রুমা সুন্দরী

প্রকাশিত: ৭:১০ অপরাহ্ণ, মে ৭, ২০২১

রুমা সুন্দরী

 

আহমাদ মোস্তফা কামাল

রুমা মোদক। কবি, গল্পকার, নাট্যকার, অভিনেত্রী, শিক্ষক। কত পরিচয় ওর, কিন্তু আমি যে তাকে বন্ধু বলেই জানি! রুমার একটা পুরনো ছবি খুঁজছিলাম, প্রথম পরিচয়ের সময় কেমন ছিল ও তা দেখা এবং দেখানোর জন্য। পেলাম না। কিন্তু স্মৃতিটা বলা যায়। বোধহয় বছর বিশেক আগে পরিচয়ের সময় ও আমাকে ‘শ্রদ্ধাস্পদেষু’ বলে সম্বোধন করায় ভীষণ রাগ উঠে গিয়েছিল আমার। একজন সুন্দরী-আকর্ষণীয় তরুণী যদি আমার মতো এক তরুণকে ‘শ্রদ্ধাস্পদ ভেবে বসে থাকে, কেমন লাগে বলেন! কিন্তু কোনো তরুণীকে তো জিজ্ঞেস করা যায় না, আপনার বয়স কত? তাই কায়দা করে জেনে নিলাম, পড়াশোনা কোথায়, কোন ব্যাচ, ইত্যাদি। জানা গেল আমরা দুজন আসলে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে একই ব্যাচে দুটো ভিন্ন বিভাগে পড়াশোনা করেছি। ক্যাম্পাসে নিছক দুর্ভাগ্যবশত দেখা হয়নি। হলে কী হতো… যাকগে, সে আলাপ আর না করি।
রুমা আমার বন্ধু। ওকে আমি যে-কোনো কথা বলতে পারি, যে-কোনো নামে ডাকতে পারি, ওর সঙ্গেই একেবারে বিনা দ্বিধায় যে-কোনো খুনসুটি করতে পারি। এবং ওর কোনো লেখা বা কাজ পছন্দ না হলে অবলীলায় তা বলতেও পারি। কিন্তু আজ বলবো পছন্দের কথা।
এই যে বইটি দেখছেন ‘এইসব প্রেম মোহ’, এটা তার সাম্প্রতিক গল্পের বই, এবারই প্রকাশিত হয়েছে ‘জলধি’ থেকে। বাইশটি গল্পের সংকলন, যদিও আমি কেবল অর্ধেকটা পড়েছি, সব পড়া হয়ে ওঠেনি এখনো। সত্যি বলতে কি, একজন লেখকের ভালো-মন্দ কিংবা শক্তিমত্তা-দুর্বলতা বোঝার জন্য তাঁর সব লেখা পড়বার দরকারও হয় না। অল্পতেই বোঝা যায়। যেমন, এই বইয়ের গোটা পাঁচেক গল্প পড়লেই বুঝে নেয়া যায় রুমার স্বাতন্ত্র্য, শিল্পরুচি, গল্প বলার কৌশল এবং শিল্পের প্রতি দায়বোধ।
গল্পকাররা নানাভাবে তাঁদের করণকৌশল নির্ধারণ করেন। কেউ খুব নিখুঁতভাবে সবকিছুর বিস্তারিত বর্ণনা দেন, যাকে আমরা ডিটেইলিং বলি; আবার কেউ অল্প কথার ভেতরে অনেক ইঙ্গিত-ইশারা দিয়ে উপস্থাপন করেন তাঁর বলবার কথাটি। রুমা দ্বিতীয় ধরনের। তাঁর অধিকাংশ গল্পই স্বল্পায়তনের। বিস্তারিত বর্ণনা দেন না তিনি, কারণ, তাঁর বিবচনায় (হয়তো) ধরা পড়ে – জীবন এমনিতেই বিস্তীর্ণভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে, পাঠক তা দেখতেও পাচ্ছেন, তাকে অত ইনিয়ে-বিনিয়ে বলার কিছু নেই, বরং দেখিয়ে দেখা যাক কোনো এক বিশেষ মুহূর্তকে, তুঙ্গ মুহূর্তকে, চেনা মানুষের আড়ালে এক অচেনা মানুষকে। যেমন, ‘আকবর আলীর তৃতীয় পাপের আগে’ দুটো পাপের কথা (ফাইল আটকে ঘুষ খাওয়া এবং ‘এনজয়’ করার জন্য বসকে মেয়ে সাপ্লাই দেয়া) তার স্ত্রী জানতো, এমনকি স্ত্রীর প্রত্যক্ষ সমর্থনও ছিল তাতে, কিন্তু তৃতীয় পাপের কথা সে নিজে ছাড়া কেউ জানে না। না, সে ছাড়া আর একজন জানেন, তিনি অন্তর্যামী লেখক, আর তার বয়ানেই আমরা জেনে যাই – বৃদ্ধ বয়সে পুত্রবধূর প্রতি অস্বাভাবিক যৌনকাতরতার অপরাধরোধ তাকে টেনে নিয়ে যায় আত্মহননের দিকে, আর এটাই তার তৃতীয় পাপ। কোনটা? যৌনতাড়না নাকি আত্মহত্যা? সে সিদ্ধান্তের ভার পাঠকদের ওপর ছেড়ে দেন রুমা।
ভালো থেকো ফুল, এইসব প্রেম মোহ, সে, গোল – এইসব গল্পের প্রধান চরিত্ররা কেউই তথাকথিত ‘নায়ক’ নয়। নানা মানবিক দুর্বলতায় ভরপুর মিথ্যুক, সন্ত্রাসী, খুনীদের জীবনেও যে প্রেম থাকে, স্বপ্ন থাকে, তুঙ্গ আবেগের মুহূর্ত থাকে; রুমা কত সহজভাবে সেসব গল্প বলেন আমাদের! দুঃখভুক স্বপ্নময় দিন, দুঃখভুক মৃত্যুময় দিন, বৈধতা অবৈধতার চোরাবালি – এইসব গল্পের অন্তর্গত মেসেজটি কত অল্প কথায় বাঙ্ময় হয়ে ওঠে আমাদের কাছে!
দীর্ঘ সব বাক্য লেখেন রুমা, দারুণ অনায়াসসাধ্য দক্ষতায়। প্রচুর উপমা-উত্প্রেক্ষা ব্যবহার করেন, যা একবারে নতুন; ইশারা-ইঙ্গিত আর প্রতীক ব্যবহার করে রচনা করেন দারুণ সব দৃশ্যগল্প।
(একটা উদাহরণ দিই : “বারান্দায় গড়াগড়ি যাওয়া ভাদ্রের খরখরে রোদটা জানালা টপকে ঘরে ঢুকে পড়ে, আক্রমণটা কেমন প্রথম মিলনের ব্যথাময় সুখ হয়ে ওঠে আজ!” – কী অসামান্য এই দৃশ্যকল্প দেখুন, একেবারে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে চোখের সামনে; আর উপমাটা, কী দুর্দান্ত!)
রুমা মঞ্চ-নাটকে দারুণ পরিচিত নাম। রচনা-নির্দেশনা দিয়েছেন কুড়িটিরও বেশি নাটক, পেয়েছেন তনুশ্রী পদক কিংবা জাকারিয়া পদকের মতো মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননা। ছ’টি গল্পগ্রন্থ, দুটো কবিতাগ্রন্থ এবং আরো অজস্র অগ্রন্থিত রচনা নিয়ে তিনি এখনো দারুণ কর্মমুখর।
শিল্পী রুমা মোদককে এবং বন্ধু রুমা সুন্দরীকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা এবং ভালোবাসা জানাই।

ছড়িয়ে দিন