লালনের অসাম্প্রদায়িক চেতনা সর্বস্তরে ছড়িয়ে দিতে হবে

প্রকাশিত: ৭:১৮ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২২, ২০২১

লালনের অসাম্প্রদায়িক চেতনা সর্বস্তরে ছড়িয়ে দিতে হবে

 

বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁই এর ১৩১তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের উদ্যোগে আজ ২ সেগুনবাগিচার স্বাধীনতা হলে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

 

 

আলোচনা সভায় প্রধান আলোচক হিসেবে আলোচনা করেন বাসদের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ও বাম জোটের কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতা কমরেড খালেকুজ্জামান। আরও আলোচনা করেন চারণ এর সংগঠক শাহজাহান কবির ও জাকির হোসেন। আলোচনা সভা সভাপতিত্ব করেন চারণের কেন্দ্রীয় ইনচার্জ নিখিল দাস। আলোচনা শেষে চারণ এর শিল্পী শাহিনা পারভীন, বিপুল কুমার দাস, জামাল হোসেনসহ অন্যান্যরা লালন গীতি পরিবেশন করেন।

 

 

প্রধান অতিথির আলোচনায় কমরেড খালেকুজ্জামান বলেন, দেশ আজ চরম সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের কবলে নিপতিত। শাসকগোষ্ঠীর আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে সাম্প্রদায়িক মননের সামাজিকরণ ঘটেছে। মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাংলাদেশ আজ হারিয়ে গেছে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে এসে হিন্দুদের পূজা মন্ডপে হামলা, ঘরবাড়ী, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগ-লুটপাট, হতাহতের ঘটনা দেখতে হলো। অথচ আজ থেকে দেড়শত বছর আগে লালন জাত-ধর্মের ভেদাভেদের বিরুদ্ধে দাড়িয়েছিলেন। লিখেছেন, ‘জাত গেল জাত গেল বলে একি আজব কারখানা’। আশা প্রকাশ করেছেন, ‘এমন সমাজ কবে গো সৃজন হবে /যেদিন হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান জাতি গোত্র নাহি রবে।’

 

 

তিনি আরো বলেন, বৌদ্ধ সহজিয়া, বৈষ্ণব মত ও সুফি মতের মিশ্রণে বাউল মত তৈরি হয়। লালন শুধু বাউল সাধক ছিলেন না, তিনি ছিলেন মরমী কবি ও সঙ্গীতকার। প্রায় একশত বছর ধরে লালন ১০ হাজার গান রচনা করেছেন। অন্নদাশঙ্কর রায় লিখেছিলেন, ‘বাংলার নবজাগরণে রামমোহনের যে গুরুত্ব, বাংলার লোকমানসের দেয়ালী উৎসবে লালনেরও সেই গুরুত্ব’। হিন্দু-মুসলমানদের আচার সর্বস্বতার বিরুদ্ধে আক্রমণ চালিয়িছিলেন লালন। ‘সুন্নত দিলে হয় মুসলমান/ নারীর তবে কি হয় বিধান/ বামুন চিনি পৈতে প্রমাণ / বামনি চিনি কিসে রে।’
তিনি বলেন, লালন শুধু গান গেয়ে যাননি, কৃষক-প্রজাদের পাশে দাড়িয়েছিলেন। তিনি দুর্দশাগ্রস্ত প্রজা বন্ধু কাঙ্গাল হরিনাথকে তার শিষ্যদের নিয়ে লড়াই করে জমিদারের পাইক-পেয়াদাদের হাত থেকে রক্ষা করেন। বাউলসহ লোকধর্মগুলো সমাজের মধ্যে অসাম্প্রদায়িক চেতনা জাগিয়ে রেখেছে। কিন্তু মৌলবাদী গোষ্ঠী বাউলদের বেশরা, বেদ্বীন, ন্যাড়ার ফকীর বলে প্রতিনিয়ত আক্রমণ করে যাচ্ছে। দুঃখজনক হলেও সত্যি বাউলদের সম্পর্কে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিও মৌলবাদীদের মতোই। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে শরীয়ত বয়াতিকে জেল খাটতে হয়েছে। শাহ আব্দুল করিমের শিষ্য বাউল রণেশ ঠাকুরের বাড়ীঘর, সংগ্রহশালা পুড়িয়ে দিয়েছে সাম্প্রদায়িক দুর্বৃত্তরা।

 

 

 

তাই, আজ বাউলসহ লোকধর্ম গুলোকে পৃষ্ঠপোষকতা করে মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। একই সাথে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা ধর্মনিরপেক্ষ শোষণমুক্ত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাজনৈতিক আন্দোলনের পাশাপাশি ঐক্যবদ্ধ প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলা এবং লালনের অসাম্প্রদায়িক চেতনা সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে দেয়ার আহ্বান জানান।

ছড়িয়ে দিন