লীলা নাগের বাড়ি হতে পারে মৌলভীবাজার জেলার একটি আইকন

প্রকাশিত: ১:২০ অপরাহ্ণ, জুন ১৪, ২০২১

লীলা নাগের বাড়ি  হতে পারে মৌলভীবাজার জেলার একটি  আইকন

সৌমিত্র দেব
বাড়ির ভিটা দেখে চমকে ওঠেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম ব্যাচের প্রথম ছাত্রী লীলা নাগের বাড়ি দেখতে গিয়ে তাঁর চোখে পড়লো একটা ধ্বংসস্তুপ । বোঝা যাচ্ছিল, কিছুদিন আগেও ভিটার ওপর ঘরের একটি কাঠামো দাঁড়ানো ছিল। লোহার খুঁটি, ইটের দেয়াল ও টালির ছাদ পুরোনো আমলে নির্মিত একটি ঘরের চিহ্ন বহন করেছে। সেখানে এখন কেবলই ভেজা মাটির একটি শূন্য ভিটা পড়ে আছে। তাতে কিছু লাল রঙের ইটের সুরকি ছড়ানো। ভিটার মধ্যে গজিয়ে ওঠেছে কিছু গুল্মলতা। তিনি তাঁর সঙ্গী পুলক কান্তি ধরকে বলেন, এটা প্রাচীনতার কারণে নয়, দখলদারিত্বের নির্মম আঘাতে এই বাড়িত ওপরে অমানিশা নেমে এসেছে ।

লীলা নাগ ছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অগ্নিকন্যা। তিনি এদেশে নারী আন্দোলনের পথিকৃৎ। রাজধানীর  নারী শিক্ষা মন্দির সহ বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন । অসীম সাহসী এই নারী  হয়ে উঠেছিলেন নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর সহযোদ্ধা । লীলা নাগের পৈতৃক বাড়ি ছিল মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার পাঁচগাঁও ইউনিয়নের পাঁচগাঁও গ্রামে । বাড়ির পাশে তাঁর মায়ের নামে কুঞ্জলতা বিদ্যালয়টি আজো স্মৃতি বহন করে আছে । কিন্তু লীলা নাগের স্মৃতিবিজড়িত এই বাড়ি থেকে ভিটামাটির চিহ্ন মুছে দেয়ার চক্রান্ত চলছে ।

 

রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, লীলা নাগের বাড়িতে গিয়ে দেখেছি পুরনো ঘরের চিহ্ন আর নেই। খালি ভিটা পড়ে আছে। লোহার খুঁটি, ইটের দেয়াল—সবকিছুই ভিটা থেকে হারিয়ে গেছে। সেখানে লাল রঙের ইট–সুরকির কিছু টুকরা ছড়ানো–ছিটানো। ভেজা মাটির বুকে কিছু লতাপাতার গাছ উঠেছে। পেঁপেগাছসহ কিছু বস্তায় লাগানো হয়েছে বিভিন্ন জাতের সবজির চারা। বোঝার উপায় নেই মাস কয়েক আগেও এ ভিটার ওপর ভাঙাচুরা হলেও একটি ঘরের কাঠামো দাঁড়িয়ে ছিল।বাড়িটি বন্দোবস্ত নিয়েছিলেন ভারতের করিমগঞ্জ থেকে আগত আলাউদ্দিন চৌধুরী । ১৯৭১ সালে তার বিতর্কিত ভূমিকা ছিল । আলাউদ্দিন চৌধুরীর পুত্রের সঙ্গে দেখা হয় । তিনি বলেন এই বাড়িতে লীলা নাগদের অংশ খুব সামান্য । তবে বাড়িটি নিয়ে মামলা আছে, সেটা স্বীকার করেন তিনি ।

গবেষক দীপংকর মোহান্ত জানান, লীলা নাগের পিতা রায় বাহাদুর গিরিশ চন্দ্র নাগ সেই সময়ে উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন । বাড়ির বসত ঘরটি নির্মাণ ্করেছিলেন তিনি । । ভিটার পশ্চিম অংশে একটি পাকা টিনের ঘর। যাঁরা এখন বাড়িটিতে বাস করছেন, সেটা তাঁদের।

বাবা গিরিশ চন্দ্র নাগ যখন আসামের গোয়ালপাড়া মহকুমার প্রশাসক ছিলেন। সেখানে ১৯০০ সালের ২ অক্টোবর লীলা নাগের জন্ম। তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা কলকাতা ব্রাহ্ম স্কুলে, মাধ্যমিক ঢাকার ইডেন গার্লস স্কুলে। কলকাতার বেথুন কলেজ থেকে বিএ (সম্মান) ইংরেজিতে উত্তীর্ণ হয়ে ১৯২১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংরাম করেই তিনি হয়েছিলেন প্রথম ব্যাচের প্রথম ছাত্রী। পরবর্তীকালে বিপ্লবী ও দার্শনিক অনিল রায়ের সঙ্গে ১৯৩৯ সালে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।

লীলা নাগ ইংরেজিতে এমএ পাস করে বিপ্লবী ধারার আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। নারী সমাজকে রাজনীতি, অর্থনীতি ও শিক্ষার মূল ধারায় টেনে আনতে বহুমুখী কর্মধারার সূচনা করেন তিনি। দীপালি সংঘ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নতুন ধারার নারী আন্দোলনের দ্বার উন্মোচন করেন লীলা।
যোগ দিয়েছিলেন গোপন বিপ্লবী দল শ্রীসংঘে, জাগরণ মন্ত্রে উদ্দীপ্ত করেছিলেন আরও অনেক তরুণীকে। নারীশিক্ষা মন্দির ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে স্ত্রীশিক্ষা প্রসারের জন্য কাজ করেন তিনি।

১৯৩৫ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দেওয়া নামে জাগরণের বাণী বৃহত্তর সমাজে ছড়িয়ে দিতে বের করেন ‘জয়শ্রী’ পত্রিকা। তাঁর পৈত্রিক ভিটার একাংশে মা কুঞ্জলতা দেবী চৌধুরীর নামে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। বর্তমানে এটি কুঞ্জলতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ১৯৭০ সালের ১১ জুন লীলা নাগ মারা যান।

বাড়ির বর্তমান বাসিন্দা আবদুল মুনিম চৌধুরী ও তাঁর পরিবার। মুনিম চৌধুরী বলেন , ১৯৬৫ সাল থেকে তাঁরা এ বাড়িতে বাস করছেন। আবদুল মুনিমের বাবা আলাউদ্দিন চৌধুরী বাড়িটি জেলা প্রশাসন থেকে ৪৫ বছরের জন্য ইজারা নিয়েছিলেন। এর আগে বাড়িটি ছিল ইউনিয়ন পরিষদের কার্যালয়। এরপর আবারও ইজারার জন্য ২০১৫ সালে আবেদন করা হয়েছে। একই সঙ্গে স্থায়ী ইজারার জন্য হাইকোর্টে একটি মামলাও করেছেন তিনি। এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। আলাউদ্দিন চৌধুরী ২০১৩ সালে মারা গেছেন। বাড়িতে বর্তমানে একটি পুকুরসহ ১ একর ৬৫ শতক ভূমি আছে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় লীলা নাগের বাড়ির লোকজন তখনকার পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে ভারতে পাড়ি জমান।

রোবায়েত ফেরদৌস বলেন , ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শতবর্ষ উদযাপনের তোড়জোড় চলছে । এ অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রীর বাড়ির এ দশা দেখে আমার কান্না পেয়েছে ।আমরা মনে করি এই বাড়িটিকে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হোক । এই বাড়ি হতে পারে মৌলভীবাজার জেলার  একটি  আইকন ।

ছড়িয়ে দিন