যা বললেন ভাষা সৈনিক ছালেহা বেগমের কন্যা

প্রকাশিত: ৫:৩৪ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২০, ২০২১

যা বললেন ভাষা সৈনিক ছালেহা বেগমের কন্যা

 

আমি ভাষা সৈনিক ছালেহা বেগমের বড় মেয়ে সৈয়দা ফেরদৌস এবং তার অন্যান্য সন্তানগণ। মৌলভী বাজার জেলাস্থ কুলাউড়া উপজেলার উছলা পাড়ায় আমাদের মায়ের পৈত্রিক সম্পত্তির জমি উপজেলা চেয়ারম্যান এ.কে.এম শফি আহমেদ সলমান কর্তৃক জোর পূর্বক দখলের প্রতিবাদে আমরা ভাষা সৈনিক ছালেহা বেগমের সন্তানদের সংবাদ সম্মেলন।

আমি এড. সৈয়দা ফেরদৌস আরা, ভাষা সৈনিক ছালেহা বেগম এর ত্যাজ্য বিত্তের একজন উত্তরাধিকারী। তিনি ১৯৫২ইং সালে ময়মনসিংহ মুসলিম গার্লস হাই স্কুলে দশম শ্রেণির ছাত্রী থাকাকালীন ভাষা শহীদদের প্রতি শোক প্রকাশ ও গুলি বর্ষণের প্রতিবাদে স্কুল ছাত্রীদের নিয়ে ক্লাস বর্জন করে কালো পতাকা হাতে মিছিলে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য ৩ বছরের জন্য শিক্ষা জীবন থেকে বহিষ্কৃত হন। ভাষা আন্দোলনে শিক্ষা জীবন শাহাদাতকারী এই মহিয়সী নারীর জীবনে আর পড়ালেখা হয়নি। ছালেহা বেগম এর বড় বোন রওশন আরা বাচ্চু একজন নেতৃস্থানীয় ভাষা সৈনিক এবং কনিষ্ট পুত্র সৈয়দ ওয়াকিল আহাদ ২০১৬ ইং সনের শ্রেষ্ঠ সংগীত শিল্পী হিসাবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার বিজয়ী স্বর্ণ পদক প্রাপ্ত একজন শিল্পী।
আমরা মায়ের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তির ভাগ বন্ঠন করে দেওয়ার জন্য ছোট ভাই সৈয়দ ওয়াকিল আহাদ (জাতীয় পুরষ্কার প্রাপ্ত) ও জালাল মোঃ আজরফ সহ শফি আহমেদ সলমান সাহেব এর কাছে যাই। তিনি জমির কাগজপত্রের ফটোকপি দেখার জন্য নিয়ে গিয়ে নিজের নামে জমির দলিল তৈরির স্ট্যাম্প নিয়ে আসেন এবং টেবিলে অবৈধ অস্ত্র ও পিস্তল রেখে আমাদেরকে সই করতে বলেন, আমরা তাকিয়ে দেখি চারিদিকে ২৫/৩০ জন গুন্ডাপান্ডা লোক দাড়ানো, আমাদের মোবাইলগুলো চট করে তিনি নিজের হাতে নিয়ে নেন। আমি বিষয়টিতে তীব্র প্রতিবাদ করে চিৎকার করলে তিনি টেবিল থেকে পিস্তলটি নিয়ে আমার মাথার উঁচিয়ে ধরেন। আমরা তখন প্রাণ ভয়ে কোন কথা না বলে সই করতে বাধ্য হই। অতপর তিনি তার গুন্ডা বাহিনী দ্বারা পরিবেষ্ঠিত অবস্থায় হাতে পিস্তল নিয়ে রাতে রেজিষ্ট্রি অফিসে নিয়ে যান এবং আরো কয়েক জায়গায় সই করতে বলেন। আমি সই করতে অস্বীকার করায় তার নিয়োজিত গুন্ডারা আমার ছোট ভাইকে দুই হাত দিয়ে চেপে ধরে কিল ঘুষি মারতে থাকে। সেই সময় উক্ত সলমানের সঙ্গে তার ভাই গিলমান, নোমান ও প্রধান সহকারী রাসেল উপস্থিত ছিল। তারা আমাদেরকে মুখ বন্ধ রেখে চুপচাপ সহি করতে বলেন। নইলে অবস্থা খারাপ হবে। এমতাবস্থায় আমরা আর কোন কথা না বলে চুপ চাপ সই করে দেই। তারপর আমাদেরকে বলেন, ঢাকা চলে যান। ৭-১০ দিনের মধ্যে আপনাদের বাকী অংশ আমি বুঝিয়ে দিব, বলে তার গুন্ডা বাহিনী দিয়ে আমাদেরকে ঢাকা গামী তার লোকের একটি গাড়ীতে তুলে দেন। পরবর্তীতে বিষয়টি থানায় সাধারণ ডায়েরী করতে গেলে থানা কর্তৃপক্ষ তা নিতে অস্বীকার করে বিষয়টি সঙ্গে সঙ্গে উক্ত “সলমান” কে জানিয়ে দেয়।
অতপর দ্রুত বিষয়টি তৎকালীন সংসদ সদস্য সায়রা মহসীনকে অবগত করলে তিনি উক্ত “সলমান” কে সতর্ক করে নির্দেশ দিয়েছিলেন যেন কোন অবৈধ পন্থা অবলম্বন না করে দ্রুত বন্টননামা দলিল করে সকলের জমি বুঝিয়ে দিতে। যেহেতু এটা ভাষা সৈনিকদের এজমালি সম্পত্তি এবং তাদের ওয়ারিশ বিদ্যমান আছে। কিন্তু উক্ত সলমান কোন কিছুরই তোয়াক্কা করেননি। সন্ত্রাসী জহির আহমেদ (ডলার) এর সঙ্গে আঁতাত করে আমাদের না জানিয়ে অবৈধ ভাবে আমাদের জমিতে একটি টিনের ঘর তৈরী করে হোটেল বসিয়ে দেয়। আমরা আপত্তি দিলে তিনি সন্ত্রাসী জহির আহমেদ (ডলার)কে আমাদের অংশ বুঝিয়ে দিতে বলেন। কিন্তু উক্ত সন্ত্রাসী জহির আহমেদ (ডলার) আমাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে নাটকীয় ভাবে হাত থেকে আমাদের স্ক্যাচ ম্যাপ ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায়। যাহা কুলাউড়া থানার জি ডি নং ৯৩৮, তারিখ ১৯/০৯/২০১৯ইং। পরে লোক মুখে জানতে পারি, উক্ত শফি আহমেদ “সলমান” উপজেলা চেয়ারম্যান হওয়ার পর অবৈধ পন্থায় স্বাক্ষরিত দলিল দেখিয়ে অপপ্রচার করে যাচ্ছেন যে তিনি জমিটি মূল্যের বিনিময়ে ক্রয় করেছেন। অথচ আমরা কোন জমি বিক্রয় করতেও যাইনি কিংবা কোন অর্থও গ্রহণ করিনি। সহযোগিতার আশায় তার কাছে গেলে গুন্ডাপান্ডা পরিবেষ্টিত একটি বাধ্যকর পরিস্থিতিতে পিস্তলের মুখে আত্মরক্ষার জন্য সই করতে বাধ্য হয়েছি। এছাড়া সে সময়ে প্রাণে বাঁচার আমাদের আর কোন উপায় ছিল না কিংবা অক্ষত অবস্থায় ফিরে আসা ও সম্ভব ছিল না। বলা বাহুল্য যে, রওশন আরা বাচ্চুর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সব কিছু ঠিকঠাক ছিল। কিন্তু মৃত্যুর আনুমানিক ৩(তিন) মাস পর থেকে বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারীর সময়ে দীর্ঘদিন আমরা এলাকায় যেতে না পারায় সন্ত্রাসী চক্র সক্রিয় হয়ে বিভিন্নভাবে অপতৎপরতা শুরু করে। পরবর্তীতে আমরা কয়েকবার এলাকায় যাওয়ার পর পরই উক্ত “সলমান” চেয়ারম্যানের লোকজন আমাদেরকে ভয়-ভীতি, হুমকি প্রদর্শন করার কারণে আমরা এখন আর সেখানে যেতে পারি না।
গত ১৪/০৩/২১ইং তারিখে বিশ্বস্ত সূত্রে জানতে পারি যে, গত ২/৩ দিন যাবৎ উক্ত সলমান চেয়ারম্যান ক্ষমতার অপব্যবহার করে পৌর এলাকায় ভাষা সৈনিকদের এজমালী পুকুরের মাঝখানে বাঁশের বেড়া দিয়ে চিহ্নিত করে মাটি ফেলে পুকুর ভরাট করছেন। বিষয়টি সঙ্গে সঙ্গে জেলা প্রশাসক মহোদয়কে অবগত করলে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে পুকুর ভরাট এর কাজ বন্ধ করতে নির্দেশ দেন। কিন্তু জেলা প্রশাসক মহোদয় এর নির্দেশ পাওয়ার পরও উক্ত “সলমান” চেয়ারম্যান কাজ বন্ধ না করে বরং রাতের আধারে নিয়মিত ২০/৩০ জন লোক দিয়ে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে পুকুর ভরাটের কাজ সম্পন্ন করাচ্ছিলেন। বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও কুলাউড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মহোদয়ও অবগত আছেন। উক্ত “সলমান” চেয়ারম্যান ভাষা সৈনিক তিন বোন ও তাদের পরিবারের জমির মূল্য ও অন্যান্য ক্ষতি বাবদ আনুমানিক ৫,০০,০০,০০০/- (পাঁচ) কোটি টাকার ক্ষতি সাধন করেছেন, যাহা অপূরণীয় ক্ষতি।
উক্ত সলমান চেয়ারম্যান, সরকারী নিয়ম ভঙ্গ করে জলাধার ও পরিবেশ আইন অমান্য করে, পৌর এলাকায় শতবর্ষী পুকুর ভরাট করে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) ও জলাধার আইন ২০০০ এর বিধান মোতাবেক আইন পরিপন্থী কাজ করে চলেছেন, অতপর পরিবেশ অধিদপ্তর সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়, সিলেট, এনফোর্সমেন্ট মামলা নং-১২৬/২০২১/১২৬ মূলে পরিচালক মোহাম্মদ এমরান হোসেন মহোদয় কর্তৃক স্বাক্ষরিত গত ২৮/০৩/২০২১ ইং তারিখের এক আদেশ পত্র অনুযায়ী পরিবেশ ক্ষতি সাধনের জন্য ক্ষতিপূরণ বাবদ ১,০০,০০০/- (এক লক্ষ) টাকা জরিমানা প্রদানের আদেশ হয়। উক্ত আদেশ এর পরও উক্ত “সলমান” চেয়ারম্যান রাতের আধারে পুকুর ভরাট এর কাজ করে গেছেন।
উল্লেখ্য যে, এলাকায় ব্যাপক লোক মুখে শোনা যায় যে, উক্ত সলমান চেয়ারম্যান ও তার বাহিনী সাধারণ নিরীহ মানুষ জনদের উপর অকথ্য জুলুম নির্যাতন, জমি দখল, অপহরণ, ধর্ষণ, মাদক ব্যবসা ইত্যাদি অসংখ্য অপরাধ এর সঙ্গে তার সম্পৃক্ত। কুলাউড়া ও আশেপাশের এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন। সিলেট, ঢাকা, লন্ডন ও কুলাউড়ার বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে তুলেছেন অবৈধ সম্পদের পাহাড়। বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের অবৈধভাবে জমি দখল, শ^শান, কবরস্থান এবং সরকারী নালার জায়গাও বাদ যায়নি। তিনি ও তার বাহিনীর বিরুদ্ধে কুলাউড়া মৌলভী বাজারের কেউ ভয়ে মুখ খুলতে চান না। কুলাউড়া থানা ও মৌলভীবাজার আদালতে অসংখ্য হামলার অভিযোগ ও মামলা মোকদ্দমা চলমান আছে। এসব অভিযোগের সঠিক তদন্ত হলে উল্লেখিত অপরাধসমূহের সত্যতা পাওয়া যাবে। তার অবৈধ ক্ষমতার দাপটে নিরীহ মানুষগণ আতঙ্কগ্রস্থ ও তটস্থ থাকেন। স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন উক্ত উপজেলা চেয়ারম্যান এর বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেয়ও না, বরং লোক দেখানো নাটক করে।
সুতরাং উপরোক্ত বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করে ভাষা সৈনিক রওশন আরা বাচ্চু, হোসনে আরা ও কিশোরী ভাষা সৈনিক “ছালেহা বেগম” দের সম্পত্তি গ্রাস হওয়া থেকে রক্ষা করতে উপজেলা চেয়ারম্যান শফি আহমেদ, সলমান-এর বিরুদ্ধে জোরপূর্বক জমি দখলের প্রতিবাদে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উক্ত বিষয়টি আপনাদের সংবাদ মাধ্যমে যথাযথভাবে প্রচারের জন্য বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি। আপনাদের এইরূপ সহযোগিতার জন্য “ভাষা সৈনিক” পরিবারের সন্তানগণ আজীবন আপনার কাছে কৃতজ্ঞ থাকবে।

ছড়িয়ে দিন

Calendar

November 2021
S M T W T F S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930