“মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস” – বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব মো: সফিকুর রহমান ই পি আর

প্রকাশিত: ১:১৪ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৭, ২০১৭

johirulবাঙ্গালী জাতি কেউ ট্রেনিং কে ভয় পেয়ে পালিয়ে যেতাম না। পাকিস্তান করার কিছু দিন পর সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের একটি সরকারী পত্রিকায়
বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে জানতে পারি যে, সাবেক পাকিস্তান সরকার দেশ রক্ষা করার জন্য সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের ( E.P.R) ইষ্ট পাকিস্তান রাইফেলস রেজিমেন্ট পদে সৈনিক এর জন্য লোক ভর্তি করা হবে।

তখন আমি সিলেট ই,পি,আর, হেড কোয়াটার খাদিমনগর হইতে প্রাথমিক পরীক্ষায় পাশ করার পর আমাকে ই,পি,আর,এর সদর দফতর ঢাকা পিলখানায় পাঠানো হলো ট্রেনিং এর জন্য।
১৯৬৭ সালে আমি এসএসসি পরীক্ষায় পাশ করার পর আমিসহ সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের ১৯ টি জেলা হইতে প্রায় ৫০০ বাঙ্গালী ঢাকা পিলখানায় প্রশিক্ষণের জন্য যোগদান করি।

ট্রেনিং কোম্পানিতে আসার পর দেখতে পাই আমাদের সকল প্রশিক্ষক পাকিস্তানি।
মাঝে মধ্যে দুই একজন বাঙ্গালী আছেন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব মো: সফিকুর রহমান ( ই পি আর )
কমান্ডার :
বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, গোলাপগনজ উপজেলা কমান্ড, সিলেট।

আমি মো: সফিকুর রহমান।

গ্রাম : খাগাইল।
ডাকঘর :আছিরগনজ বাজার।
ইউনিয়ন: ১০ নং উত্তর বাদেপাশা।
থানা : গোলােগনজ।
জেলা : সিলেট।

তখন হইতে আমি দেখতে পাই যে পাকিস্তানী শিক্ষকরা আমাদের উপর নানা রকম অত্যাচার আরম্ব করে,
যাহাতে আমারা বাঙ্গালীরা সৈনিক হতে না পারি এবং তাহাদের জুলুম অত্যাচার দেখে ট্রেনিং কোম্পানী থেকে পালিয়ে যাই।

পরে সরকারের নিকট রিপোর্ট করা হবে বাঙ্গালী জাতি কোন সৈনিকের উপাযুক্ত নয়।

তাহাদের উদ্দেশ্য হলো বাঙ্গালীদের কে যেন আর সৈনিকে ভর্তি করা না হয়।

তখন যিনি আমাদের একমাত্র বাঙ্গালী অফিসার ছিলেন সুবেদার ফজলুর রহমান।
তিনি ট্রেনিং কোম্পানী কমান্ডারের দায়িত্বে ছিলেন।

সুবেদার ফজলুর রহমান সাহেব প্রতিদিন একটি ঘন্টা আমাদের কে বাংলা ভাষায় লেকচারের মাধ্যমে বুঝাতেন।

তোমরা বাঙ্গালী জাতি কেহ ট্রেনিংকে ভয় পেয়ে পালিয়ে যেয় না।

পাকিস্তানীরা আমাদের হাজার হাজার মাইল দূর থেকে এসে আমাদের কে শাসন করছে।

আর বেশি দিন দেরী নয়, এই দেশ আমরাই শাসন করবো ইনশাআল্লাহ।

তখন আমাকে একটি প্লাটুন লীডারের দায়িত্ব দেওয়া হলো।
আমি তখন পাকিস্তানীদের আচর দেখে দৃঢ়ভাবে শপথ নিলাম,সৈনিকের চাকরী থেকে বিদায় নেবো না।

আমি আমার সহকর্মী ভাইদের বুঝাতে লাগলাম কেউ যেন পালিয়ে না যায়।

আমরা বাঙ্গালী জাতি আমাদের জাতীয় মর্যাদা রক্ষা করতে হবে।

দীর্ঘ ৬ মাস ট্রেনিং শেষ করে নতুন সৈনিক হিসাবে শপথ গ্রহন করলাম।
তখন আমাকে ইষ্ট পাকিস্তান রাইফেলস্ এর দুই নং উইং হেড কোয়ার্টার ময়মনসিংহ জেলার খাকডহর এ পোস্টিং করা হলো।

আমি তখন আলফা কোম্পানীর ৬ নং প্লাটুন এর একজন সৈনিক ছিলাম।

১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ রাত আনুমানিক ১০ ঘটিকার সময় সাবেক ই,পি,আর,এর সদর দফতর ঢাকা পিলখানা থেকে ই,পি,আর এর ডাইরেক্টর নিছার খাঁন পশ্চিম পাকিস্তানী অফিসার, আমাদের ই,পি,আর এর দুই নং উইং কমান্ডার ক্যাপ্টেন আব্বাছ সিদ্দিকিকে ওয়ারলেস্ এর মাধ্যমে ফ্রিপুট মেসেজ পাঠান।

২৫ শে মার্চের রাতে ওয়ারলেস সেটে যার ডিউটি ছিলো তিনি একজন বাঙ্গালী সৈনিক।

তাহার নাম ল্যান্স নায়েক ফরহাদ কুমিল্লা জেলার কৃতি সন্তান।

ফ্রিপুট মেসেজ একমাত্র কমিশন রেংক অফিসার ছাড়া কোন সাধারণ সৈনিক পড়তে পারে না।

কেবলমাত্র গোপনীয় সংকেত লেখা থাকে।

পরম করুনাময় আল্লাহর অশেষ মেহের বানীতে আমরা প্রায় ৫০০ সৈনিকের জীবন রক্ষা হলো ২৫ শে মার্চের কালো রাতে।

ল্যান্স নায়েক ফরহাদ সিগনাল ওপারেটর ফ্রিপুট মেসেজ এর ট্রেনিং প্রাপ্ত সৈনিক ছিলেন।

তখন ফরহাদ ভাই লেটার রিসভ করার পর
উইং কমান্ডার এর নিকট না দিয়ে আমাদের বাঙ্গালী চার জন অফিসার ( যারা অফিসার রুমে থাকেন)।

রাত ১০ টা ৩০ মিনিটের সময় ফরহাদ ভাই সুবেদার ফরিদ সাহেবকে ঢাকার নির্দেশের বিস্তারিত বিবরন জানালেন।

১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চের রাত ১২ টা ৩০ মিনিটের সময় সমস্ত পূর্ব পাকিস্তানের বাঙ্গালী সৈনিক কে গুলি করে হত্যা করা হবে।

তার কারন হলো আমরা বঙ্গালী জাতি,আমাদের ভাষা বাংলা।

আমাদের বাঙ্গালী জাতির মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

১৯৭০ সালে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে আওয়ামীলীগের ১৬৭ টি আসন লাভ করেন।

তখন পশ্চিম পাকিস্তানের পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভূট্রোর দল মাত্র ৭৫ টি আসনে বিজয়ী হয়।

সাবেক পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খাঁন ও জুলফিকার আলী ভূট্রো সহ সকল পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর প্রথম টার্গেট ছিলো আমাদের উপর।

ইষ্ট পাকিস্তান রাইফেলস্ এবং ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এর সৈনিকদের হত্যা করা না হলে তারা হয়তো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশ পালন করতে পারে।

১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ এর রাত্রির বিস্তারিত বিবরন নিচে
বর্ণনা করলাম।

ঢাকার পিলখানার নির্দেশ পাওয়া মাত্র আমাদের উয়িং হেডকোয়ার্টারে রাত্রি ১১ঘটিকার মধ্যে সুবেদার ফরিদ সাহেবের
নির্দেশে সুকৌশলে কোয়ার্টার গাড হইতে একজন নাইটগাড কমান্ডার নায়েক ফজলে এলাহী পাকিস্তানীকে সর্ব প্রথম আত্মসমর্পণ করানো হলো এবং সেই রাত্রিতে অস্ত্রাগার হইতে সমস্ত অস্ত্র বাঙ্গালী সৈনিকরা বাহির করে নিয়ে আসে এবং রাত্রি আনুমানিক ১২ ঘটিকার সময় পাকিস্তানীদের উপর অতর্কিত আক্রমন চালানো হয়।

তখন ক্যাপ্টেন কামরান আব্বাস সিদ্দিকীর বাংলয় গিয়ে তাকে এ্যারেস্ট করা হয়।

পরে সুবেদার মেজর জান্নাত খাঁন পাকিস্তানীকে তাহার বাসভবনে গিয়ে তাকে এ্যারেস্ট করা হয়।

এরপর এই দুই জন কে হত্যা করা হলো।

এরপর উয়িং হেড কোয়ার্টারের দিকে রওয়ানা হলে পাকিস্তানীরা তাহাদের নিজ নিজ অস্ত্র দ্বারা এলো পাতাড়ী গুলি চালায়।

একটি কথা হলো পাকিস্তানীরা ২৪ শে মার্চ
থেকে তাদের নিজ নিজ অস্ত্র গোপনে নিজের কাছেই রাখেন।

কিন্তু বাঙ্গালী সৈনিকদের নিকট ব্যক্তিগত কোন হাতিয়ার
ছিল না।

কিন্তু পাকিস্তানীরা আগে থেকেই হাতিয়ার নিয়ে তৈরী ছিল।

উয়িং এ ৭৫০ সৈনিকের জানার কথা নয়।

২৫ শে মার্চের কালো রাতে রাস্তার মাঠিতে কী গঠতে যাচ্ছিলো।

কেবল রাখে আল্লাহ মারে কে?
ফরহাদ ভাইয়ের ধারা ময়মনসিংহ জেলার সমস্ত বাঙ্গালী সৈনিকের জীবন রক্ষা পায়।

আমাদের ২তয় জন সৈনিক এর মধ্যে প্রায় ১৫০ জন পাকিস্তানীকে আমরা হত্যা করি।

তার মধ্যে কিছু পাকিস্তানীর নাম উল্লেখ করলাম:

১/ ক্যাপ্টেন কমান্ডার আব্বাছ সিদ্দিকী।
২/ সুবেদার মেজর জান্নাত খাঁনন।
৩/ নায়েক সুবেদার রাজা মিরদার খাঁন।
৪/ নায়েক সুবেদার সালেহ মুহাম্মদ।
৫/ নায়েক সুবেদার বুসতাণ খাঁন।
৬/ হাবিলদার শের মোহাম্মদ।
৭/ হাবিলদার কামাল খাঁনন।
৮ হাবিলদার গোলাম
খাঁন।
৯/ হাবিলদার হাসিব উল্লাহ।
১০/ নায়েক মুরশেদ।
১১/ নায়েক ফজলে এলাহী।
১২/ সিপাহী মোহাম্মদ সপি।
১৩ / সিপাহী রাজ্জাক গং।

মার্চ মাসের ২৯ তারিখের কথা তখন আমরা বঙ্গালী সৈনিকরা আমাদের নির্দিষ্ট স্থান খাগডহর হেড কোয়ার্টার ছেড়ে দিয়ে আমরা ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে আশ্রয় নেই।

তখন পাক বিমান বাহিনীর বিমান হামলা হইতে আমাদের জীবনের নিরাপত্তার জন্য সেখানে যাই।

এদিকে ঢাকার অতি নিকটভর্তি এলাকা জয়দেবপুর, রাজবাড়িতে সাবেক পাকিস্তান সরকারের সৈনিক রিজার্ভ ছিল।

সেই দ্বিতীয় ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার সাবেক পাকিস্তানী মেজর বর্তনানে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মো: সফি উল্লাহ গত ১২ ই জুনের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশে আওয়ামীলীগের একজন এমপি নির্বাচিত হয়েছে।

তখন মেজর এসেছিলেন ময়মনসিংহে।

তিনি হলেন আমার প্রথম মুক্তিযুদ্ধের অফিসার।

জনাব সফি উল্লাহ সাহেবের নেতৃত্বে আমরা ( E.P.R) এর ৪ টা কোম্পানি কে চারদিকে পাঠানো হয়।

আমি তখন আলফা কোংম্পানিতে চাকরীরত চিলাম।

আমার রেজিমেন্ট নং ছিল ১৬২৬৯।

সিপাহী মো: সফিকুর রহমান।

আমাদের =A=Coy কে সফি উল্লাহ সাহেব নির্দেশ দিলেন।

ময়মনসিংহে জিলা কোয়ার্টার হইতে বাই রোডে ঢাকায় গিয়ে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সাথে মোকাবেলা করার জন্য।

ভায়া টাঙ্গাইল রোড =C=Coy সার্ভিস কোং ময়মনসিংহ জেলা হইতে বাহাদুরাবাদ ফেরী
ঘাট পর্যন্ত শত্রু যাহাতে দিনাজপুর, রংপুর হইতে ঢাকার দিকে অগ্রসর হইতে পারে।

=B=Coy কে পাঠানো হইলো ময়মনসিংহ জেলা হইতে ট্রেন যোগে বর্তমান জেলা শহর কিশোরগঞ্জ, কুলিয়ারচর হয়ে ভৈরব বাজার পর্যন্ত সে খানে ডিফেন্স করে থাকার জন্য।

যাহাতে শত্রু কুমিল্লা ময়নামতি থেকে ঢাকার দিকে অগ্রসর হইয়া =B=Coy কে রিজার্ভ রাখা হয়।

সমগ্র ময়মনসিংহ জিলা শহরকে রক্ষা করার জন্য।

তখন আমার কোং কমান্ডার সাবেক সুবেদার এ, বি,এম, আজিজুল হক রাজশাহী জিলার চাপাইনবাবগনজ বাড়ী।

তার নির্দেশে নায়েক সুবেদার হাবিজুল হক ফেনি জেলার =A=Coy
সৈনিকের দায়িত্ব দেওয়া গেলো।

১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে, আমার আজও সে দিনের কথা মনে পড়ে।

ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রীরা আমাদের ফুলের মালা দিয়ে বিদায়ী সংবর্ধনা দেয়।

আমরা বাঙ্গালী জাতি পাকিস্তানী প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত হিসাবে আমাদের উপর সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালীর আশা আকাঙ্ক্ষা ছিল।

যাহাতে পূরণ করতে পারি এবং একটি জাতীয় পতাকার জন্য একটি স্বাধীন মানচিত্র পাওয়ার জন্য।

নতুন নামে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম দিতে পারি সকল শ্রেণীর লোক উপস্থিত ছিলেন।

তখন চোখের পানিতে আমার গায়ের খাকী পোষাক ভিজে গিয়েছিল।

আমরা সকলের দোয়া নিয়ে বিদায় হলাম ঢাকার পথে।

ময়মনসিংহ হইতে মুক্তাগাছা, মধুপুর ঘাটাইল, কালিহাতির মধ্যে যখন আমরা পৌছি তখন জনাব কাদের সিদ্দিকী সাহেবকে পেলাম।

তিনি টয়োটা নিশান সাদা রং এর একটি জিপ নিয়ে ময়মনসিংহ জেলা হেড কোয়ার্টারের দিকে আসতে ছিলেন।
তখন সন্ধা,জনাব কাদের সিদ্দিকী আমাদের কে পেয়ে খুব আনন্দিত হলেন।

এবং সঙ্গে সঙ্গে কালিহাতি,করটিয়া, মাইটাপার,এলাকার জনসাধারণ কলেজ মাঠে গরু, খাসি জবাই করে আমাদের জন্য অতি অল্প সময়ের মধ্যে খাওয়ার আয়োজন করেন।

আমার কোম্পানী কমান্ডার সাহেব নির্দিশ দিলেন আজকের রাত্রি আমরা কলিহাতি থাকবো।

সেখানে ঢাকা ময়মনসিংহ রোডের সাথে একটি লম্বা ব্রীজ ছিলো।

নির্দেশ পাওয়া মাত্র আমরা সেখানে ব্যাংকার খুড়তে লাগলাম।

এলাকাবাসীরাও বিপুল উৎসাহে আমাদের কে সহযোগিতা করলেন।

রাত্রিবেলা খাওয়ার পর আমরা যার যার পজিশনে চলে গেলাম।
পরদিন ফজরের আজান হওয়ার কিছুক্ষণ পরই ঢাকা কুর্মিটোলা ক্যান্টেনমেন্ট থেকে পাঞ্জাব রেজিমেন্টের দুই ব্যাটেলিয়ান সৈন্য আসিয়া আমাদের সাথে সম্মুখ যুদ্ধে লিপ্ত হয়।
তখন আমরা ফুল ইউনিফরম মাথায় লোহার হেলমেট শরীরে ফুল হেবার চিক লাগানো অবস্থায়।
পাক বাহিনীর সাথে সর্বপ্রথম বাংলার মাঠিতে শত্রুকে ধ্বংস করার জন্য সম্পূর্ণ তৈরী অবস্থায় ঝাঁপিয়ে পড়লাম।
সকাল ৬ টা হইতে বেলা ১১ টা পর্যন্ত শত্রুর মোকাবেলা করি।

তখন আমার সাথে এক ব্যাংকারে তিন জন সৈনিক ছিল,সিপাহি হাফিজুর রহমান কিশোরগঞ্জ জেলায় বাড়ী, সিপাহী আব্দুর রজ্জাক বরিশাল এবং আমি আমার নিকট (L.M.G) মেশিন গান ও দিইটি রাইফেল ছিলো।

মাত্র দুইশত গজ দূর হইতে পাকিস্তানী শত্রু কে লক্ষ করে গুলি ছাড়লাম।
সে দিনের যুদ্ধে পাক হানাদার বাহিনীর ২৫০ হইতে ২৭০ জন শত্রুকে আমরা হত্যা করি এবং আমাদের পক্ষের হাবিলদার বুরহান উদ্দিন সহ প্রায় ৩০ জন ই,পি,আর শাহাদত বরন করেন।
বেলা ১১ টা ৩০ মিনিটের সময় ঢাকা থেকে আগত পাক বিমান বাহিনীর দুইটি জঙ্গি বিমানের আক্রমনে টিকতে না পারায় আমরা পিছু হটতে বাধ্য হই।

তারপর ঘাটাইল থানা হইতে মধুপুর থানায় আসিয়া গজারী বাগানের জলছত্র মিশনে অবস্থা করি।
৪/৫ দিন পর হঠাৎ পাক বাহিনীর দুইটি জিপে করে ৮/১০ জন সৈনিক টাঙাইল হইতে আক্রমন করার উদ্দেশ্য আসে।
গোপন সুত্রে খবর পেয়ে আমরা ৮/১০ জন পাকিস্তানীকে সালেন্ডার করতে বাধ্য করি।
নিরুপায় হইয়া তাহারা আমাদের নিকট আত্মসমর্পণ করে।
ঐ দিন গজারী বাগানের
বিতর নিয়া হাবিলদার আব্দুর রাজ্জাক (ফেনি জেলার পরশু রাম থানার) এর সহযোগীতায় আমিও আমার সহকর্মী জামাল, গুফরান,নবী হোসেন গং আমরা কিছুদিন পর চলে যাই জামালপুর সেখানেপ পাক বাহিনীর সাথে আমাদের মোকাবেলা হয়।

শুধু বিমান হামলার কারনে আমরা পিছু হটতে বাধ্য হই।
তখন আমাদের নিকট হেবি মিশিনগান,আরটিলারি জাতীয় কোন প্রকার অস্ত্র ছিলনা।

শুধু রাইফেল, এল,এম,জি,স্টেশগান টু ইঞ্চ মটর,রকেট লানসার।
ইএ ক্ষুদ্র হাতিয়ার নিয়ে নিজের মনুবলের সাহায্যে ন্যায্য অধিকারের জানাই আমরা ( E.P.R) (E.B.R) পুলিশ আনসার মুজাহিদ বাহিনী, বিমান বাহিনী ও নৌ বাহিনীর সমস্ত বাঙ্গালী সৈনিকরা ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ হইতে পরো এপ্রিল মাস পর্যন্ত বাংলার মাঠিতে থাকিয়া শত্রুর মোকাবিলা করি।
তারপর আস্তে আস্তে আমরা বর্ডারের দিকে চলে যাই।
জামালপুর, শেরপুর নাইগাতি হইয়া নকসী সীমান্ত এলাকায় গিয়া ডিফেন্স করি, এবং সেখানে ১৫/২০ দিন অবস্থান করি।

তারপর হঠাৎ একদিন ভারতীয় মিত্র বাহিনীর ক্যাপ্টেন বাইজিদ সিং প্রায় ৫০ জন সৈনিক সহকারে আমাদের নিকট আসেন এবং আমাদের কোম্পানি কমান্ডার সাহেবকে বলেন -আপনারা ভারতে চলে আসেন।

তখন আমরা ক্যাপ্টেন বাইজিদ সিং এর কথায় ভারতে প্রবেশ করি নাই।

আমরা আমাদের কোং কমান্ডারকে বললাম -যতক্ষণ পর্যন্ত উধ্বর্তন কর্মকর্তারা আমাদের সাথে যোগাযোগ না করেন ততক্ষণ প্রর্যন্ত আমরা ভারতে প্রবেশ করিব না।

তারপর একদিন ১৯৭০ সালের পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের নির্বাচিত আওয়ামীলীগের আব্দুল হেকিম চৌধুরী সিলেটের সুনামগঞ্জ জেলার মধ্যনগর ও ধর্মপাশা এলাকা থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন, তাহার নির্দেশে আমরা আমাদের সমস্ত অস্ত্র সহকারে ভারতের ডালু B.S.F.হেড কোয়ার্টারে গিয়া অবস্থান করি।

ভারতের মেগালয় জিলার অনৃতরভূক্ত তুরা মুক্তিযুদ্ধের ১১ নং সেক্টর হেড কোয়ার্টার অবস্থিত ছিল।
তখন ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল আতাউল গনি ওসমানী সাহেবের নির্দেশে সমস্ত বাংলাদেশের ৫৫ হাজার বর্গ মাইলের মধ্যে ১১ টি সেক্টরে ভাগ করেন।

তখন আমি আমার কোং সৈনিক সহকারে আমরা ভারতের রংরা নামে B.S.F. এর H.Q এর নিটকতম এলাকা রংরা কমলী ক্যাম্প নামে সেখানে থাকি।

ভারতীয় মিত্র বাহিনীর ক্যাপ্টেন চৌহান এর অধিনে আমরা (E.P.R.)=A =Coy সৈনিক অবস্থান করি।

তখন আমরা গেরিলা যুদ্ধে শরীক হই।
আমাদের নির্দেশ দেওয়া হয় শত্রুকে ঘায়েল করে সাথে সাথে স্থান ত্যাগ করতে হবে।

তখন ১৯৭১ সাল জুন অথবা জুলাই মাস।
পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পালিয়ে এসে আজাদ কাশ্মিরের বর্ডার পথে এসে ভারতে যোগদান করেন।
সাবেক পাকিস্তানী সেনা বাহিনীর সাবেক লেফটেনেন্ট পরে কর্ণেল তাহাকে ১১ নং সেক্টরের দায়িত্ব পালন করেন।
আমার ৯ মাসের যুদ্ধের এলাকার কিছু বর্ণনা দিলাম।

ময়মনসিংহ জেলার বর্তমান নেত্রকোনা জিলা কলমাকান্দা থানা,মদন থানা,বারহাট্রা থানা,কেদুয়া দূর্গাপুর শ্রিবর্দী, নালিতাবাড়ি, কামালপুর দাদুয়া, কামালাপুর মোহনগঞ্জ এলাকায় দীর্ঘ নয় মাস মুক্তিযুদ্ধের বিপদের সময় নিজের জীবনের ঝুকি নিয়েই পাক হানাদার বাহিনীর সাথে মোকাবিলা করি।

আমার সহকর্মী গত ১২ ই জুনের নির্বাচনে আওয়ামীলীগ থেকে সংসদ সদস্য হয়েছেন।
নেত্রকোনা ১ আসনে জনাব জালাল উদ্দিন তালুকদার।
একজন মুক্তিযুদ্ধে Coy = কমান্ডার দায়িত্বে ছিলেন।
আরও নেত্রকোনা জেলার সাবেক এমপি, ১৯৭০ সালে নির্বাচিত জনাব জুবেদ আলী ভারতের মহিশখলা B.S.F. এর ক্যাম্পে আমার সাথে পরিচয় হয়।
আরও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রনেতা জনাব শামসুদ্দোহা ( দুহাভাই), আরও (ওরা ১১ জন) বাংলা ছবির অভিনেতা খসরু ভাই,তারা মিয়া মুক্তিযুদ্ধের কোং কমান্ডার এর দায়িত্ব পালন করেন।

অবশেষে টাঙ্গাইল জেলার জনাব কাদের সিদ্দিকী, তাহার ছোট ভাই বাবুল সিদ্দিকী,তাহার বড় ভাই লতিফ সিদ্দিকী, ছোট বোন রহিমা সিদ্দিকী সমস্ত পরিবার সহকারে ভারতের ঢালুতে আমার সাথে পরিচয় হয়।

মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসের মধ্যে আমি ২ জায়গায় মারাত্নক বিপদের সম্মুখীন হই।
প্রথম যুদ্ধ কালিহাতি এবং সর্বশেষ যুদ্ধ করি ১৯৭১ সালের ১৬ ই ডিসেম্বর যখন পাক বাহিনীর ৯৩ হাজার সৈনিক আত্বসমর্পন করে।

তখন কিশোরগঞ্জ জেলার কিশোরগঞ্জ আলিয়া মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা আতাহার আলী রাজাকার আলবদর,আল শামস বাহিনীর প্রায় ২ হাজার লোক পুরো কিশোরগঞ্জ জলো শহর দখল করে বসেছিল।তখন আমরা খবর পেলাম ডিসেম্বর মাসের ২০/২১ তারিখ হবে,খবর পাওয়া মাত্র আমরা ময়মনসিংহ জেলা সদর হইতে আমরা (E.P.R)এবং ফ্রিডম ফাইটার ভারতীয় মিত্র বাহিনীর ক্যাপ্টেন চৌহান এর কমান্ডে আমরা চলে যাই কিশোরগঞ্জ অভিমূখে।

তখন শম্বুগন্জ হইতে বাই রোডে নান্দাইল হয়ে যাওয়ার পখে বাংলার মির্জাফর পাকিস্তানের কুখ্যাত দালাল নরুল আমিন এর বাড়ি আমরা আগুন জালিয়ে পুরিয়ে দেই।

তখন কিশোরগঞ্জ জেলার নিকটবর্তী এলাকায় যখন পৌছি তখন আমার মাতার উপর দিলে একটা ব্রাশ ফায়ার চলে যায়।

সেইদিন অল্পের জন্য আমি প্রানে বেচেঁ যাই।

আমার মনের মধ্যে এতো বড় ভয় পেয়ে ভেবেছিলাম যে, খোদা ৯ টা মাস পাক হানাদার বাহিনীর একটা গুলির আঘাত পাই নাই।

আর স্বাধীনতার বিজয় ছিনিয়ে আনার পর আজ বাংলার রাজাকারদের হাতে মারা যেতাম।

বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব সফিকুর রহমানের সুযোগ্য উত্তরসূরি বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড, সিলেট জেলা শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জনাব জহিরুল ইসলামের সাথে কথা হলে তিনি জানান,

বর্তমানে আমার বাবা ২ বারের নির্বাচিত উপজেলা কমান্ডার।
তিনি প্রথমে গোলাপগনজ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ এর সদস্য সচিবের দায়িত পালন করেন।
পরে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ উপজেলা কমান্ড নির্বাচন ২০১০
সালের ২৬ জুন নির্বাচনে উপজেলা কমান্ডার পদে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে ১১ জনের আলহাজ্ব মো:সফিকুর রহমান প্যানেল কে উপজেলার সকল বীর মুক্তিযোদ্ধাবৃন্দ তাদের মহা মূল্যবান ভোট দিয়ে নির্বাচিত
করেন।

এরই ধারাবাহিকতায় আবারও ২০১৪ সালের ৪ জুন’র নির্বাচনে ১১জনের আলহাজ্ব মো: সফিকুর রহমান প্যানেল কে ২য় বারের মত সকলে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেন।

বর্তমানে বাবা ২ বারের নির্বাচিত উপজেলা কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি তাঁর বাবার জন্য সকলের নিকট দোয়া ও দীর্ঘায়ু কামনা করে সকলের প্রতি শুভকামনা ব্যক্ত করেন।

লেখা সংগ্রহে:
মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম
মো: নাইমুল ইসলাম
জাহের আহমদ মারুফ।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

Calendar

April 2021
S M T W T F S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
252627282930  

http://jugapath.com