রাধাপদ রায়ের হামলাকারীদের গ্রেপ্তার করতে পারে নি পুলিশ

প্রকাশিত: ৮:২৫ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ৪, ২০২৩

রাধাপদ রায়ের  হামলাকারীদের গ্রেপ্তার করতে পারে নি পুলিশ

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি 

৩ দিনেও রাধাপদ রায়ের ওপরে হামলাকারীদের গ্রেপ্তার করতে পারে নি পুলিশ ।
প্রতিবাদে সরব হয়ে উঠেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ।
তবে তাঁর চিকিৎসার খোঁজ খবর নিচ্ছে উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা ।

কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলায় পূর্বশত্রুতার জেরে ‘স্বভাবকবি’ খ্যাত রাধাপদ রায়ের (৮০) ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। আহত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে নাগেশ্বরী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।

এ ঘটনায় কবি রাধাপদ রায়ের ছেলে যুগল রায় রোববার রাতে পাশের এলাকার অভিযুক্ত দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে নাগেশ্বরী থানায় মামলা করেছেন।

সোমবার সকালে নাগেশ্বরী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আশিকুর রহমান বলেছেন, কবি রাধাপদ বর্তমানে নাগেশ্বরী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন। গত শনিবারের ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত দুই ভাই পলাতক। পুলিশ তাঁদের গ্রেপ্তারে চেষ্টা চালাচ্ছে।

স্বজন, মামলার এজাহার ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, শনিবার সকালে নাগেশ্বরী উপজেলার গোদ্দারেরপাড় এলাকায় নিজ বাড়িতে রাধাপদ রায় হামলার শিকার হন। পাশের এলাকার দুই ভাই মো. রফিকুল ইসলাম ও কদুর আলী তাঁর ওপর হামলা করেন। তাঁরা কবিকে বাঁশের লাঠি দিয়ে বেধড়ক পেটান। এতে তাঁর শরীরের বিভিন্ন অংশে জখম হয়। পরে স্থানীয় লোকজন তাঁকে উদ্ধার করে নাগেশ্বরী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ভর্তি করেন।

কবি রাধাপদ রায়ের ছেলে যুগল রায় বলেন, ‘পারিবারিক পূর্বশত্রুতার জেরে পরিকল্পিতভাবে রফিকুল ইসলাম ও কদুর আলী আমার বাবার ওপর হামলা চালান। এ ঘটনায় থানায় মামলা না করার জন্য আমাদের হুমকিও দেন। আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছি।’

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন কবি রাধাপদ রায় মুঠোফোনে বলেন, ‘রফিকুলের সঙ্গে আমার পূর্বের কোনো শত্রুতা ছিল না। রফিকুলের ভাই কদুর আলীর সঙ্গে ছয় মাস আগে একবার কথা-কাটাকাটি হয়েছিল। সেই প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য কদুর আলী তাঁর ভাই রফিকুল ইসলামকে দিয়ে আমার ওপর আক্রমণ করেন। ছয় মাস আগের ওই ঘটনা আমরা ভুলে গিয়েছিলাম। তাঁরা আমাকে একা পেয়ে এভাবে আমার ওপর হামলা চালাবেন, আমি কল্পনাও করতে পারিনি। যেভাবে আক্রমণ শুরু করেছিলেন, এলাকাবাসী না থাকলে সেদিন তাঁরা আমাকে জানেই মেরে ফেলতেন। ভগবানের কৃপায় আমি কোনোরকমে জানে বেঁচে আছি।’

‘স্বভাবকবি’ খ্যাত রাধাপদ রায় পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন, তবে পড়ালেখা কম হলেও আঞ্চলিক ভাষায় তাঁর লেখা গান ও কবিতাগুলো বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। রাধাপদ রায়ের নিজের লেখা আঞ্চলিক ভাষায় শতাধিক গান ও কবিতা আছে। নিজের লেখা গান ও কবিতা মানুষকে শুনিয়ে সামান্য উপার্জনে চলে তাঁর সংসার। আঞ্চলিক ভাষায় তাৎক্ষণিক গান, কবিতা ও ছড়া তৈরি করে মানুষকে মুগ্ধ করায় স্থানীয় লোকজন রাধাপদ রায়কে ‘স্বভাবকবি’ হিসেবে জানেন। তাঁর লেখা ‘কেয়ামতের আলামত জানি কিন্তু মানি না’ কবিতাটি ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছিল ।

রাধাপদ রায়ের (৮০) ওপর হামলার ঘটনায় উদ্বেগ ও নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন দেশের ২৫ জন নাগরিক।

মঙ্গলবার গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে হামলা ও নির্যাতনে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং তদন্তের দাবি জানান তারা।

গত ৩০ সেপ্টেম্বর সকালে উপজেলার ভেতরবন্দ ইউনিয়নের গোদ্দারেরপাড় এলাকার নিজ বাড়িতে কবি রাধাপদ রায় সন্ত্রাসী হামলার শিকার হন।

বিবৃতিতে বলা হয়, রাধাপদ রায়কে নির্যাতনের ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও সংস্কৃতিজনের উপর হামলা নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। কিছু দিন আগেও দেশের বিভিন্ন স্থানে বাউল শিল্পী ও নাট্যকর্মীর উপর হামলা, বাউলের বাদ্যযন্ত্র ও পাণ্ডুলিপিতে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে, যার কোনোটিই রাষ্ট্র ও আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারেনি।

‘আমরা মনে করি, প্রতিটি ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে আখ্যা দেওয়ার প্রবণতা এ ধরনের ঘটনা বৃদ্ধির জন্য দায়ী,’ বলেন বিবৃতিদাতারা।

তারা মনে করেন, ‘সংস্কৃতি চর্চা বন্ধ করে দেওয়ার যে আয়োজন দেশব্যাপী চলছে, তার সাথে এই ঘটনাকে পৃথক করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। যে কোনো কারণ বা প্রকারেই এ ধরনের ঘটনা ঘটুক না কেন এর পেছনে একটি বৃহৎশক্তি রয়েছে, যারা দেশ থেকে সংস্কৃতি চর্চা নির্বাসনে পাঠাতে চায়, যারা রাধাপদ রায়ের মতো সংস্কৃতিসেবীদের একের পর এক আক্রমণ করে চলেছে।

সংস্কৃতির বিরুদ্ধে বিদ্বেষপোষণকারী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দিন দিন যত বাড়ছে, তার সাথে পাল্লা দিয়ে আামাদের সংস্কৃতিকর্মী কিংবা সাংস্কৃতিক আয়োজন বাড়েনি। বরং জাতীয় সাংস্কৃতিক আয়োজনকে সঙ্কুচিত করা হয়েছে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের লক্ষ্যে প্রত্যেক সচেতন নাগরিককে এগিয়ে আসতে হবে। একইসাথে কুড়িগ্রামের সংস্কৃতি কর্মী নির্বিশেষে রাধাপদ রায়ের পাশে থাকবেন এমনটিই আমাদের প্রত্যাশা।’

বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুলতানা কামাল, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে. চৌধুরী, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের প্রেসিডিয়াম সদস্য রামেন্দু মজুমদার, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ডা. সারওয়ার আলী, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের সভাপতি অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি ড. নুর মোহাম্মদ তালুকদার, জাতীয় শ্রমিক জোটের সভাপতি মেসবাহউদ্দিন আহমেদ, মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম, মানবাধিকার কর্মী খুশী কবির, বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশ গুপ্ত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এম. এম. আকাশ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক সালেহ আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধ্যাপক ড. জোবায়দা নাসরিন, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী পারভেজ হাসেম, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য দীপায়ন খীসা, গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠক জীবনানন্দ জয়ন্ত, গবেষক ও সংস্কৃতি কর্মী ড. সেলু বাসিত, আনন্দনের প্রধান সংগঠক এ কে আজাদ, খেলাঘরের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম জহির, সমাজ কর্মী জাহাঙ্গীর আলম সবুজ, সংস্কৃতি কর্মী অলক দাস গুপ্ত, মানবাধিকার কর্মী আবদুল আলীম, ইমারত নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়ন বাংলাদেশের (ইনসাব) সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক এবং বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি (বিসিএল) গৌতম শীল।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

লাইভ রেডিও

Calendar

February 2024
S M T W T F S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
2526272829