলো। মায়াদের পাশের বাড়ির এক ছেলে ওদের সাথে পড়ে, তার কাছে জানলো এক ভোররাতে মায়ার লাশ পাওয়া গেছে ওদের বাড়ির পুকুরে। দুর্ঘটনা নাকি আত্মহত্যা কেউ জানে না।
সৈকত স্তব্ধ হয়ে গেছে। কেউকে কিছুই বলার থাকলো না। ওকেও কেউ কিছু বললো না। কেউ জানলো না মায়া ওকে কত বড় দায়িত্ব থেকে মুক্ত করে দিয়ে গেছে।
একমাস পরেই ফাইনাল পরীক্ষা, কোন রকমে শেষ করে আবার ঢাকা ফিরে এলো। নিজেকে পেশাগত জীবনে প্রতিষ্ঠিত করলো। কিন্তু বুকের নিচে এখনো কাঁটার মতো বিঁধে আছে পদ্মফুলের মতো মায়ার মুখটা। মায়া এখনো ওর জীবনের সাথে জড়িয়ে আছে। ছবিটার নাম রেখেছিলো ‘ মায়াবতী’।