মোহাম্মদ ইলিয়াছ ঃ বিস্মৃত একজন ভাষা সংগ্রামী

প্রকাশিত: ১২:৫৯ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ৩১, ২০২১

মোহাম্মদ ইলিয়াছ ঃ বিস্মৃত একজন  ভাষা সংগ্রামী

 

অপূর্ব কান্তি ধর

 

জন্ম:১ অক্টোবর ১৯২৯, মৃত্যু: ২১ নভেম্বর ১৯৮৭

এক বিস্মৃত ভাষা সংগ্রামীর কথা। একে একে ভাষা সংগ্রামের বীর সেনানীরা লোকান্তরে চলে যাচ্ছেন ।আশির দশকে বহুমাত্রিক আন্দোলনে স্বৈরাচারের ভিত কেঁপে ওঠে ।একের পর এক ঘটনা প্রতিবাদ,সভা, বিক্ষোভ, সমাবেশে জাগরণে নতুন নতুন দিক উন্মোচিত হতে থাকে।এ সকল ধারাবাহিক আন্দোলন পরিকল্পনা ও সংঘটনে এই ভাষা সংগ্রামী মৌলভীবাজারে সব সময় সক্রিয় ছিলেন। কোন সভায় সভাপতিত্ব করা বা বক্তা হিসাবে যাঁর নাম প্রস্তাব করার সময় ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের বীর সেনানী হিসাবে লম্বা ভূমিকা দেয়া হত। কিন্তু পঞ্চাশোর্ধ সুস্বাস্থ্যের অধিকারী রঙে ফর্সা ও দীপ্তিতে উজ্জ্বল এই ব্যক্তির বক্তব্য সংক্ষিপ্ত অথচ দৃঢ়। অনেক সংগ্রামী সাধারণত নিজ বক্তব্যে সংগ্রামী জীবনের ঘটনার কতক উল্লেখ করে থাকেন যা শ্রোতাদের প্রেরণা যোগায়। কিন্তু, এই সংগ্রামীর বক্তব্যে তা পাওয়া য়ায না। তিনি প্রচার বিমুখ ব্যতিক্রমী এক সংগ্রামী বীর যিনি আত্মপ্রত্যয়ী।

মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলায় পাগলাটে নদী–ধলাই। প্রচুর বৃষ্টি হলে দুকুল ছাপিয়ে ঘোলাজলের প্লাবনে বসতি, রাস্তাঘাট ও শস্যক্ষেত যায় তলিয়ে। বৃষ্টিপাত থামলে আবার দ্রুতই প্লাবনের রুদ্ররূপ রুপান্তরিত হয় শান্ত, একেবারে শান্ত নীরব স্রোতধারা যেন পুশমানা ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা জন্তু। ধলাইয়ের স্রোতধারা সিনানশুদ্ধ গ্রাম খুশালপুরে সচ্ছল মর্যাদাশীল পরিবারে জন্ম ১ অক্টোবর ১৯২৭ সালে। ভ্রমণ-পিপাসুদের প্রাণকাড়া বৃক্ষরাজি- পশুপাখি ভরা ‘লাউয়াছড়া,’ দৃষ্টিনন্দন অনন্য ‘হাম হাম জলপ্রপাত’, শান্তি ও তৃপ্তিদায়ক সমতল বুকে বীরপ্রসূ খুশালপূর গ্রাম। এই গ্রামেরই সন্তান– চির সবুজ ক্ষুদ্র এক প্রকার সুরভিত উদ্ভিদ যার পাতাগুলো লেবুর পাতার মত কোমল ও মসৃন যার নাম ইলিয়াছ।কোমল মন ও মসৃন মনন নিয়ে স্বকর্মে সৌরভ ছড়িয়ে বাঙলা ও বাঙালির নবজাগরণে এগিয়ে চলা সাহসী যৌবন।

পিতা- মাতার আট সন্তানের মধ্যে প্রথম এই ছেলেকে ঘিরে অনেক স্বপ্ন ও আশা-ভরসা নিয়ে লালন-পালনে স্নেহ-মমতায় উজাড় করে দেয়া হয় প্রজন্মের উজ্জ্বল অগ্রগমনে।বাড়ীর কাছে বিদ্যালয় থেকে মধ্য ইংরেজি পরীক্ষায় বৃত্তি লাভ করে মৌলভীবাজার সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন পাকিস্তান জন্মের বছর (১৯৪৭) মেট্রিকুলেশন পরীক্ষায় চতৃর্থ হওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করেন। ঢাকা কলেজ থেকে আই.এসসি (১৯৪৯) তে নবম স্থান অর্জন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত ও সংখ্যাতত্ত্ব– দুটিতে অনার্সে ভর্তি হন। জ্ঞানের ভুবনে অত্যন্ত মনোযোগী চর্চার দ্বারা একের পর এক কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে অবশেষে ভরা যৌবনে চিত্তাকর্ষক দ্বার উন্মোচন হয়, বিশ্বপরিমন্ডলে পাঠ নিয়ে নিজেকে মানব সমাজে মেলে ধরার সুযোগ হয় অবারিত।

বৃটিশ শাসনের শেষ প্রান্তে গ্রাম-বাংলার আর্থিক ও সামাজিক জীবন ছিলো শোষণ-পীড়িত, ক্ষত-বিক্ষত। কৃষিনির্ভর সমাজ জীবনে অভাব, অশিক্ষা, সংস্কারের নির্মম কশাঘাতে অচল, হতাশা নিয়ে দুঃসহ দিন যাপন। শিশুমনে সমাজের এ চিত্র কতটুকুই বা দাগ কাটতে পারে! হয়তো বা এটা স্বাভাবিক হিসাবেই রয়ে গেছে। ‘ বৃটিশ খেদাও’ আন্দোলনে জনমন হয় আলোড়িত, আবার রাজনৈতিক দুষ্টচক্রের চালে জনমন হয় বিভক্ত, হিংসা ও আস্থাহীনতার সাথে বৃটিশ কুটচালে এক জটিল সমাজ আবহ সৃষ্টি হয়। কৈশোরে এ দ্বন্দ্ব- সংঘাত, জনজীবনের গভীর সংকট ও আশা-নিরাশার দোলাচলের ছাপ কতটুকু পড়েছে? হয়তো বা পড়েছে কতক, কিন্তু তা প্রকাশ হয়নি তখনও। অবশেষে এককালে সমৃদ্ধ ভারতবর্ষ বিভক্ত হলো; মানুষে-মানুষে, ভাইয়ে-ভাইয়ে, পাড়া-পড়াশীর হানাহানি ও রক্তস্নানের মাধ্যেমে ভারত ও পাকিস্তান –দুটি রাষ্ট্র জন্ম হলো। আমাদের এই পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের অন্তর্ভূক্ত হলো। হানাহানির পরও স্বাধীন দেশে মানুষের সুখ, শান্তি ও স্বস্তির স্বপ্ন বাস্তবায়নের অপেক্ষা। কিন্তু সময় বলে দেয়, সুখের আশায় গুড়েবালি। সমাজে বৈষম্য,বিভেদ, হিংসা, দারিদ্র ,নিপীড়ন যায় বেড়ে।

ঠিক এই সময় কবিগুরুর দরজায় কড়া নেড়ে আহ্বান, ‘‘ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা /…..আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা’’। দীর্ঘদিন ধরে শোষণ-নিপীড়নে জর্জরিত গ্রামীণ সমাজে আচার-সংস্কার জালে আবদ্ধ ও হতাশায় নিমজ্জিতদের ঝাঁকি দিয়ে জাগিয়ে দেবার জন্য নবীনদের, অবুজ-সবুজদের আহবান জানান। একই সাথে জাতীয় কবি কাজী নজরুলের উদাত্ত আহবান, ‘কে আছো জোয়ান, হও আগুয়ান, হাঁকিছে ভবিষ্যৎ’। অচলায়তন ভেঙ্গে সমাজে নবজাগরণ সৃষ্টি ও সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য তারুণ্যকে এগিয়ে আসার আহবান সমাজে প্রাণসঞ্চার করে। নতুন সৃষ্ট দেশের গণমানুষের হৃদয়ের যন্ত্রণা থেকে মুক্তির জন্য রাজনৈতিক শক্তির পরিকল্পিত জাগরণী উদ্যোগ ও সক্রিয় পদক্ষেপ যুবশক্তিকে সাহসী ও উদ্যমী করে তুলে। দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রসর তরুণদের সংগঠিত কার্যক্রম দেশে মানবিক বাংলা গড়নে মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্র-ভাষার মর্যাদা দাবীতে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে ওঠে। নতুন সৃষ্ট রাষ্ট্রের জন্মের সাথে জনগনের যে আবেগ-অনুভূতি, তার বিকল্প বাঙালি জাতীয় চেতনায় জাগরণের কাজ ছিলো খুবই কঠিন ও জটিল। এক ঝাঁক নিবেদিতপ্রাণ যুবকদের ধারাবাহিক কাজের ফলে ছাত্র যুবকরা আন্দোলিত হয় এবং এর সাথে যুক্ত হয় দেশের সর্বসাধারণ। সৃষ্টি হয় অভূতপূর্ব বাঙালি চেতনার জাগরণ যা ঐতিহাসিক বাঙালির রক্তদান, বিশ্বে প্রথম ও অনন্য হিসাবে আজ ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা’ দিবস হিসাবে স্বীকৃত এবং একই সাথে দেশে দেশে মাতৃভাষা সংরক্ষণ ও বিকাশ হয় নিশ্চিত।

এ ইতিহাসখ্যাত ভাষা আন্দোলনে অনেকের মধ্যে এই জেলার মোহাম্ম্দ ইলিয়াছ ঢাকা বিশ্ববদ্যিালয় ছাত্র হিসাবে অংশগ্রহণকারী। ভাষা সংগ্রামের জন্য গঠিত কোন কমিটিতে তার নাম পাওয়া যায় না। জানা যায়, সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটির বাইরে সংগ্রামে সক্রিয় যোগাযোগের জন্য গোপন একটা কোর কমিটি ছিলো যার মধ্যে মো. ইলিয়াছ, গাজীউল হক, মো. তোয়াহা,শহীদুল্লাহ কায়সার, , আহমেদ রফিক প্রমুখ ছিলেন। ভাষা সংগ্রামী হিসাবে তাঁর নাম অনেক খোঁজাখুঁজির পর পাওয়া গেলো, ভাষা সংগ্রামী কবি, প্রাবন্ধিক, রবীন্দ্র গবেষক ও কলামিষ্ট জনাব আহমেদ রফিক সাহেবের লেখায়। তিনি উল্লেখ করেন, নিষ্ঠাবান অকুতোভয় সক্রিয় ছাত্র মো.ইলিয়াছ ছিলেন মানব মুক্তির লড়াইয়ে নিবেদিত কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য এবং এই দলের নির্দেশে তিনি মেডিকেল কলেজের ছাত্র ব্যারাকের ৬নং কক্ষে স্থায়ী আসন গেড়ে বসে আন্দোলনের সাথে সক্রিয় যোগাযোগ রাখতেন। কাজেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত সক্রিয় এবং সংগত কারণে পর্দার অন্তরালে। তাঁর সক্রিয় কর্মকাণ্ড  কিন্তু গোয়েন্দাদের নজরে ঠিকই ছিলো। ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে অগ্রসর ভাষা সংগ্রামীদের নিয়ে গড়ে ওঠে ছাত্র সংগঠন–ছাত্র ইউনিয়ন, যার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন মো.ইলিয়াছ ও সভাপতি হন আরেক ভাষাসৈনিক সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটির সদস্য মো.সুলতান।

এই ভাষা সংগ্রামীর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা লাভ সম্পর্কে জানার সুযোগ সীমিত। ছাত্র হিসাবে আবাসিক ছিলেন এস.এম হলে এবং তাঁর কক্ষে ছিলেন বিচারপতি হাবিবুর রহমান। তিনি ছিলেন মানব মুক্তির লড়াইয়ে নিবেদিত প্রাণ। প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামান স্যার ছিলেন আন্দোলন সহযোগী।আর সেজন্য পরীক্ষা দেয়া কতটুকু সম্ভব হয়েছে বা দিতে পারলেও ফলাফল হয়তোবা আটকে আছে। এমন বহু বিপ্লবীদের পরীক্ষা পাশের সুযোগের চেয়ে রাজনৈতিক সংগঠনের কাজের গুরুত্ব বেশি হয়ে থাকে,দেখা গেছে ।

ভাষা আন্দোলনে কতক সাফল্য সত্বেও নানাভাবে সমাজে নিপীড়ন চলতে থাকে।এমন কি ’৫৪ সালে মুসলিম লীগ বিরোধী যুক্তফ্রন্ট জয়লাভ করেও ৯২/ক ধারায় আবার চলে রাজনীতি নিষিদ্ধকরণ ও গৃহে অন্তরীণ নামক জালাতন। ’৫৪ সালের নির্বাচনে সক্রিয়কর্মী হওয়ার কারনে তাঁর বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি এবং ’৫৮ সালে সামরিক শাসন রাজনীতি নিষিদ্ধকরণের আইনে আবার পুলিশের গ্রেফতারের তালিকায়। ষাটের দশকে শ্রীমংগলে স্থিতু হওয়ার পূর্বে কিভাবে ছিলেন তাও জানা যায়নি। শ্রীমংগলে বালিশিরা ভ্যালী হাসপাতালে ডাক্তার জাহিদ ছিলেন তার শ্বশুর এবং পরিবারের অনেকই ছিলেন শ্রীমংগল কেন্দ্রিক চা বাগানে চাকরীরত ও শহরে বসবাসরত । পুলিশের চোখ এড়িয়ে এই এলাকায় যাতায়য়াত ছিলো নিশ্চয়ই। চাকরী বা ব্যবসায় করেছেন এমন কোন তথ্যও পাওয়া যায়নি। নিবেদিতপ্রাণ রাজনৈতিক কর্মী হিসাবে শুরু থেকে জীবনের শোষপাদে এসেও তাই দেখা গিয়েছে।

যতটুক জানা যায়, বাঙালি জাগরণের কালপর্বে দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দলসমূহের কার্যক্রমে গতিবৃদ্ধি ও আন্দোলন সংগ্রামের ধারার মাঝে শ্রীমংগলে স্থিতু হন। বাঙালির মুক্তি চেতনায় সমৃদ্ধ হয় মন। স্থানীয়ভাবে রাজনৈতিক বিভিন্ন শক্তি ও ব্যক্তির সাথে চলে যোগাযোগ।বাঙালি জাগরণের প্রাণপুরুষ শেখ মুজিবুর রহমানের রত্ন আহরণ অভিযানে তিনি ধরা পড়ে যান প্রখর দৃষ্টিজালে। ঊনসত্তরে বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগে যোগদান করে জাতীয় নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু মনেনীত এমএনএ নির্বাচিত হয়ে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে ৪ নং সেক্টারে রাজনৈতিক সমন্বয়কারী হিসাবে বাঙালির গৌররের ইতিহাস রচনার সাহসী যোদ্ধা হিসাবে ভূমিকা পালন করেন। মুক্ত স্বদেশে বিধ্বস্ত অর্থনীতি নতুনভাবে গড়ে তোলার পর্বে দেশে পরিত্যক্ত চা বাগান সমূহ নিয়ে গঠিত বাংলাদেশ চা-শিল্প পরিচালনা কমিটির (বি টি আই এম সি) চেয়ারম্যান নিযুক্ত করেন জাতির পিতা। দেশের প্রথম সংবিধান রচনায় ছিলেন সক্রিয় ও স্বাক্ষরকারী। দেশ পুনর্গঠন ও পরাজিত শক্তির প্রতিরোধ মোকাবেলায় মৌলভীবাজার মহকুমায় (পরে জেলায় রূপান্তরিত) আওয়ামী লীগকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করানোর জন্য এক ঝাঁক রাজনৈতিক কর্মী-নেতা সৃষ্টি করেন, যারা সত্যিকার মানুষের আস্থাশীল কঠিন সময়ে সংগ্রামে আগুয়ান ও ত্যাগী। তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও একনিষ্ঠতা, সততা ও সক্রিয়তা, সংগ্রামে পোড়-খাওয়া বিবেচনায় বাংলাদেশকে শোষণমুক্ত ও সমৃদ্ধ দেশ গঠনের লক্ষ্যে গণতন্ত্রের চর্চা সম্বলিত বাকশাল‘র (বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ ) মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদক মনোনীত করা হয়।

পঁচাত্তরের মর্মান্তিক পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞের পর বঙ্গবন্ধুহীন বাংলায় মুক্তিযুদ্ধের ধারা হয় পরিত্যক্ত, বঙ্গবন্ধু জয়বাংলা হয় নির্বাসিত, চলে রাজনীতিকদের ওপর সীমাহীন নিপীড়ন-নির্যাতন, আর্থিক-সামাজিক জীবন হয় ক্ষত- বিক্ষত। ’৭৩ সালে দেশের প্রথম নির্বাচনে নির্বাচিত জেলার পাঁচজন সংসদ সদস্যদের কেউ দলত্যাগী, আবার কেউবা একেবারে নিষ্ক্রিয়। জনাব মো: ইলিয়াছ সত্তরে নির্বাচিত এমএনএ হয়েও, স্বাধীন দেশে প্রথম নির্বাচনে মনোনয়ন না পেলেও, দলের কার্যক্রমে ছিলেন সক্রিয় ও অবিচল। পঁচাত্তর পরবর্তীতে আমৃত্যু আওয়ামী লীগের জেলা সভাপতি হিসেবে সকল আন্দোলনে সক্রিয়, দলকে পুনর্গঠন ও কর্মীবাহিনী গঠনে ধারাবাহিক তৎপর এবং ‘৭৯ ও’ ৮৬ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে এবং দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হিসাবে অর্পিত দায়িত্ব অত্যন্ত সাহসীকতার সাথে সুচারুরূপে পালন করেন। ষাটের দশকে গণজাগরণ গণ-অভ্যুত্থানের পর আশি’র দশক ছিলো স্বৈরাচার বিরোধী ধারাবাহিক একের পর এক সংগ্রামে ভরপুর এবং সেকালে এই নেতা ছিলেন আমৃত্যু আন্দোলনের কেন্দ্রে। বাংলাদেশে চা-শিল্পের প্রধান কেন্দ্র শ্রীমঙ্গলের চা বাগানে তাঁর সংযোগ ছিলো অত্যন্ত নিবিড়। চা বাগান কর্মচারীদের নিয়ে গঠিত ‘টি গার্ডেন স্টাফ এসোসিয়েশন’কে সত্যিকার সক্রিয় কর্মজীবি সমিতি হিসাবে গড়ে তোলেন এবং এর সাধারণ সম্পাদক, সভাপতি ও সর্বশেষ উপদেষ্টা হিসাবে আমৃত্যু দায়িত্ব পালন করেন। শ্রমিক ও কর্মচারীর নিকট তিনি ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয় ও শ্রদ্ধাভাজন। মালিক পক্ষের সাথে দাবী- দাওয়া নিয়ে নতুন চুক্তির পূর্বে আলোচনার টেবিলে বার্গেনিং এজেন্ট হিসাবে ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ। হৃদ্যতার সাথে যুক্তিপূর্ণ শোভন উপস্থাপনের জন্য তিনি ছিলেন ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের দিক থেকেও অত্যন্ত সম্মানিত জন।

স্বাধীন দেশে দ্বিতীয়বার সামরিক শাসন জারির পর সকল রকম রাজনৈতিক তৎপরতা বন্ধ হয়ে যায়। সামরিক সরকার প্রদত্ত শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে ছাত্র সমাজের আন্দোলন শুরু হলে তিরাশি সালে এই ভাষা সংগ্রামীর প্রস্তাবে গঠিত ‘সংস্কৃতি সংসদ’র উদ্যোগে কমলগঞ্জ উপজেলার নিভৃত গ্রাম –যোগীবিল’র সোনাটিকি মাঠে অনুষ্ঠিত হয় গণসংস্কৃতি উৎসব। তাঁরই উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত কমলগঞ্জ গণমহাবিদ্যালয়-এর লাইব্রেরীয়ান আহমদ সিরাজ ও আলীনগর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান লোকজনপ্রিয় নির্মল মনের মানুষ মোহাম্মদ আলী (প্রয়াত) ছিলেন এ উৎসব আয়োজনে নিবেদিতপ্রাণ প্রধান কর্মী। অনুষ্ঠানে এমপি জনাব মোঃ ইলিয়াছ এর সাথে উপস্থিত হন গণমহাবিদ্যালয়ের নিষ্ঠাবান অধ্যক্ষ রসময় মোহন্ত, শ্রীমঙ্গলের মানবাধিকার যেকোন উদ্যোগে সাহসী অংশগ্রহণকারী অধ্যাপক সাঈদ মুজিবুর রহমান, অধ্যাপক নৃপেন্দ্র লাল দাশ- এমন বহু গুণীজন। উৎসবে পুঁথিপাঠ, সারি-জারি, লোকজ গান, কবিতা আবৃত্তি ও গণনাটক ‘দুবাই ওয়ালা’ ও ‘চেয়ারম্যান সমাচার’ মঞ্চায়ন পরিবেশকে প্রাণবন্ত করে তুলে।গ্রামের কৃষক ক্ষেতমজুরদের নিকট থেকে একুশ হাজার টাকা চাঁদা তুলে ব্যয় সংকুলান ও সহস্রাধিক গ্রামীণ জনগণের উপস্থিতিতে দিনভর অনুষ্ঠান গ্রামীণ জীবনে আনন্দ ও চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। বাংলার লোকজ সংস্কৃতির এ অনুষ্ঠান আয়োজন বাঙ্গালির নবজাগরণে গুরুত্ববহ।

১৯৮৪ সাল । দেশে শ্রমিক কর্মচারী ঐক্যপরিষদ (স্কপ) আন্দোলন শক্তিশালী হয়ে ওঠে। দেশের বিভিন্ন শ্রেণি পেশার শ্রমজীবিরা এ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। ইলিয়াছ ভাইয়ের সাথে আলোচনা হলো, দেশব্যাপী এ আন্দোলনে সিলেটের বিরাট সংখ্যক চা শ্রমিকদের কিভাবে সংযুক্ত করা যায়। আলোচনার ভিত্তিতে শ্রমিক কর্মচারী ঐক্যপরিষদের নামে চা- শ্রমিকদের প্রতি আন্দোলনে অংশগ্রহনের আহবান জানিয়ে প্রচারপত্র ছাপিয়ে শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন এলাকায় চা বাগানে বিলি করা হয় এবং যোগাযোগ করা হয়। দেশব্যাপী ধর্মঘটের পূর্বে চা শ্রমিকদের ইউনিয়ন কার্যালয় ‘ইউনিটি হাউজ’ এ ঢাকা থেকে ফেডারেশন অব লেবার’র নেতা জনাব দীনেন সেন এর সাথে জননেতা মো: ইলিযাছ সহ দেখা করি। তিনি চা শ্রমিক কর্মী প্রশিক্ষণে শ্রীমঙ্গলে এসেছিলেন এবং ইউনিয়নে তার প্রভাবও রয়েছে। তিনি এ ব্যাপারে করার কিছু নেই বলে জনান। শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্যপরিষদের ডাকে আহুত ধর্মঘটে সারা দেশে ব্যাপক শ্রমজীবির অংশগ্রহনের ফলে দেশ অচল হয়ে পড়ে। সরকার আলোচনায় বসে এবং ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার, ন্যূনতম মুজুরি নির্ধারণ, বছরে দুটি উৎসব বোনাস প্রদানসহ বিভিন্ন দাবী আদাায় হয়। শ্রীমংগলে কেন্দ্রীয় ‘স্কপ’ নেতাদের নিয়ে সভা করার চিন্তা থেকে ঢাকায় গিয়ে যোগাযোগ করার জন্য ঢাকা যেতে বলেন ইলিয়াছ ভাই। নির্ধারিত দিনে আমি ১০০ টাকা নিয়ে রওয়ানা দিয়ে শ্রীমঙ্গলে নেতার বাসায় গিয়ে দেখা করলে তিনি আমাকে আরো ২০০ টাকা দেন। ঢাকায় যোগাাযাগ করলে শ্রমিক নেতা কয়েকজন শ্রীমংগলে এসেছিলেন। পরে যে-বিষয়টি জেনে আশ্চর্য হয়েছি যে, আমাকে দেয়া দুইশত টাকা বাজার খরচের জন্য ছিল এবং এ জন্য আর সেদিন বাজারও হয়নি। এমন আরো বহু ঘটনা রয়েছে তাঁর জীবনে। রাজনীতি অন্তপ্রাণ এমন নেতা ছিলেন যা রাজনীতিক নেতা কর্মীদের প্রেরণা হয়ে থাকবেন।

তাঁর লেখালেখি সম্পর্কে কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। ১৯৫৪ সালের ২৮ জানুয়ারী, ১১ ফেব্রুয়ারী ও ২১ মার্চ ‘আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা’ নামে তিন পর্বে লেখা তৎকালীন প্রগতিশীল পত্রিকা ‘নওবেলাল’ এ ছাপা হয়েছে যেগুলোর হাতে লেখা কপি পাওয়া গিয়েছে। ‘স্বাধীন’ দেশে সরকারি তথ্য- বিবরণী উল্লেখ করে শিক্ষায় অবহেলা, বৈষম্য, উদ্যোগহীনতার করুণচিত্র তুলে ধরেছেন। নওবেলাল পত্রিকার সম্পাদক উল্লেখ করেছেন, ‘‘পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মি: মোহাম্মদ ইলিয়াস তার ‘আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা’ প্রবন্ধে অনেক তথ্য সহায় তুলনামূলক আলোচনা করেছেন। আজিকার দিনে এই রকমের প্রচেষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা থাকা সত্বেও এদেশে তাহা বিরল। লেখকের উদ্যম সার্থক হউক, ইহাই আমাদের কামনা’’।

একুশে ফেব্রুয়ারী ও মুক্তিযদ্ধের চেতনা– অসাম্প্রদায়িক,গণতান্ত্রিক,বৈষম্যহীন সকল মানুষের সমান সুয়োগ সম্পন্ন শোষণমুক্ত সমৃদ্ধ সোনার বাংলা সৃজন। বঙ্গবন্ধু নির্দেশিত আত্মসমালোচনা ও আত্মসংযম দ্বারা রাজনীতিকদের প্রতিনিয়ত পরিশুদ্ধ হয়ে মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করা অবশ্য প্রয়োজন। নীতি ও আদর্শ নিয়ে সংগ্রাম ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে সত্যিকার জনবান্ধব নেতা। তিনি এমনই নেতা, তিনবার গণপরিষদ ও সংসদ সদস্য হয়েও ছিলো না কোন বাড়ী, গাড়ী, জৌলুস। চা- বাগান কর্মচারী সমিতির অফিস ও তৎসংলগ্ন ছোট পরিসরে ভাড়া বাড়িই তাঁর ঠিকানা ছিলো আমৃত্যু। শ্রীমংগলে একখন্ড জমি ছিল বাড়ি করার জন্য। এই জমিতে বাড়ি হয়নি, বরং দুই সংসদ নির্বাচনে এটুকুও হস্তান্তর করতে হয়েছে। সংগঠনে কর্মী সৃষ্টি করার অসম্ভব ক্ষমতা ছিলো যা দ্বারা সংগঠনের ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটিয়েছেন দুঃশাসন কবলিত সময়কালে। ১৯৮৭ সালে স্বৈরাচার বিরোধী তীব্র আন্দোলনকালে সংসদ থেকে পদত্যাগের উত্তেজনাপূর্ণ সময়ে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়েবেটিস রোগাক্রান্ত এই সংসদ সদস্য শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ঢাকায়। তখন দেশে লাগাতর হরতাল চলছে।

তাঁর তিন কন্যা ও এক ছেলে নিয়ে ভাবি মনোয়ারা খাতুন কেমন আছেন? হয়তো বা ভালো অথবা ভালো নেই। বড় কন্যার স্বামী প্রয়াত, দ্বিতীয় কন্যার স্বামী দেওয়ান কাামাল আহমদ,নীলফামারী পৌর মেয়র এবং জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বিশ বছর যাবত। রংপুরের এক আওয়ামী লীগ নেতার সাথে আলাপে জানা যায়, , যতদিন কামাল সাহেব বেঁচে আছেন, ততদিনই তিনি এ পদে বহাল থাকবেন- এত জনপ্রিয় নেতা তিনি। অপর কন্যা সিলেটে ভালোই আছেন। একমাত্র ছেলে সরওয়ার জাহান চঞ্চল শ্রীমংগলেই আছেন স্ত্রী সন্তান নিয়ে। বয়সের ভারে দুর্বল হয়ে পড়া ভাবি প্রায়শই মেয়েদের সাথে থাকেন। ডাক্তারের আদুরে কন্যা মনোয়ারা খাতুন আপন চাচাতো ভাই সম্ভাবনাময় উজ্জ্বল যুবক মোহাম্মদ ইলিয়াছের সাথে ঘর বাঁধেন অনেক স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু, ‘পাখির নীড়’ র ন্যায় সুখের ঠিকানা গড়া যে সম্ভব হয়নি। প্রাণের বন্ধন হৃদয়ের আবেদন নিয়ে পথচলা। এক সময় শ্রীমংগলে স্থিতু হয়েও আচমকা মাত্র ৫৮ বছর বয়সে ইতি ঘটে তাঁর অন্তরাল যাত্রায়।
নীতি আদর্শে অটল থেকে একুশের চেতনা নিয়ে যান মুক্তিযুদ্ধে। আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে অবিরাম পথে পথে বাঁধা অতিক্রম করে ’৮৭ সালে পরিসমাপ্তি। কোথাও তো চেতনা বহনে কোন ছেদ নেই, এ ভাষা সংগ্রামীর। আমাদের প্রিয় নেত্রী সফল রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বিস্ময়কর উন্নয়নের ম্যাজিক কী–এ প্রশ্নের উত্তরে নেত্রী যেমন বলেন, “দেশকে ভালোবাসা, দেশকে জানা এবং দেশের মানুষের জন্য নিবেদিত হয়ে কাজ করা”- হলো ম্যাজিক। এই বিস্মৃত ভাষা সংগ্রামীর নিখাদ দেশকে ভালোবাসা, দেশকে জানার বিরামহীন চেষ্টা এবং দেশের মানুষের কল্যাণে নিবেদিত হয়েই অকালে তাঁর জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে।

যতটুকু জানা যায়, মোহাম্মদ ইলিয়াছ জননেত্রীর অত্যন্ত প্রিয় ও নির্ভরযোগ্য সহযাত্রী ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারা আজ দেশ শাসনে। এই সময়কালে অনেকেই নানা পুরস্কারে, নানা মর্যাদায় ভূষিত হয়েছেন। এই বিষ্মৃত ভাষা সংগ্রামীকে একুশে পদকে ভূষিত করার সুযোগ কী নেই ? আমরা জানি, বীরের প্রতি মর্যাদা নতুন নতুন বীর সৃষ্টিতে প্রেরণা দান করে অবিরত। এই ভাষা সংগ্রামী মোহাম্মদ ইলিয়াছ এর জীবন প্রেরণা হয়ে রবে নব নব উজ্জীবনে।

অফুরান শ্রদ্ধা, হে বিস্মৃত ভাষা সংগ্রামী! ১৭-১০-২০২০