লাঠিটিলা ধংসের সরকারি চক্রান্ত বন্ধ করতে হবে!

প্রকাশিত: ১০:৩৪ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৮, ২০২১

লাঠিটিলা ধংসের সরকারি চক্রান্ত বন্ধ করতে হবে!

দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মৌলভীবাজারের জুড়ি উপজেলা । সেখানে অবিস্থিত  মিশ্র চিরসবুজ বনাঞ্চল লাঠিটিলা। দেশের সমৃদ্ধ সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মধ্যে লাঠিটিলা দ্বিতীয়, যেটি ভারত-বাংলাদেশের সীমান্তে অবস্থিত। এই বনকে ধংস করার নতুন এক  পাঁয়তারা করা হচ্ছে । যেখানে প্রাকৃতিক বনসম্পদ ও বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য। দেশের সংকটাপন্ন জীব-বৈচিত্র্যের সমৃদ্ধ এ আশ্রয়কেন্দ্র রক্ষণাবেক্ষণ করতে সরকারি ব্যবস্থাপনা  হিমশিম খাচ্ছে ,  সরকার সেখানে সাফারি পার্ক করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এ নিয়ে সম্ভাব্য ৯৮০ কোটি টাকার  বাজেটও জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। দেশের সাফারি পার্কগুলোর বেহাল অবস্থার মধ্যে এই নতুন পার্ক করার পরিকল্পনা কেন? আমার বোধগম্য নয়।

 

দেশের একমাত্র বন লাঠিটিলা যেখানে বন্য হাতি রয়েছে। ভারতে সাথে মিশ্র এই বনে অনেক দুর্লভ প্রাণী রয়েছে যার সঠিক হিসেবই নেই আমাদের হাতে। সেগুলোকে তাড়ানোর জন্য সেখানে ভারি অবকাঠামো নির্মাণ হবে? মানুষের চলাচল বাড়ানোর ফলে বনের কী অবস্থা হয়েছে তা ইতোমধ্যে দৃশ্যমান।

 

মৌলভীবাজারে এর আগে বর্ষিজোড়া ইকোপার্ক, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবকুণ্ড ইকোপার্ক, মাধবপুর লেক, বাইক্কার বিলসহ বেশ কিছু ইকো ট্যুরিজমের অধীনে পর্যটনকেন্দ্র রয়েছে। বছরে প্রায় পাঁচ লাখ পর্যটক সেখানে যান। তার মধ্যে  বর্ষিঝোড়া ইকোপার্ক নির্মাণ করে সরকারি টাকা রীতিমতো জলে ঢালা হয়েছে। ২০০৬ সালে ঘোষিত ইকোপার্কের সকল অবকাঠামো নির্মাণ হলেও আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও চালু করতে পারেনি সরকার। অথচ এই বর্ষিজোড়া একসময় বিপন্ন শকুনের নিরাপদ আশ্রয়স্থল ছিল। সেখানে পার্ক নির্মাণ হওয়ার পর মানুষের চলাচলে সেসব শকুন আর নেই। সাফারি-পার্ক যদি  করতেই হয় তাহলে এই বনকে কেন ব্যবহার না করে সেটা  লাঠিটিলায় করতে হবে? এছাড়া লাউয়াছড়ায় পর্যটকদের চাপে বনভূমির জীববৈচিত্র্য হুমকিতে আছে বলে সরকারি-বেসরকারি নানা গবেষণায় উঠে এসেছে। তারপর সংরক্ষিত বনে পর্যটন কেন্দ্র নির্মাণে কুফল নিয়ে আমাদের জ্ঞান হচ্ছে না কেন? পর্যাপ্ত গবেষণা না থাকা এর একটি কারণ বলা যায় কিন্তু সেটি বলারও সুযোগ রাখেন না আমলারা। যেমনটি হচ্ছে লাঠিটিলার ক্ষেত্রেও।

 

আইন অনুযায়ী কোনো সংরক্ষিত বনে পার্ক করার জন্য একটি বৈজ্ঞানিক কমিটি করার দরকার হয়। লাঠিটিলায় সাফারি পার্ক করার জন্যও একটি কমিটি হয়েছে তাঁরা গবেষণা করে প্রাণীদের সংখ্যা বলে দিয়েছে মাত্র দুই মাসে। সমীক্ষাটির নেতৃত্ব দিয়েছেন বন বিভাগের প্রকৃতি সংরক্ষণ এবং বন্য প্রাণী অঞ্চলের সাবেক বন সংরক্ষক ড. তপন কুমার দে। কোটি টাকা ব্যয়ে এই গবেষণা দুই মাসে কিভাবে সম্ভব হয়? ১২ শ একরের বনের প্রাণীর হিসেব বের করতে যেখানে আট বছর সময় লাগার রেকর্ড আছে সেখানে ৫ হাজার একর বনের হিসেব দুই মাসে বেরিয়ে গেছে কিভাবে? তাও সীমান্তের একটি বনের প্রাণীর হিসেব এতো সহজ হয়ে গেল উনাদের কাছে! বনের ভারতের অংশে যেসব প্রাণী আছে তারা একটা মৌসুমে এপারে থাকে আরেক মৌসুমে ওপারে যায়। তাদের হিসেব কারা বের করবে? বুঝাই যাচ্ছে এই গবেষণা আসলে নিজের পকেটের মানুষ দিয়ে নামকাওয়াস্তে করা হয়েছে। তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে বনকে হজম করা।

 

সম্প্রতি প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে এই বনের গবেষণাকাজ ও পার্ক নির্মাণের নেতৃত্বে আছেন সাবেক বন সংরক্ষক ড. তপন কুমার। তিনি এর আগেও দেশের দুইটি সাফারি পার্ক নির্মাণে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ১৯৯৯ সালে কক্সবাজারের চকরিয়ায় বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক ও ২০১২ সালে গাজীপুরে বঙ্গবন্ধুর নামে আরেকটি সাফারি পার্ক নির্মিত হয়। দুটি সাফারি পার্ক নির্মাণেই প্রধান ভূমিকা রাখেন তপন কুমার। সেসব পার্ক নির্মাণে তার বিরুদ্ধে অনেক দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গিয়েছিল। এছাড়া তার নামে বন্যপ্রাণী নিয়ে বাণিজ্য করা থেকে শুরু করে বনবিভাগের টাকা আত্মসাৎ, ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ আছে। এ নিয়ে তাকে কাঠগড়ায়ও দাঁড়াতে হয়েছিল। জেল খেটেছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে। সেই লোক এবার আরেকটি সাফারি পার্ক করতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন মানে এখানে কী ঘটতে যাচ্ছে তা সচেতন মানুষ ভালোই বুঝতে পারছেন। দেশের বন্যপ্রাণী বিদেশে পাচার করে টাকা কামানো আবার সাফারি পার্ক নাম দিয়ে বিদেশি প্রাণী আমদানি করে সরকারের ভাণ্ডারে হাত ঢুকানো ছাড়া কিছু নয়। না হলে বিশ্বব্যাপী সাফারি পার্ক যখন উঠিয়ে দিয়ে বন্যপ্রাণীদের অবমুক্ত করা হচ্ছে বাংলাদেশের মতো  নতুন একটি উন্নয়নশীল দেশে কেন সাফারি পার্ক করে অর্থ খরচ ও বন ধংস করা হবে? দেশে উন্নয়নকাজ করার জন্য এখনও হাজার সমস্যা পড়ে আছে।

 

ভালো লাগার বিষয় হচ্ছে জুড়ির লাঠিটিলার কিছু অংশ দখল হলেও এর ইকো-সিস্টেম এখনও প্রাণীদের উপযোগী। যদিও এই দখল সরকারে অবহেলার কারণে হয়েছে। কারণ সংরক্ষিত বনে প্রবেশ করাও নিষেধ করে আইন রয়েছে। এর রক্ষণাবেক্ষণ না থাকায়  মূলত মানুষ দখলের সুযোগ পান। এসবে আবার স্থানীয় নেতাদের হাত থাকে। যারা রাজনীতি করে টাকা কামানোর জন্য। একসময় মানুষ রাজনীতি করে টাকা খোয়াতেন আর এখন রাজনীতি করে কামাই করেন। তবে বনের পরিমাণ অনুযায়ী দখলের মাত্রা খুব নগণ্য। তাদের উচ্ছেদ করা সম্ভব।

 

লাঠিটিলা সীমান্তবর্তী বন হওয়ায় তা অনেকটা নিরাপদ ছিল। পার্শ্ববর্তী  ভারতে বিশাল সংরক্ষিত বন থাকায় প্রাণীদের অবাধ বিচরণ রয়েছে সেখানে। পরিবেশগতভাবে অরক্ষিত লাঠিটিলা অঞ্চলটি ইন্দো-বার্মা জীববৈচিত্র্য হটস্পটের অংশ। দেশের ছয়টি আন্তঃসীমান্ত সংরক্ষিত বনের একটি এই অরণ্য। বন্যপ্রাণীরা দিনকে দিন বিপন্ন হচ্ছে সেখানে এই বন তুলনা অনুপাতে ভালো ছিল। তাকে কাজে লাগিয়ে বিশাল এই বনাঞ্চলকে আরও নিরাপদ করা যেত। এখানে বন্যপ্রাণী সঠিক খাদ্য নিশ্চিত করে ওপারের প্রাণীদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়া দরকার ছিল। তা না করে তাদের তাড়িয়ে দেয়ার আয়োজন করা হচ্ছে? লাঠিটিলা উজাড় হয়ে গেলে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বন্যপ্রাণীদের আর নিরাপদ কোনো আবাস থাকবে না। সবই সরকারি-বেসরকারিভাবে হজম করা হয়ে গেছে। বাকি আছে লাঠিটিলা!

 

পরিকল্পনা অনুযায়ী লাঠিটিলায় সাফারি পার্ক নির্মিত হলে সেখান পর্যটকদের জন্য নানা অবকাঠামো, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন, উপকেন্দ্রসহ ভারী অবকাঠামো নির্মিত হবে। আর সেখানে বছরে ৮ থেকে ১০ লাখ দর্শনার্থী আসবেন বলে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। সাফারি পাক করার কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে বন দখলমুক্ত করা। উনারা দখল দেখছেন আর সেটি থেকে বন রক্ষার জন্য একটা সংরক্ষিত বনে ভবন নির্মাণ করবেন, বিদ্যুৎ জ্বালাবেন এবং বছরে লাখ লাখ মানুষকে এনে বনের মধ্যে পিকনিক করাবেন। বাহ বাহ, কী পরিকল্পনা আমাদের সরকারের। জীবন বাঁচাতে বন যে বাঁচাতে হয় তা উনারা জানেন না এখনও। উনাদের প্রশাসনিক ক্ষমতার ব্যবহার করে পার্ক করার জন্য মানুষকে উচ্ছেদ করতে পারেন কিন্তু বন রক্ষা করার জন্য সংরক্ষিত বন থেকে মানুষকে উচ্ছেদ করতে পারেন না, দখল ঠেকাতে বনের সঠিক রক্ষণাবেক্ষণে সক্রিয় থাকতে পারেন না। বর্তমান সরকারের উন্নয়নের ধারায় মন্ত্রী-আমলারা এখন শুধু ইট পাথরকে জোড়া দেয়াকে উন্নয়ন বুঝেন। ইটপাথর জোড়া দেয়ার কাজ হলেই তো টাকা নামবে। প্রকল্প হলেই তো লুটপাট করা যাবে! পরিবেশের বারোটা বাজিয়ে একসময় মানুষ যখন অক্সিজেন পাবে না তখন আপনাদের টাকা দিয়ে কী হবে?

 

তারপরও ধরলাম আমাদের মন্ত্রী মহোদয় খুব সৎ মানুষ প্রধানমন্ত্রী বলেছেন যেহেতু তাই তিনি এতো দুর্নীতির হিসেব বুঝেন না। মনে করলাম সাফারি পার্ক করার দরকার ছিল তাই করছেন। কিন্তু সাফারি পার্ক করার জন্য মৌলভীবাজার জেলায় বর্ষিজোড়া ইকো পার্ক (পরিত্যক্ত) ও কুলাউড়ায় সম্ভাব্য ইকোপার্কে বিশাল জায়গা রয়েছে। সেগুলোকে চালু না করে নতুন এই প্রকল্প কিসের জন্য? মৌলভীবাজারে বিনোদনের জায়গার কোনো অভাব নেই। প্রতি বছর  লক্ষ লক্ষ পর্যটক মৌলভীবাজার ভ্রমণ করেন। তারপর লাঠিটিলায় সাফারি পার্কের নামে এই বৃহৎ চিড়িয়াখানার দরকার কেন? পর্যটন জেলা হিসেবে মৌলভীবাজার সমাদৃত তারপরও কেন পর্যটন কেন্দ্র বাড়াতে হবে? আসলে অন্য কোথাও করলে হচ্ছিল না, নিজের নির্বাচনী এলাকায় করতে হবে। সেখানকার নেতাদের কিছু সুবিধা দিতে হবে? মৌলভীবাজার-১ (বড়লেখা-জুড়ি) আসনের এমপি জনাব শাহাব উদ্দিন যিনি এখন পরিবেশ মন্ত্রী, দায়িত্বগ্রহণের পর বড়লেখায় বেশ প্রকল্প হয়েছে সেখানকার নেতাকর্মীরা কাজ বেশ পেয়েছেন। জুড়ির নেতাকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত। তাদের সন্তুষ্ট করতে কি এই প্রকল্প?

 

আমার মনে হয় জনাব শাহাব উদ্দিন নিজেকে মৌলভীবাজারের মন্ত্রী ভাবেন। সারা দেশে পরিবেশের বিপর্যয় নামছে, সেসব উনার চোখে পড়ে না! পরিবেশ রক্ষা না করে উলটো ধংসের আয়োজন করছেন! এটাই কি পরিবেশ মন্ত্রীর পরিবেশ রক্ষার কাজের নমুনা? গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড থেকে নেতারা তো কম নিচ্ছেন না তাহলে বন ধংস করতে হবে কেন?  আর তিনি যদি নিজেকে মৌলভীবাজারে মন্ত্রী মনে করে থাকেন তাহলে এলাকার বন রক্ষা না করে ধংস করছেন কেন?  লাউয়াছড়ার বন দখল করছেন ক্ষমতাবানরা, সংরক্ষিত বনের মধ্য দিয়ে রাস্তা ও রেললাইন হওয়াতে গাড়ির নিচে ও ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে নিজেদের বন্যপ্রাণী প্রতিনিয়ত মারা যাচ্ছে। বনের মূল্যবান গাছ নষ্টা হচ্ছে সেসবের সমাধান করতে পারেননি কেন? এসব তো পরিবেশের দায় ছাড়া করা সম্ভব না সে কারণে উনি পরিবেশ নিয়ে কতটা বুঝেন তা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের মূল কাজ পরিবেশ রক্ষা করা পার্ক করা নয়।

 

আমার জন্মস্থান বড়লেখা নানা বাড়ি জুড়িতে। জুড়ি-বড়লেখা আসনের এমপি জনাব শাহাব উদ্দিন। লাঠিটিলার বনে আমি অনেক ঘুরে বেড়িয়েছি। মৌলভীবাজারে যখন সাংবাদিকতা করি তখন সংবাদের প্রয়োজনেও ওই বনে আমার যেতে হয়েছে। ওই বনের সাথে আমার বেঁচে থাকার সম্পর্ক। জনাব শাহাব উদ্দিনকে আমি সৎ মানুষ হিসেবে জানি। পোড় খাওয়া মাঠ পর্যায় থেকে উঠে আসা একজন নেতা তিনি। দুর্নীতির মহোৎসবে আমিও এখানে দুর্নীতির ফন্দি দেখছি কিন্তু আমি এখনও বিশ্বাস করতে চাই না তিনি বিষয়টি বুঝবেন না, আমি বিশ্বাস করতে চাই না আমলাদের ফাঁদে পড়ে কিংবা সুবিধাবাদী নেতাদের প্ররোচনায় পড়ে তিনি পরিবেশ ধংসের এই আয়োজন করবেন। বিশ্বাস করতে চাই না তিনি মন্ত্রী হওয়ার পর আর সৎ নেই

 

মাননীয় মন্ত্রী, এই সবুজ বনটা আমাদের কাছে আপনার হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের চেয়ে দামি। কারণ বন না থাকলে আমরা বাঁচব না, আমাদের প্রজন্ম বাঁচবে না। আপনি প্রজন্ম নিয়ে কী ভাবেন জানি না আমরা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের নিঃশ্বাসটুকু  কেড়ে নেয়ার আয়োজনে সামিল হতে পারি না। তাই জোর অনুরোধ করছি অবিলম্বে লাঠিটিলায় সাফারি পার্ক করার সিদ্ধান্ত বাতিল করে বন্যপ্রাণী রক্ষার উদ্যোগ নিন। সিলেটের একমাত্র সুসংরক্ষিত বনকে আপনি দখলমুক্ত করে পরিবেশ বাঁচান। এটাই আপনার মূখ্য কাজ  হবে মন্ত্রী মহোদয়।

লেখক- মাহমুদ এইচ খান, সাংবাদিক 

ছড়িয়ে দিন