যেতে যেতে

প্রকাশিত: ১:০২ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১২, ২০১৮

যেতে যেতে

শিরিন ওসমান
শার্মিনের আজ একটি গানের সন্ধার নিমন্ত্রণ । বেগম সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে। মিতালি মুখার্জি গাইবে। ওর গান সামনাসামনি আগেও শুনেছে।এত ভাল গায়। উপস্থাপনা এত প্রাঞ্জল ভাবে করে। দেখতেও মিষ্টি। বাংলাদেশের মেয়ে। ভারতে বসবাস করে। গজল গায়ক ভূপেন্দ্র সিং কে বিয়ে করেছে।

শার্মিনের মন আজ খুশী। সে সাজতে ভালবাসে। নিজের মত করে সাজে। অনেকগুলো মালা থেকে কোনটি পড়বে বেছে নিচ্ছিলো। সোনালি আর কালো রং মেশানো শাডীটি দিল্লি থেকে কেনা। আজ খুললো। আয়নায় নিজেকে ঘুরে ঘুরে দেখছে। ফিক করে হেসে দিল। মায়ের কথা মনে পড়ে গেলো। এভাবে ঘুরে ঘুরে শাডী পডে আয়নায় নিজেকে দেখার তো কথাই আসে না। মাকে কোনোদিন লিপস্টিক লাগাতে দেখেনি শার্মিন। মা খুব সুচিত্রা সেনের সিনেমা দেখতেন। মা’র কী ইচ্ছা হতো সুচিত্রা সেনের মত সাজতে?

আরশাদকে ফোন করে জানালো গান শুনতে যাচ্ছে। বললো ট্যাক্সিতে করে বাসায় ফিরতে। কারন শার্মিনের ফিরতে রাত হবে।শীতের কুয়াশা চারদিক ঢাকা। গাড়ীর জানালা কুয়াশা হাত দিয়ে মুছে।কুয়াশা ঢাকা হাতির ঝিল সোডিয়াম লাইটের আলোয় অদ্ভুত লাগছিল।ঢাকা নগরীর রূপ মেলে ধরছে। মোহময় লাগছে।

মাথাব্যাথাটা সারছে না। রোজ ঘুম ভাঙার সময় প্রচন্ড অস্বস্থি হয়, রীতিমত যুদ্ধ করে ঘুম ভাঙ্গে শার্মিনের।উঠে থিতু হতে খানিকটা সময় নেয়। ধীরে বিছানা থেকে ওয়াশ রূমে যায়।কাজের মেয়েটি গিজারের সুইচ আগেই অন করে রাখে। বেশ শীত। শীতে শার্মিন বাইরে বেরোতে চায় না জরুরী না হলে।

ছেলে মেয়ে দুজনেই আমেরিকা। ওদের চাকুরী বাচ্চা সংসার নিয়ে ব্যস্ত জীবন। সব কাজ নিজের করতে হয়। ঢাকায় শার্মিন ও আরশাদ দুজনের সংসার। আরশাদ নানা রকম কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে।নতুন ব্যবসা খুলেছে ইয়ং এক পার্টনার নিয়ে। আইটির ব্যবসা। ইন্ডিয়ার সাথে। দুবার এর মাঝে ঘুরে আসলো। সবসময় আশ্বাসের কথা শোনায়। শার্মিন অভ্যস্ত হয়ে গেছে। পয়ত্রিশ বছরের বিবাহীত জীবনে অনেক কিছু সে আপনা থেকে বুঝে যায়।

আরশাদ ডায়বেটিক রোগী। প্রায় ডায়বেটিক বেড়ে যায়। হাঁটার অভ্যাস আছে। সবসময় কিছু একটা নিয়ে ব্যস্ত থাকা অভ্যাস।অনেকটা শিশুসুলভ মনে হয়। শিশুরা কখনো স্থির থাকে না। কোনো কিছু নিয়ে ব্যস্ত থাকে। নাহয় ঘ্যানঘ্যান করে কাঁদতে থাকে। যেভাবে কাবু করা যায় সেরকম বুদ্ধি খোঁজে। আরশাদ অনেকটা সেরকম।

জীবনে কত ব্যবসা করতে দেখলাম। সব কাজে প্রথম দিকে বেশ জোরে সোরে লাগে। তারপর নানারকম জটিলতা এসে পড়ে। দেখা যায় পুরোটাই জলে যায়। আবার আরশাদ জল থেকে ভেষে ওঠে। কয়দিন চুপচাপ থাকে। ক্লাবে যায় আড্ডা গল্প করে মাথা থেকে পুরোনো জাবর ঝেরে ফেলে দেয়।

আবার উদ্ভাসিত মুখশ্রী। বুঝতে কষ্ট হয় না শার্মিনের নতুন প্রজেক্ট নিয়ে রিসার্চ চলছে। আরশাদের পত্রিকা পড়ার অভ্যাস খুব। রাত জেগে অনেক গুলো পত্রিকা পড়ে। টিভিতে টক শো দেখে। আরশাদ এবং শার্মিন যার যার রূমে থাকে। এটা প্রায় চার বছর ধরে। শার্মিনের টিভি দেখা, পত্রিকার খসখস শব্দ বিরক্তিকর লাগে।

শার্মিন ল্যাপটপে সব কাজ সারে। নিরবতা তার ভাল লাগে। গান শোনে।সিনেমা দেখে। আজ দুজনার দুটি পথ ওগো দুটি দিকে গেছে বেকে। বেশ তো। মন্দ কী?

দুজনের গল্প মন্দ হয় না।যদিও গল্প না বলে কলহ বলাই ভালো।শার্মিন যে কোনো কারনে হোক আরশাদকে খুব ভালবাসে। এত অমিলের মাঝেও দুজনের সম্পর্কের মাঝে কোনো টানাপোড়েন নেই। অদৃশ্য এক যাদুর বলে তাদের দুজনের সম্পর্ক নিশ্চিন্তে এগিয়ে যাচ্ছে।

ছেলে মাহি তার বিদেশী বৌ নিয়ে দেশে আসছে। ওরা দুজনে আর্কিটেক্ট। বিয়ে হয়েছে একবছর।বিয়েতে শার্মিন আরশাদ দুজনে আমেরিকা যায়। ওরা লস এঞ্জেলেস থাকে। একসাথে পডাশোনা করেছে। তিনবছর এ্যান নিউ ইয়র্ক তার মা বাবার সাথে ছিলো। সেখানে একটি আর্কিটেক্ট ফার্মে চাকরী করতো। মাহি দেড় বছর চাকুরী করে আবার এম এস করে নতুন একটি ফার্মে জয়েন করে।

নিউ ইয়র্ক যায় নিজের কাজে। এ্যান এসে দেখা করে। ওরা দুজন দুজনকে মিস করছিল।কাজের এত চাপ যে দুজনে বিষয়টি বুঝতে পারেনি। দেখা হওয়ার পর তারা নতুন করে নিজেদের আবিষ্কার করলো। এ্যান মাহিকে তার বাবা মায়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো। মাহি আসলেও খুব চার্মিং এবং একি সাথে সিনসিয়ার। এ্যানের বাবা ও মা আরশাদ ও শার্মিনের কাছে দীর্ঘ একটি পত্র লেখেন। মাহিকে তাদের অনেক ভাল লেগেছে। তারা এ্যান ও মাহিকে বিবাহিত দেখতে পেলে খুব খুশী হবেন।শার্মিনের সাথে মাহির নিয়মিত কথা হয়। বিষয়টি মাহি তার বাবাকেও বলে। বাবা মনে হলো খুশী। কারন এ্যান কে তিনি আগে দেখেছেন। বড় মায়াময় মেয়েটি। আরশাদ আর শার্মিন দুজনে ছেলের বিয়েতে L A যায়। এ্যানের বাবা মাও আসেন। বেশ আনন্দ ও সৌহার্দের পরিবেশে মাহিন আরশাদ ও এ্যানিতা বার্নেটের বিয়ে হয়ে যায়।

মাহি আর তার বোন আয়শা এক শহরে থাকে। ওদের একটি মেয়ে আছে। নাম ইশিতা। মাহির খুব আদরের ইশিতা। বয়স ছয়। কিন্তু এত কথা জানে! আয়শা ও তার স্বামী মিনহাজ একটি ইউনিভার্সিটিতে হিস্ট্রির শিক্ষক। দুজনেই এসোসিয়েট প্রফেসার হলো এবছর। ওরা দেশে এসেছে দু’বছর আগে।ওদের উৎসাহ এবং ভাইয়ের বিয়েতে খাটুনি দেখে শার্মিন কেঁদে ফেলে। ওর মনে পড়ে ভাইদের বিয়েতে এমনি করে খাটাখাটি শার্মিন করেছিল। আয়শা আর মাহির ভালবাসার বন্ধন যেন টিকে থাকে শার্মিন এই প্রার্থনা মনে মনে বার বার করতে থাকে।

শার্মিনের ঢাকার জীবন কাটে বই পড়ে,সংসার আর বন্ধুবান্ধব নিয়ে।আরশাদ আমেরিকা গিয়ে একমাসও থাকতে পারে না। যদিও তার এসোসিয়েট লোকজনের অভাব নাই। আসলে ওরা দুজনেই দেশে থাকতে চায়। নিজের মত করে। দুজনের জীবন ধারায় মিল বলতে গেলে নাই। দুজন দুজনের জীবনে নিজের স্পেসটুকু পেয়ে যায়। গায়ে গায়ে ঠেকে সংসার করতে অভ্যস্ত নয় দুজনে।এই একটি জায়গায় আরশাদ আর শার্মিনের বিস্তর অমিলের মাঝে এক অদৃশ্য মিল কাজ করে যায়।