মুজিবনগর সরকারের অবদান ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে

প্রকাশিত: ১০:৩৪ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ১৭, ২০২১

মুজিবনগর সরকারের অবদান ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে

তাপস হালদার
১৭ এপ্রিল, মুজিবনগর সরকারের ৫০ বছর পূর্তি দিবস।বাংলাদেশের অদ্ভ্যুদয়ের ইতিহাসে দিন স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা ও নেতৃত্বদান,বিশ্ব জনমত গঠন এবং বঙ্গবন্ধুর মুক্তিতে গুরুত্ব ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে মুজিবনগর সরকারের অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

১৯৭১ সালের ২৬মার্চের প্রথম প্রহরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানী বাহিনীদের কাছে গ্রেফতারের ঠিক পূর্ব মুহুর্তে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন।ঠিক সেই সময় থেকেই বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের কাছে পরিচিতি লাভ করে। পাকিস্তানী শাসকরা ভেবেছিল শেখ মুজিবকে বন্দি করে আর কয়েক লাখ বাঙালিকে হত্যা করলেই তাদেরকে রুখে দেওয়া যাবে।কিন্তু তারা শেখ মুজিব চিনতে ভুল করেছিল।মুক্ত মুজিবের চেয়েও বন্দি মুজিব যে আরো বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠবে,সেটা পাকিস্তানী শাসক চক্র বুঝতে পারেনি। বাঙালির প্রতিটি মানুষের সাথে বঙ্গবন্ধুর ছিল আত্মার সম্পর্ক।সেজন্যই তো বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে জাতি ধর্ম-বর্ণ, নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য দৃপ্ত শপথ নিয়েছিল সমগ্র বাঙালি জাতি।

২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার ও সারাদেশে ভয়াবহ গনহত্যা শুরু হলে কৌশলগত কারণে আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারা ভারতে চলে যায়।প্রথমে আত্মরক্ষা ও পরবর্তীতে পাল্টা আক্রমন করার জন্য প্রস্তুতি গ্রহন করেন।তাজউদ্দিন আহমেদ সহ আওয়ামী লীগ নেতারা যখন ভারত সরকারের কাছে মুক্তিবাহিনী গঠন,ট্রেনিং ও অস্ত্রের জন্য সাহায্যে প্রস্তাব দেন তখন তাদেরকে জিঙ্গাসা করা হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের কোন সরকার গঠিত হয়েছে কিনা?নেতারা উপলব্ধি করলেন একটি সাংগঠনিক সরকার ছাড়া কোন ভাবেই বিশ্বের কোন দেশের সহযোগিতা পাওয়া যাবেনা। তখন সাংগঠনিক ভিত্তিতে যুদ্ধ পরিচালনার জন্যই সরকার গঠনের প্রয়োজনীয়তার দেখা দেয়।

৩ এপ্রিল ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দ্রিরা গান্ধীর সাথে বৈঠকে তাজউদ্দিন আহমেদ জানান,পাকিস্তান বাহিনী আক্রমন শুরুর সাথে সাথেই বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণা করে সরকার গঠন করা হয়েছে।বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবই সেই স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট এবং মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠকে যোগদানকারী সকল প্রবীণ সদস্যই মন্ত্রীসভার সদস্য।সেখানে উপস্থিত দলীয় নেতাদের সিন্ধান্ত অনুযায়ী তিনি নিজেকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তুলে ধরে শ্রীমতি ইন্দ্রিরা গান্ধীর কাছে।এবং তিনি মিসেস গান্ধীকে স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতির অনুরোধ করেন।শ্রীমতি ইন্দ্রিরা গান্ধী উত্তরে আশ্বস্ত করে বলেন,উপযুক্ত সময়ে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়া হবে।বৈঠকে মুক্তিবাহিনীদেরকে অস্ত্র ও ট্রেনিং এবং শরণার্থীদেরকে সাময়িক আশ্রয়ের বিষয়েও তিনি রাজি হোন। তারপরই আনুষ্ঠানিক ভাবে অস্থায়ী সরকার গঠন প্রকৃয়া শুরু হয়।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী লীগের এমএনএ এবং এমপিদের নিয়ে কুষ্টিয়া জেলা সীমান্তে অধিবেশন ডাকেন তাজউদ্দিন আহমেদ।সেখানেই সর্বসম্মতভাবে মুক্তিযুদ্ধ ও সরকার পরিচালনার জন্য মন্ত্রীসভা গঠিত হয়।১০ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি ও সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ঘোষনা করে গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গঠন করা হয়।সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপ-রাষ্ট্রপতি এবং বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি,তাজউদ্দিন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী,এম মনসুর আলী অর্থমন্ত্রী,খন্দকার মোশতাক আহমেদকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী,এ এইচ এম কামরুজ্জামানকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী করা হয়।এবং আরো ১২ টি মন্ত্রনালয় এই চারজন মন্ত্রীদের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হয়।সেনাপ্রধান করা হয় তৎকালীন কর্নেল এম এ ওসমানীকে ।অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করতে সকল শ্রেনীর কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের প্রতি রাষ্ট্রপতির আদেশ জারি করেন।১১ এপ্রিল তাজউদ্দিন আহমেদ আকাশ বানী শিলিগুড়ি কেন্দ্র থেকে মন্ত্রী পরিষদ গঠনের ঘোষণা দিয়ে বক্তব্য দেন।দেশব্যাপী সর্বাত্মক প্রতিরোধ যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক সমর্থনের জন্য আহ্বান জানান।

মন্ত্রীসভার আনুষ্ঠানিক শপথের জন্য চুয়াডাঙ্গার একটি স্থানে ১৪ এপ্রিল দিনটি নির্ধারণ করা হয়।কিন্তু ১৩ এপ্রিল পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী চুয়াডাঙ্গা দখল করে নেওয়ার কারণে পরিকল্পনা বাতিল করা হয়।শেষ পর্যন্ত মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলাকে বেছে নেওয়ার কারণ হলো পাকিস্তান আর্মিরা যাতে কোন ভাবে শপথ গ্রহন অনুষ্ঠানে হামলা করতে না পারে।বৈদ্যনাথতলা ছিল এমন একটি স্থান যেখানে আসতে হলে ভারতের আকাশ সীমা ব্যবহার না করে আসা যাবেনা। ১৭ এপ্রিল সকালে জাতীয় নেতৃবৃন্দ দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের নিয়ে বৈদ্যনাথতলায় উপস্থিত হন। ছোট একটি মঞ্চে শপথ গ্রহন অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।অতিথিদের জন্য গ্রামের বিভিন্ন বাড়ি থেকে কিছু চেয়ার আনা হলো। যার অধিকাংশেরই হাতল ভাঙা। আমবাগানের চারদিকে রাইফেল হাতে কড়া পাহারায় দাঁড়িয়ে রয়েছেন বীর মুক্তিযোদ্ধারা। খবর পেয়ে আশপাশের লোকজনও জড়ো হয়েছেন ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশে’র প্রথম সরকার গঠনের ইতিহাসের সাক্ষী হতে।খোলা আকাশের নিচে চৌকি পেতে তৈরি করা হলো শপথের মঞ্চ। সকাল ১১টার দিকে শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হলো। একে একে মঞ্চে উঠলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ,খন্দকার মোশতাক,এম মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামানসহ অন্যরা।আনুষ্ঠানিক ভাবে বাংলাদেশের ঘোষণাপত্র পাঠ করেন অধ্যাপক এম ইউসুফ আলী।সেই ঘোষণাপত্রটিই হলো স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধান আইনি দলিল, যা আমাদের সংবিধান এবং সরকার গঠনের মূল ভিত্তি।মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে এই ঘোষণাপত্র কার্যত মুজিবনগর সরকার কর্তৃক অলিখিত সংবিধান ছিল।

শপথ নেওয়ার পর ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতিকে ইপিআরের (ইস্ট পাকিস্তান রেজিমেন্ট) পক্ষ থেকে একটি দল গার্ড অব অনার দেয়া হয়।

Tapos sent Yesterday at 16:33
শপথ গ্রহন অনুষ্ঠানে নবগঠিত প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ উপস্থিত প্রায় একশত সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বলেন,‘আমি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের সাংবাদিক বন্ধুদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি এই জন্য যে,তারা আমাদের আমন্ত্রণে স্বাধীন বাংলাদেশের মাটি দেখে যাওয়ার জন্য বহু কষ্ট করে,বহু দূর দূরান্ত থেকে এখানে উপস্থিত হয়েছেন’।প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ আরো বলেন,আজ থেকে বৈদ্যনাথতলার নাম হবে ‘মুজিবনগর’।দেশে-বিদেশে মুজিবনগর সরকার হিসেবেই অস্থায়ী সরকার পরিচিতি লাভ করে।মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী কার্যালয় ছিল ৮ থিয়েটার রোড় কলকাতা।এই সরকারের নেতৃত্বেই পুরো নয় মাস মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়।

১৭৫৭ সালে পলাশীর আম্রকাননে ইংরেজদের হাতে নবাব সিরাজদৌল্লার পতনের মধ্য দিয়ে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল ঠিক দুইশত চৌদ্দ বছর পর মেহেরপুরের আরেকটি আম্রকাননেই মুজিবনগর সরকারের শপথগ্রহণের মধ্য দিয়ে বাংলার স্বাধীনতার নতুন সূর্য উদিত হয়েছিল।

মুজিবনগর সরকার পরিচালিত হয়েছে বঙ্গবন্ধুর নামেই।মহাভারতে যেমন রাজা যুধিষ্ঠিরের বনবাস কালে ছোট ভাই ভরত রাজার পাদুকা সিংহাসনে রেখে রাজ্য শাসন করেছিল ঠিক তেমনি বঙ্গবন্ধুকে সামনে রেখেই মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেছিল মুজিবনগর সরকার।বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও প্রেরণা থেকে শক্তি সঞ্চয় করেই মুজিবনগর সরকার সীমিত সামর্থ্যে নিয়ে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ ও প্রশাসন পরিচালনা করেছে। পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর মুক্তি এবং স্বাধীনতার জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়ের স্বীকৃতি অর্জনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বীকৃতির আবেদন জানিয়ে সে সময়কার ১০৭টি দেশের কাছে চিঠি পাঠায় সরকার।

মুজিবনগর সরকারের সুদক্ষ পরিচালনায় দীর্ঘ নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের রক্ত ও দুই লাখ মা বোনদের সম্ভ্রমের বিনিময়ে পরাধীনতার শৃঙ্খল মুক্ত হয়ে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১, বিজয় লাভ করে বাংলাদেশ।
লেখক: সদস্য,সম্প্রীতি বাংলাদেশ ও সাবেক ছাত্রনেতা।
ইমেইল:haldertapas80@gmail.com