মৃত্যু নদীর গল্প

প্রকাশিত: ৬:৩৮ অপরাহ্ণ, জুন ১২, ২০২১

মৃত্যু নদীর গল্প

সিগমা আউয়াল

জলভরা চোখে নিঃসীম আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে জাফর মিয়া ।রাস্তায় চাক্কার পাম্প ছেড়ে উল্টো করে ফেলে দিয়ে গেছে পুলিশ তার রিক্সার ।
বাড়িতে আজ খাবার নেই ।
বাচ্চাগুলোর দিকে তাকিয়ে না পারতে রিক্সা নিয়ে বেড়িয়েছে । মহাজনের টাকা দিয়ে যেকটা টাকা থাকে একবেলা কোনরকম দুমুঠো ভাত আধ পেটা খায় ওরা ।আজ যে সবাই কে উপোস যেতে হবে!

এই লকডাউন কি তাই তো বোঝে না জাফর মিয়া ।আগে পেটে খাবার তারপর জানে বাঁচা । তারপর না লকডাউন । গ্রামের বাড়ি বলতে এখন আর তো কিছুই নেই ।রাক্ষুসি কীর্তনখোল তার ঘর- বাড়ির ,জমি- জিরাত সব খেয়েছে ।বউটা সাহেবদের বাসায় বাসায় ঝিগীরি করতো । দুটো ভাত কিছু ভালমন্দ খাবার দিতো । তাই দিয়ে আর দুজনের রোজগারে চলে যাচ্ছিলো সংসার । মাস গেলে কিছু টাকা পয়সা রোজগার করে মোটামুটি সংসারটা কোন রকম চলছিলো । এখন আর পারছে না জাফর মিয়া । লকডাউন কি তাই তো বুঝতে পারছে না । বস্তিতে তো কিছু বুঝতে পারে না ।এটা তবে বড়লোকদের রোগ?
কি জানি পুলিশ সরকার কেউ বোঝে না তাদের দুঃখ ।

কাল সারারাত মাথা ব্যথা ছিলো মরিয়মের। ওঠে বসে, ঘুম হয়না কেমন ঝিমানি ভাব।
— ছোট পোলা হিরুর বয়স তিন বছর বুকের দুধ খাওয়া ছাড়ছে আরো দেড় বছর আগে। পায়না দুধ তারপরও বুকের দুধ তার খাওন লাগে। নেশার মতো হুদা কামে খাওন। অনেক কষ্টে ছাড়াইছে মরিয়ম। অথচ বাচ্চাগুলোনের দুইডা ভাতও পেট ভইরা খাওয়াতে পারে না মরিয়ম । ক্ষিদার জ্বালায় ঘুমের মধ্যে ছটফট করে । আল্লাহ গো দেশে কি অসুখ দিলা। মানুষ বেরামে কি মরবো, না খাইয়া তো আরো বেশি মরবো। এতো কষ্ট কইরা শহরে আইসাও শান্তি নাই। দেহি সকাল হইলে পুরান বাসার ম্যাডামের কাছে যামু, যদি কয়ডা পয়সা দেয়, আর তো সহ্য হয়না আল্লাহ গরীবের এতো কষ্ট।
মনে মনে কথা গুলো ভাবে মরিয়ম ।

জাফর মিয়ার রিকশা সারাইতে যাইবো তানা হইলে রাস্তায় রিক্সা বার করতে পারব না।

গলির দোকান থেকে দশটাকার মুড়ি কিনে ঘরে রেখে মরিয়ম জোরে কদমে হাটে বড় রাস্তার দিকে।
রাস্তা লোকজন কম ।মরিয়ম গলির মধ্যে এসে কোন রকম বড় রাস্তাটা পার হয়েই ধানমন্ডির গলিতে ঢুকে পড়ে । ম্যাডামের বাসার সামনে এসে দেখে সব সুনসান রাস্তার দুই পাশে সারিসারি কত বড় রঙ বেরঙে বাসা বাড়ি কিন্তু লোকজনের আওয়াজ নাই । ভয়ে ভয়ে গেটের সামনে দাড়ায় , গেট ভেতর থেকে বন্ধ । কলিং বেলে চাপ দেয় দারোয়ান তারিখ মিয়া পকেট গেট দিয়ে উঁকি মারে ,
— কেড্যা মরিয়ম নাকি ? তা কেমুন আছো অনেকদিন পরে আইল্যা কি ব্যাপার ?
— আর কেমুন থাকুম ভাই কাজকাম নাই । পোলার বাপে রিক্সা চালাইত হেইডা কাইল পুলিশে ভাইঙা দিসে ।অহন আসছি ম্যাডামের ধারে যদি কিছু সাহায্য করে ।একটু কি দেখ্যা করন যাইবো ? একটু কি খবর দিবেন ম্যাডামের?
— কেউ তো আসা নিষেদ ।দেখা তো করে না । আইচ্ছা বাইরে থাকো দেখতাছি ।

পাঁচতলার থাকে শফিক সাহেব । রীমা আর দুই বাচ্চা নিয়ে তাঁর ছোট্ট সংসার ।
তারিখ মিয়া পকেট গেট খুলে ডাকে মরিয়ম কে —- আসো তোমারে ম্যাডামে উপরে যাইবার কইছে তয় নীচের বাথরুম থেক্যা গোছল কইরা মুখে এই নতুন মাস্ক লাগাই তারপর যাইবা, বুঝলা । এই লও কাপড় ম্যাডাম দিছে । গোছল কইরা পরিষ্কার কাপড় পইড়া তারপর যাইবা উপরে ।
উপরে যেয়ে মরিয়ম দেখে রীমা মাস্ক মুখে দরজায় দাড়িয়ে,
— মরিয়ম এসছো ? কেমন আছো ? তো কি খবর তোমাদের ?
ছ,ফিট দূরে দাড়িয়ে ম্যাডাম ।
—- খুবই খারাপ খবর ম্যাডাম ।ধরতে গেলে পোলাপান লইয়া না খাইয়া আছি । রোজা রমজানের দিন তারপর কাজকাম সব বন্ধ ।
—- হুমমম , কি করবে বলো সবারই অসুবিধা । আমার তো দুটো বাচ্চা নিয়ে কত কষ্ট হচ্ছে কাজ করতে , ইচ্ছা থাকলে তোমাকে আসতে বলতে পারছি না ।
দেখি ঈদ পযন্ত তারপর একটা ব্যাবস্থা করতে হবে ।এ ভাবে আর চলতে পারছি না । তুমি একটু দাড়াও ।

ঘর থেকে কিছু চাল – ডাল ,আলু – তেল , ডিম নিয়ে এলো একটি বাজারের থলের মধ্যে । ততোক্ষণ তারিখ মিয়াও উপরে চলে এসছে ।
—- তারিখ মিয়া আপনি দেখন তো কোন রিক্সা পান নাকি আর এই থলেটা নিয়ে যান মরিয়মের জন্য কিছু বাজার দিলাম । বাজার শুদ্ধ একটা রিক্সায় তুলে দেবেন ।
— জ্বি ম্যাডাম তারিখ মিয়া নীচে চলে গেলেন ।
—-তুমি এই টাকা কটা রাখো মরিয়ম । রোজার দিনে একটু ভালো-মন্দ খেও । হাত বাড়িয়ে টাকা কটা নেয় মরিয়ম । লজ্জিত হাসি হেসে বলে —কোন কাজ থাকলে কন কইরা দিয়া যাই । এমনে এমনে আর কত ট্যাকা নিমু ম্যাডাম ?
—- না না ঠিক আছে ,ওটা আমি রোজায় কাউকে ইফতারির জন্য দেবো বলে রেখেছিলাম । ঈদের ৭/৮ দিন আগে এসো আর কিছু টাকা দেবো । শাড়ি – কাপড় দিতে পারবো না এবার । বাজারে যাওয়া বন্ধ ।
—- কাপড় লাগতো না গো ম্যাডাম ,আগে পোলানের খাওনডার জোগাড় করি । বাঁচলে তো কাপড় । কাপড় লাগতো না । নীচে আসে মরিয়ম থলে হাতে রিক্সায় ওঠে । মনে হয় পাখির মতো উড়াল দিয়ে ঘরে ফিরি

মরিয়ম যেতে যেতে চিন্তা করে এইড্যা কি অসুখ ছড়াইল দুনিয়াতে ? বাপের মুখে শুনছে তার বড় চাচা মুক্তিযুদ্ধ করছে , মরিয়ম বাপে তখন ছোড । তারপরও বাপের মুখে যখন মুক্তিগো গল্প শুনতো তখন দেখতো । কেমন আলো জ্বলজ্বল করতাছে বাপজানের মুখে ।একদিন বাপজানের জিজ্ঞেস করছিলাম — বাপজান তুমি করো নাই যুদ্ধ ?
বাজানে উত্তর দিলো —- না রে মা, হেই ভাগ্য হয় নাই । তখন ছোড আছিলাম তয়
মনে আছে সব কিছু ।
মরিয়ম ভাবে এইড্যাও কি যুদ্ধ ? সুনসান শহর । রাইতদিন মানুষ মরতাচ্ছে । পুলিশের গাড়ি । এ্যামবুলেন্সের শব্দ যখন তখন ।ভয়ে পোলাপান লইয়া চুপচাপ থাকি ।কিন্তু পেট তো চলে না ।
অনেক কষ্টে দিন চলে মরিয়মের , কোন কাজ পায়না । রিক্সা চালিয় তারিখ মিয়া কোন রকম দিন চালায় ।মরিয়ম কাজ খোঁজে বস্তির বয়স্ক খালাদের কাছে ।সবার এক কথা বান্ধালোক হিসাবে থাক । করোনা টেষ্ট করাইয়া হেরা তোরে রাখবো ।এই অসুখের মধ্যে বস্তিতে থাকা দৈনিক আসা- যাওয়ার করা লোক রাখতো না কেউ ।
চুপ করে থাকে মরিয়ম এ কথার কোন জবাব তার জানা নাই ।

পুরানো বাসায় আবার যায় মরিয়ম । ম্যাডাম কইছিলো — ঈদের আগে এসো একবার মরিয়ম ।
অনেক আশা নিয়ে যায় মরিয়ম । দারোয়ান তারিখ মিয়া বলে কি সংবাদ তোমার ?
পাঁচতলার ম্যাডামে তো নাই । গতকাল দেশে গেছে তোমারে খবর দিতে কইছিলো ।তোমার তো ফোন নাই নাম্বারও নাই, কেমনে খবর দিতাম ?
—- পোলার বাপের একটা আছে হইডার নম্বর দিমুনে ভাই, দুঃখিত মনে বলে মরিয়ম ।এরপরে আইলে লইয়া আসুম। হঠাৎ ইনটারকম বাজে তারিখ মিয়া দৌড়ে চলে যায় ।
তারিখ মিয়া না আসা পযন্ত দাড়িয়ে ছিলো মরিয়ম ।হঠাৎ ঝন করে শব্দে পকেট গেট খোলে তারিখ মিয়া ।ভালো করে হাতমুখ ধুইয়া উপরে পাঁচতলার যাও সাহেব তোমারে ডাকছে । মনে হয় ম্যাডাম কিছু রাইখ্যা গেছে তোমার লাইগা যাও গো যাও, তয় সিড়ি দিয়া যাও।
অনেক আশায় মরিয়ম সিড়ি ভেঙে পাঁচতলায় ওঠে ।সাহেব তাকে ভেতরে ডাকে —এসে মরিয়ম ভেতরে আসো ।তোমার ম্যাডাম কিছু জিনিস পত্র রেখে গেছেন নিয়ে যাও । অনেক সাহস সঞ্চয় করে ঢোকে মরিয়ম । একটা কাপড়ের থলি দেখিয়ে দেন ।
—- এটা তোমার নাও । আচ্ছা এদিকে একটু এসো তো পায়েপায়ে এগিয়ে যায় মরিয়ম ।আধাঘন্টা পর সাহেবের দেয়া পাঁচহাজার টাকা আর ম্যাডামের দেয়া কাপড়চোপর নিয়ে সাহেবের ঘর থেকে বেরিয়ে আসে মরিয়ম । বাড়িতে ফেরে অন্য এক মরিয়ম । করোনাযুদ্ধে যাকে সব কিছু বিলিয়ে দিতে হয়েছে পিশাচ শ্রেনী ভদ্রলোকের কাছে । এরপর আর কোন ভয় নেই মরিয়মের তার বাচ্চারা আর অভুক্ত থাকবে না !!

ছড়িয়ে দিন