ঢাকা ১৮ই জুলাই ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৩রা শ্রাবণ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ১১ই মহর্‌রম ১৪৪৬ হিজরি


লাখো গৃহহীন পুনর্বাসন-আকাশ ছোঁয়া রেকর্ড বাংলাদেশের

redtimes.com,bd
প্রকাশিত মার্চ ১২, ২০২১, ১২:৪৬ পূর্বাহ্ণ
লাখো গৃহহীন পুনর্বাসন-আকাশ ছোঁয়া রেকর্ড বাংলাদেশের

মো. রেজুয়ান খান

কোটি কোটি বাঙালির নির্ভরতা ও আস্থার ঠিকানা বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল ও দুরদৃষ্টিসম্পন্ন পরিকল্পনা আর সুদক্ষ নেতৃত্বে অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রা অব্যাহত রয়েছে বাংলাদেশের। করোনার এই কঠিন সময়েও দিন রাত তাঁর সুদূরপ্রসারী চিন্তা ভাবনা দেশের মানুষ আর দেশকে উন্নয়নের শিখরে নিয়ে যাচ্ছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ক্ষুধা, দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। সরকার প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার ও সমাজের প্রকৃত গৃহহারা ভূমিহীনদের সামাজিক নিরাপত্তা বিধানের নিশ্চয়তাসহ সম্পূর্ণ বিনা খরচে পাকাঘরে পুনর্বাসন করছে। গৃহহীন মানুষদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে ১৯৭২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তৎকালীন নোয়াখালী জেলার রামগতি থানা (বর্তমানে লক্ষ্মীপুর জেলা) পরিদর্শন করে তিনি স্বচক্ষে সেখানকার গৃহহীন মানুষের কষ্ট দেখে ব্যথিত হয়েছেন। তাৎক্ষণিক সেখানকার ২০০ ক্ষতিগ্রস্ত গৃহহীন পরিবারকে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ২০০টি ঘর তৈরি করে দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি। সেই ২০০ পরিবারের জন্য নির্মিত ঘরগুলোকে বঙ্গবন্ধু পোড়াগাছা ‘গুচ্ছগ্রাম’ নামে অভিহিত করেছিলেন। সেই থেকেই গুচ্ছগ্রাম প্রতিষ্ঠার শুরু। ঐবছরই বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে বৃহত্তর নোয়াখালীতে আরও ৪টি গুচ্ছগ্রাম তৈরি এবং সেগুলোতে ১ হাজার ৪৭০টি পরিবারের প্রায় ১০ হাজার গৃহহীন মানুষকে পুনর্বাসন করা হয়েছিল। খোলা আকাশের নিচে বাস করা মানুষদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা নিশ্চিত হওয়ায় তাদের মুখে সেইসময় হাসি ফুটে ওঠেছিল।

১৯৯৭ সালের ১৯ মে কক্সবাজার ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হয়ে অনেক মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৭ সালের ২০ মে কক্সবাজার পরিদর্শনে যান এবং সেখানকার গৃহহীন মানুষের আহাজারি নিজ চোখে দেখে ব্যথিত হন এবং তাঁরই নির্দেশনায় ১৯৯৭ সালে ‘আশ্রয়ণ’ নামে একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙ্গনে ভূমিহীন, গৃহহীন ও ছিন্নমূল পরিবার পুনর্বাসনের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ‘আশ্রয়ণ’ প্রকল্পটি পরিচালিত হচ্ছে। ‘যার জমি আছে ঘর নেই, তার নিজ জমিতে ঘর নির্মাণ’ উপখাতের আওতায় একটি সেমি পাকা ঘর নির্মাণে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের অনুকূলে আশ্রয়ণ-২ প্রকল্প হতে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ প্রদান। যাদের এক শতাংশ থেকে ১০ শতাংশ ভিটে বাড়ির জমি আছে, কিন্তু ঘর নাই, তাদেরকে তালিকাভুক্ত উপকারভোগী হিসেবে চিহ্নিত করা। অনুমোদিত প্লান, ডিজাইন, প্রাক্কলন ও গুণগতমান বজায় রেখে ঘর নির্মাণ করা। উপজেলা আশ্রয়ণ-২ প্রকল্প বাস্তবায়ন টাস্কফোর্স এর সভাপতি ও আয়ন ব্যয়ন কর্মকর্তার দায়িত্বপ্রাপ্ত হলেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার। যার জমি আছে ঘর নাই বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি ও নীতিমালা অনুযায়ী গঠিত কমিটি (পিআইসি) দ্বারা নির্মাণ কাজ বাস্তবায়ন করে থাকেন। কাজের গুণগতমান স্পষ্টিকরণে কার্যাদেশপত্রে উল্লেখ রয়েছে, নির্মিতব্য সেমিপাকা ঘরের নকশা ও প্রাক্কলন আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের ওয়েবসাইট www.ashrayanpmo.gov.bd থেকে সংগ্রহ করে সে অনুযায়ী কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। এ বিষয়ে কোনো অস্পষ্টতা থাকলে সরাসরি প্রকল্প পরিচালককে অবহিত করার উল্লেখ আছে। ১৯৯৭ থেকে জুন ২০২০ পর্যন্ত ২১৭২টি আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে ১ লাখ ৬৫ হাজার ছিন্নমূল, গৃহহীন পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়েছে। এছাড়া যার জমি আছে ঘর নেই, তার নিজ জমিতে ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে ১ লাখ ৫৩ হাজার ৭৭৭টি। আশ্রিত পরিবারের সদস্যদের জীবনমান পরিবর্তনের লক্ষ্যে পুনর্বাসিত প্রতি পরিবারকে ৩০ হাজার টাকা করে ১ লাখ ৪২ হাজার ৭১৮টি পরিবারকে ক্ষুদ্র ঋণ দেওয়া হয়েছে। আশ্রয়ণ প্রকল্পের অভ্যন্তরে ১৫ লাখ ৫৪ হাজার ৬৭৫টি বৃক্ষ রোপণ করা হয়েছে। আশ্রয়ণবাসীদের বিনোদনের জন্য ২ হাজার ২০১টি কমিউনিটি সেন্টার নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া আশ্রয়ণবাসীদের জন্য ২০টি টং ঘর ও ৪৬১টি পুকুরের ঘাটলা তৈরি করে দেওয়া হয়েছে।

 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গৃহহীন মানুষের কষ্ট ও দুর্দশার কথা অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করেছেন। মুজিব জন্মশতবর্ষে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা- দেশে একজন মানুষও গৃহহীন থাকবে না, মুজিব জন্মশতবর্ষের জন্য এটাই বড়ো উৎসব। সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে ভূমিহীন, গৃহহীন, ছিন্নমূল পরিবারের স্বামী-স্ত্রী উভয়ের যৌথ নামে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ভূমির মালিকানা স্বত্বের কবুলিয়ত দলিল সম্পাদন, রেজিস্ট্রি ও নামজারি করে দেওয়া হচ্ছে। আশ্রয়ণ ও গুচ্ছগ্রামে পুনর্বাসিত পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন উৎপাদনমুখী ও আয়বর্ধক ব্যবহারিক কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। প্রশিক্ষণ শেষে তাদেরকে আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নে ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণ করা হয়। আগামি ২০২২ সালের মধ্যে তালিকাভুক্ত আরও চার লাখ মানুষকে পুনর্বাসন করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত রয়েছে। বর্তমানে আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের ব্যারাক নির্মাণের দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ আর ‘যার জমি আছে ঘর নেই, তার নিজ জমিতে ঘর নির্মাণ’ এর কাজটি উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন, দেশে কোনো গৃহহীন থাকবে না। প্রত্যেক গৃহহীন পরিবার সম্পূর্ণ বিনামূল্যে স্থায়ীভাবে বাড়িসহ দুই শতক জমির মালিকানা বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সেমিপাকা প্রতিটি বাড়িতে থাকছে দুইটা বেডরুম, একটা কিচেন রুম, একটা ইউটিলিটি রুম, একটা টয়লেট ও একটা বারান্দা। ইটের দেয়াল, কংক্রিটের মেঝে এবং রঙিন টিনের ছাউনি দিয়ে তৈরি হবে দুই কক্ষের আবাসন। দেশের সকল ভূমিহীন ও গৃহহীন অর্থাৎ ‘ক’ শ্রেণির পরিবার পুনর্বাসন কার্যক্রমের জন্য প্রণীত নীতিমালায় আরও কিছু জনকল্যাণমূলক ১৫টি বিষয়ে নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। মুজিববর্ষে ‘বাংলাদেশের একজন মানুষও গৃহহীন থাকবে না’-এই নির্দেশনা বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় হতে ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১ অনুসরণীয় নির্দেশনাসমূহের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- শুধুমাত্র ‘ক’ শ্রেণির ভূমিহীন ও গৃহহীন নির্বাচনে উপজেলা প্রশাসন ভিক্ষুক, প্রতিবন্ধী, বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা, ষাটোর্ধ প্রবীণ ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার বিবেচনা করে উপকারভোগীর তালিকায় অন্তর্ভুক্তকরণের নির্দেশনা। ঘর নির্মাণ সামগ্রী (কাঠ, টিন, ইট, বালু, সিমেন্ট ইত্যাদি) এর গুণগত মান নিশ্চিত হয়ে সঠিকভাবে ব্যবহার করা; নির্মাণ কাজের গুণগতমান আবশ্যিকভাবে বজায় রাখা; নির্মাণ কাজ চলাকালে যথাযথ কিউরিং ও বালু সিমেন্টের মিশ্রণ অনুপাত সঠিকভাবে করা; গুণগতমান নিশ্চিতকল্পে পূর্ত কাজ সম্পাদনে প্রয়োজনীয় ন্যূনতম সময়সীমা ও পর্যায়ক্রমিক ধাপ অনুসরণ করা; প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) এর সকল সগস্যগণ নির্মাণ কাজ তদারকিতে তৎপর থাকা; বিচ্ছিন্ন বা দুর্গম বা নদী ভাঙ্গনপ্রবণ এলাকায় গৃহ নির্মাণ করা যাবে না। নির্বাচিত জায়গাটি গ্রোথ সেন্টারের নিকটবর্তী হতে হবে। উপকারভোগী নির্বাচনের পূর্বে বিদ্যমান তালিকা যাচাই করতে হবে। তালিকার বাইরে প্রকৃত ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবার থাকলে তারাও গৃহ নির্মাণের আওতায় আসবে। তবে এক্ষেত্রে উপজেলা টাস্কফোর্স কমিটির অনুমোদন নিতে হবে। সবিশেষে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কোনো অবস্থাতেই উপকারভোগীর নিকট হতে পরিবহণ বা অন্য কোনো খরচের অর্থ নেওয়া হবে না। সত্যি নির্দেশনাসমূহ জনবান্ধব ও গরিব মানুষদের জন্য অত্যন্ত উপযোগী।

১৯৯৬ সাল থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২১ পর্যন্ত মোট ৯ লাখ ৯৮ হাজার ৩৪৬টি ছিন্নমূল গৃহহীন পরিবারকে বাসস্থানের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে। সম্পূর্ণ সরকারি খরচে লাখ লাখ গৃহহীন মানুষকে জমির মালিকানাসহ পাকা বাড়ি নির্মাণ করে দেওয়ার নজির পৃথিবীতে আর কোথাও নাই। এটি কোনো গল্প বা স্বপ্ন নয়। এটা হচ্ছে বাংলাদেশের সম্পূর্ণ বাস্তবতার চিত্র। লাখো গৃহহীনকে একসাথে পুনর্বাসন করার মাধ্যমে পৃথিবীতে এক আকাশছোঁয়া রেকর্ডের নজির স্থাপন করলো বাংলাদেশ।
#

সংবাদটি শেয়ার করুন

July 2024
S M T W T F S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031