র‍্যামন মেগসাসাইয়ের নামে পুরস্কারটি কেন

প্রকাশিত: ৯:২৭ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৬, ২০২১

র‍্যামন মেগসাসাইয়ের নামে পুরস্কারটি কেন

 

হাজার হাজার বিপ্লবীকে হত্যাকারী ফিলিপাইন প্রেসিডেন্ট  র‍্যামন মেগসাসাইয়ের নামে পুরস্কারটি কেন?
পঞ্চাশের দশকে ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট ছিল র‍্যামন মেগসাসাই। তিনি ফিলিপাইনের নামকরা মেগসাসাই পরিবার থেকে এসেছিলেন। মেগসাসাই পরিবারে বহু উচ্চপদস্ত সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা থাকায় রেমন এর পক্ষে উপরে উঠা সহজ হয়। তার পরের জেনারেশনের মেগসাসাইরাও বড় বড় পদ ভোগ করে।
২য় মহাযুদ্ধে জাপান আর্মির জন্য ভয়ের ছিল হুকবালাহাপ ( Hukbalahap সংক্ষেপে হুক HUK) নামে একটি গেরিলা সেনাবাহিনী যাদের নারী পুরুষ মিলে ১৫ থেকে ২০ হাজার সৈন্য ছিল একটিভ, ৫০ হাজার ছিল রিজার্ভ। জাপান কর্তৃক আমেরিকার হাওয়াই দ্বীপের ঘার্টি পার্ল হারবার দখলের দশ ঘন্টার মধ্যে জাপানীরা ফিলিপাইন দখল করে আমেরিকান ও ফিলিপিনো যাকে পেয়েছিল, আটক করে। এরপর৷ ১৯৪৪৷ সালে আমেরিকাব সেনা নায়ক মেক আর্থার পুনর্দখল পর্যন্ত ফিলিপাইনে জাপানবীরা তান্ডব চালায়। ফিলিপিনোদেরকে দাস বানায়, হাজার হাজার নারীকে ভোগ করে। ফিলিপাইনের ৬০% এলাকায় হুকবালাহাপ জাপানীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিল। তাদেরকে মেক আর্থার অষ্ট্রেলিয়া থেকে সামরিক সহায়তা দেয় এমনকি সাবমেরিনও দেয়। তারা সোভিয়েত সহায়তা প্রধানত পেত। আমেরিকা শেষে দেখে, হুকবালাহাপ আসলে কম্যুনিষ্ট গেরিলা সংগঠন। জাপান থেকে ফিলিপাইন মুক্ত হলে তা হুকবালাহাপ এর হাতে পড়বে ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হবে। আমেরিকা পাল্টা আরেকটি ফিলিপিনো বাহিনী গঠন করে। রেমন মেগসাসাই তখন সে বাহিনীর ক্যাপ্টেন। হুকবালাহাপ বুঝতে পেরে তাদের কয়েকটা নীতি ঘোষণা করে ১) মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ ২) জাপ বিরোধী লড়াই ৩) সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াই ৪) মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াই।
বেশ, মার্কিনের কাছে জাপানের থেকে বড় শত্রু হয় হুকবলাহাপ। তারা এই গেরিলা গ্রুপকে ধ্বংস করার লড়াই শুরু করে। রেমন মেগসাসাইকে আমেরিকা নিয়ে বিশেষ ট্রেনিং দেয় সিআইএ। ফিলিপাইনের বিশাল যুব শ্রেণী যুক্ত হয় হুকবালাহাপ এর সাথে। শুরু হয় মার্কিন অপপ্রচার। সিআইএর কর্নেল এডওয়ার্ড লেন্সডেল বিশেষভাবে দায়িত্ব নেয় ফিলিপাইনের জনপ্রিয় বাহিনীটিকে নির্মুল করতে। ২য় মহাযুদ্ধ শেষে রেমন মেগসাসাইকে দশ হাজার সেনার একটি বিশেষ বাহিনীর দায়িত্ব দেয়া হয় যাদের কাজ ছিল ভয়ানক নির্মমতার সাথে বেআইনীভাবে হুকবালাহাপ এর ফিলিপিনো গেরিলাদের হত্যা করা। অথচ হুকবালাহাপ সাধারণ ভেটেও আসছিল এই ভেবে যে এক সময় ভোটে জিতে তারা সমাজতান্ত্রিক ফিলিপাইন বানাবে। প্রথম নির্বাচনে তাদের ৬ জন সদস্য পার্লামেন্ট মেম্বার নির্বাচিত হলেও তাদেরকে সংসদে বসতে দেয়া হয়নি। শুরু হয় ব্যাপক যুদ্ধ। ভয়ানক নির্মমতা দিয়ে রেমন মেগসাসাই হুকবালাহাপকে দমন করে। এর মধ্যে তিনি লিবারেল পার্টি থেকে সংসদ সদস্যও নির্বাচিত হন। হন ডিফেন্স সেক্রেটারি যার ক্ষমতা দ্বারা ফিলিপাইনে বিপ্লবী চিন্তার লোকজনকে হাজারে হাজারে হত্যা করা হয়।
১৯৫৩ সালে তিনি লিবারেল পার্টি ছেড়ে ন্যাশনালিষ্ট পার্টি থেকে প্রেসিডেন্ট পদে দাঁড়িয়ে জিতে যান যা সবই ছিল মার্কিনীদের পুরস্কার। ১৯৫৭ সালে এক বিমান দুর্ঘটনায় মারা যান। তার নামে আমেরিকার নিউ ইয়র্কের রকফেলার ফাউন্ডেশন একটি বাৎসরিক পুরস্কার দেয়ার প্রবর্তন করেন। যাকে এশিয়ার নোবেল বলা হয়। পুরস্কার দেয়ার শুরু ১৯৫৮ থেকে।
তখন সোভিয়েত এর সাথে আমেরিকার স্নায়ুযুদ্ধ চলছে। এরকম পুরস্কার দিয়ে বিভিন্ন দেশে কিছু লোককে বুদ্ধিজিবীর তকমা দেয়া হয় যারা পুজিবাদী বা পেটি বুর্জোয়াদের মনোভাবী (পেটি বুর্জোয়া মানে মার্ক্সিজম লেনিনিজম স্টাডি করেছেন, সমাজতান্ত্রিক প্রগতিশীল মনোভাব দেখান কিন্তু আসলে পুঁজিবাদের প্রতি থাকে দুর্বলতা) লোক, যারা মুলত পুঁজিবাদের পক্ষে বুদ্ধিজীবীর অবস্থানে উঠেন। এভাবে মনস্তাত্ত্বিক ক্ষেত্রে কোন দেশের প্রগতিশীলতাকে পুজিবাূী ও সুবিধাবাদ এর পক্ষে প্রভাবিত করা। পুরো পর্ব এশিয়ার দেশগুলোর প্রগতিশীল উত্থানকে আমেরিকা এভাবে দমন করেন। ইন্দোনেশিয়ার ঘটনা আরো মারাত্মক। যদিও চিন, উত্তর কোরিয়া ও ভিয়েতনামে পারেনি। ভিয়েতনামে আমেরিকা সরাসরি যুদ্ধ করে হারে।
রেমন মেগসাসাই পুরস্কারটি এখনো দেয়। তবে এদেশেও এ পুরস্কার নিতে কেউ বিরোধিতা করেনি। সুইডেনের নোবেল পুরস্কারও পুঁজিবাদী মনোভাবী লোককে দেয়ার চেষ্টা হয়। তবে কিছু ব্যতিক্রমও ঘটে। জ্য পল সার্তকে দেয়া নোবেল সাহিত্য পুরস্কার তিনি প্রত্যাখান করেছিলেন।
মার্কিনের বিশ্বস্ত দালালী করে সমাজতন্ত্র প্রতিরোধ করা ছাড়া রেমন মেগসাসাই এর আর তেমন কোন অবদান ছিল না। হা বলা হয় তার সময়ে ফিলিপাইনে দুর্নীতি ছিল না, বাণিজ্য, শিল্প, সংস্কৃতিতে বিরাট উন্নতি ছিল – এসব মনে হয় বলতে হয় বলে বলা। না হলে তার নামে পুরস্কার দেয়ার মানবিক গুন থাকে না।
এরকম একটা খুনি ও ঘৃণিত লোকের নামের পুরস্কার কোন দেশে কেউ এ পুরস্কার গ্রহণ করতে অসম্মতি জানায়নি, এটাই আশ্চর্য চয়েস তাদের। এ পুরস্কার নিশ্চিত ফিলিপাইনে অনেক পরিবারের স্বজন হারানোর ব্যদনার বিষয়।
সুতরাং মানুষ এবারে মেগসাসাই পুরস্কার পাওয়া ড, ফেরদৌসি কাদরীকে চিনবার চেষ্টা না করে সে সময়ে ছিল পরীমনির মুক্তি সংগ্রামে। কারণ পরীমনির মুক্তিতে নারীর প্রতি সহিংসতার আলামত দেখেছেন। সেটা মানুষের কাছে বেশি গুরুত্ব বহন করেছিল। বরং কাদেরী যদি পুরস্কারটা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন খুনির নামের পুরস্কার বলে, সেটা হবে মানুষের মুক্তির বার্তা।
(সুত্র — গুগল)

ছড়িয়ে দিন