রোজা বা সংযমের ফজিলত বিস্তৃত হোক অন্তরে

প্রকাশিত: ১২:১৪ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৫, ২০২১

রোজা বা সংযমের ফজিলত বিস্তৃত হোক অন্তরে

খছরু চৌধুরী

ইসলামের মূল ভিত্তি পাঁচটি। এগুলো হলো – (১) আল্লাহ ও আল্লাহর প্রেরিত রসুল সাঃ এর প্রতি ঈমান বা বিশ্বাস স্থাপন করা (২) সালাত বা নামাজ কায়েম করা (৩) জাকাত দেওয়া (৪) হজ্ব করা ও (৫) রমাদ্বান মাসে রোজা রাখা। (বুখারি, হাদিস নং ৭)। রোজা শব্দটি ফার্সি, উর্দু, হিন্দি ও বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত হলেও এর বুৎপত্তিগত অর্থ বুঝতে কারো অসুবিধা হয়না। আরবী শব্দ সওম (এবং বহুবচনে সিয়াম) এর বহু ভাষার প্রচলিত প্রতিশব্দ রোজার অর্থ যে ‘বিরত থাকা’ এইটুকু সকলেই বুঝি। ইসলামি শরিয়ত ও ফিকহ্ শাস্ত্রের পরিভাষায় – মহান আল্লাহর ইবাদত বা সন্তোষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে সুবহে-সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সকল প্রকার পানাহার ও যৌনসম্ভোগ থেকে বিরত থাকার নাম হলো রোজা বা সিয়াম।

বিশ্বাসীদের জন্য পবিত্র রমজান মাস করুণার সওগাত নিয়ে আসে। রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস এটি। ‘রহমত’ আল্লাহ্ তায়ালার বিশেষ গুণের বৈশিষ্ট্য। পবিত্র কোরআনের সঙ্গে রহমতের সুনিবিড় সম্পর্ক। মহান আল্লাহর এই রহমতের গুণটি দুনিয়ার সব মানুষ — মুসলিম- অমুসলিম, বাধ্য-অবাধ্য সবার জন্যই সমভাবে প্রযোজ্য। রমাদ্বান মাসের প্রথম দশ দিন রহমতের। মহান আল্লাহ্তায়ালা চান, তাঁর বান্দা তাঁর গুণাবলী অর্জন করে সে গুণে গুণান্বিত হয়ে আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি সেই গুণের প্রকাশ ঘটাক। পবিত্র রহমতের দশ দিন অতিবাহিত হবার পর শুরু হয় মাগফেরাত কামনার দশ দিন। মানুষ, শয়তানের বন্ধু-জাত মানুষের দ্বারা বিপথগামী হয়, পাপাচারে নিজের অন্তর কলুষিত করে। সে যদি তার ভুল বুঝতে পেরে খাসদিলে অনুশোচনা অনুভব করে এবং মহান আল্লাহর কাছে তওবা ও মাগফেরাত কামনা করে তাহলে মহান আল্লাহ তার গুনাহ মাফ করে দেন। পবিত্র কোরআনে এসেছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারীকে ভালোবাসেন এবং যারা পবিত্র থাকে তাদেরও ভালোবাসেন (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২২২)। রমজান মাসের শেষ দশ দিন যেহেতু নাজাত বা মুক্তির। সুতরাং এই দশ দিন আমাদের করণীয় হবে দুনিয়ার সবকিছুর আকর্ষণ ও মোহ থেকে মুক্ত হয়ে প্রভুপ্রেমে বিভোর হওয়া। বিশেষ করে — পাপ ও গুণাহ – যা জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হয়; যথা: ঘুষ-দুর্নীতির মত পাপাচার, খাদ্যেভেজাল মিশিয়ে বিক্রি করার মত পাপাচার, দায়িত্বে থেকে রাষ্ট্রীয় আমানতের কেয়ানত, ক্ষমতার লিপ্সায় সাধারণ মানুষকে ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে বিভ্রান্ত করা ইত্যাদি থেকে বিরত থাকা এবং নিজের মনকে পরিশুদ্ধ রাখা।

রমজানের অরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো- এটি কুরআন নাজিলের মাস। রমজানের এক সম্মানিত রাতে (লাইলাতুল কদরে) আল্লাহ তা’আলা উম্মতে মুহাম্মাদির জীবন পরিচালনার গাইড হিসেবে মহাগ্রন্থ কুরআনুল কারিম নাজিল করেছেন। একাধিক আয়াতে তা এভাবে বর্ণিত হয়েছে — ” شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِيَ أُنزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِّلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِّنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ রমজান মাস-ই হল সেই মাস; যাতে নাজিল করা হয়েছে কুরআন। যা মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সত্যপথ যাত্রীদের জন্য সুষ্পষ্ট পথ নির্দেশ আর ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য বিধানকারী (সুরা বাকারা : আয়াত ১৮৫)।” রোজা বা সাওম সাধনা সম্পর্কে হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, নবীজি (সা.) বলেন: যে ব্যক্তি মিথ্যা বলা ও মিথ্যা আমল বর্জন করেনি, তার এ পানাহার পরিত্যাগ করায় আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই (বুখারি, সওম অধ্যায়, পরিচ্ছেদ: ১১৯১, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ২৪২-২৪৩, হাদিস: ১৭৮২)।

পবিত্র রোজার ফজিলত বা শ্রেষ্ঠত্ব বা পূণ্য সমন্ধে জানার পর, বুঝবার পর কোনো মানুষ মুমিন মুসলমান যখন এটা থেকে নিজেকে বঞ্চিত রাখবে — তখন বুঝতে হবে এর বা এদের মত দূর্ভাগা জাতি এ পৃথিবীতে আর নেই। পৃথিবীর অনেক মুসলিম সংখ্যা গরিষ্ট ও লগিষ্ট দেশকে অবাক করে ৯০ ভাগ মুসলিম জনসংখ্যার এই বাংলাদেশে পবিত্র রমজান মাসে পূণ্যের চেয়ে পাপ-অর্জনের প্রতিযোগিতা যেন বেশী হয় — দেশপ্রেমিক আলীম- ওলামাদের সরকারি ব্যবস্থাপনার ঘুষ-দুর্নীতি বিরোধী বয়ানের অভাবে অনেকে মশগুল থাকেন জঘন্য ধরণের পাপাচার নিয়ে। যেমন – রমজান আসলে দ্রব্যমূল্যের দাম ও খাদ্যের ভেজালের পরিমাণ বাড়ে বহুগুণ! রাস্ট্র যন্ত্রের ভেতরের অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতিও বাড়ে! উপরোক্ত হাদিসে উল্লেখিত দিক-নির্দেশনা অমান্য করে যারা ফ্যাশন হিসেবে রোজা রাখবেন, তারাবিহ পড়বেন — মহান আল্লাহর বিচারে এরা তো আরও কঠিন শাস্তির সমমুখীন হবেন রোজ কেয়ামতের দিনে! কিন্তু মানুষ হিসেবে ইহজাগতিক সুস্থ বসবাসের স্বার্থে আমাদের কর্তব্য হলো — এসকল দোষী মানুষকে চিহ্নিত করে দুনিয়াবি বিচার ও শাস্তির আওতাধীন করা।

আসুন, পবিত্র রমজানের উছিলায় ফজিলতের অংশ হিসেবে রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে থাকা অসাধু আমলা, অদক্ষ ও দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদ এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় থাকা খাদ্যভেজালকারী, ঘুষকোর সকলের মুখোশের আড়ালে ঢেকে রাখা কুৎসিত অবয়বটি জনগণের সামনে উন্মোচিত করি। সংযমের ফজিলত বিস্তৃত করে নেই আমাদের অন্তরে অন্তরে। ১৪ এপ্রিল’২০২১ খ্রীঃ মৌলভীবাজার।

লেখকঃ স্বাস্থ্য প্রযুক্তিবিদ ও জনস্বাস্থ্য বিষয়ক কলামিস্ট mkmchowdhury@gmail.com