রোগপ্রতিরোধী স্বাস্থ্যকর্মীর জীবন-মান উন্নয়নে আমলাতন্ত্রের অনীহা কেন?

প্রকাশিত: ১১:৩১ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ১০, ২০২০

রোগপ্রতিরোধী স্বাস্থ্যকর্মীর জীবন-মান উন্নয়নে আমলাতন্ত্রের অনীহা কেন?

– খছরু চৌধুরী

গত ২৬ নভেম্বর থেকে স্বাস্থ্য বিভাগের মাঠপর্যায়ের জনগোষ্ঠীর সেবাদাত্রী স্বাস্থ্যকর্মীরা কর্মবিরতি পালন করছেন। মা ও শিশুদের টিকাদান কার্যক্রম শুধু স্থবির নয়, মুখ থুবড়ে পড়েছে। দেশের ১ লাখ ২০ হাজার আউটরিচ টিকাদান কেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। হাম-রুবেলা রোগ প্রতিরোধের জাতীয় ভ্যাকসিন ক্যাম্পেইন সম্পাদনের অনিশ্চয়তায় ইতিমধ্যে দু’বার তারিখ পেছানো হয়েছে। সামনের মাস-দুই সময়ের মধ্যে বিশাল অংকের ঋণের টাকায় দেশে আসবে কোভিড-১৯ প্রতিরোধী ভ্যাকসিন – এটি নিয়েও সৃষ্টি হয়েছে নানা আশংকা। সব মিলিয়ে জনস্বাস্থ্যের রোগপ্রতিরোধী স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় হতাশাজনক পরিস্থিতি। কিন্তু কেন এমন হলো? কেন এমন হয়?

‘চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম’ – বিজ্ঞানের স্বতসিদ্ধ কর্মপন্থার নীতিকে অনুসরণ করে ১৯৭৩ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার দেশে ২৭ হাজার ৫ শতের অধিক রোগপ্রতিরোধী স্বাস্থ্যকর্মী নিযুক্ত করেন। যুদ্ধ-বিধস্ত স্বাধীন দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার কর্মপদ্ধতি গণমুখী নিয়মে ঢেলে সাজিয়ে অপর্যাপ্ত সংখ্যার হাসপাতাল দ্বারা চিকিৎসা সেবার পাশাপাশি রোগের প্রতিরোধ কার্যক্রমের উপর অধিক গুরুত্বারোপ করেন। কিন্তু জাতির চরম দূর্ভাগ্য এই যে, পৃথিবীর জঘন্যতম নির্মম হত্যাকান্ডের মধ্যদিয়ে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে খুন করা হয়। দেশপ্রেমিক ও সাহসী রাজনৈতিক নেতৃত্বের শূণ্যতার কারণে প্রশাসনের রন্ধ্রে-রন্ধ্রে পাকিস্তানি শোষণের মানসিকতার আমলাতন্ত্র পুণঃপ্রতিষ্টিত হতে থাকে। মহান স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তথা বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশ বিনির্মাণের বিপরীতে রাষ্ট্রের বিভিন্ন কাঠামোগুলো দাঁড় করানো হয়। কখনো প্রকাশ্য ঘোষণা, কখনোবা গোপন কৌশলে মুক্তির আদর্শের বিপক্ষে প্রশাসন পরিচালনা করার নীতি গ্রহণ করতে কুণ্ঠিত হয়নি তৎকালীন সরকারগুলো। জনগোষ্ঠীর মৌলিক মানবিক অধিকার স্বাস্থ্য সেবাপ্রাপ্তির সরকারি ব্যবস্থাপনা খাতকে দূর্বল করার নানারূপ ফন্দি আঁটতে থাকে। ধীরে ধীরে রোগপ্রতিরোধের কার্যক্রম দূর্বল করে, কর্মীর সংখ্যা সীমিত রেখে, কর্মীর কাজ ও জীবন-মানের আধুনিকায়ন না-করে কৌশলে চিকিৎসা-সেবার বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ করার নীতিতে পরিচালিত হয় স্বাস্থ্য প্রশাসন। প্রশাসনের উপর আধিপত্য চলে আসে চিকিৎসা সেবা বাণিজ্যের বণিক এবং সুবিধাভোগী আমলাদের। ব্যবস্থাপনার নীতিতে রাষ্ট্রের গৃহিত জনস্বাস্থ্য বিষয়ক আইন-বিধি ও মৌলিক নীতিমালা ক্ষেত্র বিশেষে লঙ্ঘিত ও উপেক্ষিত হতে থাকে। ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ভ্যাকসিনেশনের মূল আইন পাশ কাটিয়ে ১৯৮৫ সালের ১৫ আগষ্ট (জাতির শোকের দিনে) তারিখে মেডিক্যাল ওয়ার্কারদের নন-মেডিকেল পরিচয় দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। ২০১৪ সালে মহামান্য হাইকোর্ট এক রায়ে উল্লেখিত বিধি অবৈধ হলেও স্বাস্থ্য-প্রশাসন ২০১৮ সালে কার্যতঃ এই বিধির বাংলা অনুবাদ করে দায় এড়াতে চেয়েছেন। প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও রোগ প্রতিরোধের জনবল আর বাড়ানো হয়নি। প্রাতিষ্ঠানিক পরিধিতে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম ও প্রতিষ্ঠান গুলোকে অকার্যকর করে রাখার নিমিত্তে চরম ভারসাম্যহীন অবস্থায় স্বাস্থ্য-জনবল রেখে দেয়া হয়েছে। প্রায়শঃ প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসক আছেন তো নার্স নেই, নার্স আছেন তো মেডিকেল টেকনোলজিষ্ট নেই। এই নেই নেই অবস্থা যেন শেষ হবার নয়। প্রিভেন্টিভ স্বাস্থ্যকর্মীর নিয়মিত নিয়োগ নেই ৬ থেকে ১০ বছর। এটি এমন এক কর্মকৌশল যে, এখানের সরকারি স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠানে কোনো না কোনো জনবলের অভাব লাগিয়ে রাখার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে খাদ্যভেজাল নিয়ন্ত্রণে মাত্র ৬ হাজার স্যানিটারী ইন্সপেক্টর নামীয় দক্ষ জনবলের চাহিদা পুরণের ব্যবস্থা না-করে খাদ্য মাধ্যমে সৃষ্ট ২ শতাধিক রোগের দ্বারা ভুক্তভোগী মানুষ দিয়ে চিকিৎসা বাণিজ্যে’র বাজার চাঙ্গা রাখা হচ্ছে।

অন্যদিকে, রোগপ্রতিরোধী কার্যক্রমে বঙ্গবন্ধু সরকারের আমলে সৃষ্ট পদের প্রিভেন্টিভ স্বাস্থ্যকর্মীদের উপর কাজের পরিমাণ ১০ থেকে ১২ গুণ বেশী বাড়িয়ে দেয়া হলেও তাদের জীবন-মান উন্নয়নের দিকে কর্তৃপক্ষের নজর নেই। প্রজাতন্ত্রের অন্যান্য দপ্তরের কর্মচারীদের সাথে তুলনা করলে দেখা যায় – অনেক নিম্নগ্রেডের বেতনভোগী কর্মচারীগণ ৪ থেকে ৬ ধাপ উপরে উঠে গেছেন। নানা টাল-বাহানার মধ্য দিয়ে তাঁদের বেতনের গ্রেড পরিবর্তনের কার্যকর কোনো সম্ভাবনা না-থাকায় ক্ষোভের আগুনে পুড়ছেন এসকল মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মী। যৌক্তিক দাবীর বাস্তবান না করে, কর্মবিরতি স্থগিত বা প্রত্যাহার হলেও ২৭ হাজার কর্মীর মনে যে ক্ষোভের-বঞ্চনার আগুন জ্বলছে এটি নেভাবে কে?

যে কোনো দেশে জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষার কার্যক্রম প্রধানতঃ দু-ভাগে ভাগ করে সম্পাদন করা হয়। স্থাপনা মানে হাসপাতালের ভেতরে যে সকল স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রত্যক্ষভাবে রোগীর সেবা কাজে নিয়োজিত থাকেন তাঁদেরকে কিউরেটিভ স্বাস্থ্যকর্মী এবং স্থাপনার বাইরে (মাঠপর্যায়ে) নিরন্তরভাবে রোগের প্রতিরোধে কাজ করেন এমন সব স্বাস্থ্যকর্মীকে প্রিভেন্টিভ স্বাস্থ্যকর্মী বলা হয়ে থাকে।

বাংলাদেশের জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকার ও আমলাতন্ত্র রোগপ্রতিরোধী স্বাস্থ্য-জনবলের প্রতি উদাসীন থাকলেও এদের অবদান অবিস্মরণীয়। সংখ্যায় অপ্রতুল হলেও এদের কাজের বিনিময়ে সরকার পেয়েছেন ৭ টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার। আমাদের সকলের জানা উচিত যে, একটা দেশে কয়টা সরকারি ও বেসরকারি উন্নতমানের হাসপাতাল তৈরি করা হলো, কয়টি লিভার-হার্ট-কিডনি-চোখ ট্রান্সপ্লান্ট করা হলো, কয়টি জঠিল-কঠিন সার্জারী হলো, সিজারিয়ান ডেলিভারিতে শিশু জন্মালো এবং হাসপাতালে স্বাস্থ্যসেবার মান কেমন ছিলো? – এগুলো কিন্তু জনস্বাস্থ্য উন্নয়নের প্যারামিটার নয়। জনস্বাস্থ্য উন্নয়নের প্রকৃত সূচকগুলো হলো – গড় আয়ূ বৃদ্ধির পরিমাণ, টিকাদানের হার, মা ও শিশু মৃত্যুর হ্রাসকরণ, পুষ্ঠিমান উন্নয়ন, ভেজাল খাদ্যের নিয়ন্ত্রণ, বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়ন ইত্যাদি।

উল্লেখিত সূচকগুলোর উন্নয়নেই নিরন্তর কাজ করেন প্রিভেন্টিভ স্বাস্থ্যকর্মীরা। এদের শ্রম-ঘামের বিনিময়ে বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য আজ বিশ্বের বিস্ময়। এদের কাজের বিনিময়েই বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও জনগণ আজ বিশ্বের বুকে ভ্যাকসিন হিরোর সম্মানে ভূষিত। এদের পদের সংখ্যা বৃদ্ধি ও জীবন-মানের উন্নয়নে আমলাতন্ত্রের এত অনীহা কেন? এদেরকে শোষিত-বঞ্চিত রেখে এবং দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় চিকিৎসা সেবা বাণিজ্যের বাজার সম্প্রসারণের নীতি বহাল রেখে কি বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ে তোলা সম্ভব? ১০.১২.২০২০ খ্রিষ্টাব্দ।

লেখকঃ জনস্বাস্থ্য বিষয়ক কলামিস্ট ও সাংগঠনিক উপদেষ্টা, স্বাসেপ।

ছড়িয়ে দিন

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

Calendar

October 2021
S M T W T F S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31