যখন পুলিশ কমিশনার ছিলাম …

প্রকাশিত: ১১:০৮ পূর্বাহ্ণ, মে ৬, ২০২০

যখন পুলিশ কমিশনার ছিলাম …

কাওসার চৌধুরী

ধীরাজ ভট্টাচার্য মহাশয় লিখেছিলেন-
তাঁর সাড়াজাগানো স্মৃতিকথা ‘যখন পুলিশ ছিলাম’। পেশায় উনি সত্যি সত্যিই পুলিশের কর্মকর্তা ছিলেন। পুলিশ থাকাকালের স্মৃতি নিয়েই তিনি লিখেছিলেন সেই স্মৃতিকথা- যা পরবর্তীতে ভীষণ জনপ্রিয় হয়েছিল।

তাই বলে তাঁর সাথে তো আর আমার তুলনা হতে পারে না! তাছাড়া আমিতো পেশায় পুলিশ ছিলামও না! কিন্তু এই ছবিগুলো হাতে আসার পর হঠাৎ মনে হল- ওরকম একটা কিছু লিখে দেই ছবির শিরোনামে! তবে লিখলেইতো আর হয়না, বাস্তবতা বলে একটি কথা আছে- সেটাকে মেনে চলতে হয়! কিন্তু, জগতে সবকিছুই তো আর বাস্তবতা মেনে চলে না; বিশেষত আবেগ! ওটাকে সামাল দেয়া খুবই কঠিন কাজ বটে! আমিও সেই আবেগের কাছে পরাজিত হয়েই এই ক্যাপশনটাই দিলাম; তবে একটু ঘুরিয়ে!

আসল কথায় আসি।
পুরনো ছবি ঘাঁটাঘাটি করতে গিয়ে এই ছবিক’টা পেয়ে গেলাম হঠাৎ করেই। এগুলো একটা খন্ড-নাটকের ছবি। বাংলাদেশ টেলিভিশনে এক সময় খন্ড-নাটক শিরোনামে মিনি সিরিয়াল প্রচারিত হত। সাল’টা সম্ভবত ছিয়াশি কি সাতাশি হবে! অবশ্য বিটিভি’র প্রথম খন্ড-নাটক ছিল ‘যত দূরে যাই’। ইমদাদুল হক মিলনের লেখা, ফখরুল আবেদীন দুলালের প্রযোজনা। ওই নাটকেও সৌভাগ্যবশত আমি অভিনয়ের সুযোগ পেয়েছিলাম। আমার বিপরীতে ছিলেন তারানা হালিম। আমাদের চেয়ে অপেক্ষাকৃত তরুণ জুটি ছিল তৌকির আহমেদ ও শমী কায়সার। তৌকির আমার ছোট ভাইয়ের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন; কিংবা উল্টোকরে বললে- আমি তৌকিরের বড়ো ভাইয়ের চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পেয়েছিলাম। নাটকটির কথা আজো দেখি অনেকেরই বেশ মনে আছে!

ফিরে আসি আজকের ছবি প্রসঙ্গে।
যে নাটকটির বদৌলতে পুলিশের ভূমিকায় আমাকে দেখছেন- তার শিরোনাম ছিল ‘ফিরিয়ে দাও অরণ্য’। নাটকটি লিখেছিলেন পুলিশের তখনকার এআইজি (পরবর্তীকালে ডিআইজি) মনসুরুল আজিজ (প্রয়াত)। প্রযোজনা করেছিলেন খ ম হারূন। এটা তৌকির আহমেদের অভিনীত প্রথম নাটক।

নাটকটির বিষয়বস্তু এবং কাহিনী আবর্তিত হয়েছিল তখনকার সময়ে তরুণদের মাঝে ড্রাগের ব্যবহার আর তার প্রতিরোধ নিয়ে। আমার চরিত্রটি ছিল ‘প্রতিরোধকারী দলের’ নেতৃত্ত্ব দেয়া। এই নাটকে আইজিপি’র ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন জহুর ভাই (জহুরুল ইসলাম, ডলি জহুরের প্রয়াত জীবনসঙ্গী)। এছাড়াও জামাল ভাই (জামাল উদ্দিন হোসেন) মুনিরা ইউসুফ মেমী, মুকুলসহ আরো বেশ ক’জন অভিনয় করেছিলেন এই নাটকে।

প্রযোজক হারূন ভাই (খ ম হারূন) আমাকে এই নাটকের স্ক্রীপটি দেয়ার পর আমি এই চরিত্রে অভিনয় করবো কীনা তা নিয়ে একোটু গড়িমসি করছিলাম। কথায় বলে- ‘মোটেই মা রাঁধে না, তপ্ত আর পান্তা’; আমার অবস্থাও ছিল ওরকম প্রায়! এমনিতেই চান্স জোটেনা, তার ওপরে আবার আলগা ফুটানি 🙂 !

এই নাটকের স্ক্রীপট যখন আমার হাতে আসে, তার আগের সপ্তায় রবিঠাকুরের ‘মধ্যবর্তিনী’ নাটকটি প্রচারিত হয়। আমি ছিলাম সেই নাটকের সুবোধ নায়ক! আমার বিপরীতে ছিলেন শামীম আরা নীপা। তখোন আমি বিটিভিতে সবেমাত্র একক-নায়ক আর রোমান্টিক চরিত্রের অভিনেতা হিসেবে যাত্রা শুরু করেছি মাত্র। টার্গেট ছিল- টিভিতে ‘রোমান্টিক নায়ক’ হওয়ার! কিন্তু কোথাকার জল কোথায় গিয়ে যে দাঁড়ালো- ভেবে পাই না! ওরকম নায়ক হওয়ার জন্য যে যোগ্যতা থাকা দরকার ছিল, সে রকম কিছু অবশ্য আমার মাঝে তেমন খুব একটা আমি দেখিওনি কোনদিন! যাক গে!

‘মধ্যবর্তিনী’ নাটকে আমার অভিনয় দেখে ‘ফিরিয়ে দাও অরণ্য’ নাটকের রচয়িতা এআইজি মনসুরুল আজিজ প্রযোজককে বলেছিলেন- এ রকম লাল্টুমার্কা একজনকে দিয়ে পুলিশ কমিশনারের অভিনয় করাবেন কী করে! বলে নেয়া ভালো- আমার সাথে তখনো নাট্যকারের দেখাই হয় নি! পরিচয়ও ছিলনা কোনদিন। কিন্তু হারূন ভাই আমাকে দেখেছেন মঞ্চে অভিনয় করতে। উনি আমার অভিনয় সম্পর্কে আস্থাশীল থাকায় শেষপর্যন্ত ওই নাটকে আমার অভিনয় করা হয়েছিল আর কি!

অবশ্য এই নাটকে অভিনয়ের পেছনে আমার প্রয়াত স্ত্রীর ভূমিকাও যথেষ্ট জোরালো ছিল। একদিন সকাল ১১টার দিকে ‘ফিরিয়ে দাও অরণ্য’ নাটকের পান্ডুলিপিটা বগলদাবা করে আমি বের হচ্ছিলাম রামপুরায় গিয়ে ওটা হারূন ভাইয়ের কাছে ফেরৎ দেবো বলে! কিন্তু আমার স্ত্রী বললেন- তুমি কিন্তু চরত্রটি করবে কীনা তা নিয়ে আর একটু ভেবে দেখতে পারো ! আমি বলি- কেন ? স্ত্রী বললো- তুমি সেদিন মহিলা সমিতি থেকে তোমাদের নাটকের পোশাকেই বাসায় ফিরেছিলে। তোমার পরনে আর্মির পোষাক ছিল। তোমাকে পুলিশ কিংবা আর্মির চরিত্রে বোধহয় খারাপ লাগবে না! কথা শুনে আমি একটু থমকে যাই!

বলে নেয়া ভালো; আমি ততদিনে ‘নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়’-এ কাজ শুরু করেছি (১৯৮৫)। মঞ্চে তখন আমাদের নিয়মিত প্রযোজনা ছিল আইরিন শ-এর লেখা নাটক ‘কবর দিয়ে দাও’। নাটকটি রুপান্তর করেছিলেন জামাল ভাই (জামাল উদ্দিন হোসেন) এবং পরিচালনা করেছিলেন আমাদের আতা ভাই (আতাউর রহমান)। ওই নাটকের একটি চরিত্রে ‘অল্টারনেটিভ’ হিসেবে হঠাৎ আমি পরপর ৩টি প্রদর্শনীতে অভিনয়ের সুযোগ পেয়ে যাই। সেই চরত্রটি ছিল একজন সেনা সদস্যের। একদিন অভিনয়শেষে খুব তাড়াহুড়ো করে বাসায় ফিরেছিলাম- কস্টিউম চেঞ্জ কিংবা মেক-আপ না তুলেই। আর তখনই স্ত্রীর বিবেচনায় পুলিশ কিংবা আর্মি বনে যাই! সার্টিফিকেট পেয়ে যাই পুলিশ সাজবার। আমি অবশ্য প্রতিটি স্ক্রীপ্ট নিয়ে প্রথমেই আমার স্ত্রীর সাথেই শেয়ার করতাম। নাটক নিয়ে শুধু আলোচনাই নয়- নাটকে আমার সংলাপ মুখস্ত করাবার ক্ষেত্রেও তার ছিল অনেক বড়ো অবদান। হায়, আমার স্ত্রী অকাল প্রয়াত হলেন কর্কট-ব্যাধিতে! প্রার্থনা করি- আমার স্ত্রীর আত্মা যেনো চিরশান্তিতে থাকে।

এরমাঝেই এলো এই চ্যালেঞ্জিং চরিত্রটি।
আমার প্রকৃত বয়স তখন তিরিশ কি বত্রিশের কোঠায়! কিন্তু পুলিশের এই চরিত্রটি ছিল পঞ্চাশোর্ধ বয়সের। তারওপরে চরিত্রটি আবার সমাজের বিশেষ কেটাগরির! আমাদের দৈনন্দিন চরিত্রের সাথে যায়না এর ধাঁচটি। ফলে একজন ‘পুলিশ কমিশনারের’ চরিত্রের যে বৈশিষ্ট; তাঁর আচার আচরণ, চলাফেরা, জেশ্চার-পোশ্চার সবকিছুই নতুনভাবে রপ্ত করতে হয়েছিল আমার!

আজো মনে আছে, সেই চরিত্রটি ধারণ করার জন্য আমি এআইজি মনসুরুল আজিজের অফিসিয়াল চেয়ারের পাশে একটি অতিরিক্ত চেয়ারে বসে প্রায় দিন পনের অফিস করেছিলাম- উনারই পরামর্শে! কিভাবে তিনি চেয়ারে বসেই সালাম নেন, ফাইলে সাক্ষরশেষে কীভাবে সেটা ফেরৎ দেন, কিংবা কতখানি হাত নেড়ে কথা বলেন- ইত্যাদি ইত্যাদি অনেককিছুই! তবে শিরদাঁড়া সোজাকরে চেয়ারে বসবার অভ্যেসটি তখোন থেকেই হয়েছিল!

আমার, অর্থাৎ ডিএমপি’র কমিশনারের নিজের কামরায় অভিনয়টুকু আমরা সত্যি সত্যিই বেইলী রোডে ডিএমপি কমিশনারের অফিসেই করতাম। শুটিং হত রেড-বিল্ডিং-এ ডিএমপি কমিশনারের খাস কামরায়।ওখানেও ঘটতো নানান ঘটনা।

একদিনের কাহিনী বলি।
সকাল সাড়ে দশটার দিকে আমাদের সবাইকে নিয়ে বিটিভি’র একটি গাড়ি (মিনি বাস) এসে থামলো কমিশনার সাহেবের অফিসের গেটে, বেইলী রোডের কোনায়। পুরো শুটিং টিম তখন আমাদের এই গাড়িতে। হারূন ভাই আমাকে জোর করেই গাড়ি থেকে নামালেন সবার আগে। কমিশনারের র‍্যাংক আর পোশাক পরে আমি গেটের দিকে যাবার সাথে সাথেই গেটের সেন্ট্রি গগনবিদারী চীৎকার ছেড়ে আকাশের দিকে রাইফেল তুলে- মাটিতে সজোরে পা-ঠুকে সালাম জানালো। আমিও যথারীতি পুলিশী কায়দায় সালাম গ্রহন করে ঢুকে গেলাম অফিসের ভেতরে।

মনসুর ভাই (এআইজি মনসুরুল আজিজ) আগেই অবশ্য আমাকে এসব বিষয়গুলো সম্পর্কে শিখিয়ে পড়িয়ে ‘কমিশনার’ বানিয়ে রেখেছিলেন। তিনি বলতেন- স্যালুটতো ওরা অভিনেতাকে দেয়না, স্যালুট দেয় ‘ইউনিফরম আর র‍্যাংক’কে! সুতরাং যতক্ষণ তুমি ওই পোশাক এবং র‍্যাংক পরে আছো- ততক্ষণ তোমাকে ওই স্যালুটের মর্যাদা নিতে এবং দিতেই হবে। আমি ওই র‍্যাংকওয়ালা পোষাক পরিধানের সাথে সাথে মনসুর ভাইও কিন্তু উঠে দাঁড়িয়ে আমাকে সালাম জানাতেন। তখন নিজেকে খুব ক্ষমতাবান মনে হত! বুকের ভেতরে এক ধরণের পুলকিত বাতাস অনুভব করতাম- যার কোন যৌক্তিক পাটাতন ছিল না!

প্রতিটি প্রফেশনের আসলে একেক ধরণের বিশেষত্ব এবং শৃংখলা থাকে। দীর্ঘ চার মাস এই নাটকে অভিনয় করে আমি পুলিশের কিছু কিছু ডিসিপ্লিন খুব কাছ থেকেই পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পেয়েছিলাম।

একদিন ওই নাটকের জন্য বিটিভি স্টুডিওর রেকর্ডিং সেরে বাসায় ফিরছিলাম রাত প্রায় সাড়ে ১২টার দিকে। আমি তখোন এলিফ্যান্ট রোডে থাকি। একটি রিকশা নিয়ে একাই ফিরছিলাম। আমার রিকশাটি কাটাবন মসজিদের কাছে আসতেই দুদিক থেকে দু’তিন জন পুলিশ এসে থামালো আমায়। একটু কড়া সুরে জিজ্ঞেস করলো আমার পরিচয়, কোথা থেকে আসছি, কোথায় যাচ্ছি এত রাতে? সাথে এত বড় স্যুটকেসই বা কেন? ওটার ভেতরে আছেটা কি; ইত্যাদি এক গাদা প্রশ্ন। আমি যথারীতি সবগুলো প্রশ্নের জবাব দিয়ে যাই একে একে। তাতেও তারা সন্তুষ্ট না হয়ে আমাকে স্যুটকেস খুলতে বলেন। আমি স্যুটকেস খুলে দেখাই তাদের। কপাল মন্দ, সেদিন স্টুডিওতে ছিল পারিবারিক সিকোয়েন্সগুলোর অভিনয়। নইলে পুলিশের পোষাক দেখিয়ে ‘বাট’ নিতে পারতাম হয়তো! কিন্তু যা আছে সেটা দেখিয়েই তাদের ক্ষ্যান্ত করি।

এরপরে বিদায়ের পালা।
পুলিশ বললো- ঠিক আছে যান আপনি। এটা বলেই তারা চলে যাচ্ছিলেন ফিরে। আমিই একটু বাহাদুরি দেখাবার জন্য ওদের ডেকে বলি- দেখেন ভাই, আমি কিন্তু টিভির একটি নাটকে পুলিশ কমিশনারের ভূমিকায় অভিনয় করছি। ওটার রেকর্ডিং শেষ করেই আমি ফিরছিলাম। ওই নাটকটি লিখেছেন আপনাদের একজন এআইজি। আপনারা যে এতক্ষণ এখানে আটকে আমাকে হেনস্তা করলেন, তার জন্য আমি কিন্তু এআইজি সাহেবকে বলে আপনাদের পানিশমেন্টের ব্যবস্থা করতে পারি, কালকেই!

ওরা তিনজনই আবার আমাকে ঘিরে ধরলো দু’দিক থেকে। বললো- অই মিয়া, রাইতের বেলায় হগল বেডায় আইজি সাহেব আর স্বরাষ্ট মন্ত্রীর বন্ধু কিংবা আত্মীয় স্বজন হইয়া যায়। ওইগুলা আমাগো দেহা আছে। অহন কি সোজা নিজের বাসায় যাইবেন, নাকি আমগো লগে রমনা থানায় যাইবেন? মিছা কথা কইয়া, পুলিশের নাম ভাঙ্গাইয়া হামকি ধামকি দেওনের লাইগা আমরা আপনেরে কাল সকালেই কোর্টে চালান দিতে পারি। অহন কোনডা করবেন? বাসায় যাইবেন, নাকি চৌদ্দ শিকের ভিতরে? রাতডা কিন্তু ভালই কাটবো কইলাম মশার কামড় খাইয়া! কথা না বাড়িয়ে আমি রিকশাওয়ালাকে আগে বাড়তে বলি।

মনে মনে ভাবি-
নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার অভিনয় করলেই কি আর ‘বাংলা বিহার উড়িষ্যার’ মালিক হওয়া যায়! থাক।

বিটিভি থেকে একটু আগে পাওয়া চেক’টা পকেটে আছে কীনা পরীক্ষা করে নিলাম হাত দিয়ে। ওটা ক্যাশ করে আগামীকাল কাঁচা বাজার থেকে কি কি কেনা যায় সেটা ভাবতে ভাবতেই বাসার গেটে পৌঁছে যাই। আহারে বাস্তবতা, আহারে জীবন, অভিনেতার জীবন!

ছবিগুলো বিটিভি’র সেই সময়ের স্থির চিত্রগ্রাহকের তোলা।
উনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

কাওসার চৌধুরী ঃ অভিনেতা ও প্রামান্য চিত্র নির্মাতা

ছড়িয়ে দিন

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

Calendar

November 2021
S M T W T F S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930