রোগটির সূত্রপাত যখন থেকে

প্রকাশিত: ১১:৩৮ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ৩০, ২০২১

রোগটির সূত্রপাত যখন থেকে

মীরা মেহেরুন 

মোটামুটি ৮০’র দশক থেকে রোগটির সূত্রপাত। নব্বইয়ের দশকে বেশ কয়েকটি মৃত্যুর ভেতর দিয়ে রোগের প্রাদুর্ভাব বেশ প্রকট হয়ে ওঠে। ২০০০ বা তৎপরবর্তী সময়ে এর প্রাদুর্ভাবে আমাদের সমাজ কাঠামো বেশ ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। এ রোগে মৃত্যু হার খুব কম, কিন্তু মৃত্যুর তুলনায় পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া এত তীব্র যে আক্রান্তের পরিবার, পারিপার্শ্বিক পরিবেশ, রাষ্ট্রসহ সর্বস্তরে বেশ ঝাঁকুনি দেয়। ২০০২ সালে এ ব্যাধির কবলে পড়ে মডেল তিন্নির মৃত্যু বেশ আলোড়ন তুলেছিল মিডিয়া জগতে, সমাজে, রাষ্ট্রে। শীতলক্ষ্যা ব্রীজের নিচে পাওয়া যায় তিন্নির ক্ষত বিক্ষত মৃতদেহ। বিচার হয়নি, খুনী অভি লাপাত্তা। ব্রীজের ওপর দিয়ে যতবার যাই আসি ততবার তিন্নির মুখটি ভেসে ওঠে আর নিজের অজান্তেই পিলারের নীচে চোখ চলে যায়।
এক কথায় এ রোগের নামকরণ করা বেশ কঠিন। পশ্চিমা দেশে সুপরিচিত এ সামাজিক ব্যাধির নাম সুগার ড্যাডি-সুগার বেবি-সুগার মম। রোগটির ঢেউ এসে আছড়ে পড়েছে বাংলাদেশেও। ৮০-৯০ এর দশকে এ রোগ সংশ্লিষ্ট বেশ কিছু প্রভাবশালীর নাম উঠে এসেছিল যাদের ব্যাবসা ছিল মিডিয়া কেন্দ্রিক এবং এরা আন্তর্জাতিক মাফিয়া হিসেবে সমাজে বেশ সুপরিচিত। নারী নির্যাতন, নারী কেলেঙ্কারি, নারী হত্যার সঙ্গে জড়িত এসব মাফিয়াদের বিরুদ্ধে মুখ খোলেনা কোনো মিডিয়া, কোনো নারী সংগঠন, ধর্মগুরু, সুশীল সমাজ, রাজনীতিবিদ, এমনকি আইন আদালতও ।নীরব হয়ে যায় এক জ্ঞাত কারণে। জ্ঞাত কারণগুলো থাকে এত কুৎসিত আর ঘৃণ্য মোড়কে মোড়ানো যে সেগুলো নাই বা উল্লেখ করলাম। যা সমাজের সকলেই অবহিত।
মুনিয়া হত্যা না আত্মহত্যা এ ব্যাপারে কোনো পক্ষ বিপক্ষ যাচাইয়ের বিষয় এটা নয়। এমন ঘটনা কেন ঘটছে বারবার? মেয়েটির দিকে আঙুল তোলার আগে পরিবার থেকে শুরু করে সমাজ, রাষ্ট্রের কোনো দায় আছে কিনা তা পর্যবেক্ষণ করা যাক।
পতিতা, রক্ষিতা, লোভী, গোল্ড ডিগার, আরো বহু রকমের বিশেষণে বিশেষায়িত করে গালিগালাজ করে চলেছে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ যার প্রতিফলন ঘটেছে গত দু’দিন যাবৎ সোসাল মিডিয়া জুড়ে।
পুরুষশাসিত সমাজের কথা বাদই দিলাম যে নারীসমাজের একাংশ মেয়েটি সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্যের তীর ছুড়ে দিয়ে হাত পা গুটিয়ে দায়মুক্ত হতে চাইছেন তাদের গায়ে কি কুটিল সমাজের কাদামাটি একেবারেই স্পর্শ করেনি? হয়তো ভাবছেন আমরা তো কিছু করিনি, তো আমাদের কি?
মোটেও তা নয়। ঘটনাটি গোটা সমাজের দিকে প্রশ্নবোধক আঙ্গুল তুলেছে। ধিক্কার দিয়েছে নীরব মিডিয়াকে।
মেয়েটি মুক্তযোদ্ধা কন্যা। স্কুল পড়ুয়া অবস্থায় বাবা মা দুজনকে হারিয়ে এতিম হয়ে বসে আছে অল্প বয়সেই । কোনো একটি সূত্রে জানা গেছে জমিজমা সংক্রান্ত ব্যাপারে তিন ভাই বোনের মধ্যে কি একটা মামলা/ঝামেলা চলছে। মেয়েটি ঢাকায় পড়তে এসে যখন মডেলিং শুরু করেছে তখন তার বড় বোন-ভাইয়ের উচিত ছিল এই পথ থেকে তাকে সরিয়ে নেয়া। কারণ লিখিত বা অলিখিত হোক এ পথটি খুব মসৃণ বা সুগম নয় তা আমরা খুব ভালোভাবেই জানি। যখন সে এই পথে পা বাড়িয়েছে তখন বড় দুই ভাই-বোন মুনিয়ার কানের মধ্যে চার/পাঁচটা থাপ্পড় মেরে কুমিল্লায় ফিরিয়ে নিয়ে তার দায়িত্ব গ্ৰহণ করেনি কেন? পরিবারের সদস্যরা (ভাই-বোনেরা) কি অভিভাবকহীন (এতিম) মেয়েটির দায় এড়াতে পারে? আজকে মিডিয়ার সামনে এসে কাঁদছে, সব শেষ হয়ে যাবার পর বোধদয় অর্থহীন। বড় ভাই বোনের দায় দায়িত্ব হীন স্বার্থপরতা মুনিয়াকে ঠেলে দিয়েছে জাঁকজমকপূর্ণ জীবনলোভের পথে।
এ সমাজে অসংখ্য হাজার কোটিপতি আছে যাদের দৈনিক হাত খরচ ১০-১৫ লক্ষ টাকা তারা নিজেদের দালাল লাগিয়ে এসব অসহায় সুন্দরী মুনিয়াদের খুঁজে বেড়ায় আর প্রতিদিনের হাতের ময়লা দিয়ে রক্ষিতা করে নেয় এবং দীর্ঘমেয়াদী ভোগের পথ সুগমের জন্য বিয়ের প্রতিশ্রুতিও করে ফেলে। অঢেল এবং অবৈধ অর্থের একচেটিয়া মালিকানা যেহেতু পুরুষতন্ত্রের হাতে সুতরাং হিসেব অনুযায়ী অর্থ যার শক্তি তার। গোটা সমাজের নাকের ডগায় রাষ্ট্রকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে এসব শক্তিশালীতন্ত্র দুপায়ে দলে চলেছে সামাজিক মূল্যবোধ, করে চলেছে সবধরনের অপরাধ।
মেয়েটির বোঝার বিষয় ছিলো যে এসব আনভীর সোবহানের হাতের ময়লা দিয়ে প্রতিদিন তারা ১০০ রক্ষিতা রাখতে পারে। কিন্তু সে কি মুনিয়াদের হত্যার অধিকার রাখে?
মুনিয়াদের আর্থিক নিরাপত্তার জন্য পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রকে তৎপর হতে হবে। নারীর হাতে সম্পদ ও সম্পত্তির নিশ্চয়তা থাকতে হবে । দীর্ঘ দিনের বঞ্চনা, অপ্রাপ্যতায় মুনিয়াদের জীবন হয়ে পড়ে পরনির্ভরশীল। তারা খুব দ্রুত পড়ে যায় মিথ্যা প্রতিশ্রুতির ফাঁদে। অতঃপর ভবিতব্য হয়ে ওঠে দীর্ঘ মেয়াদি চুক্তিভিত্তিক অথবা অচুক্তিভিত্তিক রক্ষিতা জীবন অথবা নির্যাতনের শিকার হয়ে হত্যা বা আত্মহত্যা।
মুনিয়াকে ঘিরে আরো যা যা ঘটবে তা আমরা জানি পুরোনো অভিজ্ঞতা থেকে। ঘটনা কেন্দ্রিক দ্বীধাগ্ৰস্ত আমাদের সর্বমহলকে বলছি রাষ্ট্রের চেয়ে শক্তিশালী কেউ নয়। সুস্থ সমাজ সুরক্ষায় একটি দায়িত্বশীল সমাজ বা রাষ্ট্র এর দায় এড়াতে পারে না।
আমরা আইনগত বিচারের অপেক্ষায় রইলাম।
সবশেষে পুরুষতন্ত্রের জন্য আমার বলার একটি কথা, আপনার মৃত্যুর পর অসুবিধায় পড়ে, লোভে পড়ে আপনার কন্যাটিও কিন্তু আনভীরদের কাছ থেকে মৃত্যু উপহার পেতে পারে। সুতরাং আর্থিক ভাবে তার জীবনের নিরাপত্তার ব্যবস্থাটি করে যান আপনার জীবদ্দশায়। কারণ দেখছেন তো ভিকটিম নারীর পাশে মিডিয়া, সমাজ, সংগঠন, রাজনৈতিক দল, এমনকি পরিবারের আপনজনদের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ।
আর মুনিয়া কে ট্রল করা নারীদের বলছি, মুনিয়ার জায়গায় নিজেকে অথবা নিজের কন্যাকে একবার দাঁড় করিয়ে দেখুন, তাকে একচেটিয়া ভাবে দোষারোপ করা যায় কিনা!
বিঃদ্রঃ আমাদের মতো সাধারণ মানুষদের খুব বেশি চাওয়া পাওয়া নেই। একটি সুন্দর, পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ, সমতাভিত্তিক সমাজ। বিগত ৫০ বছরে দেশের আনাচে কানাচে অনেক আগাছা পরগাছা জন্মেছে। পরিস্কার করা দরকার।
৩০.০৪.২০২১
রাত১২.৩০মি.।

ছড়িয়ে দিন