মিতা হক , আমার প্রিয় মানুষটি

প্রকাশিত: ১:৩২ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১২, ২০২১

মিতা হক , আমার প্রিয় মানুষটি

লুনা শীরিন

 

মেমোরী রিফ্রেশ করার ব্যাপার থাকে , বিশেষ করে কাঊকে নিয়ে গুছিয়ে কথা বলার আগে বা লেখার আগে –ভেবে নিতেই হবে –আমি কথা বলছি দশজনের সামনে বা আমি লিখছি পাবলিক প্লেসে, সাবধান তো হতেই হবে ।
কিন্তু তুমি কি বলতে পারো –ভালোবাসা কি করে গুছিয়ে প্রকাশ করা যায় ? আবেগ কি করে খুব গুছিয়ে বা চিন্তা করে করে প্রকাশ করা যায় ? আসলেই কি সেটা সম্ভব ? হয়তো যায় যদি সামনে পরিচালকের দেয়া স্ক্রীপ্ট হাতে থাকে । তাই তো করেন অভিনয় শিল্পীরা –আমি তো অভিনয়শিল্পী না । আবার গতকাল এই শহরে তখন রাত সাড়ে নয়টা –রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী “মিতা হক” হয়তো এক মিনিট আগেই পরপারে চলে গেছেন –ছোটবোন শাহিন সঙ্গে সঙ্গে জানালো – আমি ব্যাস্ত হয়ে ঘরের কাজ সারছিলাম –শাহিন ওর পড়াশুনা করছে –কিন্তু আমি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে দেখি –শাহিনের দুই চোখ ভীষন লাল হয়ে আছে –মানে শাহিন মিতা আপার জন্য কাদছে আরো দুইদিন ধরে। মিনিটে মিনিটে খবর আসছে –ঢাকা থেকে । শেষ সংবাদ জানানোর সাথে সাথেই শাহিন কে বলি – “আমি মিতা আপাকে নিয়ে লিখি শাহিন ? “ যেনো আমি অনুমতি চাইছি । শাহিন ধীরে বলে- “লেখো মেঝপা ,কিন্তু তোমার সাথে মিতা আপাকে পেচাবা না , মিতা আপার কথাই লিখবা । “
কি অবাক – মিতা আপার ভালোবাসার কি স্মৃতি  আমার কাছে আছে সেটা লিখতে গেলে তো নিজেকে টানতেই হবে । আমি কি স্বরনিকা লিখবো নাকি ? মিতা হক কতবড় শিল্পী ছিলেন সেটা কি লিখতে বসেছি নাকি ? আমি কি বলতে বসেছি মিতা আপা কত বড় ফ্যামিলির মেয়ে ছিলেন ? এইসব তো যারা তথ্য সংগ্রহ করে লিখবে তারা বলবে । আমি কেবল-ই বলতে চাই – “মানুষ মিতা হক”-কে ক্যামন দেখেছি । সেটা লিখতে বসেছি বলেই তো টিস্যু বক্স হাতের কাছে টেনে নিয়েছি , কাদতে হবে , অপরাধ স্বীকার করতে হবে – বলতেই হবে – গত ১২ বছর আমি মিতা,পা একটা ফোন দিয়ে জানতে চাইনি –
মিতা আপা– ক্যামন আছো ? ভালোবাসার মানুষের কাছে সবচেয়ে জরুরী প্রশ্ন ।
অথচ অতবড় শিল্পী তারচেয়েও বড় মানুষ ছিলেন মিতা আপা –তাই তিনি খবর রেখেছেন বরাবর জানতে চেয়েছেন, আমি নাইয়া ক্যামন আছি- নাইয়া কত বড় হলো ? যতবার আমার পরিচিত মানুষ মিতা আপার সামনে গেছে –মিতা আপা জানতে চেয়েছে আমার কথা ,আমার বাকী বোনদের কথা । মিতা আপা কত বড় শিল্পী এটা মনে রাখলে কি কাজটা করতেন তিনি ?কি দায় তার ? তিনি কত বিখ্যাত শিল্পী এটা মনে রাখলে কি নাইয়ার জন্মের দিন ১৯৯৯ সালের ১৯ শে নভেম্বর রাত দেড়টায় সেন্ট্রাল হসপিটালে –কাচের জানালার ওপাশে যেখানে আমাকে অপারেশন করা হচ্ছে সেখানে দাড়িয়ে থাকতেন মিতা হক ?
এখানেই মিতা হক আকাশ-সমান মানুষ – এমন মানুষ হয়ে উঠার জন্য অনেক অনেক বড় মনের মানুষ হতে হয় –মিতা আপা তাই ছিলেন আজন্ম, সবার কাছেই মিতা আপা তাই ছিলেন ।
২০০১ সালে মিতা আপার সাথে রবীন্রদসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ থেকে তিনদিনের সফরে আসামের শিলচর গেলাম। মিতা আপার ভালোবাসাতেই ২০০১-২০০২ এ আমি সম্মিলন পরিষদের সদস্য হয়েছিলাম । তো সেই সফরের গল্প মিতা আপা সবার কাছে করতেন অনেক বছর ধরে করেছেন , অসাধারন অভিনয় করে করে গল্প করতে পারতো মিতা পা । সিলেটগামী ট্রেন তুরনানিশীথা তে উঠেছি মিতা আপা,র সাথে , একটা কামরায় একদিকে আমি আর মিতা আপা , অন্যদিকে সিলেটের কোন এক এমপির ছেলে। তরুন ছেলে – বয়স ৩৫/৩৬ হবে হয়তো – আমাদের সাথে আলাপ হলো – তিনি মিতা আপাকে চেনেন না । আমি ছেলের ঠিকুজী জানতে গিয়ে জানলাম , সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছে – ঢাকাতেই থাকে , এবং নাকি গান ও শোনে ।
আমাকে যারা জানেন তারা বলতে পারবেন , সেদিন ঐ ট্রেনের কাম্ড়ায় পারলে সেই ছেলের কলার ধরতে গিয়েছিলাম – আপনি কেন “মিতা হক”-কে চিনবেন না ? কি কারনে চিনবেন না মিতা হক কে আপনি ? বিস্বাশ করো –মিতা আপা আমাকে থামাতে গিয়ে অস্থির হয়ে পড়েছিলো । বলে-“ লুনা তুই থাম , তুই থাম , সবাই কেন আমাকে চিনবে ,আমাকে চিনতেই হবে এমন কোন কথা নেই, প্লীজ এমন করিস না আর “।
কতবছর পাড় হলো -২০০১ থেকে ২০২১ । ২১ বছর আগের কথা –মিতা হক সেই ট্রেনের কামড়াতেও প্রমান করলেন, প্রথমে তিনি “মানবিক মানুষ “ এর পরে তিনি “ শিল্পী”। মনে পরে ছোটবেলায় সেই স্যারের উচ্চারন –“বড় গাছ নুয়ে থাকে “। মিতা আপা তাই ছিলেন , একদম সাধারন সাদা মনের মেয়ে – পৃথিবীর যাবতীয় দুঃখ / কষ্টেও মিতা আপা হাসতেন , ভালোবাসতে পারতেন , গান গাইতেন ভালোবাসা দিয়ে ।
লেখা শেষ করতে হবে – আম্মা বলছিলেন এই মাত্র ২ঘন্টা আগে – লুনা , মিতাকে নিয়ে লেখ , ও তো আমাদের বাড়ির সদস্য, ও তো আমার মেয়ে-ই , বাকী দুই বোন বড়পা আর কনাও তখন ফোন লাইনে – আম্মার কন্ঠ কি বুজে আসছিলো কান্নায় ? আমেরিকা থেকে বাকী দুই বোনের চোখের কোনায় কি পানি জমেছিলো ? টরোন্টো শহরে এখন রবিবার সকাল সাড়ে দশটা –আমরা বাকী তিনবোন কিছুক্ষণ নীরব থেকে ফোন ছেড়ে দেই –অন্যাদিকে ছোটবোন শাহিন গতরাত থেকেই নীরব হয়ে আছে । শাহিনের এই নীরবতা কে ভাঙবে ? কে শুনবে শাহিনের নীরব কান্না ? মিতা আপার মেয়ে জয়িতা -কে পেলে কি শাহিন এক্টু হাল্কা হতে পারতো ?
মিতা আপা –সেই পুরানো কথা নতুন করে বলি –“ তোমার মৃত্যু নেই মিতা আপা , তোমার ভালোবাসা জমা আছে বাংলাদেশের হ্রদয়ে –তুমি বিশ্রাম করো এবার “। শিল্পী বা তারকা খ্যাতির দাম্ভিক পোশাক তিনি কখনোই পরতে চাননি। বরং প্রচলিত ঘুণে ধরা সমাজের কিছু বিকৃত মানুষের রোষানলে পড়তে পারেন জেনেও মিতা হোক সোচ্চার হয়েছেন সাংস্কৃতিক বিপ্লবে, ফেসবুকে বা কিছু গণমাধ্যমে কথাও বলেছেন।
মিতা হক একবার বাংলা সংস্কৃতি বাদ দিয়ে
মেয়েদের আরবীয় বোরখা সংস্কৃতি গ্রহণ করার সমালোচনা করেছিলেন, সে কারণে তাকে কম নিগ্রহ করা হয়নি!
ধানমন্ডি রবীন্দ্র সরোবরের সামনে মিতা হকের গানের স্কুল ‘সুরতীর্থে’ নতুন এক শিক্ষার্থী ভর্তি হতে এসেছেন। বার বার কথায় কথায় অনবরত ইংরেজি বলার পারঙ্গমতা দেখানো সেই তরুণীকে গীতবিতান রেখে ছোট্ট একটি গল্পগুচ্ছের বই হাতে দিয়ে বলেছিলেন, ‘এখান থেকে দুটি গল্প পড়ে পরের ক্লাসে এসে আমাদের শোনাবে।’
মেয়েটি অবাক, ‘আমি তো আপনার কাছে গান শিখতে এসেছিলাম!’
মিতা হক বলেছিলেন, ‘আগে সেই মানুষটাকে জানো, উপলব্ধিতে আনো।’
একজন মিতা হক ছিলেন এমনই রবীন্দ্রসাধক। শুধু ভালো গাইতে পারা নয়, জীবনবোধের সঙ্গে সেই সম্মিলনটা খুব যত্নে গড়ে দিতে চাইতেন তিনি।
সুচিত্রা মিত্র যেমন বলেছিলেন তিনি তা বিশ্বাস করতেন।
‘‘সারাটা জীবন কেটেছে/তাঁর গানের ঝরনাতলায়/সুখে দুঃখে ঝড়ে ঝঞ্ঝায়/ আত্মপ্রত্যয় এসেছে/ চলায় বলায়।/এই এক গীতবিতান/আমার কাছে/গীতা বাইবেল কোরান/তাই ভালোবাসি এই গান।’’
(রবীন্দ্রসঙ্গীত জিজ্ঞাসা: সুচিত্রা মিত্র)
‘সুরতীর্থ’ নামের যে গানের স্কুল বা সংগীত সংগঠন, তা ছিল মূলত মিতা হকের প্রতিদিনকার অক্সিজেন। সেখানে কোনো ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ক তিনি গড়েননি। বরং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়েই ছিল তার গোটা পরিবার। এ দেশের কতজন শিক্ষার্থী যে মিতা হকের বাসায় আশ্রয় পেয়ে ঢাকায় প্রতিষ্ঠা নিয়েছে, তার তালিকাও কম দীর্ঘ হবে না। আর বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া অগুনিত শিক্ষার্থীদের লাঞ্চব্রেকসহ দুপুরের খাওয়া, আড্ডা আর গুরু মিতা হকের কাছে গানের তালিম নেওয়া যেন নিত্য ব্যাপার। মাস শেষে হয়তো ভার্সিটি ফি-অন্যান্য খরচ শেষ করে হাতে টাকা নেই। গান শেখার পয়সা কোত্থেকে দেবে? উল্টো মিতা হক কিছু হাত খরচ দিয়েছেন এমন তরুণ-তরুণী এ দেশে একশরও ওপরে গোনা যাবে।
একজন মিতা হকের মূল্যায়নে এসব কথা জরুরি। কারণ, সবাইকে নিয়ে জীবনের আনন্দ উদযাপন সবাই পারেন না। তার মতো মানুষেরা তাই অনেক দিক দিয়ে অনন্যা। নির্মোহ জীবনের পথিকৃৎ হয়ে থাকেন।
এ দেশে অনেকেই শিল্পী। কিন্তু সুরের সাধক, ক’জনার যাপিত জীবনকে বলা যায়? মিতা হক তেমনই এক নির্মোহ সুরের সাধক। যিনি জীবনে ধারণ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথের দর্শন। এমন শিল্পবোধের মানুষ, রবীন্দ্র সাধনের এমন আলোকবর্তিকাকে আমরা হারালাম ৫৯ বছর বয়সে।
তিনি কিডনিজনিত রোগের পাশাপাশি সর্বশেষ পোস্ট কোভিডের আক্রমণ সইতে না পেরে চলে গেলেন না ফেরার দেশে।
যে ছায়ানটের শীতল ছায়ায় জন্ম ও বেড়ে ওঠা, সেখান থেকেই শেষ শ্রদ্ধা, চোখের জল আর ফুলেল শুভেচ্ছায় সিক্ত হয়ে বিদায় নিলেন সংগীতশিল্পী-সংগঠক মিতা হক।
বিশেষ নোটঃ
( মিতা আপাকে ভালোবাসেন একজন সাধারন মানুষ । যিনি সঙ্গীত ভালোবাসেন মনে প্রানে -তিনি প্রয়াত মিতা, আপাকে নিয়ে লিখেছেন আমার ম্যাসেঞ্জারে — । আমি চলে গেলে কি একজন মানুষ আমাকে নিয়ে লিখবেন যিনি আমাকে চেনেন না কিন্তু আমার খোজ রেখেছেন মন থেকে ? জীবনের পূর্ণতা নানা মাত্রায় -মিতা আপাও জানতেন না তাকে না চিনেও কত মানুষ তাকে ভালোবাসেন । এই মানুষ তেমন একজন মানুষ – আপনাকে বিমন্র সন্মান ) ১১ এপ্রিল /২০২১।