যে মেয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে

প্রকাশিত: ১:০৩ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ২৪, ২০১৮

যে মেয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে

জেসমিন চৌধুরী

রোদে ভাসা একটা দিন আজ, মনও ইতিবাচক আবেগে থৈ থৈ। কোথাও আজ হতাশার কোন স্থান নেই, না মনে না বাইরে। বাগানে দেশি লাউয়ের ডগা চারপাশের বিদেশী ফুলের ক্যানভাসে বিশিষ্ট হবার আনন্দে দুলছে। ডাইনিং টেবিলের উপর রাখা ফুলদানিতে এক ছাত্রীর দেয়া একরাশ সাদা আর গোলাপী লিলির সুবাসে সারা ঘর মৌ মৌ।

গত কয়েকদিন ধরে চরম ব্যস্ততা, দৌড়াদৌড়ির কারণে ঘাড়ে পিঠে ভীষণ ব্যথা, কিন্তু আমার মনের উঠানে শুধুই তৃপ্তির রোদ আজ।

আঠারো বছর বয়সে এইচএস সি পাশ করার আগেই বিয়ে হয়ে যাওয়া, অর্থনৈতিক সংকট, বাচ্চাকাচ্চা বড় করা, ভাঙ্গা গড়ার হিসেব মেলানো, এইসব করে ক্যারিয়ার গড়া হয়নি। যোগ্যতা বলতে দেখানোর কিছু নেই। টুকটাক লেখালেখি করি কিন্তু সেক্ষেত্রেও এখনো তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু করা হয়নি। জিরো আওয়ার কন্ট্রাক্টে উচ্চশিক্ষায় ইচ্ছুক প্রাপ্তবয়স্কদের ইংরেজি পড়াই। বিপদগ্রস্থ, বিপথগামী, রোগী, দুঃখী মানুষদের জন্য দোভাষীর কাজ করি।

বলার মত কোনো বিষয় নয়, কিন্তু যখন মেধাবী কোন ছাত্রকে উপরের লেভেলে উঠাতে গেলে সে আপত্তি জানিয়ে বলে, ‘আমি তোমার ক্লাসেই থাকতে চাই, আমার লেভেল বাড়ানোর দরকার নেই,’ তখন ক্যারিয়ার গড়তে না পারার দুঃখ ভুলে যাই। যখন কোনো মৃত্যুপথযাত্রী আমাকে দেখে খুশি হয়ে উঠে, ‘আফনে আইছইন খুশি অইছি, আফনে আমার মাত বালা বুঝোইন,’ তখন গলায় একটা কিছু আটকে যায়। জীবনে যা কিছু করতে পারতাম কিন্তু পারিনি তার দুঃখ ভুলে যাই। আমি ধর্মকর্ম করি না জেনেও যখন হিজাবী কোন সৌদী ছাত্রী একতোড়া ফুল দিয়ে বলে, ‘তুমি আমার বেস্ট টিচার,’ তখন মনে হয় এই ভাল, এই করার জন্যই আমার জন্ম হয়েছিল।

গতকাল ছোটবেলার এক বন্ধুর সাথে বহুবছর পর ফোনে আলাপ হলো যার স্বামী হঠাৎ করেই তাকে ডিভোর্স করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন শুধুমাত্র জীবনের একঘেয়েমি দূর করার জন্য। আমি ভদ্রলোকের সিদ্ধান্তের ভালমন্দ নির্ধারণে যাব না, কিন্তু আমার বন্ধুটির সাথে যে এটা মহা অন্যায় হয়েছে তা অবশ্যই বলব। আমার মতই পড়াশুনা শেষ করার আগেই বন্ধুটির বিয়ে হয়েছিল, বিয়ের পর সংসার ছাড়া সে আর কিছুই করেনি। সে জানে না জীবন কীভাবে একা বাঁচতে হয়। কিন্তু তার কান্না শুনে আমি সহানুভূতি জানাইনি, কারণ আমি অসহায়ত্বে নয়, বরং ক্ষমতায়নে বিশ্বাস করি। বন্ধুকে সেটাই বললাম, ‘মন খারাপ না করে এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগাও, জীবনে যা কিছু করতে পারোনি, তা এখন করতে চেষ্টা করো’। আমি মন থেকে বিশ্বাস করি, মানুষের অসাধ্য কিছু নেই, শুধু মনেপ্রাণে করতে চাইতে হবে।

ছোটবেলা আমার বাবামা আমাকে এই বন্ধুটির মত হবার চেষ্টা করতে বলতেন, কারণ আমি সারাদিন পাগলের মত বনেবাদাড়ে ঘুরে বেড়াতাম আর সে খুব লক্ষী মেয়ে হয়ে থাকত। যেমন ছিল তার রূপ, তেমন তার গুণ। বড়দের কথা শুনত, চমৎকার রান্না করত, পরম মমতায় নিজের মায়ের দেখাশোনা করত। গতকাল ফোনে আমি তাকে উপদেশ দিয়েছি এবার আমার মত খারাপ হবার চেষ্টা করতে, লক্ষী হয়েতো অনেক থাকা হলো। আমার কথা শুনে এতো দুঃখের মধ্যেও সে হেসে ফেলল।

ছোটবেলা আমরা দুই বন্ধু একসাথে আমাদের বাড়ির পুকুরে ঝাঁপাঝাঁপি করতাম, কিন্তু সাঁতার শেখা হবার আগেই দেখা গেল আমরা যখন পুকুরে যাই, তখন রাস্তার অন্যপাশে ছেলেদের আড্ডা বসে যায়। পুকুরে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। আমার বন্ধুটির সাঁতার শেখা হয়েছিল কী না মনে নেই, তবে আমি আমার বাচ্চাদের সাথে ঝাঁপাঝাঁপি করে সাঁইত্রিশ বছর বয়সে নিজে নিজে সাঁতার শিখেছি। এবার আশেপাশে কোন উৎসুক পুরুষ দৃষ্টি ছিল কী না আমার জানা নেই, থাকলেও আমার কিছু আসত যেত না।

সাঁতারের আগেই ড্রাইভিং, ইদানিং সাইক্লিং শিখেছি। পরবর্তি প্রজেক্ট মোটর বাইক। চালানোর জন্য না, শুধুই শেখার জন্য শিখব। জীবনের উপর আমার কোনো রাগ নেই, প্রাণভরে প্রতিশোধ নিয়েছি, এখন শুধু বসে বসে তৃপ্তির ঢেকুর তোলা।’