যে কারণে আজ উদযাপিত হয়নি সৈয়দ আল ফারুকের জন্মদিন

প্রকাশিত: ৮:৪৬ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১২, ২০২৪

যে কারণে আজ উদযাপিত হয়নি সৈয়দ আল ফারুকের জন্মদিন

 

দেশব‌রেণ্য ক‌বি, শিশুসা‌হি‌ত্যিক ও সাংস্কৃ‌তিক ব্য‌ক্তিত্ব সৈয়দ আল ফারুকের ৬৬তম জন্মদিন আজ ১২ এপ্রিল ২০২৪ শুক্রবার। জন্মদিনে নানা রকম অনুষ্ঠানে আড্ডায় তাঁর সময় কাটে।

বিশেষ করে সুবিধাবন্চিত শিশুদের সঙ্গে তো একটা দুপুর বা সন্ধ্যা না কাটালেই নয়। তবে ৬৬ বছরে এবারই একেবারে ব্যতিক্রম। প্রায় দু সপ্তাহ যাবত জ্বর ঠান্ডা কাশিতে জর্জরিত। বিছানায় বিশ্রামে। তাই এবার থাকছে না কোনো আনুষ্ঠানিক আয়োজন।জন্মেছেন লক্ষ্মীপুর জেলার টুমচর গ্রা‌মে, বড় হয়েছেন, নিজেকে বাডিয়েছেন ঢাকায় আর বিশ্বের নানা শহরে বিশ্ববাঙালির কাছে নিজেকে বাংলা ভাষার একজন সফল লেখক এবং বাংলা সংস্কৃতির একজন অপরিহার্য দূত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে চলেছেন গত অর্ধশতাব্দীব্যপি।

আধুনিক কবিতার সচেতন পাঠকমাত্রই তার একটি কবিতার জন্যে অপেক্ষা করেন নিয়মিত। সমসাময়িক ঘটনা, সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ, স্বদেশ-মাটি, স্বপ্ন-রমণী, রক্ত মাংসের নারী – সাধারণ অতি সাধারণ সব কিছুই ধারণ করে আছে সৈয়দ আল ফারুকের কবিতার শরীর অসাধারণভাবে। কবিতায় তিনি উপস্থাপন করেন প্রতিনিয়ত চোখে দেখা কিংবা অদেখা আধুনিক অতি আধুনিক এমন নতুন নতুন বিষয় যা যে-কোনো পাঠকের কাছে এক অনাস্বাদিত অভিজ্ঞতা।

প্রথম কবিতা লেখা কৈশোরে উনিশ শ উনসত্তরে, সাহিত্য চর্চায় পুরোপুরি আত্মমগ্ন হয়েছেন সত্তর দশকের মাঝামাঝি। ১৯৮২ সালে প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘উড়োখুড়ো মন’ প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে তিনি ব্যাপকভাবে পাঠকের সমাদর আর আলোচকের প্রশংসা আয় করেন, চিহ্নিত হন সত্তর দশকের অন্যতম প্রধান কবি হিসেবে।

বাংলাদেশের শিশুসাহিত্যেও সৈয়দ আল ফারুক একটি দীপ্র নাম। কী ছড়া, কী কবিতা, কী গল্প – সব শাখাতেই উজ্জ্বল উপস্থিতি তাঁকে সত্তর দশকের শীর্ষস্থানীয় শিশুসাহিত্যিক হিসেবে চিহ্নিত করে।

অশ্রুতপূর্ব শ্রুতিসুখকর অন্তমিল প্রয়োগ, বৈচিত্রময় আঙ্গিক রচনা, নিপুন নিখুঁত ছন্দ সৃষ্টি সৈয়দ আল ফারুকের ছড়ার প্রধান বৈশিষ্ট্য। অসংখ্য স্মৃতিধার্য ছড়ার সৃষ্টি-কর্তা, এই লেখক লিখেছেন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিস্ময়কর স্মরণীয় কিশোর কবিতা। অভাবনীয় উপমা, মিষ্টি শব্দচয়ন, টুকরো চিত্রকল্প – সব মিলিয়ে প্রতিটি কবিতাই স্বতন্ত্র, শক্তিশালী। বিচিত্র বিষয়, অপূর্ব বর্ণনা এবং মোহনীয় ভাষা তাঁর শিশুকিশোর গল্পগুলোর মূল প্রাণশক্তি। তাই লেখাবাহুল্য, সৈয়দ আল ফারুকের প্রতিটি ছড়া, যে কোনো কিশোর কবিতা কিংবা সবগুলো গল্পই পাঠকের মনে তোলে স্বত:স্ফূর্ত তোলপাড় ।সৈয়দ আল ফারুকের ছড়া-কবিতা-গল্পের জগৎ এমন এক মোহনীয় জগৎ – যেখানে কেবল ছোটদেরই নয়, সব বয়েসী পাঠকের সমান প্রবেশাধিকার, সমান আনন্দ।

২০টি কাব্যগ্রন্থ, ২০টি ছোটদের বই নিয়ে মৌলিক ও সম্পাদিত গ্রন্থসংখ্যা অর্ধশত।

উল্লেখযোগ্য কবিতার বই : তুমি খাপ-খোলা তলোয়ার, গুলশান ব্রিজের পাশে প্রকাশ্য রাস্তায়, স্ত্রীর পত্র পুরুষ হইতে সাবধান, এক মিনিট ভালোবাসা পালন করুন, শ্রেষ্ঠ কবিতা, আমি সিঁড়িটা ব্যবহার করতে চাইনা অথচ সিঁড়িটা আমাকে ব্যবহার করতে ইচ্ছুক, কবিতাসমগ্র ১, নির্বাচিত ১০০ কবিতা, সৈয়দ আল ফারুকের শ্রেষ্ঠ কবিতা এবং আমাদের কোথাও কোন শাখা নেই।

উল্লেখযোগ্য ছোটদের বই : ছবির মধ্যে ছবি, বদলে যেতে যেতে, বাংলাদেশের পা দুটো, সবার ওপরে মুক্তিযোদ্ধা, সাহেবের মামা, একাই ১০০, সৈয়দ আল ফারুকের কিচ্ছু ভাল্লাগে না, একার কাছে একটা জাদুর পেনসিল আছে, আমার আমি, কিশোর সমগ্র১, ওয়াও, আমি নিজের হাতে বাজাই নিজের ঢোল, আমার মনে জাগতো শুধু বঙ্গবন্ধু হই আমাদের শিশুকিশোর সাহিত্যের অনন্য সম্পদ।

বাবা : সৈয়দ বদরুল আলম, মা : জাকিয়া আলম।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে বিএ অনার্স, এমএ।
নব্বইয়ের সাড়াজাগানো ‘সাপ্তাহিক আকর্ষণ’ সম্পাদক, লন্ডন থেকে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক ম্যাগাজিন ‘কারি লাইফ’-এর এশিয়া এডিটর ছিলেন দীর্ঘদিন।
লেখক, সাংবাদিক ও শিল্পীদের প্রতিষ্ঠান মূলধারা এবং ছোটদের লেখক, প্রকাশক ও সংগঠকদের প্রতিষ্ঠান শিশুসাহিত্য পারিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের স্থাপনা-সদস্য। উড়েছেন, ঘুরেছেন এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ।

উল্লেখযোগ্য প্রাপ্তি : ডাকসু সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮০), জেনারেশন পুরস্কার (১৯৯০), নাট্যসভা সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯০), শিশু-উন্নয়ন পুরস্কার (১৯৯৭), অগ্রণী ব্যাংক-বাংলাদেশ শিশু একাডেমি শিশুসাহিত্য পুরস্কার (১৪০৪), কবি জীবনানন্দ দাশ সাহিত্য পুরস্কার (২০০৩), আইরিন আফসানা শিশুসাহিত্য পুরস্কার (২০০৩) নুরুল কাদের ফাউন্ডেশন পুরস্কার (২০০৩), সংহতি বিশেষ সম্মাননা পদক (২০০৮), গুলশান ক্লাব সম্মাননা (২০১৪) লক্ষ্মীপুর জেলা সাহিত্য সংসদ পুরস্কার (২০১৪), কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় স্মৃতি পুরস্কার (২০১৪), আনন্দধারা পুরস্কার, ইউকে (২০১৫), বাঙালি সম্মাননা পুরস্কার, ইউকে (২০১৫), চয়ন সাহিত্য ক্লাব স্বর্ণপদক (২০১৫), ওয়াল্ড সেন্টার ফেয়ার ইউএসএ সম্মাননা (২০১৬) নিউ ইয়র্ক, মানবাধিকার শান্তি পদক (২০১৬), জীবনানন্দ দাশ স্মৃতি পুরস্কার (২০১৬) পশ্চিমবঙ্গ, সময়ের শব্দ সম্মাননা (২০১৬) কলকাতা, চ্যানেল আই সিটি আনন্দ আলো সাহিত্য পুরস্কার (২০১৮), শিশুসাহিত্যিক মোহাম্মদ নাসির আলী পদক (২০১৮), স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী খেয়া সাহিত্য পুরস্কার (২০২১), সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী স্মৃতি পুরস্কার (২০২১)।

ইংরেজি, হিন্দি, উর্দু, ফরাসী, জার্মান, গ্রিক, উজবেক, রুশ, পর্তুগিজসহ কয়েকটি ভাষায় অনূদিত হয়েছে তার লেখা।

সত্তুর দশকের প্রধান কবি ও শিশুসাহিত্যিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেও বিশ্বের বিভিন্ন শহরে বাংলা সংস্কৃতির বিকাশেও রয়েছে তার ব্যাপক ভূমিকা। বিশ্ববাঙালির সামনে তিনি কথা বলেন বাংলা সংস্কৃতি নিয়ে, বাংলাদেশকে নিয়ে। মোটিভেশনাল স্পিকার হিসেবে তাঁর খ্যাতি রয়েছে। পাঠ-অভিনয়েও পারদর্শী সৈয়দ আল ফারুক মঞ্চে ও ভার্চুয়াল মাধ্যমে সাহিত্য-সংস্কৃতির অনুষ্ঠান উপস্থাপনা, পরিচালনা ও পরিকল্পনায়ও সুনাম কুড়িয়েছেন।

দেশের উল্লেখযোগ্য লেখকদের বঙ্গবন্ধুকে নিবেদিত কবিতা ও ছড়া নিয়ে ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত তার সম্পাদিত বাতাসে লাশের গন্ধ গ্রন্থটি বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর প্রথম দিকের উল্লেখযোগ্য কাজ হিসেবে চিহ্নিত। তিনি বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে ১০ দিনব্যাপী বঙ্গবন্ধু বইমেলা ও বঙ্গবন্ধু উৎসবের আয়োজক।

বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী গ্রন্থ নিয়ে টেলিভিশনে ধারাবাহিক অনুষ্ঠান করেছেন চার মাসব্যাপী, যাতে পৃথিবীর নানা দেশের বঙ্গবন্ধু অন্তপ্রাণ ২৬ জন বিশিষ্ট লেখক-সাংবাদিক-শিল্পী-শিক্ষাবিদ-অনুবাদক-রাজনীতিবিদ-কুটনীতিবিদকে সম্মান জানিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বিশ্বব্যাপী যারা কাজ করছেন, তাদের খুঁজে বের করে তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন বঙ্গবন্ধু কী কী কাজ করেছেন সে-সব নিয়ে, পাঠ করেছেন অসমাপ্ত আত্মজীবনী গ্রন্থটি। গবেষণা করছেন বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে। আর বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা তার ‘শেখ মুজিবের তর্জনি’ গানটি বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।
সৈয়দ আল ফারুকের সর্বশেষ বই ‘আমার মনে জাগতো শুধু বঙ্গবন্ধু হই।

করোনাকালীন সময়ে প্রতিদিন শিল্পী নাহিদ নাজিয়ার সঙ্গে যৌথভাবে অংশ নেন ‘উইডিয়া’ নামে সাড়াজাগানো ডিজিটাল এন্টারটেইনমেন্ট ওয়েব সিরিজে। এ পর্যন্ত ৪৫০দিনে ৪৫০টি কবিতা-ছড়া-গানের মিউজিক ভিডিও তথা পাঠ-অভিনয় পরিবেশনা ফেইসবুক, ইউটিউব ও অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমে বেশ প্রশংসিত হয়েছে। ঘরবন্দি মানুষের মানসিক সুস্থতায় সাহায্য করেছে।

শয়নে-স্বপনে-জাগরণে সাহিত্য-ই তাঁর জীবন। ৬৪ বছরের এই জীবনে ৫৩ বছরের লেখক-জীবন আর প্রায় অর্ধশত বই নিয়ে সৈয়দ আল ফারুক এখন বিশ্ববাঙালির কাছে একটি অনন্য নাম।

একমাত্র পুত্র অরণ্য সৈয়দ ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন থেকে হিস্ট্রি ও জার্নালিজমে অনার্স, ইন্টারন্যাশনাল রিলেশন্স ও পলিটিক্সে মাস্টার্স, বর্তমানে গবেষণা ও লেখালেখিতে ব্যস্ত।
স্ত্রী বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী ও প্রামাণ্য চিত্রনির্মাতা নাহিদ নাজিয়া বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে বিএ অনার্স, এমএ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

সৈয়দ আল ফারুকের স্থায়ী বসবাস ঢাকায়। তবে মাঝে-মধ্যে লন্ডনে আর কখনও-সখনও কলকাতায়ও সময় কাটাতে পছন্দ করেন তিনি।

জন্মদিনে পাঠক ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা, যে যেখানেই আছেন,
আজকের এই বিশেষ দিনে, সবার মঙ্গল কামনা করেছেন তিনি এবং সবার কাছ থেকে মঙ্গল প্রার্থনা করছেন। বলেছেন ‘আমার বইয়েরা যেন থাকে দুধে-ভাতে’।

লাইভ রেডিও

Calendar

May 2024
S M T W T F S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031