যে স্বপ্ন আমাদের দেখিয়েছে সম্প্রীতি বাংলাদেশ

প্রকাশিত: ১১:১১ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ৭, ২০২১

যে স্বপ্ন আমাদের দেখিয়েছে সম্প্রীতি বাংলাদেশ

 

অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল) 

সম্প্রীতি বাংলাদেশের আজ চতুর্থ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। আজ থেকে চার বছর আগে যাত্রা শুরু সম্প্রীতি বাংলাদেশের। ধারাবাহিক অনেক প্রস্তুতি বৈঠক আর প্রায় বছরব্যাপী মতবিনিময় সমাজের প্রতিনিধিত্বশীল নানা অংশ এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে। তারপর সেই মাহেন্দ্রক্ষণ- জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু আমাদের। সেদিন এই সংগঠনটিকে আশীর্বাদ আর শুভেচ্ছায় পুষ্ট করেছিলেন অনেক বরেণ্যজন। তাদের কারও কারও আজ শরীরী অনুপুস্থিতি আমাদের মাঝে করোনার ভয়াল থাবায়। তবে তারা চিরভাস্বর আমাদের অন্তরে শ্রদ্ধায় আর স্মরণে। আবার অনেকে আছেন যাদের  স্নেহধন্য

সম্প্রীতি বাংলাদেশ। আজও তাদের দেখানো পথেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় আমাদের নিয়ত ছুটে চলা।
সম্প্রীতি বাংলাদেশের এই ছুটে চলায় সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন সত্তরের প্রিয় তরুণ অগ্রজ পীযূষ দা। সঙ্গে আমি আর আমাদের সঙ্গে আছে নবীন-প্রবীণ একদল। একদিন বঙ্গবন্ধু স্বপ্ন দেখেছিলেন বাঙালীর জন্য একটি অসাম্প্রদায়িক জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার। চ্যালেঞ্জটা ছিল বিশাল, পাহাড়সম। একে তো বাঙালীর হাজার বছরের ইতিহাসে ছিল না নিজের কোন স্বাধীন রাষ্ট্রের ঠিক-ঠিকানা, তার ওপর এ জাতিকে শাসন করেনি কোন বাঙালী শাসক। তাই যে বাঙালী ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলনে পুরোধাস্থানীয় ছিল সেই বাঙালীই আবার মেতেছিল ব্রিটিশ হটিয়ে ভারত ভেঙ্গে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে। কিন্তু পাকিস্তান যে নতুন

খোলসে পুরাতন ঔপনিবেশিক শাসনেরই ধারাবাহিকতা মাত্র এ কথাটি যিনি সবার আগে বুঝেছিলেন তিনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেই বাঙালীকে তিনি অসাম্প্রদায়িকতার দর্শনে দীক্ষিত করেছিলেন। আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে আওয়ামী লীগের যাত্রা যেদিন শুরু সেদিন থেকেই শুরু একটি অসাম্প্রয়াদিক বাঙালী জাতির ইতিহাস সৃষ্টির পথে চ‚ড়ান্ত যাত্রা। শুধু তাই নয়, বঙ্গবন্ধু এ জাতিকে এমন একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন যার উদাহরণ আমাদের ইতিহাসে কিংবা অঞ্চলে তো বটেই, এমনকি বিশ্বের মানচিত্রেও বিরল। নিরানব্বই ভাগ মানুষের ধর্ম ছাড়া আর সবকিছু অভিন্ন এমন হোমোজিনিয়াস জাতিরাষ্ট্রের দ্বিতীয় কোন উদাহরণ আমাদের জানা নেই। পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুই নির্ধারণ করেছিলেন অসাম্প্রাদায়িক এই জাতিরাষ্ট্রটির নাম, জাতীয় সঙ্গীত, এমনকি

জাতীয় পতাকাও। তিনি শুধু স্বপ্ন দেখিয়েই বিশ্রাম নেননি, জীবদ্দশাতেই বাস্তবায়ন করেছিলেন তার সেই স্বপ্নটিও। বাঙালীর প্রথম ভূমিপুত্র শাসক বঙ্গবন্ধু বাঙালীকে উপহার দিয়েছিলেন তার প্রথম স্বাধীন রাষ্ট্র, সঙ্গে দিয়েছিলেন রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি, একটি পূর্ণাঙ্গ সংবিধান। যুদ্ধবিধ্বস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠন করে তুলে এনেছিলেন সাত শতাংশ প্রবৃদ্ধির দ্রæত বর্ধনশীল রাষ্ট্রের কাতারে। বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশের অন্তর্নিহিত মূল শক্তিই হলো বাঙালীয়ানা আর অসাম্প্রদায়িকতা।
বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশের এই শক্তির কথা জানা আছে বাঙালী আর বাংলাদেশের চিরশত্রæদের খুব ভাল করেই। এ কারণেই তাদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু বরাবরই

বাঙালী আর বাংলাদেশের ‘প্রাণভোমরা’ বাঙালীয়ানা আর অসাম্প্রদায়িকতা। বঙ্গবন্ধুর সপরিবারে নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশের যে দ্রæতলয়ে পেছনে ছুটে চলা সে সময় রাষ্ট্রীয় স্বর্ণ পৃষ্ঠপোষকতায় তাই পুষ্ট হয়েছে পাকিস্তানপন্থী আর সাম্প্রদায়িক শক্তি। রাজাকার মন্ত্রী আর প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে জয় বাংলার জায়গায় বাংলাদেশ জিন্দাবাদ আর ‘ম্যারি মি আফ্রিদি’ কিংবা রাজপথে জামায়াতের আগুন সন্ত্রাস আর হেফাজতী তাণ্ডব -কি দেখিনি আমরা পঁচাত্তর পরবর্তী বাংলাদেশে?


২০০৯-এ শেখ হাসিনার হাত ধরে ঘুরে দাঁড়ানো বাংলাদেশের আবারও নতুন করে বিনা যতিতে সামনে ছুটে চলাটা আজ বিশ্বের রোল মডেল, এমনকি এই করোনার দিনেও। কিন্তু সক্রিয় এখন আঁধারের শক্তিগুলো। তারা ভোল পাল্টায় আর পাল্টায় খোলস। পাল্টায় না শুধু তাদের দুরভিসন্ধি আর বাংলাদেশ বিরোধিতা। তাদের লক্ষ্যবস্তু এখনও বঙ্গবন্ধু, বাঙালীয়ানা আর বাঙালীর অসাম্প্রদায়িকতার চেতনা। তাই তারা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য তুলে ফেলে দিতে চায় বুড়িগঙ্গায় আর বাহ্মণবাড়িয়া

কিংবা সোনারগাঁয়ে তাদের তাণ্ডবে হতভম্ব হয় গোটা জাতি। এ তো গেল তাদের অশুভ এজেন্ডা বাস্তবায়নের একটি দিক। তাদের কালো থাবা আমাদের অগোচরে বিস্তৃত হচ্ছে আরও একটি জায়গায়। শুধু ফ্লাইওভার, স্যাটেলাইট, টানেল আর মেট্রোরেলের স্বপ্নে বিভোর হয়ে আমরা তা দেখেও দেখছি না বা হয়ত সত্যিই দেখছি না। হয়ত দেখার সেই চোখ দুটোই আমরা হারিয়ে বসেছি।
আমি যখন আশির দশকের শেষে আর নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র তখন এই অশুভ সাংস্কৃতিক আগ্রাসন আর বাঙালী সংস্কৃতির নির্বাসনের প্রত্যক্ষদর্শী। সে সময়টায় ছিল জেনারেল এরশাদের শাসন। শম্ভুগঞ্জ ব্রিজ পেরিয়ে ব্রহ্মপুত্রের চরে শীতে বসত যাত্রাপালা। আমরা দলবেঁধে তা

দেখতে যেতাম। সে যাত্রায় থাকত ‘বিবেক’। সেই বিবেক নাড়া দিত আমাদের তরুণ বিবেকগুলোকে। এই আমরাই এক সময় দেখলাম ময়মনসিংহ শহরময় মাইকিং- যাত্রায় থাকছে প্রিন্সেস ঝুমুর খানের ঝুমুর ঝুমুর নৃত্য! নির্বাসনে তখন যাত্রার বিবেক আর ময়মনসিংহে থাকতে থাকতেই খালেদা জিয়ার জমানায় দেখেছি ব্রহ্মপুত্রের চরে আর যাত্রাপালা বসে না। সেই জায়গাটা কেড়ে নিয়েছে ওয়াজ মাহফিল।
আগ্রাসন দেখছি অন্যখানেও। অটোমান সা¤্রাজ্যের পতনের পর কামাল আতাতুর্কের হাত ধরে যে অসাম্প্রদায়িক আধুনিক তুরস্কের যাত্রা সত্তর বছর পর তা মুখ থুবড়ে পড়েছে শুধু তুরস্কের অসাম্প্রদায়িক শক্তিগুলোর উদাসীনতায়। তারা দেখেও দেখেনি যে, সাম্প্রদায়িক শক্তি মাঠে না থাকলেও কিভাবে একের পর এক স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি আর সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে তাদের বাড়া ভাতে ছাই দেয়ার প্রস্তুতিটা চ‚ড়ান্ত করছে। তা শুধু তুরস্কেই নয়, বরং তুর্কি

বংশোদ্ভূত মানুষ পৃথিবীর যে প্রান্তেই বাস করুক না কেন সেখানেই। এর বাইরে নয় বাংলাদেশও। ফলে আজকের তুরস্কে এমন সব প্রজন্ম দাঁড়িয়ে গেছে যারা নিজেদের অজান্তেই কখন যে সাম্প্রদায়িক ধ্যান-ধারণায় দীক্ষা নিয়ে বসেছে তা তারা নিজেরাও জানে না। কিছু মিল কি খুঁজে পাচ্ছেন? এই সেদিনই তো আমরা শ্রদ্ধায় স্মরণ করলাম হলি আর্টিজান বেকারীর শহীদদের। সেদিন যারা অভিজাত ওই বেকারীটিতে রক্তের গঙ্গা বইয়েছিল তারা কিন্তু ওয়াজ জেনারেশনের প্রোডাক্ট নয়, তাদের বেশিরভাগই ছিল হলি আর্টিজান শ্রেণীটিরই প্রতিনিধি। আবার তাকিয়ে দেখুন ক’দিন আগের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ফুটেজগুলোর দিকে। যারা সেদিন আগুনে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছাড়খাড় করেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একের পর এক সরকারী স্থাপনা, তারা কিন্তু সমাজের অন্য আরেক অংশের প্রতিনিধিত্ব করে।
২০৪১-এ যে উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্নে আমরা বিভোর সেই বাংলাদেশকে কাদামাটির বদলে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর তাগিদ থেকেই সম্প্রীতি বাংলাদেশের

পথ চলা। আমাদের স্বপ্ন বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ, আমাদের বিশ্বাস বঙ্গবন্ধু তনয়ায়। অশুভ যে শক্তি আমাদের সোনার বাংলাকে পোড়ামাটির বাংলাদেশে পরিণত করতে চায় তাদের বিরুদ্ধে আমাদের প্রচেষ্টা প্রতিনিয়ত। জন্ম মুহূর্তটির পর থেকেই সম্প্রীতি বাংলাদেশ ছুটে বেড়িয়েছে দেশজুড়ে। শুধু গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনটিকে সামনে রেখে, নির্বাচনে অসাম্প্রদায়িক শক্তির বিজয় নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আমরা দেশের জেলায়-উপজেলায় শতাধিক জনসভা, পথসভা, মতবিনিময় সভা আর সেমিনারের আয়োজন করেছি। বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লবের স্বপ্ন ছিল ধর্ম-দল-মত নির্বিশেষে স্বাধীনতার সপক্ষীয় সবাইকে একটি প্লাটফর্মে নিয়ে এসে

স্বাধীন দেশে স্বাধীনতার সপক্ষীয়, অসাম্প্রদায়িক শক্তির শাসন নিশ্চিত করা। যারা বাংলাদেশে বিশ্বাস করে না তারা চাইলে থাকতে পারে এদেশে, তবে তাদের থাকতে হবে ক্ষমতা আর নীতিনির্ধারণী জায়গাগুলো থেকে শত কিলোমিটার দূরে। আজ যদি কেউ জানতে চান সম্প্রীতি বাংলাদেশের লক্ষ্য কি, বিনয়ের সঙ্গে জবাব দেই, ‘আমরা বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত স্বপ্নটি বাস্তবায়নের স্বপ্ন দেখি’।
করোনাকালেও আমাদের ছুটে চলা থমকে গেলেও থেমে নেই। করোনাপূর্ব বাংলাদেশে একদিন আমরা ছুটে বেড়িয়েছি কখনও ‘দেশজুড়ে সম্প্রীতি’ তো কখনও ‘শতবর্ষের পথে বঙ্গবন্ধু’ এমনি সব মন্ত্রকে ধারণ করে দেশের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে। আর এই করোনার দুর্দিনেও আমরা সরব আছি, থাকছি তৎপর ‘সম্প্রীতি

সাংলাপ’ কিংবা ‘টেলিমেডিসিন’ নিয়ে ভার্চুয়াল মাধ্যমে। আমাদের আজকের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আয়োজনটুকুও হবে ভার্চুয়ালিই। করোনা থামাতে পারবে না আমাদের। এই করোনার দিনেও আমরা সংখ্যায় বাড়ছি, বাড়ছে আমাদের সাংগঠনিক সক্ষমতা। একের পর এক নবগঠিত জেলা আহবায়ক কমিটিগুলো আমাদের আরও বেশি করে স্বপ্নালু হতে সাহস যোগাচ্ছে। দুই শ’ বছরের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য মার্কিন ক্যাপিটলে উগ্রবাদী উন্মত্ততায় হয়ত মুখ থুবড়ে পড়তে পারে, কিন্তু বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে আমরা আতাতুর্কের তুরস্কের কিংবা ওয়াশিংটনের ক্যাপিটলের পুনরাবৃত্তি হতে দেব না-আজকের এই বিশেষ দিনে এটাই আমাদের স্বপ্ন আর শপথ।

-চেয়ারম্যান, লিভার বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়
-সদস্য সচিব, সম্প্রীতি বাংলাদেশ

ছড়িয়ে দিন