যেখানে মৃত্যু ভয়ও তুচ্ছ —

প্রকাশিত: ৭:৩১ অপরাহ্ণ, জুন ৪, ২০১৮

যেখানে মৃত্যু ভয়ও তুচ্ছ —

প্রশান্ত রায়

ভারতের প্রথম সশস্ত্র গনসংগ্রামের নাম সাঁওতাল বিদ্রোহ। ১৮৫৫ সালের ৩০- শে জুন যুদ্ধ শুরু হয় এবং ১৮৫৬ সালের নভেম্বর মাসে তা শেষ হয়। নেতৃত্ব দেন মহান বীরসংগ্রামী সিদু মাঝি ( মাঝি অর্থ প্রধান বা মোড়ল বা নেতা) কানু মাঝি দুই ভাই।চাঁদ মুর্মু, ভৈরব মুর্মু, ডোমন মাঝি প্রমুখ।কেন এই বিদ্রোহ ? —- বিহারের ভাগলপুর জেলার অন্তর্গত দামিন-ই-কোহ্ (পাহাড় পর্বতের প্রান্তদেশ) অঞ্চল থেকে বীরভূম পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে সাঁওতাল ভূমিপুত্রদের বসবাস ছিল।ঐ অনুর্বর জঙ্গলেঢাকা পতিত জমি সাঁওতালরা অমানবিক-কঠিন পরিশ্রম করে বাসযোগ্য ও ঊর্বর করে তুললে “দিকু” অর্থাৎ বহিরাগত উচ্চবর্নীয় জমিদার, জোতদার, মহাজন, সুদখোর, অসৎ ব্যবসায়ীরা নানা অসাধু উপায় অবলম্বন করে আদিবাসীদের সেইসব জমি গ্রাস করতে থাকে।ইতি পূর্বে বেশকয়েকবার এই একই ভাবে তারা আদিবাসীদের জমি কেড়ে নেয়।এরপর জমিদার জোতদারেরা ঐ অঞ্চলে ভূমিরাজস্ব সীমাহীন বৃদ্ধি ঘটালে তাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।উইলিয়াম হান্টার তাঁর ” Annals of Rural Bengal” গ্রন্থে লিখেছেন –” জমিদার মহাজনরা মিথ্যা ঋনের জালে হৃত-দরিদ্র আদিবাসীদের এমনভাবে জড়িয়ে ফেলতো যে, ঋন পরিশোধ করতে তাদের ফসল ও জমি হারাতে হত।এমনকি তাতেও তাদের ঋন পরিশোধ হতো না। অবশেষে পুরুষ কৃষকেরা দাস হয়ে এবং নারীরা শ্রমদাসী ও যৌনদাসী হয়ে জমিদার-ভূস্বামী-মহাজনদের বাড়িতে নৃশংস পীড়নে দিন কাটাতে হতো।” কর্নওয়ালিসের প্রশাসনিক রিপোর্টে জানা যায়, ” ১৮৫৫–৫৬ সালের মধ্যে দেশীয় রাজন্যবর্গ, মহাজন-জোতদারবর্গ ও উৎপীড়ক বর্গের দ্বারা প্রায় ১২ হাজার সাঁওতাল যুবতী ও মহিলা ধর্ষিতা হয় এবং ৩ হাজার যুবতী ও মহিলা ধর্ষন ও খুন হয়।এদের বলপূর্বক বাগানবাড়ি, কাছারিবাড়ি, বৈঠকবাড়ি তুলে নিয়ে যাওয়া হতো।” ( ১৮৬১ সালের মার্চ মাসে প্রকাশিত রিপোর্ট)।
এভাবে সম্মান ও শারীরিক আঘাতের পর আদিবাসী ভূমিপুত্রদের উপর নেমে আসে “সাংস্কৃতিক আঘাত “।উচ্চবর্নের এইসব মানুষেরা আদিবাসীদের নিজস্ব সংস্কৃতির উপর হস্তক্ষেপ করতে থাকে এবং ধীরে ধীরে তাদের সংস্কৃতিকে গ্রাস করতে থাকে।ফলে সাঁওতালরা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে এবং নিরুপায় হয়ে অস্ত্র হাতে তুলে নেয়।শুরু হয় বিদ্রোহ। প্রায় ৩ লক্ষাধিক সাঁওতালদের সঙ্গে এই বিদ্রোহে বিভিন্ন এলাকার কামার, কুমোর, তাঁতি, ছুতার প্রভৃতি নিন্মবর্নের মানুষ যোগদান করেন। ১৮৫৫ সালের ৩০-শে জুন প্রায় ৩০ হাজার সাঁওতাল কৃষকের বীরভূমের ভাগনা ডিহি থেকে সাঁওতালভূমির উপর দিয়ে কলকাতাভিমুখে পদযাত্রা করেন — ” ভারতের ইতিহাসে এটাই প্রথম গন পদযাত্রা”। এই আত্মমর্যাদা ও অধিকার আদায়ের আন্দোলনে আদিবাসী সাঁওতাল নারীদের অংশ গ্রহন ছিল স্বতঃস্ফূর্তভাবে। বিখ্যাত ঐতিহাসিক অনীল শীল এর ” নিম্নবর্গের ইতিহাস ” গ্রন্থে জানা যায় —” তাহাদিগের স্ত্রীলোকেরা অস্ত্র ধরিয়া নিবিড় অরন্য হইতে বাহির হইয়াছে। অনেকে পুরুষবেশ ধারন করিয়া যুদ্ধ করিয়াছে।সিদু-কানুর বোন ফুলমনির লাশ উদ্ধার করা হয় রেল লাইনের ধার হইতে।শোনা যায় ধর্ষন ও শারীরিক নির্যাতনের পর তাহাকে হত্যা করিয়া সেখানে ফেলিয়া রাখিয়া যায়।”
প্রথমে ইংরেজরা এই বিদ্রোহ দমনে অংশ নেয়নি।কিন্তু দেশীয় জমিদার ও মহাজনরা সাঁওতালদের বিরুদ্ধে ভুল বুঝিয়ে ইংরেজদের যোগদান করায়।” ক্যালকাটা রিভিউ ” পত্রিকা থেকে জানা যায়— ” প্রথমবার যুদ্ধে ইংরেজ সেনাপতি মেজর বরোজ সাঁওতালদের সঙ্গে পরাজিত হয়।এরপর সরকারের ৫৫ নং ব্রিগেডের সেনারা বিভিন্ন সাঁওতাল অধ্যুষিত অঞ্চলে স্থানীয় জমিদারদের সহায়তায় নৃশংস হত্যালীলা চালায়। প্রায় ৩৩ হাজার সাঁওতাল নারী-পুরুষ এই বিদ্রোহে নিহত হয়।সিদু-কানুকে ফাঁসি দেওয়া হয়।” ইংরেজ অভিযানের অন্যতম সেনাপতি জার্ভিস লিখেছেন —” দেশীয় রাজন্যবর্গ সরলপ্রান সাঁওতালদের বিরুদ্ধে আমাদের ভুল বুঝিয়েছিল। আমরা যুদ্ধ করিনি, করেছিলাম গনহত্যা।”
তাই সেদিন উচ্চবর্নীয় জমিদার, জোতদারেরা ইংরেজদের সংঙ্গে নিয়ে হাজার হাজার ভূমিপুত্রদের খুন-ধর্ষন করে।এই লড়াই ছিল নিম্নবর্ণের মানুষদের সাথে বিদেশী বর্ণহিন্দু ও বিদেশী ইংরেজদের লড়াই।আজও আদিবাসীদের উপর সমানে চলছে ব্রাহ্মন্যবাদী শাসন-শোষন-অত্যাচার ও সীমাহীন বঞ্চনা।২০১৫ সালের কেন্দ্রীয় অনগ্রসর শ্রেনী কল্যান মন্ত্রকের একটি রিপোর্টে জানা যায় –” ভারতে আদিবাসী এলাকায় ৪ বর্গ কিমির মধ্যে একটি প্রাইমারি বিদ্যালয় নেই, ১১ বর্গ কিমিতে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় নেই, ১৭ বর্গ কিমিতে একটি প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই।দেশের ৮৬% আদিবাসী দারিদ্র সীমার নিচে বসবাস করে। ৯১% আদিবাসী শিশু অপুষ্টিতে ভোগে, ৮৯% আদিবাসী রমনী অপুষ্টি নিয়ে সন্তান জন্ম দেয়।” এবার ভাবুন বঞ্চনা কাকে বলে? তাই আজ আদিবাসী সমাজে সিদু-কানুর মতো আত্মমর্যাদা সম্পন্ন, অধিকার সচেতন বীর নেতার আবির্ভাবের বিশেষ প্রয়োজন হয়ে পড়েছে — যিনি সমগ্র তফসিলী সমাজকে নেতৃত্ব দিয়ে ব্রাহ্মন্যবাদী সমস্ত অত্যাচার ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবেন।

জমিদার ও ইংরেজদের বিরুদ্ধে সিধু-কানুর লড়াই ছিল “অসম লড়াই” — কামান-বন্দুকের বিরুদ্ধে তীর-ধনুকের লড়াই।তথাপি তারা যুদ্ধ করলেন কেন ? কারন তারা বুঝেছিলেন আত্মমর্যাদা নিয়ে, মা-বোনদের ইজ্জত-সম্মান নিয়ে বাঁচাই জীবন, নতুবা মৃত্যু অনেক শ্রেয়। তাই সাঁওতাল বিদ্রোহ ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে শুধুমাত্র প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামই নয় — এই সংগ্রাম ছিল আদিবাসী ভূমিপুত্রদের অধিকার ও আত্মসম্মান রক্ষার গনসংগ্রাম।।

Calendar

January 2022
S M T W T F S
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031