রহস্য দ্বীপ লংকাওয়ী

প্রকাশিত: ১২:১৬ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ১০, ২০১৮

রহস্য দ্বীপ লংকাওয়ী

আনোয়ার চৌধুরী

দিল্লীতে মাসব্যাপী একটি প্রশিক্ষণে অংশ গ্রহনের সূত্র ধরে স্বপরিবারে ভারত ভ্রমণের কথা ছিল ২০১৫ সনের মে মাসে। কিন্তু পরিবারের সদস্যদের ভারতের ভিসা পেতে অস্বাভাবিক বিলম্ব হওয়ায় দিল্লী দূরই থেকে যায়। প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ফিরে সন্তানদের আশস্থ করি তাদেরকে নিয়ে যাবো সুন্দর দেশ মালয়েশিয়ায়। মালয়েশিয়ার কোন অঞ্চলে যাওয়া যায় একথা বলার সাথে সাথেই দুই বন্ধু বললো ‘অবশ্যই প্রথমে যাবে লংকাওয়ী, পরে যেকোন শহরে। ’ ওদের পরামর্শ গ্রহন করে অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি সময়ে স্বপবিারে যাত্রা করলাম কুয়ালালামপুরের উদ্দেশ্যে । সূয্যি মামা জাগার আগেই এয়ার এশিয়ার বিমান আমাদের নামিয়ে দিলো কেএল-২ এয়ারপোর্টে। সেখান থেকে মালিন্দো এয়ার যোগে যেতে হবে লংকাওয়ী। মধ্যখানে ৬ ঘন্টা যাত্রা বিরতি কেএল এয়ারপোর্টে। দীর্ঘ ৬ ঘন্টা বিরক্তিকর ট্রানজিট কাটিয়ে দুপুর ১২টায় উঠে বসি মালিন্দো এয়ারের সুপরিসর বিমানে।
লংকাওয়ী ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে নেমেই যেন স্বস্তি পেলাম। শীতল ফুর ফুরে বাতাসে শরীর ও মনে এক ধরনের প্রশান্তির আমেজ লাগে। আগের রাতের টানা বিমান ভ্রমন ও কুয়ালালামপুর এয়ারপোর্টে দীর্ঘ ৬ ঘন্টার ট্রাঞ্জিট ইত্যাদি সবকিছু মিলিয়ে একেবারে ক্লান্তিকর অবস্থা । তবুও স্ত্রী- সন্তানদের মধ্যে উত্তেজনার যেন শেষ নেই। অল্প সময়েই ইমিগ্রেশনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়। ট্যাক্সিও পেয়ে যাই খুব সহজে। এয়ারপোর্টের ভিতরেই ট্যাক্সি সার্ভিসের কাউন্টার। কাউন্টারে বসা ভদ্র মহিলার নিকট হোটেলের ঠিকানা দিতেই ঝটপট শ্লীপ কেটে দিলেন এবং ৩০ রিঙ্গিত পরিশোধ করতে বললেন। বের হয়েই দেখি আমাদের ট্যাক্সি দাঁড়ানো। মাথায় স্কার্ফ পড়া মহিলা চালকটি মালামাল উঠাতে সাহায্য করলো। ওর নাম আয়েশা,সাকিন ইন্দোনেশিয়া। সে জানায় লংকাওয়ীতে অনেক ইন্দোনেশীয়ান তরুনী ট্যাক্সী চালক হিসেবে কাজ করছে। গন্তব্যস্থল কোয়া (কঁধয) শহরের হোটেল কেটলীয়া ইন (ঈধঃঃষবুধ ওহহ) ।
আহ্ কি সুন্দর দেশ! চারদিকে সবুজ আর সবুজ। রাস্তার দুপাশে ফুলে ফলে ভরা নানা রকম অচেনা গাছপালার সাজানো বাগান। কোথাও কোথাও প্রাকৃতিক বনভ’মি। কোথাও ফসলী জমি। সবুজ ধান ক্ষেত । মাঝে মাঝে পিংক কালারের নজরকাড়া দালানকোঠ্ া। যতই শহরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি হোটেল রেষ্টুরেন্ট,শপিং মল.রিসোর্ট ইদ্যাদি দৃষ্টিগোচর হয়। প্রায় আধা ঘন্টার মধ্যে চালক আয়েশা হোটেল কেটলীয়া ইন এর দরজায় আমাদের পৌঁছে দেয়। ছোট্ট ছিমছাম দুতলা বিল্ডিং। ভিতর থেকে গেট বন্ধ । কাউকে দেখা যাচ্ছেনা। পাশের হোটেলের রিসিপশনের ভদ্রলোকের সাহায্য নেই। তিনি বেশ কিছুক্ষণ ডাকাডাকি করলে ভিতর থেকে র্স্কাফ পরিহিতা এক তরুনী বের হয়ে আসে। আন্তরিকতার সাথে অভ্যর্থনা জানায়। নাম এ্যাইনী। ইন্দোনেশিয়ান মুসলিম। তিনিই রিসিপশন কাম ম্যানেজারের দায়িত্বে আছেন। পাসপোর্ট পরখ করে নামধাম এন্ট্রি করে রুমের চাবি হাতে তুলে দেয় এ্যাইনী। কিন্তু দুতলায় রুমে প্রবেশ করে স্ত্রী ও সন্তানদের চেহারায় বিরক্তির ছাপ লক্ষ্য করি। সত্যি বলতে কি আমারও একদম পছন্দ হয়নি। তবে চেপে যাই। হোটেল বুক করেছি ঢাকা থেকে অন লাইনে। একরাশ ক্লান্তি নিয়ে নতুন করে হোটেল খোঁজার ইচ্ছে হয়নি। এখানেই ডেরা গারলাম। সান্তনা খুঁজলাম এই বলে যে সকল পর্যটন এলাকাতেই ’বাজেট হোটেলের রুপ একই রকম।’
লাগেজপত্র ঘুছিয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে খাবারের উদ্দেশ্যে বের হই। ক্ষুধায় পেট চু চু করছিল। আসার পথে হোটেলের অদূরে একটি জমজমাট রেস্টুরেন্ট দেখে এসেছিলাম। গেলাম সেখানে। হোটেল আল আইমান রেষ্টুরেন্ট। মালে ভাষায় জবংঃড়ৎধহ ঘধংর কধহফধৎ অষ –অরসধহ, চবশধহ জধনঁ। বেশ লম্বা নাম। রেষ্টুরেন্টে ঢুকে বেশ ভালোই লাগলো । ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট।ষ্টাফদেও প্রায় সকলেই ভারতীয়। টেবিলে বসতেই ফর্সা মুখমন্ডলের ওয়েটার ছেলেটি জিজ্ঞেস করলো কি খেতে চাই। আমরা নিজেদের মধ্যে পছন্দের তালিকা নিয়ে আলাপ করছিলাম। আমাদের কথাবার্তা শুনে ছেলেটি জানতে চাইলো আমরা ঢাকা থেকে এসেছি কিনা। তার মুখে বাঙলা জবান শুনে আমরাতো তাজ্জব। আমার ছেলেদের বিস্ময় আর কাটেনা । সাহেব আলী শেখের বাড়ী কোলকাতার রানাঘাটে। এখানে আছে বছর দুয়েক ধরে। তার সাথে আরো আছে হাবড়ার মাছুম মন্ডলসহ তামিলনাড়–র আরো বেশ কয়েকজন ভারতীয়। তাদের দেখে খুব আপন মনে হলো। মাছ মাংস শাক সবজি ডাল ভর্তা সহ হরেক রকম মজাদার খাবার কাঁচের গ্লাস দিয়ে ঘেরা সেলফে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। আরো আছে খিচুিড়,সাদা ভাত,পরোটা, নান রুটি ও দোসা। দামও আয়ত্বের মধ্যে। আমরা সাদা ভাতের সাথে গরু,মুরগী ও সামুদ্রিক মাছের ঝোলসহ ব্যঞ্জন দিয়ে ভোজন পর্ব শেষ করি। যে কদিন ছিলাম বেশীরভাগ সময় এ হোটেলেই খাওয়া দাওয়া করেছি।
বিকেল বেলা হোটেল থেকে একটু দূরে সী-বীচে যাই। বীচ সংলগ্ন নারিকেল গাছে হলুদ বর্ণের ডাব দেখে খুব অবাক লাগে লাগে। আমরা সেখানে বেশ কিছু সময় বসি এবং ছবি তুলি। পাশেই একটি তারকা খচিত হোটেল। তারপর যেদিকেই যাই কেবল হোটেল, রেষ্টুরেন্ট ও শপিং মল। সেখান থেকে সামনের দিকে এগিয়ে যেতেই একটি সুন্দর পার্ক দেখতে পাই। বীচের গা ঘেঁষে পার্কটি তৈরী করা হয়েছে। নানা রকম গাছ গাছালি দিয়ে পরিকল্পিতভাবে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। বীচ ঘেঁেষ একটি সুন্দর রাস্তা একেবারে পার্কের শেষ প্রান্তে গিয়ে থেমেছে। রাস্তার দুপাশে চমৎকার গাছপালা । হাত বাড়ালেই গাছের পাতা কিংবা ফুলের নাগাল পাওয়া যায়। বকুল ফুলের মৌ মৌ গন্ধে গোটা পরিবেশ যেন মাতোয়ারা। একটু পর পরই ছোট ছোট বসার বেঞ্চ । তবে দুজনের বেশী বসার সুযোগ নেই। কাপুলের জন্যই কি এভাবে তৈরী করা হয়েছে? একটু পর আবিস্কার করলাম রাস্তা একটি নয় অনেকগুলি। অনেক নারী পুরুষ বৈকালিক ভ্রমনে ব্যস্ত। অনেকে জগিং করছে। তদুপরি অসংখ্য বাইসাইকেল চলাচল করছে। শিশু কিশোর যেমন চালাচ্ছে তেমনি অনেক বয়স্ক নারী পুরুষও সমান তালে সাইকেল চালাচ্ছে। পরে এর মাজেজা বুঝা গেল। একটি বিল্ডিং এর সামনে শত শত সাইকেলের পার্কিং দেখে। এখান থেকে ঘন্টা ভিত্তিক সাইকেল ভাড়া দেয়া হয়।শিশুরা চড়ে আনন্দ পেতে আর বয়স্করা চড়ে ব্যায়ামের জন্য । আমার বড় ছেলে মাসফী একটি সাইকেল ভাড়া নেয়ার জন্য উতলা হয়ে যায়। আমার নিষেধ সত্বেও মায়ের কাছ থেকে ১০ রিঙ্গিত নিয়ে এক ঘন্টার জন্য ভাড়া নেয়। পার্কের বিভিন্ন পথে সাইকেল চালিয়ে বেশ আনন্দ পায়। এখানে সকাল বিকাল সপরিবারে অনেকেই বেড়াতে আসে। বিকেলে বেলার সমুদ্রের শীতল বাতাস মনকে প্রশান্তিময় করে। আমরা হাটতে হাটতে অনেক দূরে চলে যাই। তীর ঘেঁষে একটি বেঞ্চে বসে সমুদ্রের অপর পাড়ে স্থাপিত ঈগলের ভাস্কর্য দেখি। জায়গাটির নাম ঈগল স্কয়ার এবং পার্কের নাম ঈগল পার্ক। কোয়া শহরের অন্যতম দর্শনীয় স্থান।
কোয়া লংকাওয়ীর অন্যতম প্রধান শহর। ওরা বলে পেকান কোয়া (ঢ়বশধহ শঁধয)। এটি জেলা সদর। তবে কোয়া সম্পর্কে বলার আগে লংকাওয়ী সম্মন্ধে একটু বলে নেয়া ভালো। লংকাওয়ী মালয়েশিয়ার কেদাহ (কবফধয) অঙ্গ রাজ্যের একটি জেলা। জেলার সদর দপ্তর কোয়া। যেমন বাংলাদেশের নোয়াখালী জেলার সদর দপ্তর মাইজদী কিংবা পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার সদর দপ্তর বহরমপুর। অফিসিয়্যাল নাম ষধহমশধরি ঃযব ঔববিষ ড়ভ কবফধয যা মালে ভাষায় ষধহমশধরি ঢ়বৎসধঃধ শবফধয ।বিশেষ দ্বীপাঞ্চল। এর অবস্থান আন্দামান সাগরের তীরে এবং থাইল্যান্ড সীমান্ত ঘেঁষে। ছোট বড় ১০৪টি দ্বীপের সমন্বয়ে এলাকাটি গঠিত। মজার ব্যাপার হলো মাত্র ৪টি দ্বীপে জনবসতি রয়েছে। অন্যগুলি জনমানবহীন। দুই তৃতীয়াংশ জায়গা পাহাড় ও বনভুমি বেষ্টিত। দ্বীপটি মালাক্কা প্রনালী দ্বারা মালয়েশিয়ার মূল ভ’খন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন। কেদাহ সদর থেকে ৫১ কিলোমিটার দূরে। মোট আয়তন ৪৭৮ বর্গ কিলোমিটার এবং লোকসংখ্যা প্রায় এক লক্ষের কাছাকাছি। ৮৪% মালয়ী। বাকীরা প্রধানত চাইনীজ,ভারতীয় ও থাই বংশদ্ভ’ত। এ দ্বীপ রহস্য দ্বীপ হিসেবেই বেশী পরিচিত। এর ভৌগলিক অবস্থান, প্রকৃতি ,জনবসতি ও সর্বোপরি বহুল প্রচলিত ‘মিথ’ বা লোককাহিনীর কারনে এটি রহস্যময় দ্বীপ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। কি সেই মিথ?
মাশুরী রোমহর্ষক গল্প
একদা লংকাওয়ী অঞ্চলের এক নিভৃত পল্লীতে একটি সাধারন পরিবারে এক অসাধারন সুন্দরী কন্যা শিশুর জন্ম হয়। মা-বাবা আদর করে শিশুটির নাম রাখে ওয়ারিতা মাশুরী। বয়স বাড়ার সাথে সাথে তার রুপ ও গুনের কথা সারা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই তার পানি প্রার্থী হয়। এর মধ্যে এলাকার প্রভাবশালী এক মোড়ল ছিল একেবারে মরিয়া। কিন্তু মেয়েটির পিতা মাতা তাকে এক সাহসী সৈনিকের সাথে বিয়ে দেয়। সৈনিকটি ছিল এক বীর যোদ্ধা। তার বীরত্বের কাহিনী অনেকটা রুপকথার মতো ছড়িয়ে পড়ে গোটা অঞ্চলে । কিন্তু এতে মোড়ল ক্ষিপ্ত হয়। ঈর্ষার আগুনে জ্বলে উঠে তার কুৎসিত মন। সে নানা রকম ষড়যন্ত্র করতে থাকে। মাশুরী ও তার পরিবারের ক্ষতি করার মতলব আটে। এক পর্যায়ে সুযোগ পেয়েও যায়। কোন এক যুদ্ধের কারনে সৈনিকটি বেশ কিছুদিন এলাকার বাহিরে ছিল। মাশুরীর সাথে তখন গ্রামের একটি যুবকের বন্ধুত্ব গড়ে উঠে। সে সুযোগে মোড়ল মেয়েটির চরিত্রে কালিমা লেপন করে। তার যুদ্ধ ফেরৎ স্বামীও মোড়লের কথা বিশ^াস করে। সালিশ বিচারের প্রহসন করে তাকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদন্ডাদেশ দেয়া হয়। আত্মপক্ষ সমর্থনের কোন সুযোগ না দিয়েই তাকে একটি গাছের সাথে বেঁধে ধারালো ছুরি দিয়ে গলা কেটে তাকে হত্যা করা হয়। বেশ কয়েকবার তার গলায় ছুরি চালিয়েও ঘাতকরা সফল হয়নি। যন্ত্রনা কাতর মাশুরী তখন তার ঘরে রক্ষিত পারিবারিক বিশেষ তরবারী দিয়ে আঘাত করতে বলে। ঘাতকরা তাই করে। এভাবেই অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে তাকে হত্যা করে। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে মাশুরী ছিল নির্দোষ। তাই মৃত্যুর সময় সে গোটা লংকাওয়ীকে অভিশাপ দিয়ে যায়। সে বলে যায় তার মতো নিরপরাধ সতী সাধ্বী নারীকে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে যারা হত্যা করেছে এবং যারা বিনাপ্রতিবাদে এহেন অন্যায়কে মেনে নিয়েছে বা প্রশ্রয় দিয়েছে সকলকেই এর দায় বহন করতে হবে। পরবর্তী ৭ পুরুষ পর্যন্ত লংকাওয়ীর কোন উন্নতি হবেনা। তারা অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকবে। তার দেয়া অভিশাপ সত্যি সত্যিই লংকাওয়ীবাসীকে ভোগ করতে হয়েছিল দীর্ঘদিন ধরে। ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল উনিশ শতকের শুরুতে। তারপর থেকে লংকাউয়ীর কোন উন্নতি হয়নি। মালয়েশিয়ার আকাশ চুম্বি উন্নতি হলেও লংকাওয়ী অন্ধকারেই থেকে যায়। সত্যি বলতে কি প্রধানমন্ত্রি মাহাথীর মোহাম্মদ উদ্যোগ গ্রহন করার পূর্ব পর্যন্ত লংকাওয়ী ছিল একটি অত্যন্ত অনুন্নত, অবহেলিত ও প্রায় পরিত্যাক্ত অঞ্চল । সভ্যতার আলো যেন সেখানে পৌছেনি। মূল ভুখন্ড উন্নত মালয়েশিয়ার সাথে এর কোন মিলই ছিলনা। অবশেষে ১৯৮৬ সনে প্রধানমন্ত্রি মাহাথির মোহাম্মদ নিজ উদ্যোগে দ্বীপটির উন্নতির দিকে নজর দেন। তিনি লংকাওয়ীকে একটি আকর্ষনীয় পর্যটন অঞ্চল হিসেবে গড়ে তুলেন। সাথে বিভিন্ন বীচ এলাকায় গড়ে তোলেন ডিউটি ফ্রি শপিং কমপ্লেক্স। স্থাপন করেন আর্ন্তজাতিক বিমান বন্দর। চালু করেন অত্যাধুনিক ফেরী সার্ভিস। বিভিন্ন স্পটে গড়ে উঠে হোটেল-মোটেল ও রির্সোট। অতি অল্প সময়ে প্রকৃতিপ্রেমী ও সৌন্দর্য পিয়াসীদের মনোযোগ আকর্ষন করে লংকাওয়ী। সারা দুনিয়া থেকে দলে দলে পর্যটক আসতে শুরু করে।বর্তমানে প্রতি বছর ৩০/৩২ লক্ষ পর্যটক আসে এখানে। বিদেশীরাও এখানে বিনিয়োগ করে। মানুষ নগরের জৌলুসের পাশাপাশি প্রকৃতির শীতল ছায়া,সমুদ্রের হাতছানি,পাহাড় ও নদীর নান্দনিক দৃশ্য উপভোগের সুযোগ পায়। দীর্ঘ দিনের প্রায়শ্চিত্তের পর মাশুরীর অভিশাপ যেন কেটে যায়।
পরের দিন হোটেলের দেয়া ব্রেকফাষ্ট করি সকাল ৯টার দিকে। হোটেলের নীচতলার খোলা বারান্দায় বসে মালয়েশিয়ান রেসিপি খেতে খুব মজা পায় আমার ছেলেরা। খুত খুতে স্বভাবের ইশরাতও খেয়ে তৃপ্তি পেয়েছে দেখে আমিও তাদের আনন্দে শরীক হই। নাশতার নাম ‘নাসি লেমাক’ (ঘধংর খবসধশ )। মালয়েশিয়ান ট্র্যাডিশনাল ফুড। তবে ইন্দোনেশিয়া,সিঙ্গাপুর ও ব্রুনাইতেও এ খাবার বেশ জনপ্রিয়। চিকন চালের ভাতের সাথে আস্ত সিদ্ধ ডিম এবং কাচকি মাছ জাতীয় এক ধরনের সামুদ্রিক মাছের কড় কড়া ভাজি। সাথে সামান্য মিষ্টি ঝোল ও নারিকেলের দুধ মিশানো। মনে হয় মিষ্টি জাতীয় কোন আইটেমও মিশ্রিত থাকে। বড় ছেলে মাশফীর অভিমত হলো এর সাথে সুইট চিলি দেয়া আছে। যাক ওর কথাই মেনে নিই সকলে । বিভিন্ন দেশের রেসিপি সম্পর্কে ওর ভালো ধারনা আছে। সে নিয়মিত টেলিভিশনের বিভিন্ন চ্যানেলে বিদেশী রান্নাবান্নার অনুষ্ঠান দেখে।বিভিন্ন মেন্যু সম্পর্কে ভালো ধারনা অর্জন করেছে ইতোমধ্যে। ভবিষ্যতে পাঁচতারকা হোটেলের প্রধান শেফ হওয়ার সখ আছে ওর ! এজন্যে ওর কথায় একমত পোষন করি। তবে খেতে ভালোই লাগে। পরে চেনাং বীচে বেড়াতে গিয়ে দেখলাম এ খাবার কেবল নামি দামি রেষ্টুরেন্টে বিক্রয় হয়না, ফুটপাতেও বিক্রয় হয় দেদারসে। চেনাং এর সদর রাস্তার উপর পসরা সাজিয়ে মালয়ী এবং ইন্দোনেশিয়ান মহিলারা এ খাদ্য বিক্রি করছে। অনেক পর্যটকই খাচ্ছে বেশ মজা করে। এটা নাকি মালয়েশিয়ার ঐতিহ্যবাহী খাবার। দুপুরে চেনাং বীচের একটি মোটেলের রেস্তোরায় লাঞ্চ করি । সেখানে আরেকটি ঐতিহ্যবাহী খাবারের স্বাদ গ্রহন করার সুযোগ হয়। সে খাবারের নাম ছিল ‘নাসিগোরেং ’। ইন্দোনেশিয়ান ট্র্যাডিশনাল ফুড।
নাশতা খেয়ে যাত্রা করি চেনাং বীচের উদ্দেশ্যে। ভ্রমন সূচী এবং ট্যাক্সী ঠিক করে দিয়েছে হোটেল ব্যবস্থাপক এ্যাইনী স্বয়ং। আগের দিন রাতে সে খুব আন্তরিকতার সাথে বুঝিয়ে দিয়েছে কোথায় যাবো কিভাবে যাবো, কোথায় গেলে আনন্দ করা যাবে, কোথায় গেলে কমদামে ভালো শপিং করা যাবে ইত্যাদি যাবতীয় বিষয়। এখানে ট্যাক্সী ভাড়ার রীতি বেশ চমৎকার! যে কেউ চাইলেই হোটেল কর্তপক্ষ সারাদিনের জন্য এমনকি সপ্তাহখানিকের জন্য ট্যাক্সী ভাড়া করে দিতে পারে। দৈনিক ভাড়া ৭০/৮০ রিঙ্গিতের বেশী নয় । কোম্পানী শুধু গাড়ী সরবরাহ করে, চালক ও জ¦ালানী সরবরাহ করেনা। নিজেকেই চালাতে হবে এবং জ¦ালানী কিনতে হবে। সময় শেষ হয়ে গেলে এয়ারপোর্ট, জেটি,মোটেল কিংবা কোন শপিং মলের পাশে গাড়ী রেখে গেলেই চলবে,কোম্পানীর লোকজন সেখান থেকেই গাড়ী সংগ্রহ করবে। গাড়ী চুরি কিংবা ছিনতাইয়ের কোন ভয় নাই। অদ্ভ’ত মনে হলো। আমরা অবশ্য এ্যাইনীর পরামর্শে ভিন্ন নিয়মে ট্য্যাক্সী ভাড়া করি।
ট্যাক্সিতে উঠা মাত্রই চালক ইসলামী রীতিতে সালাম ও গুড মণির্ং জানায়। আমরা বাংলাদেশী মুসলিম এ কথা শুনে সে জানালো সে মালয়ী মুসলিম। নাম বাসরী বিন ঈশা। ভালো ইংরেজী বলতে পারে। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়–য়া আমার দুই পুত্র এবং তাদের মা ইংরেজী সাহিত্যের শিক্ষক ইশরাত মিলে চালকের সাথে বাতচিত চালিয়ে যাচ্ছিল ভালোভাবেই। অল্পক্ষনের মধ্যেই চালকের সাথে হৃদ্যতা গড়ে উঠে। সে গাইডের ভ’মিকায় অবতীর্ণ হয়। আমাদের পূর্ব পরিকল্পনা নতুনভাবে সাজিয়ে দেয়। চেনাং পৌছে আমরা পানতাই তেংগাহ (ঞবহমধয) জেটিতে যাই । মালয় ভাষায় ‘পানতাই’ মানে বীচ আর ‘পোলাও’ অর্থ দ্বীপ। বাসরী আমাদেরকে সমুদ্র তীরে একটি খোলা জায়গায় নিয়ে যায়।সেখান চেয়ার পেতে এক মহিলা বসে আছে। মহিলাটি সম্ভবত ট্যুর অপারেটর কোম্পানীর ম্যানেজার গোছের কেউ হবে। তিন দ্বীপ ভ্রমনের (ঞযৎবব ওংষধহফ ঃড়ঁৎ) জন্য মহিলার সাথে কথাবার্তা হয়। সে দাম চায় ৪৫০ রিঙ্গিত। বাসরী যখন বলে আমরা তার লোক তখন সে ৩৫০ রিঙ্গিতে রাজি হয়। পরে বুঝতে পারি ট্যাক্সিওয়ালাদের সাথে ট্যুর অপারেটরস কোম্পানীর একটি অলিখিত যোগাযোগ আছে। যাই হোক এখানকার দ্বীপ ভ্রমনের বিভিন্ন ধরনের ট্রীপ আছে। আমরা পছন্দ করি ৪ জন ৪ ঘন্টায় ৩ দ্বীপ ভ্রমণ। আমাদের জন্য একটি বোট নির্ধারন করা হয়। বোট মানে আমাদের দেশের মাঝারী আকারের যান্ত্রিক স্পীড বোট। আমরা জেটিতে না উঠে বীচে নেমে পড়ি। বোট রাখা হয়েছে সাগরের মধ্যে হাটুপানিতে। বোটে উঠার জন্য পানিতে একটি চেয়ার পেতে দেয় চালক। বোটে বসার জন্য আরামদায়ক চেয়ার,সোফা ও বেঞ্চ পাতানো । উঠার সাথে সাথে চালক আমাদের লাইফ জেকেট পড়িয়ে দেয়। চালকের নাম আদি (অফফর)। ইন্দোনেশিয়ান। সে সব কিছু বুঝিয়ে দিয়ে ইঞ্জিন ষ্টার্ট দেয়। সামনে বিশাল সমুদ্র। আহ কী সুন্দর দৃশ্য! চারদিকে সাগরের নীল জলরাশি ঢেউ খেলছে। শীতল বাতাসে মূহুর্তেই শরীর জুড়িয়ে যায়। সাগরের বুকে যেন বোটের খেলা চলছে। কোনটি আসছে কোনটি যাচ্ছে। সবগুলোতে পর্যটকে ভর্তি। বেশ কিছুক্ষণ চলার পর দেখি গহীন সমুদ্রের মধ্যে মাথা তুলে দাঁিড়য়ে আছে এক উচুঁ পাহাড় ! পাহাড়ের গায়ে নানা রকম বৃক্ষলতা। আসলে ওটা একটা ছোট্ট দ্বীপ। জনবসতি নেই। মনে হয় আগে আরো বড় ছিল। ক্রমাগত ভাঙ্গার ফলে ছোট হয়ে গেছে। দ্বীপের দৃশ্য নয়নাভিরাম। ওমা একটু পরে দেখি আরেকটি দ্বীপ। দ্বীপের ভিতরে বিশাল সুরঙ পথ দেখা যাচ্ছে। কী অদ্ভুত সুন্দর ! ন্যাশনাল জিওগ্রাফী চ্যানেলে এধরনের দ্বীপ প্রায়ই দেখানো হয়। আমার কাছে অবাস্তব মনে হতো। এখন স্বচক্ষে দেখে ভুল ভাঙলো। এমনি একটি দ্বীপের কাছাকাছি গিয়ে বোট চালক আদি থামলো। দ্বীপটি দেখিয়ে বললো ওটা প্রেগন্যান্ট লেডী আইল্যান্ড! বেটা বলে কী ! সে আবার ব্যখ্যা করে বললে আমরা গভীর মনোযোগের সাথে দ্বীপটির দিকে তাকাই। আরে তাইতো! দ্বীপটির পাহাড়ের অবয়ব দেখলে খুব স্পষ্টভাবে বুঝা যায় একটি মেয়ে লোক যেন ঘুমিয়ে আছে। তার পেটের অংশটি বেশ খানিকটা উচু্ ঁ। দেখতে অবিকল পোঁয়াতি মেয়ের মতো । অবাক হওয়ার মতো কান্ড ! পাহাড়ের আকৃতি(ঝযধঢ়ব) এমন হতে পারে তা না দেখলে বুঝানো যাবেনা। আমরা দেখতে পাই আমাদের মতো আরো অনেক পর্যটক প্রকৃতির এই বিচিত্র খেয়াল দেখছে খুব আগ্রহ নিয়ে। তারপর সেখান থেকে বিশাল নীল জলরাশির উপর দিয়ে বোট এগিয়ে যায় আরেকটি দ্বীপের দিকে। দ্বীপের কাছাকাছি গিয়ে একটি জেটিতে বোট থামে। অনেক বোট জেটির আশেপাশে । কোনটি থেকে পর্যটকরা নামছে জেটিতে আবার কোনটিতে উঠছে ছেড়ে যাওয়ার জন্য। আদি জানালো এই দ্বীপে আমরা একঘন্টা থাকতে পারবো। তারপর আবার এখান থেকেই বোটে উঠতে হবে। জেটির সরু কংক্রিটের সিড়ি পথ দিয়ে দ্বীপে উঠার সময় ডানদিকে নীচের কাদা পানিতে হরেক রকম ছোট ছোট সামুদ্রিক মাছ ছুটাছুটি করছে,সিড়ির রেলিংয়ে বসে আছে বানরের দল। খাবার দিলে খাচ্ছে মনের আনন্দে। দ্বীপের মাটি স্পর্শ করতেই সামনে একটি সাইনবোর্ড দেখতে পাই। দ্বীপের নাম পোলাউ ডায়াং বুনতিং (চড়ষধঁ উধুধহম ইঁহঃরহম)। এখানে দুটি দর্শনীয় স্থান। ডায়াং বুনতিং মার্বেল জিয়ো ফরেষ্ট পার্ক এবং ফ্রেস ওয়াটার লেক। এ দ্বীপটি ইউনেস্কোর ওর্য়াল্ড হেরিটেজ পার্কের অংশ।
একটি কাউন্টার থেকে জনপ্রতি পাচ রিঙ্গিত দিয়ে টিকেট কিনে যাত্রা শুরু করলাম লেকের দিকে। যাত্রা তো নয় সিড়ি বেয়ে উপরে উঠা। বলা যায় একেবারেই বন্ধুর পথ । সিড়ির পাশেই দলে দলে বানরের পাল নাচানাচি করছে, কখনোও ভেংচি কাটছে। সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড লেখা বানরকে যেন খাবার দেয়া না হয়। নিষেধ সত্বেও দেখলাম অনেক পর্যটক খাবার দিচ্ছে। সিড়ি পথের দুপাশে গহীন অরণ্য। অচেনা বৃক্ষরাজির সমাহার।পথ যেন শেষ হয়না। এক পর্যায়ে উঠার পালা শেষ হয়ে শুরু হয় সিড়ি বেয়ে নীচে নামার পালা। প্রায় ২০ মিনিট উঠা নামার পর পৌছলাম ফ্রেস ওয়াটার লেকে। এক আশ্চর্য সুন্দর জায়গা। চারদিকে সবুজ পাহাড় মাঝখানে স্বচ্ছ পানির লেক। লেকের পাড়ে জেটি। জেটিতে শ্বেতাঙ্গ পর্যটকদের ভিড়। অনেকেই লেকে সাতার কেটে উপরে এসে বিশ্রাম নিচ্ছে। অনেক স্বল্প বসনা ললনা জেটিতে শুয়ে রৌদ্র ¯œান করছে। অনেকে প্যাডেল বোটে চড়ে লেক পরিভ্রমণে ব্যস্ত। জেটির এক পাশে নানা রকম সুভেনীর, টি শার্ট, গেঞ্জি,ক্যাপ,ইত্যাদি হরেক রকম পণ্য সামগ্রীতে সাজানো একটি দোকান। অপর পাশে রেষ্টুরেন্ট ও বার। আমার গিন্নী ও ছোট ছেলে সাবিত রঙিন ক্যাপ কেনার জন্য আগ্রহী হয়। দাম জিজ্ঞেস করতেই বিক্রেতা ছেলেটি বাংলা ভাষায় জবাব দিলো ৩১ রিঙ্গিত। কী আশ্চর্য সাত সমুদ্র পেরিয়ে গহীন অরণ্যে এক্কেবারে খাস বিক্রমপুরী তরুণ! গায়ের রঙ দেখে ভেবেছিলাম তামিল হতে পারে। আবুল কালাম আজাদ মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার বাসিন্দা। এখানে আছে পাঁচ বছর যাবৎ। আসার পর বাড়ী যাওয়া হয়নি। আগামী বছর শীতে বাড়ী যাবে বলে মাকে জানিয়ে দিয়েছে । মা অস্থির হয়ে গেছে ছেলেকে দেখার জন্য।কিন্তু স্বল্প বেতনের চাকুরে ছেলের পক্ষে বছর বছর বাড়ী যাওয়া সম্ভব না। লাখ তিনেক টাকা খরচ করে এখানে এসেছে। আগে সে টাকা উঠাতে হবে। তারপর অন্য ভাবনা। জিজ্ঞেস করলে জানায় বেতনভাতা সাকুল্যে ১৫০০ রিঙ্গিত। সহজেই বুঝা গেলো টাকা রোজগার করা খুব কঠিন। বিদেশে স্বদেশী মানেই সুহৃদ। ক্যাপ এখান থেকে না কিনে চেনাং বীচ থেকে কেনার পরামর্শ দিলো। আমরা জেটিতে দাঁড়িয়ে লেকের সৌন্দর্য উপভোগ করি। জেটির সাথে সারি সারি প্যাডেল বোট বাধাঁ। ইচ্ছে করলেই লেকের স্বচ্ছ পানিতে বোটিং করা যায়। অনেক পর্যটকইবোটিং এনজয় করছে দেখলাম। জনপ্রতি ৫০ রিঙ্গিত। যদিও লাইফ জ্যাকেটের ব্যবস্থা ছিল কিন্তু সাহস করিনি প্যাডেল বোটে চড়ার। জেটি থেকে লেকের পাড় ঘেঁষে পাহাড়ের নীচ দিয়ে একটি কাঠের সিড়ি পথ গেছে লেকের শেষ প্রান্তে। আমরা ওটা দিয়ে হাঁটি বেশ কিছুক্ষণ। সিড়ি পথের নীচে অনেক বড় বড় পাথর খন্ড পড়ে আছে। কোনটা পানির নীচে কোনটা পানির উপরে। সামনে এগিয়ে যাচ্ছি এমন সময় হঠাৎ একটি লিকলিকে সাপ পাশের জঙ্গল থেকে লাফ দিয়ে আমার পাশে পড়ে। ভয়ে গা শিহরিয়ে উঠে। কিন্তু কিছু বুঝার আগেই আরেক লাফে লেকের পানিতে পড়ে যায়। আহ বাচা গেল।! শেষ প্রান্তে যাওয়ার ইচ্ছে বাদ দিয়ে ফিরে আসি জেটিতে। এখানে কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে চারিদিকের সবুজ পাহাড় ও লেকের নীল জলরাশির সৌন্দর্য উপভোগ করি।
লেকের দৃশ্য দেখা শেষ করে সিড়ি বেয়ে উপরে উঠা শুরু করি।ফেরার পথেও একই দৃশ্য। বানরের দল রাস্তা দখল করে আছে। অনেকটা অনুরোধের সুরে এবং অনুনয় বিনয় করে ইশারা ঈঙ্গিতে সরে যেতে বলি। কিন্তু অসম্ভব জেদী বানরের দল মোটেও কর্ণপাত করেনি। তারপর কোন প্রকারে পাশ কাটিয়ে ভয়ে ভয়ে ওদের ক্রস করে যাই। তবে সিড়ি বেয়ে উঠাÑনামা বেশ কষ্টকর। নামার সময় দেখতে পাই কাঠের দেয়াল ঘেরা ছোট্ট একটি ঘর। লেখা আছে সুরাউ (ঝঁৎধড়) । গহীন বনেও সুরাউ ! ছোট্ট ঘরের কাছে গিয়ে দেখি দুই ভাগে বিভক্ত দুটি কামরা। নামাজের স্থান। এক কক্ষে পুরুষ অন্যটিতে মহিলাদের নামাজের ব্যবস্থা । ভিতরে এয়ার কুলার লাগানো আছে। পরে অন্যান্য স্থানে এবং কেএল ও লংকাওয়ী এয়ারপোর্টেও ‘সুরাউ’ দেখতে পাই। সুরাও মানে মসজিদ। আমরা ডায়াং বুনতিং দ্বীপের অকৃত্রিম সৌন্দের্য্যরে ছবি ক্যামেরবন্দী করে জেটিতে ফিরে আসি। ফেরার সময় বুঝতে পারি পর্যটকের ভিড় যেন আরো বেড়ে গিয়েছে। প্রকৃতির সৌন্দর্য পিপাসু একদল ছাত্র/ছাত্রীকে দেখি সিড়ি পথ বেয়ে উপরে উঠছে। আমরা ডেকের লেন্ডিং প্লেসে এসে বোটম্যান আদিকে খুঁজি ।বোটম্যানকে ডাকার জন্য মাইকের ব্যবস্থাও আছে। ছোট ছেলে সাবিত আদিকে ডেকে দিতে মাইকম্যানকে অনুরোধ করলে সে হেসে বলে ‘ও পটেটোর কথা বলছো?’। আদিকে এরা পটেটো নামে চিনে। বেশ কয়েকবার ডাকাডাকির পর দূরে বিশ্রামরত আদি আমাদের দেখতে পায় এবং আমাদের কাছে বোট নিয়ে চলে আসে। বোটে উঠে সাবিত আদিকে পটেটো বলে ডাকতেই আদি হেসে ওঠে। সে বুঝতে পারেনি তার নিক নেম আমরা কিভাবে জানলাম।
এবার যাত্রা পোলাও সিঙ্গা বেসার(চড়ষধঁ ঝরহমধ ইবংধৎ)। সাগরের বুকে যেন দ্বীপের মেলা । সব দ্বীপই উচুঁ পাহাড় বেষ্টিত। বেশ কিছুক্ষণ চলার পর দুটি দ্বীপের মাঝখানে সাগর বক্ষে আদি বোট থামিয়ে দেয় । এ দ্বীপগুলোর গাছপালার মধ্যে কিছুটা ভিন্নতা দেখা যায়। এ দ্বীপের অপর নাম ‘বড় সিংহের দ্বীপ’। আদি বলে আসলে এখানে কোন সিংহ নেই। ভালোভাবে খেয়াল করলে দেখা যায় দ্বীপের আকৃতি অনেকটা বৃহদাকার সিংহের মতো। গাছপালাগুলো এমনভাবে সাজানো যেন একটি বৃহদকার সিংহ দাঁড়িয়ে আছে। দূও থেকে দেখলে দ্বীপটিকে অবিকল সিংহমূর্তি মনে হয়। এখানে আমাদের নামতে হয়নি। আমরা বোটেই বসে থাকি। হঠাৎ দেখি ঝাঁকে ঝাঁকে গাঙচিল ও বাদামী রঙের ঈগল দ্রুতবেগে নামছে আর উড়ছে। তারা সমুদ্রের পানিতে ভাসমান খাবার ছো মেরে নিয়ে যাচ্ছে। শিকার ধরার তীব্র প্রতিযোগীতা কার আগে কে ধরবে। পুরো সমুদ্রের আকাশ যেন গাঙচিল ও ঈগলে ছেয়ে যায় নিমিষের মধ্যে। সাবিত ও মাসফী দ্রুত ক্যামেরাবন্দি করে এই নজরকাড়া দৃশ্য। আমরা পরে জানতে পারি বোটচালক আদি চেনাং থেকে বোটে উঠার সময় মুরগীর মাংস ও চামড়া জাতীয় খাবার সাথে নিয়ে আসে। এখানে এসে সেগুলো সমুদ্রের পানিতে ছিটিয়ে দেয়। আর নিকটবর্তী পাহাড়ী দ্বীপ থেকে গাঙচিল ও ঈগলের দল সেগুলো ছো মেরে নিয়ে নেয়। পর্যটকদেও নির্মল আনন্দ দিতে বোট চালকরা এমন কৌশল অবলম্বন করে। সমুদ্রের এ জায়গাটির নাম ঈগল ফিডিং স্পট। তবে খুব সকাল বেলা নাকি ছোট ছোট সামুদ্রিক মাছ এখানকার স্বচ্চ পানিতে দলে দলে ঘুরে বেড়ায়। তখন পাখির দল শিকার ধরে মনের আনন্দে। সে দৃশ্য উপভোগ করতে হলে খুব সকালে আসতে হয়। ছোটবেলায় দেখেছি আমাদের গ্রামাঞ্চলে প্রচুর গাঙচিল ও ঈগলের বাসা। আমাদের বাড়ীর পেছনে উচুঁ কড়ই গাছ ও জামগাছের মগডালে বাসা বেঁেধ থাকতো অনেক ঈগল পাখি। স্থানীয় ভাষায় এদেরকে বলা হতো ‘কৌড়াল পাখি।’ অবশ্য এখন এ পাখি মোটেও দেখা যায়না। কোথায় যে হারিয়ে গেল! এরা অনেক সময় বড় বড় মাছ ধরে এনে খুব আয়েশ করে খেতো। আমরা সেই দৃশ্য খুব উপভোগ করতাম। বিশেষ করে দিঘির স্বচ্চ পানি থেকে বোয়াল, শোল ও আইড় জাতীয় বড় বড় মাছ ধরার সময় অনেক ক্ষেত্রে থাবা থেকে ছিটকে পড়তো। অনেকেই সে মাছ কুড়িয়ে নিয়ে যেতো। রাতের প্রহরে প্রহরে কৌড়াল পাখির ডাক এবং চিলের তীব্র চিৎকার এখনো যেন কানে বাজে। পাখিগুলি দেখে গ্রামের ছোটবেলার স্মৃতি মনের অজান্তেই ভেসে উঠে। এখানকার পর্ব শেষ করে আমরা যাত্রা করি আমাদের ভ্রমণের শেষ গন্তব্য ‘পোলাউ বেরাস বাসা’র (চড়ষধঁ ইবৎধংয ইধংধ) দিকে।
বেরাস বাসা’ দ্বীপ সুন্দর সী বীচ ও নরোম সাদা বালির জন্য বিখ্যাত। আমরা বোট থেকে নেমেই বীচের নীল জলরাশিতে নেমে পড়ি। ওয়াও! এত সুন্দর পানি! পানি এত স্বচ্ছ হতে পারে ! বেশ কিছুটা সময় পানিতে দাঁড়িয়ে কাটাই। বীচ এলাকাটি খুব বড় নয়। তবে একেবারে ন্যাচারাল । পাহাড়ের পাদদেশে বালুময় বীচ। এটি পিকনিক স্পটও বটে। দেখলাম অনেকগুলো গ্রুপ বনভোজনের জন্য এখানে এসেছে। আসলেই বনের মধ্যে ভোজন! তবে বন-সমুদ্র ভোজন বললেই বোধ হয় সঠিক হবে। একটি নান্দনিক পরিবেশ বিরাজমান। পানি স্বচ্চ ও অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা। হাটু পানিতে দাঁড়ালে সমুদ্রের তলদেশে চিক চিক করা সাদা বালি সত্যিই মন কেড়ে নেয়। নরোম হালকা রোদ ও শীতল বাতাসে শরীর ও মন জুড়িয়ে যায়। নীল সমুদ্রের উপর নীল আকাশ এক মোহনীয় পরিবেশ তৈরী করে। এ বীচ সাঁতার কাটার জন্যও উপযুক্ত স্থান। সমুদ্র খুব গভীর নয় এবং ঢেউ খুব বড় নয়। ফলে নির্বিঘেœ সাতার কাটা যায়। দেখলাম অনেক পর্যটক মনের আনন্দে সাঁতার কাটছে। এখানে অনেক চিত্তাকর্ষক ও এ্যাডভেঞ্চারিং আইটেম আছে। যেমন প্যারা সেইলিং (ঢ়ধৎধ ঝধরষরহম),জেট স্কী (ঔবঃ ংশর),¯œর্কেলিং (ঝহড়ৎশবষরহম) বেনানা বোটিং (ইধহধহধ ইড়ধঃরহম) ইত্যাদির চমৎকার ব্যবস্থা রয়েছে। এগুলি তরুন-তরুনীদের কাছে খুবই জনপ্রিয়। আনন্দ উপভোগের সাথে এ্যাডভেঞ্চার ও থ্রিল আছে। পর্যটকরা একজন একজন করে আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে এবং আকাশ থেকে সমুদ্র অবগাহন করে অপার তৃপ্তি লাভ করার সুযোগ পাচ্ছে। ¯œর্কেলিং এর মাধ্যমে সমুদ্রের তলদেশে বিচরণকারী বিচিত্র সামুদ্রিক প্রানী ও নানা প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ, জলজ গাছগাছালী ,শৈবাল ও সাগরতলের রহস্যময় জগত দেখার অপার সুযোগ রয়েছে। শহরের কোলাহলময় যান্ত্রিক জীবন থেকে সরে গিয়ে নিরিবিলী প্রাকৃতিক পরিবেশে বসে অবসর কাটানোর জন্যও এ দ্বীপ ভ্রমণ পিপাসুদের কাছে খুবই প্রিয়। সী বীচের লাগোয়া পাহাড়ের বনভ’মির সৌন্দর্য্যও কম চিত্তাকর্ষক নয়। এখানে অনেকগুলি বৃহৎ ছায়াদার গাছপালা রয়েছে । অনেকটা আমাদের দেশের বট বৃক্ষের মতো। পর্যটকরা গাছের ছায়ায় বসে দীর্ঘক্ষণ রিলাক্স মুডে সময় কাটাতে পারে। আমরাও অনেক সময় কাটাই শীতল ছায়ায়। সমুদ্রের বুক থেকে ভেসে আসা বাতাসে এবং দূর সমুদ্রের দৃশ্য,দ্বীপমালার সবুজ বৃক্ষরাজি সবকিছু মিলিয়ে এক অদ্ভ’ত মনকাড়া সৌন্দর্য্যরে অনাবিল স্বাদ গ্রহনের সুযোগ পাই পরিবার পরিজনকে নিয়ে যা অনেকদিন স্মৃতিতে জাগরুক থাকবে। এখানে বেশকয়েকটি দোকানপাটও আছে। মিনারেল ওয়াটার,ফলের জুস,¯œ্যাকস,কোমল পানীয়,নানা রকম স্থানীয় সুমিষ্ট ফল ফলারী ও সুভেনীর জাতীয় কিছু আইটেম আছে। আছে বিশালাকৃতির সবুজ ডাব । একটি ডাবের পানি একজনের পক্ষে খেয়ে শেষ করা সম্ভব নয়। আমরা গাছতলায় বসে সুস্বাদু জুস ও ডাব খেয়ে সময় কাটাই। বানরের উৎপাত এখানেও আছে। ওরা নাকি অনেক সময় খাবার কেড়ে নেয়। দোকানের তরুনী সুহা আগেই সতর্ক করে দেয়। দেখলাম বানরের দল পাশেই গোল টেবিল বৈঠকে বসেছে। তবে ওদেও মারমুখি ভাব দেখে খানিকটা ভয়তো পেয়েছিলামই। তবে ওদেরকে উত্যক্ত না করলে নাকি ওরা তেমন অভদ্র আচরণ করেনা। যাহোক একটি তৃপ্তিদায়ক স্মৃতি জাগানো সময় কাটিয়ে উঠলাম আদির বোটে। আমাদের ধারনা ছিল আরো একটি দ্বীপে নিয়ে যাবে । কিন্তু আদি জানালো ৩টি দ্বীপ দেখানো হয়ে গিয়েছে । ঈগল ফিডিং স্পটকেও দ্বীপ হিসেবে ধরা হয়েছে যদিও আমরা দ্বীপে নামিনি। এখন ফিরে যেতে হবে তেলুক বারু জেটিতে (ঞবষঁশ ইধৎঁ লবঃঃু) যেখান থেকে বোটে উঠেছিলাম। প্রায় আধা ঘন্টা সমুদ্রের নীল জলরাশির মধ্যে দিয়ে ভ্রমণ করে অবশেষে নামলাম তেলুক বারুতে। সাবিত ‘গুড বাই পটেটো’ বলে আদিকে বিদায় জানালে সে এক নির্মল হাসি দিয়ে আবারও তার বোটে চড়ার আমন্ত্রন জানিয়ে নতুন যাত্রীর সন্ধানে ছুটে চলে দূর সমুদ্রে। তীরে উঠতেই ট্যাক্সী চালক বাসরীর সাথে দেখা হয়। সে সহাস্যে আমাদেরকে স্বাগত জানায়। ভ্রমণ কেমন হলো জানতে চায়। আমরা ফাইন বলতেই সে তৃপ্তির হাসি দেয়।
বাসরীর পরামর্শ মোতাবেক আমরা চেনাং বীচ ও বীচ সংলগ্ন ডিউটি ফ্রী শপিং সেন্টারে যাই। ওর ট্যাক্সেিত করেই যাই। আমাদেরকে একটি শপিং মলের সামনে নামিয়ে দিয়ে সে বিদায় নেয়। বিদায়ের সময় অনেক পরামর্শ দিয়ে যায়। তার সেল ফোন নম্বরও দিয়ে যায়। প্রয়োজন হলে যেন তাকে ডাকি। তার আন্তরিকতায় আমরা মুগ্ধ হই। বিশাল বিশাল শপিং মল রাস্তার দু’পাশে। বিদেশী পর্যটকদের ধরে রাখার জন্য সরকার সকল রকম পণ্যের উপর থেকে শুল্ক উঠিয়ে দিয়েছে। শুধু ন্যাচারাল বিউটি দেখিয়ে পর্যটকদের মন ভেজানো যাবেনা। সেজন্য চাই সস্তায় বিলাস দ্রব্যের কেনাকাটার ব্যবস্থা, নিরিবিলি পরিবেশে আধুনিক সুযোগ সুবিধা সম্বলিত থাকার ব্যবস্থা, রসনা বিলাসের জন্য মুখরোচক ও ট্র্যাডিশনাল খাবার দাবারের ব্যবস্থা, নির্বিঘেœ নিশ্চিন্তে বেড়ানোর সুব্যবস্থা। বলা বাহুল্য মাহাথীর সরকার এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সবকিছুই করেছে। শুধু চেনাং নয় পুরো লংকাউয়ী এলাকাতেই ডিউটি ফ্রী শপিং মলের ছড়াছড়ি। নান্দনিক শৈলীতে গড়ে তুলা হয়েছে অসংখ্য রিসোর্ট,কটেজ, রেস্তোরা ও বাহারী শপিং সেন্টার যেখানে মালয়ী ঐতিহ্যের সাথে যোগ করা হয়েছে আধুনিক সুযোগ সুবিধা। ঢুকলাম একটি ডিউটি ফ্রী শপিং মলের ভিতরে। পণ্য সামগ্রির বিপুলতা ও বৈচিত্র্য দেখে স্ত্রী পুত্ররা বিস্মিত। দেশী-বিদেশী সকল আইটেমই আছে। কোনটা রেখে কোনটা কিনবো? সবকিছুই পছন্দ ! বিক্রয় কর্মীর ৯০ভাগই তরুনী। মালয়ী, ইন্দোনেশীয়ান, তামিল ও চাইনীজ। ক্রেতার মনোরঞ্জনে ওরা সদা ব্যস্ত। কিভাবে ক্রেতা বিশেষ করে মহিলাদের পটাতে হয়, পণ্য গচাতে হয়, ট্যাকের পয়সা খসাতে হয় সে বিষয়ে লাস্যময়ী তরুনীগুলি একেবারে পাকা। তারা আমার স্ত্রীকে বেশ কিছু ভেষজ ক্রীম, শ্যাম্পু ফেইস ওয়াস ও স্লীমিং ট্যাবলেট গছিয়ে দেয় কয়েক মিনিটের মধ্যে। এসব পণ্য যে এমন অল্প দামে দুনিয়ার আর কোথাও পাওয়া যাবেনা তা বলতে ভুল করেনি। আমাকেও সুন্দরভাবে মোড়ানো বিশেষ দ্রব্যের একটি প্যাকেট কিনতে বার বার অনুরোধ করছিলো! ওটার যে কোন পাশর্^ প্রতিক্রিয়া নেই একথা বলছিল অত্যন্ত বিনয়ের সাথে! আমার প্রয়োজন নেই একথা বলতে হয়েছে অনেকবার। স্ত্রী-সন্তানের বহু আকাক্সিক্ষত ক্যাপ পাওয়া গেল এখানে। যেটি ডায়াং বুনতিং দ্বীপে ৩১ রিঙ্গিত বলেছিল সেটি এখান থেকে কেনা হলো ১৯ রিঙ্গিতে। স্ত্রী পুত্ররা যেন মওকা পেয়ে যায় । দেখছো কত সস্তা! সব কেনাকাটা এখান থেকেই করতে হবে ! অন্যান্য জিনিসের সাথে কেনা হলো ঐতিহ্যবাহী মালয়ী ড্রেস গোটা তিনেক। বিশাল মলে অনেক্ষণ ঘুরাফেরা করে সকলেই ক্লান্ত এবং খানিকটা ক্ষুধার্থ। বের হলাম সেখান থেকে।
এবার শুরু হলো রেস্টুরেন্ট খুঁেজে বের করা। মল থেকে বের হয়েই পাশে দে তে পাই আন্ডার ওয়াটার ওয়ার্ল্ড। ছেলেরা সেখানে ঢুকার বায়না ধরলো। কিন্তু তখন ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময় অবস্থা । ফলে ইচ্ছা থাকা স্বত্বেও দেখা হয়নি এমন একটি আকর্ষনীয় জায়গা। বেশ কয়েকটি রেষ্টুরেন্ট ঘুরে অবশেষে একজন ভারতীয় পর্যটকের পরামর্শে গেলাম চেনাং বীচ সংলগ্ন ডেল্টা মোটেল এন্ড রেষ্টুরেন্টে। বীচমুখী রেষ্টুরেন্টে বসার জায়গা খুব সুন্দর। খাবার টেবিল থেকেই বিশাল আন্দামান সাগরের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। দেখতে পাই বীচের চিক চিক করা সাদা বালির উপর দিয়ে পর্যটকরা হেটে যাচ্ছে। কেউবা সাগরেরর নীল জলে সাতার কাটছে। কেউবা বীচ বাইকে চড়ে দ্রুতবেগে চলে যাচ্ছে অননন্তের সন্ধানে ! এমন দৃশ্য দেখতে দেখতে খাওয়ার কথাভুলেই গিয়েছিলাম প্রায়। সম্বিত ফিরে পাই সুরিয়া নামের ইন্দোনেশিয় ওয়েটারের বিন¤্র সম্ভাসনে । কি খেতে চাই জানতে চাইলো মেয়টি। এখানে ওয়েটার থেকে শুরু করে ম্যানেজার পর্যন্ত সকল স্টাফই মহিলা। সকলের মাথায় স্বার্ফ । পরিধানে মালয়দের জাতীয় পোষাক। তবে ইন্দোনেশিয়ান ও মালয়েশিয়ানদের মধ্যে চেহারার খুব পার্থক্য আছে বলে মনে হয়নি।
মেনু পছন্দ করতে ছেলেদের বিশেষ করে বড়ছেলে মাসফীর ইচ্ছেই প্রাধান্য পায়। তার অভিমত হলো বিদেশে বেড়াতে এসে বাংলাদেশী খাবার খাওয়া বোকামী। এখানকার ঐতিহ্যবাহি খাবারের স্বাদ চেকে নেয়া বুদ্ধিমানের কাজ। তথাস্তু। তার আগ্রহো ইন্দোনেশিয়ান ফুড নাছিগোরেং এর অর্ডার দিই। খাবার তৈরী করতে বেশ খানিকটা সময় নেয় ওরা। অবশেষে গরম গরম খাবার পরিবেশন করে ওয়েটার মেয়েটি। তবে যতটা ভেবেছিলাম নাছিগোরেং ততটা সুস্বাদু মনে হয়নি। রেসিপিটি ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় খাবার হলেও মালয়েশিয়া,সিঙ্গাপুর,ব্রনাই, দক্ষিণ থাইল্যান্ড,সুরিনাম এবং নেদারল্যান্ডে সমান জনপ্রিয়।
চেনাং এর প্রধান সড়কের দুপাশে কেবল দোকান আর দোকান। হরেক রকম বাহারি পণ্যের সমাহার। কাপড় চোপড়ের এবং জুতা-স্যান্ডেলের দোকানই বেশী মনে হয়েছে। । তাছাড়া রয়েছে অনেক খাবারের দোকান। ফল ফলারীর দোকান। আছে পার্লার ও স্পা সেন্টার। বীচের গা ঘেঁষে রয়েছে নানা রকম রিসোর্ট,কটেজ ও হোটেল মোটেলের প্রাধান্য। সবগুলি বীচমুখী। সামনে খোলা জায়গায় চেয়ার টেবিল পাতানো যেখানে বসে পর্যটকরা বীচ ও সাগরের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারে,গল্প গুজবে মেতে উঠতে পারে কিংবা আয়েশের সাথে খানাপিনা করতে পারে। আমরা একটি রেষ্টুরেন্টের সন্মুখের খোলা জায়গায় বসে বেশ কিছুক্ষণ প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য উপভোগ করি।সামনে বিশাল আন্দামান সাগর যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে !
কেনাকাটার জন্য চেনাং মলেরর সুখ্যাতি রয়েছ্ ে। ট্যাক্সী চালক বাসরীও চেনাং মলে শপিং করার পরামর্শ দিয়েছিল। চেনাং মলের ভিতরে প্রবেশ করে দেখি ‘সেল’(ঝধষব) এর মহোৎসব। সব দোকানেই ‘সেল’ চলছে। জুতা, স্যান্ডেল, টি শার্ট,ঐতিহ্যবাহী মালয়ী ড্রেসের ছড়াছড়ি। খুব একটা ভিড় নেই এবং পরিবেশও খুব শান্ত। মার্কেটের চিরাচরিত হৈ চৈ নেই। মালয়ী পোষাক পরিধানকারী বিনয়ী সেলস গার্লরা পন্য সামগ্রী ক্রেতার হাতে তুলে দিতে জোড়াজুড়ি করেনা। ফিক্সড প্রাইস থাকায় কেনাকাটায় কোন ঝক্কি ঝামেলা নেই। শপিং করে ঠকারও কোন কারন নেই। ডিউটি ফ্রি থাকায় দামও অনেকটা সহনীয় পর্যায়ে বলে মনে হয়েছে। কেনাকাটা করে মলের গ্রাউন্ড ফ্লারে নেমে বড় ছেলে মাসফী’র আবদারে ঢুকি ষ্টারবাকস কফির ষ্টলে। ষ্টারবাকস কফির স্বাদই আলাদা। এখানকার ¯œ্যাকস ও খুব মজাদার।
শপিং মলের ভিতরে পদযুগল মেসাজ করার খুব সুন্দর ব্যবস্থা রয়েছে। বীচ এলাকায় দীর্ঘ সময় হাটাহাটি করে অনেকেই ক্লান্ত হয়ে যায়। দু’পা চলতে চায়না অনেক সময়। ক্লান্তি দূর করে পদ ুযগলকে সচল করার উপায় কি? হ্যাঁ উপায় আছে । মল কর্তৃপক্ষই সে ব্যবস্থা করে রেখেছে ক্রেতাদেও আরাম আয়েশের জন্য । মাত্র ৩ রিঙ্গিতের বিনিময়ে পদযুগলের ক্লান্তি দূর হয়ে যায় ! মলের খোলা জায়গায় সারি সারি ইলেকট্রিক চেয়ার পাতা আছে। চেয়ারে বসে হাতলের গর্তে ৩ রিঙ্গিতের কয়েন ফেল একটি বাটনে চাপ দিলেই চেয়ার সচল হয়ে যায়। দুপাকে বিভিন্ন কায়দায় চেপে ধরে আবার ছেড়ে দেয়আবার চেপে ধরে বিভিন্ন কায়দায় । এভাবে চলতে থাকে প্রায় ১০ মিনিট । আহ্ কি আরাম ! বাপ-বেটা মিলে সে আরাম অনুভব করি বেশ কিছুক্ষণ। অত:পর আমরা চেনাং মলের পাশ দিয়ে চলে যাওয়া প্রধান সড়ক ধরে হেঁটে বেড়াই অনেকটা সময়। চেনাং এর রুপ দেখা এবং সাথে সাথে কেনাকাটা চলে সমান তালে। নান্দনিক দৃশ্যকে ক্যামেরা আর মোবাইল ফোনে বন্দী করার কাজও চলে থাকে দুই ছেলের বদৌলতে। রাস্তার পাশে একটু পর পরই ফলের দোকান। অর্ডার দিলে জুস তৈরী করে দেয়। একটি দোকানের খোলা চত্তরের চেয়ার টেবিলে বসে অর্ডার দিলাম আম ও কমলা লেবুর জুস দিতে। দক্ষিণ ভারতীয় ছেলেটি মজাদার জুস তৈরী করে টেবিলের উপর রাখে। খুব আয়েশ করে জুস পান করছি এমন সময় একটি ফিলিপিনো মেয়ে আমার স্ত্রী ইশরাতকে বেশ কয়েকটি রঙিন কাগজ ধরিয়ে দেয় এবং পাশেই একটি স্পা সেন্টারে হ্রাসকৃত মূল্যে সেবা নিতে অনুরোধ করে। বিভিন্ন ধরনের স্পা’র উপকারীতা এবং আকর্ষনীয় মূল্য হ্রাসের বিষয়টি বার বার উল্লেখ করে মেয়েটি। ইশরাত অনেক বুঝিয়ে তাকে নিভৃত করে। ক্রেতা জুটাতে পারলে ওরা কমিশন পায়। আরো কিছুক্ষণ চেনাং এলাকায় বেড়িয়ে ট্যাক্সি যোগে রওনা দিই কোয়া শহরের দিকে। ট্যাক্সী নিতে গিয়ে সব সময় সতর্ক থেকেছি চালক যেন তামিল না হয়। হোটেল থেকে বলে দেয়া হযেছিল তামিল চালকরা নাকি অনেক সময় যাত্রীকে বিপদে ফেলে। অনেক সময় লুঠপাট করে। ফলে গায়ের রঙ একটু তামাটে বা কালো হলেই মনে হয়েছে সে তামিল। পরে কুয়ালালামপুর গিয়ে বুঝতে পেরেছি সে ধারনা সর্বাংশে সত্য নয়। সকল তামিলই খারাপ নয় আর সকল মালয়ীই ভালো নয়। যেদিন আমরা কুয়ালালামপুর শহরে পৌঁছাই সেদিনের মালয়ী চালকের আচরণ মোটেও ভালো ছিলনা। মাত্র ১০ রিঙ্গিতের ভাড়া সে আমাদের নিকট থেকে ৩০ রিঙ্গিত রেখেছিল। তবে এটা ঠিক বেশীর ভাগ মালয়ী চালকের আচরণ ভালো এবং আন্তরিক ছিল। কিন্তু তামিল চালকের গাড়ীতে না উঠায় তাদের সম্পর্কে ঢালাওভাবে নেতিবাচক ধারনা পোষন করাও সঠিক নয় বলে মনে হয়েছে।
চেনাং ও কোয়া শহরে নারীর ক্ষমতায়ন দেখে খুব ভালো লেগেছে । সকল পেশাতেই নারীদের প্রাধান্য দেখেছি। গাড়ী চালক থেকে রিসোর্টের ব্যবস্থাপক সর্বত্র নারীর অবাধ বিচরণ। আপন পেশায় ওরা যেমন দক্ষ তেমনি আন্তরিক। আমার মনে হয়েছে নারী স্বাধীনতার সত্যিকারের রুপ দেখতে হলে লংকাওয়ীতে আসতে হবে। শালীন পোষাক পরিধান করেও যে ঘরের বাইরে স্বাচ্ছন্দে কাজ করা যায় তার প্রমান মালয়েশিয়ান ও ইন্দোনেশিয়ান নারী। রক্ষণশীলতা ও আধুনিকতার এক চমৎকার সমন্বয়। নারীর প্রতি রাষ্ট্র ও সমাজের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, নারী শিক্ষার সম্প্রসারন, নারীর কর্মসংস্থানের অবাধ সুযোগ সৃষ্টি সর্বোপরি কর্মক্ষেত্রে নারীর নিরাপত্তা বিধানই নারীকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভ’মিকা পালন করেছে।
সন্ধ্যার পর কোয়া শহরে ফিরে আসি । হোটেলে কিছু সময় বিশ্রাম নিয়ে বেরিয়ে পড়ি সাগর তীরে। এখানে লম্বা বীচ না থাকলেও সমুদ্র তীর ঘেঁেষ গড়ে উঠেছে অনেক হোটেল রেস্টুরেন্ট ও বিনোদন কেন্দ্র। রযেছে চেয়ার টেবিল পাতা অনেক খোলা চত্তর। সন্ধ্যার পর ওসব চত্তর বেশ জমজমাট থাকে। সবগুলি সাগরের দিকে মুখ করে তৈরী করা হয়েছে যাতে খানাপিনার সাথে সাথে সমুদ্রের রুপ উপভোগ করা যায়। খোলা জায়গায় চেয়ার টেবিলে বসে বসে রিলাক্স করার জন্য খুবই উপযোগী জায়গা। বেরন বে বিস্ট্রো (ইধৎড়হ ইধু ইরংঃৎড়) নামে একটি রেষ্টুরেন্টের সামনের খোলা জায়গায় পাতানে চেয়ারে বসে অনেক সময় কাটাই। কোয়া প্রনালী ও আন্দামান সাগরের শীতল বাতাসে মন আনন্দে ভরে উঠে। রেষ্টুরেন্টের স্পেশাল চা তেহ-তারিক (ঞযব-ঞধৎরশ) এর স্বাদই আলাদা! নানা ধরনের ফলের জুস খেয়ে বেশ তৃপ্তি নিয়ে বের হই সেখান থেকে। ওখান থেকে হোটেলের দিকে আসতেই দেখি হোটেলের অদূরে একটি আলোকজ্জ্বল স্টেডিয়ামে ফুটবল খেলা চলছে। বড় ছেলের আবদারে যেতে হলো সেখানে । শহরের ক্রীড়ামোদী যুবকেরা প্র্যাকটিস ম্যাচ খেলছিল। আবার পাশে পর্যটকদের খেলার ব্যবস্থাও আছে। বেশ কিছু সময় খেলা উপভোগ করে আইমান রেস্টুরেন্টে রাতের খাবার খেয়ে নিলাম। হোটেলের ওয়েটার কোলকাতার বাঙ্গালী ছেলে সাহেব আলী শেখ ও মাছুম মন্ডলের কাছ থেকে বিদায় নিই। সাবিত ওদেরকে নিয়ে ছবি তুললো। এ কদিনে ওরা আমাদের বেশ আপন হয়ে গিয়েছিল। হোটেলে ফিরে বিল পরিশোধ করে সামনের খোলা বারান্দায় পাতানো চেয়ারে বসি। পাশের চেয়ারে বসা ভদ্রলোক এগিয়ে এসে পরিচিত হলেন। তারপর শুরু করলো গল্প। তিনি মোহাম্মদ আযম খান। এ হোটেলের অন্যতম মালিক। সাকিন পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশে। আদি নিবাস ভারতীয় পাঞ্জাবের গুরুদাসপুর জেলায়। দেশ ভাগের সময় তার পিতা পাকিস্তানে হিযরত করে। প্রায় এক দশক ধরে এখানে হোটেল ব্যবসায় নিয়োজিত আছেন আযম সাহেব। জানালেন ভারত,পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়ার অনেক লোক এখানে ব্যবসা করছে।এমনকি বাংলাদেশেরও স্বল্প সংখ্যক ব্যবসায়ী আছে। তবে বিদেশীদের এখানে ব্যবসা করতে হলে একজন মালয়েশিয়ানকে পার্টনার হিসেবে নিতে হয়। এখানকার কানুন এমনটাই। মালয়ীরা বসে বসে লভ্যাংশ গুনে। কোন পরিশ্রম করেনা। ফলে তারা দিন দিন অলস হয়ে যাচ্ছে। আযম খান নিজ দেশ পাকিস্তান সম্পর্কে হতাশা ব্যক্ত করেন। সেখানকার রাজনীতিবিদরা চরম দুর্নীতিবাজ। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা খুব খারাপ। শহরাঞ্চলে ১০/১২ ঘন্টার বেশী বিদ্যুত থাকেনা। গ্রামাঞ্চলেরর অবস্থা আরো খারাপ। জঙ্গী ও সন্ত্রাসীদের কারনে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি হচ্ছে দিনকে দিন। আবার জঙ্গী দমনের নামে পশ্চিমারা নির্বিচারে বোমা বর্ষন করে ুহাজার হাজার নিরিহ মানুষকে হত্যা করছে প্রতিদিন । সরকার এবং সামরিক বাহিনী অনেকটা দর্শকের ভ’মিকা পালন করছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা অসহায়। মানুষের জান মালের কোন নিরাপত্তা নেই। জনগন দেশের ভবিষ্যত নিয়ে চরম হতাশ। মনে মনে বলি তোমার দেশের অপরিনামদর্শী রাজনীতিবিদদের কারনে আমরাও এক সময় চরম ভোগান্তির শিকার হয়েছিলাম। তোমাদের কাছ থেকে পৃথক হয়ে আমরা বেচে গেছি। তোমাদের তুলনায় আমাদের আর্থসামাজিক অবস্থা অনেক ভালো। মানব উন্নয়ন সূচকে আমরা অনেক উপরে। বেশ কিছুক্ষণ গল্প করে তাকে সহানুভ’তি জানিয়ে বিদায় নিলাম।
পরদিন ভোরে উঠে কোয়া শহরের আরো কিছু দর্শনীয় স্থান দেখলাম। স্ত্রী-পুত্ররা তখনও ঘুমে। প্রধান সড়ক ধরে এগুতেই সামনে পড়লো একটি সুবৃহৎ সুন্দর মসজিদ। ওদের ভাষায় সুরাউ। ইংরেজী ও আরবীতে লেখা আল- হানা মস্ক। এটি লংকাওয়ীর সর্ববৃহৎ মসজিদের অন্যতম। প্রথম প্রধানমন্ত্রি তংকু আবদুর রহমান ১৯৫৯ সনে মসজিদটি উদ্ভোধন করেন। নির্মাণ কাজে মধ্য এশীয় ও মালয়ী রীতি অনুসরণ করা হয়েছে। মসজিদ প্রাঙ্গনে আছে অতিথিশালা, কনফারেন্স রুম ও ট্রেনিং সেন্টার। এমন আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি ও ব্যবস্থাপনা দেখে ভালো লাগে। আরেকটু সামনে যেতেই পাই দাতারাং লাং (উধঃধৎধহম খধহম) বা ঈগল স্কয়ার। একটি বিশাল আকৃতির ঈগলের ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে একটি পাথরের স্তম্বের উপর। বিশাল দুটি ডানা বিশিষ্ট ঈগলটি উড়ার আগ মূহূর্তের ভঙ্গিমায় স্থাপন করা হয়েছে অর্থাৎ যেন এখনই উড়াল দেবে এমন একটি পোজ দেয়ার সময় । এই ঈগলটি নাকি লংকাওয়ীতে সকল আগুন্তককে স্বাগত জানায়। যারা মূল ভ’খন্ড থেকে সমুদ্র পেরিয়ে এখানে এসে জেটিতে নামে তাদের চোখে প্রথমেই এই ঈগল ভাস্কর্যটি পড়ে। ঈগল লংকাওয়ীর জাতীয় প্রতীক। এক সময় হাজার হাজার ঈগলের বসবাস ছিল এখানে। তখন অবশ্য মানুষের আনাগোনা ছিল খুবই কম। মালে ভাষায় ঈগলকে বলে ‘হেলাং’ আর লালাভ বাদামী রঙকে বলে‘ক্ওায়ী’। এই দুই শব্দের মিলনে এলাকার নাম হয়েছে লংকাওয়ী। হাতে কিছু সময় থাকায় এগিয়ে যাই লেজেন্ডা পার্ক দেখতে।
তামান লেজেন্ডা (ঞধসধহ খবমবহফধ) মানে লেজেন্ডা পার্ক। ‘তামান’ শব্দের অর্থ হলো পার্ক। লেজেন্ডা পার্ক কোয়া শহরের অন্যতম দর্শনীয় স্থান ও বিনোদন কেন্দ্র । ১৯৯৬ সনে এর উদ্বোধন করা হয়। সমুদ্র থেকে প্রায় ৫০ হেক্টর পুনরুদ্ধারকরা জায়গা (জবপষধরসবফ ষধহফ ) নিয়ে পার্কটি স্থাপন করা হয়েছে। পার্কে মানব সৃষ্ট বিশুদ্ধ মিঠা পানির পুকুর , লেগুন, উন্মুক্ত বাগান, ঝর্ণা,মিউজিয়াম, লেক,ওয়াকওয়ে,ভাস্কর্য,স্মৃতিসৌধ,কৃত্রিম সমুদ্র সৈকত,নানা রকম ফুল ও ফলের বাগান, বিশ্রামাগার ইত্যাদি রয়েছে। খাল সদৃশ একটি দীর্ঘ স্বচ্ছ পানি প্রবাহ পার্কের মধ্যভাগ দিয়ে বয়ে চলেছে। বৈচিত্রে ভরা চিত্তাকর্ষক ভাস্কর্যগুলি ডিসপ্লের মাধ্যমে লংকাউয়ীর ইতিহাস, ঐতিহ্য, বীরত্বগাথা,পৌরানিক কাহিনী ও লোকগাথার বিষয়বস্তুকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে অত্যন্ত চমৎকারভাবেএ খালের একদিকে রয়েছে কৃত্রিমভাবে তৈরী ২০ ফুট উচুঁ পাহাড় এবং অন্যদিকে আছে ৪০ ফুট উচুঁ উদযাপন গ্যালারি (ঈবষবনৎধঃরড়হ এধষষবৎু) যেখান থেকে সাগরের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। সকাল থেকে গভীর রাত অবধি পার্কটি খোলা থাকে। আইন র্শঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো থাকায় পর্যটকরা নিরাপদে সময় কাটাতে পারে।
হোটেলে ফিরে বিদায়ের প্রস্তুতি শুরু করি। নাসিলেমাক দিয়ে নাশতা সেরে যাত্রা করি লংকাওয়ী এয়ােেপার্টের দিকে । আকাশ অনেকটা কুয়াশাচ্ছন্ন। বিমান বন্দরে পৌছেই শুনতে পাই কুয়ারালামপুরের সকল ফ্লাইট বিলম্বের কথা। ফ্লাইট বিলম্ব তেমন কোন আচানক খবর নয়। বিমান যাত্রীদের প্রায়শ:ই এমন বিরম্বনায় পড়তে হয়। স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছি। আমাদের মতো আরো অনেক যাত্রীই অলসভাবে বসে আছে। কেউ কুয়ালালামপুর, কেউ সিঙ্গাপুর, কেউ জাকর্তা কেউবা চেন্নাইয়ের যাত্রী। ঘন্টা দুয়েক বসে থাকার পর টনক নড়লো যখন জানতে পারলাম গতকাল বিকেল থেকে কোন বিমান এখানে নামেনি এবং এখান থেকেও কোন বিমান উড়াল দেয়নি। এয়ারপোর্টের কর্মকর্তা এবং এয়ার লাইনস’র লোকজন যাকেই জিজ্ঞেস করি কেউ কোন আশার বানী শুনাতে পারেনি। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর স্ত্রী সন্তানেরা বিরক্ত হয়ে পড়ে। সময় যেন কাটতে চায়না। দুপুর গড়িয়ে বিকেল। একটু পর পর বিভিন্ন এয়ারলাইনসের প্রতিনিধিরা তাদের ফ্লাইট বাতিল কিংবা রাতে ছাড়ার ঘোষনা দিচ্ছে মাইক্রোফোনে। কিন্তু মালিন্দো এয়ার কর্তৃপক্ষ যেন কুম্ভকর্ণ। কোন ঘোষনা নাদিয়ে যাত্রীদের অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখে দেয়। ইতিমধ্যে অনেক যাত্রী বিকল্প পথে কুয়ালালামপুর যাত্রা শুরু করে। পাশের চেয়ারে বসা দুই ইন্ডিয়ান যাত্রীর সাথে আলাপ হলো। তারাও আমাদের মতোই কুয়ালালামপুরের যাত্রী। বীরেশ রঞ্জন মিত্তালের আদি বাসস্থান বিহারের রাজধানী পাটনায়। কর্মস্থল চেন্নাই। আর রঞ্জিত মিশ্রের বাড়ী উত্তর প্রদেশের সুলতানপুর জেলায়। কর্মস্থল পুনায়। দুজনই এসেছেন মালয়েশিয়া ভ্রমণে সপরিবারে। মিশ্রজীর ছেলে গৌরব পেশায় প্রকৌশলী। কর্মস্থল কুয়ালালামপুর। তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ফেরীর মাধ্যমে সমুদ্র পার হয়ে পেনাং অথবা কুয়ালা পার্লিস শহরে যাবেন এবং সেখান থেকে বাস যোগে কুয়ালালামপুর যাবেন। পরামর্শ অভিজ্ঞ গৌরব মিশ্রের। আমাদেরকেও সঙ্গী হতে অনুরোধ করেন। সময় লাগবে ৯/১০ ঘন্টা। এত দীর্ঘ পথ বাসে যেতে হবে মনে করে ওদের প্রস্তাবে রাজী হইনি। আশায় বুক বেধে বসে থাকি। একেবারে শেষ মূহর্তে মি. মিত্তাল আবারো এসে অনুরোধ করেন। আমাদের দুটানা অবস্থা দেখে মঙ্গল কামণা করে পরিশেষে বিদায় নেন।
বেলা গড়িয়ে যায়। বিমান ছাড়ার কোন ঘোষনা নেই। বিলম্বেও কথাই কেবল বার বার বলছে। যাত্রীদের দুশ্চিন্তা কেবল বাড়ছে। এক পর্যায়ে বুঝতে পারলাম আমরা ভুল করছি। আশে পাশের অনেক যাত্রীকেই আর দেখতে পাচ্ছিনা। যে যেভাবে পারছে ট্যাক্সী নিয়ে জেটির দিকে চলে গেছে। মালিন্দো এয়ারের কর্মকর্তারা জানালো আজকে আর কোন সম্ভাবনা নেই। আগামী কাল সকাল ১১ টায় ফ্লাইট ছাড়তে পারে। তখন মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। বড় ছেলে মাশফী ইতিমধ্যে গুগুল সার্চ করে কুয়ালালামপুর যাওয়ার বিভিন্ন রুট বের করেছে । এয়ারপোর্টে চেক ইন এর দায়িত্বে নিয়োজত দুজন কর্মকর্তাও সহজ রুটের নিশানা দেয় এবং সড়ক পথে চলে যাওয়ার পরামর্শ দেয়। বিদেশ বিভুঁইয়ে এমন বিপদে অনেকটা অসহায় লাগে। যাহোক ছেলেরা আমাকে সাহস জোগায়। সিদ্ধান্ত নিলাম পেনাং নয় কুয়ালা পার্লিস যাবো ফেরীযোগে। ট্যাক্সী ভাড়া করে রওয়ানা দিলাম কোয়া শহরের জেটির দিকে।
মাত্র আধা ঘন্টা সময় লাগলো জেটিতে পৌছতে। মালয়েশীয় চালক ইব্রাহিম যথেষ্ট সহায়তা করে । সে জানায় কুয়ালা পার্লিস থেকে কুয়ালালামপুরগামী বাসের টিকিট জেটি থেকেই কাটা যায়। জেটির আশেপাশে অসংখ্য কাউন্টার । গেলাম কাউন্টারে, কিন্তু বিধি বাম। টিকিট শেষ। রাত ৯টার আগে কোন টিকিট নেই। একে একে সকল কাউন্টারে গেলাম। সকলের একই কথা। টিকিট ফুরিয়ে গেছে। জানা গেল সারা দিন ধরে বিমানের ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় সকল বিমান যাত্রী হুমরী খেয়ে পড়েছে বাসের উপর। সিদ্ধান্ত নিলাম কুয়ালা পার্লিস গিয়েই বাসের টিকিট কাটবো। জেটিতে প্রবেশ করে বুঝতে পারলাম এটি একটি জমজমাট সমুদ্র বন্দর। মেইন ল্যান্ড মালয়েশিয়া যাওয়ার একমাত্র মাধ্যম। প্রচুর যাত্রী। তবে বেশ ছিমছাম । বেশ কিছুক্ষণ বসে সময় কাটালাম। জনপ্রতি ২৪ রিঙ্গিত দিয়ে ফেরীর টিকিট কাটলাম। টিকেট কাটতে বিদেশীদের পাসপোর্ট দেখাতে হয়। সরু পথ পেরিয়ে উঠলাম ফেরীতে। ফেরী মানে হাজার খানিক যাত্রী ধারন ক্ষমতা সম্পন্ন তিন তলা বিশিষ্ট জাহাজ। পুরোটাই শীতাতপ নিয়িন্ত্রিত। বেশ আরামদায়ক। ঘুরে ফিরে দেখলাম কোন সীট খালি নেই। এয়ারপোর্টের অনেক সহযাত্রীর সাথে দেখা হলো এখানে। বিদেশী পর্যটকের সংখ্যাই বেশী। যথাসময়ে ফেরী ছাড়লো। আন্দামান সাগরের নীল জলরাশির উপর দিয়ে জাহাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে কুয়ালা পার্লিসের দিকে। সাগরের মাঝে মাঝেই ছোট ছোট দ্বীপ। কখনো কখনো ফেরী একেবারে দ্বীপের গা ঘেঁেষ যাচ্ছিল। দ্বীপগলো গভীর জঙ্গলে ঢাকা। বিশাল বিশাল বৃক্ষরাজির সমাহার। আকাশ ছিল অনেকটা কুয়াশাচ্ছন্ন। নীল আকাশে গাঙচিলের দল বেঁধে উড়াউড়ি। ওরা যেন ফেরীটাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। মৃদু মন্দ বাতাসে ক্লান্তি যেন অনেকটা দূর হয়ে যায়। জানালার ফাঁক দিয়ে তাকালেই এক অনির্বচনীয় সৌন্দর্যের ছবি যেন ভেসে উঠে । প্রায় ঘন্টা দেড়েক নৌ ভ্রমণ শেষে পৌছলাম কুয়ালা পার্লিস বন্দরে। বন্দর থেকে ৭/৮ মিনিট হেটে পৌছাই বাস স্ট্যান্ডে। বাস ষ্ট্যান্ড যাত্রীতে ঠাসা। টিকিট নিয়ে অনেকটা কাড়াকাড়ি। কোন প্রকারে পেলাম রাত সাড়ে ৯টার টিকিট। আমাদেরকে দেয়া ৪টি টিকিটই অবশিষ্ট ছিল। আগেই সব টিকেট শেষ হয়ে গিয়েছিল। সৌভাগ্যবশত টিকেট পাই। মনে মনে শোকর আদায় করি। মালামালসমেত গেলাম আবার বন্দরের পাশেই একটি রেষ্টুরেন্টে সান্ধকালীন লাঞ্চ খেতে। সারাদিনের টেনশনে লাঞ্চ করার সুযোগ হয়নি। সন্ধ্যা হয় হয় অবস্থা। অর্ডার দেয়ার পরই মাগরীবের আযান ভেসে আসে কাছের একটি মসজিদ থেকে। ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট। সাদা ভাত,সামুদ্রিক মাছ, মুরগী,ও গরুর মাংস খেয়ে যেন অমৃতের স্বাদ পেলাম। সারাদিন অনেক কিছু খেলেও ভাত খাওয়ার সুযোগ হয়নি। কিন্তু আয়েশ করে খেতে পারিনি। ওয়েটারদের তাড়ার কারনে। এখানে নিয়ম হলো সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত রেষ্টুরেন্ট খোলা থাকবে। আযানের সাথে সাথেই বন্ধ হয়ে যাবে। বাস ছাড়বে রাত সাড়ে নয়টায় । এত সময় কিভাবে কাটাই? বড় ছেলে বুদ্ধি বের করলো । পাশের কেএফসি তে ঢুকে পড়ি। কিন্তু সেখানে বসার সীট নেই। ইউরোপিয়ান পর্যটকরা সব সীট দখল করে আছে। অনেক্ষণ দাঁিড়য়ে থেকে কোনমতে একটি টেবিল পেলাম। কফির অর্ডার দিয়ে বসে পড়লাম । অনেক সময নিয়ে কফি ও ¯œ্যাকস খেলাম। ছেলেরা এ সুযোগে ইন্টারনেটের সদ্ব্যবহার করলো। চেয়ে দেখি কেবল আমার ছেলেরা নয় আশেপাশের সকলই মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট ব্যবহারে গভীরভাবে নিমগ্ন। সুন সান নিরবতা। স্বল্প বসনা ইউরোপীয় তরুনীরা সকলকে টেক্কা দেয়। বেশ আনন্দেই সময় কাটলো। বাস কখন ছাড়বে সে ব্যাপারে কোন মাথা ব্যাথা নেই।
কেএফসিতে দীর্ঘ সময় কাটিয়ে বাস স্ট্যান্ডের দিকে যাই। কুয়ালালামপুরগামী অনেক বাস দাঁিড়য়ে আছে। যাত্রীরা দ্রুত উঠছে। মিনিট দশেক পর আমরাও বাসে উঠি। বাসগুলা বেশ বড়সড়। সীটও খুব আরামদায়ক। দুজনের সীট একেবারে সামনে আর দুজনের একেবারে পিছনে। ড্রাইভারের চেহারা দেখে তামিল মনে হলো। আবার তামিল ভীত ! আমরা ছাড়া আর কোন যাত্রী নেই। জিজ্ঞেস করলে চালক বলে সামনের স্টপিজ থেকে উঠবে। আমরা কিছুটা ভয় পেয়ে যাই। চালকের আচরণও সন্দেহজনক মনে হয়েছে। মাঝে মাঝেই চালক মোবাইলে কার সাথে যেন কথা বলছিল ওর ভাষায়। আমাদের সন্দেহে আরো ডাল পালা গজায়। চারদিকে নিকষ অন্ধকার। মনে মনে দোয়া দুরুদ পড়তে শুরু করি। বেশ কয়েকটি শহর পার হওয়ার পর বাস থামে একটি স্টপিজে। সেখান থেকে মাত্র ৪ জন যাত্রি উঠে । তাও আবার ৪ জনই মহিলা। ভয় কিছুটা কাটলেও পুরাপুরি শংকা মুক্ত হয়নি। ঘন্টা খানিক পর আরেকটি শহরে থামলো। সেখানে সব সীট ভর্তি হয়ে যায় যাত্রীতে। যখন ভয় কাটলো তখন আর ঘুম আসেনি। মনে মনে বলি বনের বাঘে খায়না মনের বাঘেই খায়। তাছাড়া তামিল চালকদের প্রতি অহেতুক সন্দেহ করাও ঠিক হয়নি। ভোর রাতে কুয়ালালামপুর বাস স্ট্যান্ডে নামিয়ে দিলো চালক। মালয়ী চালক নজীব বিন আবদুর রহমানের ট্যাক্সিতে চেপে বসি বুকিট বিনতাং এলাকায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে। সেখানকার সেভেন নাইট ইমবি হোটেলে সীট বুকিং করা আছে ঢাকা থেকেই। ‘আমি আপনাদের জন্য জেগে আছি সারা রাত ধরে, আপনাদের এত দেরী হলো কেন আনোয়ার?” জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে বললেন রিসিপশনিষ্ট ফারিহা আক্তার। আপনি বাঙ্গালী ? বাংলাদেশী? আমার এ প্রশ্নে সে বললো‘আমি তো বাংলাই বলছি। বিশ^াস হচ্ছেনা আপনার?’’ যাহোক ভোর রাতে কুয়ালালামপুর শহরের একটি হোটেলে বঙ্গ ললনার এহেন আন্তরিকতায় সকল ক্লান্তি যেন নিমিষে উধাও হয়ে যায়। এক অনাবিল প্রশান্তি বয়ে যায় মনের কোণে। তিন তলার দুটি রুমে ঢুকে দিলাম লম্বা ঘুম।

লাইভ রেডিও

Calendar

January 2023
S M T W T F S
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031