পাকিস্তানে সন্ত্রাসবাদ

প্রকাশিত: ১২:৩০ অপরাহ্ণ, জুন ২৬, ২০২১

পাকিস্তানে সন্ত্রাসবাদ

লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরী

দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে ইংরেজ শাসকদের হাত থেকে মুক্ত নব্য স্বাধীন ভারত-পাকিস্তান রাষ্ট্রে স্বাধীনতার পূর্বে তৎকালীন উপমহাদেশীয় সমাজে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ অথবা ধর্মীয় উগ্রবাদ নিয়ে কোনও আশঙ্কা লক্ষ্য করা যায়নি হরপ্পা-মহেঞ্জদারো থেকে সিন্দুকোষ উপত্যকার বিস্তীর্ণ এলাকার অধিবাসীদের মাঝে। কয়েক হাজার বছরের ইতিহাসে ভারতীয় ভূখন্ডে শক-হুন-যাযাবর-মোঘল-পাঠান বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠীর আগমন ঘটেছে এবং শাসনকাল পরিলক্ষিত হয়েছে ঠিকই অথচ এখানে সকল ধর্ম ও বর্ণের মানুষের বসবাস ছিল নিরাপদ। আঠারো শতকের প্রারম্ভে ও সতেরো শতকের শেষার্ধে এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মুসলিম সমাজে হাতেগোনা কিছু সংগঠন সৃষ্টি হয়েছিল। ভারতের সমাজে মুসলিম রাজনীতির সূচনাকাল সতেরো শতকের শেষ প্রান্তে। মূলত হিন্দুদের পাশাপাশি মুসলমানদের অধিকার নিয়ে তাদের সক্রিয় হতে দেখা গেল এসময়। ইংরেজদের শাসনামলের শেষ শতকে মুসলিম রাজনীতি এই উপমহাদেশের মুসলমানদের মাঝে নতুন আগ্রহ ও কৌতুহল সৃষ্টি করেছিল। ১৯৪৭ পর্যন্ত ধর্মীয় উগ্রবাদের কোনো ঘটনাই পরিলক্ষিত হয়নি। এমনকি এই উপমহাদেশের একমাত্র রাজনৈতিক ব্যাক্তি যিনি একটি পৃথক মুসলিম স্টেট প্রতিষ্ঠার জন্য লর্ড মাউন্টব্যাটেনের সাথে বিন্দুমাত্র আপোস করতে চাননি দেশ ভাগের শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত সেই কায়েদ-ই আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৪৭ সালের ১১ আগষ্টের ঐতিহাসিক ভাষণে বলেছিলেন ‘পাকিস্তানে সকল ধর্ম-বর্ণ-পেশার মানুষ একত্রে বসবাস করবে যেখানে সাম্প্রদায়িকতার কোনও স্হান থাকবে না’। তার কিছুদিন পরই পাকিস্তান স্বাধীন হলো। কায়েদ-ই আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মন্ত্রী সভায় আইন মন্ত্রী নিযুক্ত হলেন যোগেন্দ্র নাথ মন্ডল। পাকিস্তানের জনক জিন্নাহ নিজে একজন  শিয়া সম্প্রদায়ের মুসলিম ছিলেন। জিন্নাহর তথা পাকিস্তানের প্রথম ক্যাবিনেটে একজন হিন্দু সদস্য, কতিপয়  শিয়া ছাড়াও একজন আহমেদীয়া গোত্রের সদস্য নিযুক্ত হয়েছিলেন। যদিও জিন্নাহর জীবদ্দশায় পাকিস্তানের রাজনৈতিক চিত্র এমনই ছিল তবে তার মৃত্যুর পর খুব দ্রুত পাকিস্তানের সমাজ ব্যবস্থার চিত্র বদলে গেলো। যেহেতু সে সময়ে পত্র পত্রিকার ও প্রযুক্তির প্রসার ঘটেনি সেহেতু পশ্চিম পাকিস্তানের সকল খবরা খবর পূর্ব পাকিস্তানে পৌঁছতেও পারেনি। বিভিন্ন নথিপত্র থেকে জানা যায় যে ১৯৫০ সালের মে মাসে এক ভারতীয় সাংবাদিককে তৎকালীন পাকিস্তানের আইন মন্ত্রী যোগেন্দ্র নাথ মন্ডল বলেছিলেন ‘পাকিস্তানে হিন্দুদের বসবাসের আর কোনও সুযোগ ও সম্ভাবনা নেই’। প্রকৃত অর্থেই জিন্নাহ যে পাকিস্তানের স্বপ্ন দেখেছিলেন তার মৃত্যুর পর পাকিস্তান আর সেখানে থাকলো না। পাকিস্তানে শুধু হিন্দুরাই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিলেন সেটা না বরং এর দুই বছর পরে ১৯৫২ সালে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে ভাষার অধিকার থেকে ছিন্ন করতে চাইলেন। বাংলাদেশে ভাষার জন্য আন্দোলন হলো। প্রাণ দিতে হলো রফিক-সালাম-বরকতদের। ঐতিহাসিক ভাবে তমুদ্দুন  মজলিস ভাষা আন্দোলনের মূল স্ফুলিঙ্গ হয়ে থাকলেও আওয়ামী লীগ এই আন্দোলনকে পূর্ণাঙ্গতা দিয়েছিল।  জিন্নাহর মৃত্যুর পর পরই পাকিস্তানের চিত্র বদলে গেলো। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পশ্চিম পাকিস্তানের পরিনতি টের পেয়েছিলেন। এজন্যই তিনি ধীরে ধীরে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের কথা ভাবছিলেন। ১৯৪৭ সালে পশ্চিম পাকিস্তানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ ছিল ২৩ ভাগ। এবং কাকতালীয় ভাবে এর তিন বছর পর সেটা তিন ভাগে গিয়ে পৌঁছে। হিন্দু-খৃষ্টান- শিয়া-আহমেদীয়া-শিখদের জন্য পাকিস্তানের মাটি কোনভাবেই আর নিরাপদ থাকলো না। ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের উপর নির্যাতন বাড়তেই থাকলো পাকিস্তানে। শেখ মুজিবুর রহমান একবার যুক্তফ্রন্ট গঠন করেন আবার ছয় দফা দেন আবার সত্তরের নির্বাচনে জয়লাভ করেন তবুও পাকিস্তানের জুলুমশাহীদের বর্বরতা থেকে নিজেদের এবং দেশের মানুষকে রক্ষা করতে পারলেন না। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য রাজনৈতিক ভাবে প্রস্তুত ছিলেন। কিন্ত জুলফিকার আলী ভুট্টোর ছিল অন্য ইচ্ছা। তিনি সামরিক সরকারের পরিবর্তে রাজনৈতিক সরকারের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে যাবার ফলে ভুট্টোর করার আর কিছুই ছিল না। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ভুট্টো পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হলেন ঠিকই কিন্ত পাকিস্তানের মোল্লাদের বিরুদ্ধেও যেতে পারলেন না তিনি আবার মোল্লাদের দমনও করতে পারলেন না। তবে ১৯৭২ সালে ভুট্টো সাহেব পাকিস্তানের মোল্লাদের একটি সেক্যুলার স্টেট এর প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্ত পাকিস্তানের মৌলবাদীদের কেউই সেই প্রস্তাব গ্রহন করেননি সেদিন। পক্ষান্তরে জুলফিকার আলী ভুট্টোর উপর বিভিন্ন উগ্রবাদী গোষ্ঠীর চাপ বেড়ে গেলো।

১৯৭৩-১৯৭৭ সালে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন সময়ে ভুট্টোও মোল্লাদের চিন্তাধারাতেই পরিচালিত হতে থাকলেন। ৪ এপ্রিল ১৯৭৭ সালে ভুট্টোর ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছিল। জেনারেল জিয়াউল হকের কাছে ভুট্টোর সহধর্মিনী নুসরাত ভুট্টো প্রাণ ভিক্ষা করেছিলেন কিন্ত জিয়াউল হক ভুট্টোকে ফাঁসি দিয়েছিলেন তার পরবর্তী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য। বাংলাদেশে যেমন শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর সামরিক শাসন ব্যবস্থা জারি হলো ঠিক একই কায়দায় পাকিস্তানেও জুলফিকার আলী ভুট্টোকে ফাঁসি দিয়ে ক্ষমতায় এলেন জেনারেল জিয়াউল হক। ১৯৭৭-১৯৮৮ এই এগারো বছরে তিনি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোশকতায় পাকিস্তানের ইসলামী উগ্রবাদী গোষ্ঠীকে মদত দিয়ে গেলেন। পাকিস্তানে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের উপাসনালয়গুলো ভেঙ্গে তৈরী করা হলো শপিং মল ও আবাসন ভবন। খৃষ্টান ও ইহুদীদের দেখা গেলো অষ্টেলিয়া চলে যেতে। হিন্দুদের দেখা গেলো ভারত ও আমেরিকায় চলে যেতে। বিগত ৪৪ বছরে পাকিস্তানের মোল্লাদের মনোভাব বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয়নি। আজ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান প্রমানিত করতে চেষ্টা চালালেও পাকিস্তান আজও মৌলবাদীদের দখলেই রয়ে গিয়েছে। পাকিস্তানে ২০১২-২০১৪ সাল পর্যন্ত সুন্নি সম্প্রদায়ের মৌলবাদী গোষ্ঠী সিয়াদের উপর ৭৭টি, আহমেদীয়াদের উপর ৫৪টি, খৃষ্টানদের উপর ৩৭টি, হিন্দুদের উপর ১৬টি ও শিখদের উপর ৩টি জঙ্গি হামলা চালিয়েছে। এই দুই বছরে পাকিস্তানে ২০০ জঙ্গি হামলায় ৭০০ জনের প্রাণহানী ঘটেছে। পাকিস্তান পিপলস পার্টির সাবেক সংসদ সদস্য ফারাহনাজ ইস্পাহানী এক গবেষনায় উল্লেখ করেন যে জেনারেল জিয়াউল হক ক্ষমতা গ্রহণের পর পাকিস্তানের ইসলামী গোষ্ঠী গুলোকে মিলিটারি সাপোর্ট দিয়েছেন ও ট্রেনিং দিয়ে কাশ্মীরকে পাকিস্তানের ভূখন্ড হিসেবে পেতে চাইলেন। পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দাদের সহায়তায় মোল্লাদের সুসজ্জিত ও ঐক্যবদ্ধ করছিলেন জেনারেল জিয়াউল হক। সংবিধানে এন্টি-আহমেদীয়া অর্ডিনেন্স জারি করে ধর্মীয় সংঘাতের যে বীজ বপন করেছিলেন জেনারেল জিয়াউল হক সেই বিতর্ক-সংঘ্ত-সংঘর্ষ আজও পাকিস্তানে চলমান।

লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক

ছড়িয়ে দিন