লকডাউনের কারণে

প্রকাশিত: ১:০১ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১১, ২০২০

লকডাউনের কারণে

জেসমিন চৌধুরী

আমার নিউরোসাইকোলজিস্টের সাথে এপয়েন্টমেন্ট ছিল গতকাল। লকডাউনের কারণে ফোনেই কথা হলো।
সে বলে, ‘তুমি কেমন আছো?’
আমি বলি, ‘কেউ ভালো নেই।’
সে বলে, ‘সবার কথা ছাড়ো, তুমি কেমন আছো?’
আমি বলি, ‘আমার কথা ছাড়ো, তুমি কেমন আছো?’
সে বলে, ‘এই সেশনটা তোমার ভালো থাকা নিয়ে, আমাকে নিয়ে নয়।’
আমি বলি, ‘এখন সবকিছু অন্যরকম। আমার আর তোমার মধ্যে এখন আর তেমন কোনো পার্থক্য নেই।’
সে বলে, ‘ব্যাখ্যা করো।’
‘তুমি কি ঘর থেকে কাজ করছ?’
‘না, আমাকে নিউরোলজি ওয়ার্ডে রোজ ডিউটি করতে হয়, অল্প কাজ‌ই শুধু ফোনে সারা যায়।’
‘তোমার পিপিই আছে তো? তুমি ঠিক আছো তো? থাকবে তো?’

সে এই প্রশ্নের উত্তর দেয় না। কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে আবার বলে,
‘তুমি তো নিজের কথা একেবারেই বলছ না। যতদুর মনে পড়ে, ক্রিসমাসের পর প্যানিক এটাক হয়ে ইমার্জেন্সিতে যেতে হয়েছিল তোমাকে। তারপর বাংলাদেশে চলে গেলে। এখন কেমন আছো?’
‘বাংলাদেশ ভালো নেই। দিনমজুরদের অনেকের ঘরে খাবার নেই, ডাক্তারদের পিপিই নেই। বস্তি আর রিফুজি ক্যাম্পে সামাজিক দুরত্বের উপায় নেই। মড়ক শুরু হলে সব সাফ হয়ে যাবে।’
‘এসব কি তোমাকে অনেক কষ্ট দিচ্ছে?’
‘আমার কষ্ট বলে এখন আর কিছু নেই। পৃথিবীর অসংখ্য মানুষ কষ্টে আছে। গার্ডেন সেন্টারের সব গাছ ফেলে দিতে হয়েছে। গ্রিন রাবিশ কালেকশন বন্ধ। ফার্মগুলো একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। মৃত্যুর মুহূর্তে স্বজনকে দেখতে পারছে না লোকে। মৃতের যথাযথ মর্যাদায় সৎকার হচ্ছে না। কেয়ার হোমের বৃদ্ধরা টেস্ট ছাড়াই হারিয়ে যাচ্ছেন।’
‘তুমি এসবের সাথে কীভাবে cope করছ?
‘আমি জানি না, আমি ভাবিনি।’
‘আমরা এই বিষয়ে আগেও কথা বলেছি। তোমাকে নিজের কথা ভাবতে হবে।’
‘আমার তো অনেক কিছু আছে। আমার তুলনায় অনেক বেশি কষ্টে আছে অনেক বেশি মানুষ। এই সময়ে নিজের কথা কীভাবে ভাবব?’
‘দুটো পাশাপাশিও হতে পারে। সবার কথা ভাবলে, আবার নিজের কথাও ভাবলে। তোমার কি মনে হয় এখন তুমি আগের চেয়ে একটু ভালো আছো?’
‘অনেক কঠিন প্রশ্ন। আমি নিজে অনেক ভালো আছি, আবার সবার সাথে মিলে আগের চেয়ে অনেক খারাপ আছি। কিন্তু আমার দুশ্চিন্তার ধরন পাল্টে গেছে। আমার মনে হয় এই প্যানডেমিক আমার মানসিক রোগ সারিয়ে দিয়েছে।’
‘সেটা কীভাবে?’
‘ভাববার মতো এতো বেশি বিষয় যে নিজের কথা ভেবে প্যানিক এটাক হবার কোনো সুযোগ নেই।’
‘তোমার অনেক লেখালেখির পরিকল্পনা ছিল, সেসবের কী খবর?’
‘বদলে যাওয়া জগতের জন্য কী লিখতে হবে আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।’
‘সময়টা আসলেই কঠিন।’

‘আমার মনে হচ্ছে সমস্যার উঁচু নিচু পাহাড়গুলো সব সমতল হয়ে গেছে। হতে পারে তুমি থেরাপিস্ট আর আমি রোগী কিন্তু এই বদলে যাওয়া সময়ে আমরা প্রায় সমান দুঃখী।’
‘তোমার এই জিনিসটা ভালো, আবার একটু খারাপও। তুমি একটা ঘন্টার জন্য অন্তত শুধু নিজের উপর ফোকাস রাখতে চেষ্টা করো।’
‘পারছি না।’
‘তুমি কি এই সবকিছুর মধ্যে ইতিবাচক থাকতে পারছ?’
‘আমার সমস্ত অস্তিত্বে এখন ইতিবাচকতা। নিয়মিত ব্যায়াম করছি, বাচ্চাদের সাথে সময় কাটাচ্ছি। রান্নার উপকরণ থেকে বিচি নিয়ে বাগান করছি। নিজ হাতে বাগানে মাটি খুঁড়ে রান্নাঘরের আবর্জনা পুঁতে রাখছি। কালো বিনে সবুজ জিনিস কিছুতেই ফেলবো না আমি। করোনাকে জয়ী হতে দেব না।’
‘এটা ভালো। কিন্তু নিজেকে ক্লান্ত করে ফেলছ না তো?’
‘আমার ছেলে বারবার জিজ্ঞেস করছে আমার শরীরে এতো প্রাণ ক‌ই থেকে আসে? আমি জানি না, শুধু জানি আমাকে লড়তে হবে যতদিন সম্ভব, যতভাবে সম্ভব।’
‘ভবিষ্যতের কথা ভাবলে কেমন লাগে?’
‘আমি খুব আশাবাদী। হয়তো অনেক মানুষ মরবে। হয়তো বিশ্ব অর্থনীতি আমার জীবদ্দশায় আগের অবস্থায় ফিরে যাবে না। কিন্তু মানুষ হিসেবে আমরা আগের চেয়ে সহজ হবো, ভালো হবো। হয়তো আগের মতো সহজে কেউ কারো হাত ছোঁব না কিন্তু কাঁধ মিলিয়ে কাজ করব। প্রকৃতির প্রতি যত্নশীল হবো। আমি ভীষণ ভাবে বেঁচে থাকতে চাই। পৃথিবীর কাজে আসতে চাই।’

‘আমি কি আবার দুই সপ্তাহ পর তোমাকে কল করব?’
‘মনে হয় না তার প্রয়োজন আছে। আমি নিজেকে সামলাতে পারছি। তোমাদের সার্ভিস এখন অনেকের প্রয়োজন হবে। তাদেরকে সময় দাও।’
‘আবার! সবার তো তোমার মতো ব্রেইন হেমারেইজ হয়নি। সবার প্রয়োজন তোমার মতো নয়। আবার তোমার অনিচ্ছায় জোর করে তোমাকে সার্ভিস দেয়াও সম্ভব নয়।’
‘আমার মনে হয় এখন এসব বাদ দাও। আমি এখন নিজের উপর ফোকাস করে ভাবতেই পারছি না। কথা বলা তো দূরের কথা।’
‘ঠিক আছে, যদি এই করোনা সমস্যা দূর হয়, আমি জুলাই মাসের দিকে তোমার খবর নেব। এর আগে দুশ্চিন্তা বা প্যানিক বোধ করলে তোমার কাছে আমার নাম্বার তো আছেই, কল দিও।’

ছড়িয়ে দিন

Calendar

December 2021
S M T W T F S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031