রেখেছ বাঙালী করে….’

প্রকাশিত: ১:৪১ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ২১, ২০২০

রেখেছ বাঙালী করে….’

মিনার মনসুর

অ্যাপার্টমেন্ট কমিটি যখন সিদ্ধান্ত নিল যে কাজের বুয়াদের বাসায় আসাটা বন্ধ করা হবে– তখন সত্যি সত্যিই খুব ভয় পেয়েছিলাম। সকালে-সন্ধ্যায় দুবেলা কাজ করেও যেখানে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যায় না– সেখানে ভয় পাওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। মুখে কিছু না বললেও ভেতরে ভেতরে আমার বুক কাঁপছিল। কিন্তু সবার নিরাপত্তার স্বার্থে আমরা সিদ্ধান্তটিকে স্বাগত জানিয়েছিলাম। সেটা সম্ভবত মার্চের ২৫/২৬ তারিখের কথা। তারপর তিন সপ্তাহ পার হয়ে গেছে। আমি যুগপৎ আনন্দ ও বিস্ময়ের সঙ্গে আবিষ্কার করি যে সবকিছু স্বাভাবিক ও সাবলীলভাবেই চলছে। এমনকী তুলনামূলকভাবে কিছুটা নির্ভারভাবেও। তফাৎ কেবল এইটুকু যে পরিবর্তিত পরিস্থিতি আমাদের অভ্যস্ত জীবনধারাও বদলে দিয়েছে। বদল হয়েছে আমাদের গতানুগতিক ভূমিকারও। বাস্তবতার প্রয়োজনেই কর্মবিভাজন হয়েছে। গৃহস্থালির কিছু কাজ আমার ছেলেমেয়ে ভাগ করে নিয়েছে। আমার ওপর দায়িত্ব বর্তেছে কাপ-প্লেট ও হাঁড়িপাতিল ধোয়ার। প্রথমদিন ভারি অস্বস্তির মধ্যে ছিলাম। সেসঙ্গে ছিল শারীরিক অস্বস্তিও। হাত জ্বলছিল। চামড়া উঠে যাচ্ছিল দুই হাতের। কিন্তু এখন, সত্যি বলতে কী, একধরনের আনন্দও পাই এ ধরনের শারীরিক শ্রমে।

জীবন এরকমই। অসীম তার ধারণক্ষমতা। যেকোনো পরিস্থিতির সঙ্গে সে খাপ খাওয়াতে পারে সহজেই। বুদ্ধদেব বসু তাঁর এক লেখায় বলেছিলেন যে মানুষের ক্ষমতা যে কী অসীম সেটি ধনুকের ছিলা কান পর্যন্ত না টানলে বোঝা যায় না। সভ্যতার ইতিহাস নিয়ে যারা গবেষণা করেছেন তারা দেখেছেন, যেসব জাতি বা জনগোষ্ঠীকে টিকে থাকার জন্যে কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, তারাই সবচেয়ে বেশি এগিয়ে গেছে। অন্যদিকে, যাদের তেমন বা একেবারেই সংগ্রাম করতে হয়নি, তারা অবিকশিত অর্থাৎ সেই আদিম পর্যায়েই রয়ে গেছে। মানুষের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এই যে বৈশ্বিক মহাসংকটের মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি, এ সংকটও নিশ্চিতভাবে পৃথিবীকে অনেকটাই বদলে দেবে। ট্রাম্পসাহেবরা চান বা না চান, বাস্তবতার চাপেই বহু ইতিবাচক ঘটনা ঘটে যাবে। যেমন– যে আমি সারাজীবন কায়িক শ্রমকে ভয় পেয়ে এসেছি, সেই আমি সেই কাজ করছি শুধু না, করে আনন্দও পাচ্ছি। পরিবর্তন এভাবেই আসে।

অবশ্য ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনার পর (শ্বশুরবাড়ির নিন্দা করে বিপদে পড়তে চাই না!) পৃথিবী পাল্টালেও বাঙালি পাল্টাবে কি-না সে প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া কঠিন। রবীন্দ্রনাথ বড় খেদের সঙ্গে বলেছিলেন, ‘রেখেছ বাঙালী করে মানুষ কর নি!’ আর নজরুল লিখেছেন, ‘বিশ্ব যখন এগিয়ে চলেছে, আমরা তখনও বসে/বিবি তালাকের ফতোয়া খুঁজেছি, ফিকাহ ও হাদিস চষে!’ রবীন্দ্রনাথের মতো সর্বংসহা মানুষও স্বজাতির ওপর কতটা ত্যক্তবিরক্ত হয়ে উঠেছিলেন– তার বহু প্রমাণ ছড়িয়ে আছে তাঁর গ্রাম-উন্নয়ন বিষয়ক রচনাবলীতে। অধিক না বলাই ভালো। আমরা যারা ধর্ম-নীতি-আদর্শ ইত্যাদি নিয়ে বড় বড় কথা বলি, প্র্রত্যেকেরই আয়নায় নিজের মুখখানি ভালো করে দেখার সময় এসেছে। করোনা এসেছে, চলেও যাবে। কিন্তু মানুষ হওয়ার সুযোগ যদি একবার হাতছাড়া হয়ে যায়, জীবনে তা আর ফিরে নাও আসতে পারে।

ঢাকা: ১৯ এপ্রিল ২০২০

ছড়িয়ে দিন