রুধিররঙ্গিণী

প্রকাশিত: ১১:৪৬ অপরাহ্ণ, মে ২৮, ২০১৮

রুধিররঙ্গিণী

সৌম্য সালেক

আত্মচেতনা কিংবা কামনা- বাসনায় নর নারীতে ভেদ নেই। তবে আমাদের লোক সমাজে, সাহিত্যে, কৃষ্টিতে সেটাকে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পুরুষের ভূমিকায় প্রকাশ হতে দেখি কিন্তু এই নাটকে তার উল্টো ঘটেছে। আত্মবাসনার বশে এক নারী এখানে অবিরাম ডানা-ঝাপটায়। এক গভীর কামনাবোধ, অধরা-আস্বাদন তাকে উড়িয়ে চলে কিন্তু কী অদৃষ্ট-কারণ তাকে কেবল বঞ্চনা উপহার দেয়, তবু সে অভীপ্সিত লক্ষ্যে অবিচল এবং সে তার একমাত্র আশ্রয়কে লঙ্ঘন করতেও দ্বিধা করে না। নাটকে আমরা দেখি, মা তার মেয়েকে বারবার সর্বনাশের কথা বলে ফেরাতে চাইছে কিন্তু সে মানা শুনছে না, সে ছুটে চলে আকাঙ্ক্ষার অভিমুখে; যে ভোলা বাঁশি বাজায় শঙ্খনদীতীরে তার দিকে…

সে আবারও বিফল মনোরথ, তার স্পর্শমণি এবারও অধরা থেকে গেলো। শেষে আমরা দেখি, অনেকটা গ্রিক ট্রাজেডির মতো নিয়তির-নিষ্ঠুর-বাণে এক আক্রান্ত পাখি সে, তার সেই উগ্র অার্তনাদ, রক্ত-মাংসভেদী আত্মখুন আপনাকে বহুদিন এক বিষণ্ন প্রশ্নবাণে তাড়িত করবে।

নির্দেশক নাটকটিকে সহজতর বললেও এর ভাষ্য ও দৃশ্যকল্পগুলো যে খুব সহজ তা বলবো না কেননা এর বিষয়/ ভাববস্তু পরপর দৃশ্যরূপে আসে নি, এসেছে সংলাপে, কথকতায় এবং অালোক প্রক্ষেপণের নানা নান্দনিক কসরতে।

নাটকের সংলাপে ও বক্তৃতায় সাধু রীতি ব্যবহৃত হয় না, এটা আমরা পড়েছি । এ নাটকের বারবার ক্রিয়াপদ ও সর্বনাম পদে সাধুবাচক শব্দের উপস্থিতি লক্ষ্য করেছি। লেখক অবশ্য বলেছেন অক্ষরবৃত্তের কথ্যচলনে নাটকটির বাচনশৈলি তৈরি করা হয়েছে, যদি এমনটা কৃত্রিমভাবে না হয়ে কোনও নির্দিষ্ট অঞ্চলের বাকরীতিকে প্রকাশ করে থাকে, সেক্ষেত্রে এটা ইতিবাচক। অবশ্য যদি এটিকে কাব্যনাট্য বলা যায় তবে এসব প্রশ্নের অবসান হয়ে যায়। রুধিররঙ্গিনী, কাব্যনাট্য কিনা সে আলোচনা বা বিবেচনার জন্য অারো কিছু অনুধ্যান বাকি রয়েছে।
নাটকের বাককৌশলের চেয়ে চিন্তা- প্রবাহ এবং নাট্যনির্মীতি আমাকে অধিক অাকর্ষণ করেছে, এটা সহসাই বোদ্ধা দর্শক-শ্রোতার মনোযোগ কাড়বে বলে মনে করছি । নাটকে আমরা মূলত তিনটি দৃশ্য প্রত্যক্ষ করি, সেখানে ছিল ঘটনা বর্ণনা, তত্ত্ব এবং যুক্তির বিপরীতমুখী নানা খেল্। খুব দ্রুততার সাথে সব এগিয়েছে এবং বর্ণনার এত ঘনঘটার মধ্যেও দর্শকমনকে নিবিষ্ট ও অচঞ্চল রাখতে পারা এ নাটকের বড় সাফল্য। দু ‘এক জায়গায় পাত্র-পাত্রির উচ্চারণের কিঞ্চিৎ অস্পষ্টতা ব্যতিরেকে রোকেয়া রফিক বেবি, আজাদ আবুল কালাম এবং জ্যোতি সিনহা  তিনজনই দুর্দান্ত অভিনয় দেখিয়েছেন। এছাড়া নির্দেশনা, মঞ্চ নির্মাণ ও আলোক প্রক্ষেপণে কবি সুভাশিস সিনহা  বরাবরের মতোই পারঙ্গমতা প্রদর্শন করেছেন। হৃৎমঞ্চ তার প্রারম্ভিক প্রযোজনাতেই হৃদয় কাঁপিয়েছে, আমরা এই মঞ্চ থেকে এমন আরও অনেক নান্দনিক কাজ প্রত্যাশা করছি।

নাটক দেখেছি ১৬ মে, এখনও কানে বাজছে সেই লাল রমণীর রক্তকামনার হা-হুতাশ, কোথা থেকে সেই অাদিম -প্রেরণা এসে কবির হৃদয়ে বসে, চিরদিন কে বাজায় শঙ্খনদী তীরে, কে দোলায়, পোড়ায়…
আমি এখানে Marina Tsvetaeva থেকে দু’ছত্র পড়ে শেষ করছি ::
‘Where does such tenderness come from?
With my head on your chest, rest.’