যদি অভিজিৎকে সতর্ক করে দিতে পারতাম

প্রকাশিত: ১২:৪৪ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২১

যদি অভিজিৎকে সতর্ক করে দিতে পারতাম

হাসানআল আব্দুল্লাহ 

অভিজিৎ রায়ের একটি ইমেল খুঁজে পেলাম, সেখানে তিনি ঢাকায় যাওয়ার পথে নিউইয়র্কে তিনদিন অবস্থান করার কথা বলেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, “বাংলাদেশে যাওয়ার পথে ৩ দিন নিউইয়র্কে থাকবো। কাল সকালে নিউইয়র্ক পৌঁছাচ্ছি। আসলে ব্যাপারটা হঠাৎ করেই হল। আমাদের ফ্লাইট ক্যান্সেল হয়ে যাওয়াতেই এই প্ল্যান। লাগোর্ডিয়ার সামনে কোন এক হোটেলে থাকবো। হয়তো আপনার সাথে দেখা হতে পারে।” ইমেলের শুরুতে ইংরেজিতে লেখা ছিলো, সাথে বন্যা ও তৃষা থাকবে। ২০০৯ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে অভিজিৎ দম্পতির সাথে নিউইয়র্কের জ্যামাইকায় একটি জমপেশ আড্ডা হয়েছিলো। পরে, ঢাকায় গিয়েও তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে আমাকে ইমেল করেছিলেন। সম্ভবত এর একবছর আগে বা পরে অভিজিৎ নিউইয়র্কে আমাদের বাসায় একদিনের অতিথিও হয়েছিলেন। আটলান্টায় ফিরে বিজ্ঞানের উপর ভিত্তি করে লেখা আমার মহাকাব্য, নক্ষত্র ও মানুষের প্রচ্ছদ-এর ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন বলেও মনে পড়ে। লেখাটি তিনি হয়তো মুক্তমনায় ছেপে থাকবেন। তবে, তাঁর “আলো হাতে চলিয়াছে” গ্রন্থখানা প্রকাশের অনেক আগে থেকেই আমাদের মাঝে সখ্য হয়েছিলো। সম্ভবত “মুক্তমনা” প্রতিষ্ঠার পর থেকেই জাহেদ আহমেদের মাধ্যমে তাঁর সাথে আমার পরিচয় হয়। জাহেদ ছিলেন মুক্তমনা’র সহ-প্রতিষ্ঠাতা। প্রচুর লিখেছি এক সময়ে মুক্তমনা’য়। বিবর্তন সংখ্যায় তিনি একই শিরোনামে আমার একটি ছোট্ট কবিতা বাংলা ও ইংরেজিতে প্রকাশ করেছিলেন। পরে তাঁর অনুরোধে ছন্দ নিয়েও প্রবন্ধ লিখেছি। তিনি ছিলেন আপাদমস্তক মুক্তমনা একজন সৃষ্টিশীল মানুষ। তবে, ২০১৫ সালের যে দিনটিতে তাঁকে হত্যা করা হয় তার আগের দিনই আমি বইমেলা থেকে নিউইয়র্কে ফিরি। এবং কি আশ্চর্য মেলায় অভিজিতের সাথে আমার একবারও দেখা হলো না! কেনো এমন হয়েছিলো? কেনো মুক্তমনা’র সাথে আমার এমনকি জাহেদের যোগাযোগ ক্ষীণ হয়ে গিয়েছিলো? হয়তো হতে পারে যার যার ক্ষেত্রে আমরা প্রচণ্ড ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। আবার মুক্তমনায় জামাত-শিবিরের কিছু চেলা ছদ্মনামে ঢুকে গিয়েছিলো বলে যতোদূর মনে পড়ে আমরা অভিজিতকে সতর্ক করে দিয়েছিলাম, এবং মুক্তমনায় সবাই লিখবেন বলেই এর নাম মুক্তমনা এমনও একটি বিশেষ অভিমত ছিলো অভিজিতের, যেটা আমরা মেনে নিতে পারিনি, সেটাও একটি কারণ হতে পারে। সে যাইহোক, আমরা সবাই বিজ্ঞানের আলোকে বেড়ে ওঠা একটি সমাজ চেয়েছি, এখনও চাই!
২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মেলা উপলক্ষে ঢাকায় অবতরণ করার পরের দিন আমি আরো দু’জন বন্ধুকে নিয়ে কবি নির্মলেন্দু গুণকে দেখতে তাঁর বাড়িতে যাই। সদ্য বাইপাস সার্জারি হওয়ায় তিনি বেশ ক্লান্ত। সেদিন কবির সাথে আমাদের দীর্ঘ আড্ডার ফাঁকে একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছিলো। এক পর্যায়ে তিনি আমাকে একা সিঁড়ির পাশে ডেকে নিয়ে সতর্ক ভাবে চলাচল করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “বহুদূর থেকে তোমাকে চেনা যায়।” সেদিন আমি একজন অন্যরকম গুণদাকে পেয়েছিলাম। এবং যে আমরা মেলা শেষে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দিয়ে বাড়ি ফিরি, সে বছর মেলা ভাঙার এক ঘণ্টা আগেই নিয়মিত বেরিয়ে পড়তাম। এখন ভাবি, হায় হায়, অভিজিতের সাথে যদি মেলায় দেখা হতো, তাঁকে যদি সতর্ক করে দিতে পারতাম, যেমন আমাকে গুণদা করেছিলেন!