মুখ ঢেকে যায়

প্রকাশিত: ১১:৩৩ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১২, ২০২৪

মুখ ঢেকে যায়

 

বীথি চট্টোপাধ্যায়

সোনার গয়না উপহার পেলে বিবাহযোগ্য মেয়েরা কত খুশি হয় সেটা প্রতিদিন বিজ্ঞাপনে দেখতে হয়। বৎসর বৎসর কেটে গেল বিজ্ঞাপন বদলালোনা। উনিশো চুরাশি সালের মেয়েরা আর দু-হাজার চব্বিশ সালের মেয়েরা এইসব গয়নার বিজ্ঞাপনে অবিকল একরকম। বিজ্ঞাপন কেউ সমাজকে না জেনে তৈরি করেনা৷ সমাজের মানুষ যা দেখলে জিনিসটা কিনবে, সেইরকম করেই বিজ্ঞাপন হয়। সমাজ কী চাইছে, ক্রেতা কী চাইছে মাথায় রাখতে হয়।
চল্লিশ বছর আগে ক্রেতা চাইত বিয়েতে বাবা মায়ের দেওয়া দামি নেকলেস দেখে আনন্দে দুলে উঠবে। এখনও ক্রেতা তাই চায়। পোস্টারে, টিভিতে, কাগজে, ফেসবুকে সব জায়গায় সেই এক মেয়ে, এক বাবা, একই নেকলেস, নেকলেস পেয়ে একই মেয়ের সেই একই নাচ, একই হাসিকান্না।
অতি ধনীরা বিজ্ঞাপনের টার্গেট হননা। তাঁরা বাজারের দামি জিনিস এমনি এমনিই কেনেন। আবেগ উস্কে দিয়ে তাঁদের ডাকতে হয়না কোনওদিন। না খেতে পাওয়া হাভাতেরাও সোনা, হীরের বিজ্ঞাপনের টার্গেট নন বড় একটা। তাঁরা বড়ই অনিশ্চিত জীবন কাটান পয়সা না-থাকবার জন্য। তাঁরা দামি অলঙ্কার কোথা থেকে কিনবেন!
এইসব বিজ্ঞাপনের টার্গেট শুধু মধ্যবিত্ত। মধ্যবিত্ত মানে যে বাড়ির ছেলেমেয়েরা পুরোপুরি লেখাপড়া শিখবার সুযোগ পায়। পছন্দের খাবার খেতে পায়। মাথার ওপর ছাদ আছে। কলে জল আছে। কিন্তু হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক হলে মেডিক্লেম প্যাকেজ কভার করেনা৷ সেই মধ্যবিত্ত। এরা কবিতা লেখে, রাজনীতি বোঝে।
সেই মধ্যবিত্তকে টার্গেট করতে এখনও মেয়ের বিয়ের টোপ দিতে হয়। সোনার গয়নায় মেয়েকে মুড়ে দেবার আবেগ মধ্যবিত্ত তারমানে এখনও খায়। পি এফের টাকা ভাঙে মেয়ের বিয়ের জন্যে। ছেলের বিয়ের জন্যে নয়। পণ নেবার এখন অনেক ঝামেলা। তাছাড়া বাঙালি বলে কথা, একেবারে নির্লজ্জ নাহলে পণ চাইতেও চক্ষুলজ্জা আরেক ঝামেলা। কিন্তু সোনার গয়না চাইতে হয়না। সোনার গয়না দিলে আপনার আদরের সোনামনি খিলখিল করে হেসে ওঠে বিজ্ঞাপনের বিয়েতে। তাই পি এফ ভাঙতে হয়, সারা জীবনের সঞ্চয় ভাঙতে হয়। পরে হঠাৎ স্ট্রোক হলে কোথা থেকে ধার পাওয়া যাবে ভাবতে হয়। কিন্তু মেয়ে থাকলে সোনা তো লাগবেই। মেয়ের জন্ম থেকে সোনা জমানোর জন্যে অজস্র স্কিম। অজস্র অফার। সোনার গয়নার অনেক দাম। আকাশছোঁয়া দাম বললেও অত্যুক্তি হয়না। আর বেচতে গেলে সেই দাম একেবারেই ওঠেনা৷ সোনা ছেলে মেয়ে নির্বিশেষে সবার জন্যেই শখ হতে পারে৷ স্রেফ শখ। বিয়ে থেকে ইয়ে সবত্র সোনা, হীরে প্লাটিনাম শখে ছড়াছড়ি গেলেও সেটা কোনওভাবেই ক্ষতিকর নয়। আমার নিজেরও সোনার গয়না ভাললাগে; শখেই, কখনও সখনও। কিন্তু শখে কেউ মেয়ের জন্ম থেকে কিস্তিতে টাকা জমাতে পারেনা। পি এফ ভাঙতে পারেনা। ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তা নষ্ট করতে পারেনা।
যেটা মধ্যবিত্ত করে। একটা সমাজের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হয় এই মধ্যবিত্ত, সেই মধ্যবিত্ত যদি মেয়ের বিয়ের জন্যে সারা জীবনের জমানো টাকা খরচ করে তাহলে সেই সমাজে মেয়েরা কোন রসাতলে গিয়ে বসে আছি? মেয়েরা ফুঁসে ওঠেনা এই ব্যবস্থায়? বাড়িতে বলেনা যে জমানো টাকা গয়না কেনবার জন্যে নয়, দুঃসময়ের জন্যে। সোনার গয়না ছাড়াও সেজেগুজে, খেয়ে পরে দিব্যি সুন্দর থাকা যায়। আনন্দে জীবন কাটাতে সোনার গয়না লাগেনা, ওটা শখ। কমপালসন নয়। কেন বলেনা মেয়েরা এসব? কেন একটানে ছিঁড়ে উড়িয়ে দেয়না গুনে গুনে বের করা টাকায় কেনা নেকলেসের সুতো?
যতদিন মেয়ের জন্যে এই বাড়তি অবিমৃষ্যকারী খরচের বোঝা থাকবে ততদিন কে মন থেকে চাইবে মেয়ে সন্তান?
নারী দিবসে আমাদের সমস্ত শুভ বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষের একটা শপথ নেওয়া উচিত যে মেয়ের বিয়ের জন্যে কেউ অর্থ সাহায্য বা ঋণ চাইলে সেটা আমরা সামর্থ্য থাকলেও দেবনা। কিছুতেই দেবনা। বিয়েতে দামি বা সস্তার উপহার দিতে পারি কিন্তু আগে থেকে কোনও সাহায্য করবনা। মেয়ের বিয়েতে সাহায্য মানেই তো মেনে নেওয়া যে মেয়ে একটা বিষম বোঝা।
কলেজ ইউনিভার্সিটিতে পড়া, কবিতা লেখা, আবৃত্তি করা মেয়েদের এই দেনার লেকলেস মানায়না, তাও নিশ্চয় মেয়েরা জানে। যেদিন মেয়েরা ফুঁসে উঠবে ঠিক সেইদিন থেকে এইসব অর্ধশতক পুরোনো বিজ্ঞাপন উবে যাবে। সেদিন থেকে মেয়েদের পা পেছন থেকে টেনে ধরবেনা কোনও অভিশপ্ত নেকলেস। কেন এত বাধ্য আমাদের মেয়েরা? মেয়েদের কড়া গলায় কথা বলা যে খুব দরকার। তাইনা?