শরীয়া ও প্রচলিত আইনে পুত্র ও কন্যা সন্তানের মধ্যে বিস্তর ফারাক

প্রকাশিত: ২:১৮ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ১৪, ২০২১

শরীয়া ও প্রচলিত আইনে   পুত্র ও কন্যা সন্তানের মধ্যে  বিস্তর ফারাক

মীরা মেহেরুন

বাবা এবং মায়ের কাছে তার সন্তান সবচেয়ে বেশি প্রিয়। সন্তান জন্মের পর পিতার পক্ষ থেকে এবং মায়ের পক্ষ থেকে ভালোবাসা, অধিকাংশ কনসেনট্রে শনের স্থানান্তর ঘটে সন্তানের প্রতি।
কন্যাসন্তান কখনো কন্যা হয়ে জন্মায় না। এই পরিবার, সমাজ, ধর্ম, রাষ্ট্র তাকে কন্যা সন্তান হিসেবে চিহ্নিত ও রূপান্তরিত করে যদিও পুত্র ও কন্যাসন্তানের মধ্যে পার্থক্য কেবল বায়োলজিক্যাল।
ইসলামী শরীয়া আইন ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী যে সম্পদ বন্টনের নিয়ম রয়েছে তাতে পুত্র ও কন্যা সন্তানের মধ্যকার প্রাপ্তিতে বিস্তর ফারাক তৈরি করেছে। আজ সে ‌ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে যাবো না কারণ সচেতন ব্যক্তিবর্গ মোটামুটি এসব বিষয়ে অবহিত।
বাস্তবতার নিরিখে গতানুগতিক সামাজিক প্রেক্ষাপটে দেখা গেছে, যে সম্পত্তিটুকু কন্যা সন্তান পৈতৃক সূত্রে প্রাপ্য হচ্ছে সেটুকু অধিকাংশ ক্ষেত্রে বুঝে পায়না, বুঝে নিতে গেলে পারিবারিক অন্যান্য ওয়ারিশরা বিষয়টিকে ভীষণ কুনজরে দেখেন। প্রাপ্য সম্পদ গুলো ভাইদের বা ভাইপো ভাইঝি দের দান করলে সে ভালো বোন হিসেবে চিহ্নিত হয় এবং এর বিপরীতে সে একজন শ্রেষ্ঠ নিকৃষ্ট হিসেবে নিক্ষিপ্ত হয়। বংশ পরম্পরায় এই চিরাচরিত ধারণা গুলোর শিকড় প্রোথিত হয়েছে আমাদের আবহমান সমাজে। বিভিন্ন আইনানুসারে একজন স্ত্রীর স্বামীর সম্পদে যে অধিকারের কথা বলা হয়েছে তার কোনো বাস্তবতা সমাজে নেই। সুতরাং নারী প্রান্তিক।
এই জনগোষ্ঠীর ভূ-সম্পত্তিতে অধিকার প্রতিষ্ঠিত হলে নারী নির্যাতন কমে আসবে ৯০ শতাংশ। কারণ নারী নির্যাতন বিষয়ক গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে অধিকাংশ নারী নির্যাতন ঘটছে যৌতুক ও যৌতুক -কেন্দ্রিক হত্যা, আত্মহত্যা। স্ত্রী সম্পদশালী হলে তার প্রতি স্বামীর সর্বাত্মক সহযোগিতা ও মনোযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়। নিঃস্ব একজন নারীর স্বামীর কাছে কোনো চাওয়া পাওয়া থাকে না। কারণ একজন ভিখারির কোনো ইচ্ছে বা অনিচ্ছে থাকতে পারে না। তাকে পঁচা-বাসি, এঁটো-কাটা যা খেতে দেয়া হবে তাই সে খেতে বাধ্য।
কন্যা সন্তান স্বামীর বাড়ি থেকে নির্যাতনের শিকার হয়ে যখন পিতার দরজায় উঁকি দেয় অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের আশ্রয় দেয়া হয় না। সব ধর্মের কন্যাদের ক্ষেত্রে একই আচরণ পরিলক্ষিত হয়। কন্যা সন্তানের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণে সকল ধর্মই কমবেশি এক সূত্রে গাঁথা। তাদের এই মূল্যবোধে তৈরি করা হয় যে, পিতার বাড়ি থেকে স্বামীর বাড়ি যাবে বউ হয়ে আর স্বামীর বাড়ি থেকে বের হবে লাশ হয়ে।
আহারে জীবন! কী মূল্যহীন! কী ধিকৃত, অবহেলিত, বঞ্চিত জীবন।
এ বৈষম্যের পেছনে কতগুলো নিষ্ঠুর সত্য লুকিয়ে আছে। আজ সে বিষয় নিয়েও কোনো আলোচনা নয়।
সমাজে কার কি অবদান সে হিসেবও আজ নয়। শুধুমাত্র এটুকুই বলার বিষয়, একজন সন্তান হিসেবে পিতার নিকট পুত্রের যে অধিকার কন্যাসন্তানের সেই অধিকার টুকু প্রতিষ্ঠিত হোক।
পুত্রশোকে পিতার বুকের পাষাণ যেমন গলে যায় তেমনি কন্যাসন্তানের জন্যে একই প্রতিক্রিয়া হওয়ার কথা। যদি তাই হয় তবে পিতারাই এগিয়ে আসুন। ঘর থেকেই কন্যাসন্তানের অধিকার প্রতিষ্ঠার বিপ্লব শুরু হোক।
পিতা যদি তার কন্যা সন্তানকে পুত্রসন্তানের সমপরিমাণ সম্পদ উইল করতে চান তাহলে রাষ্ট্র বা ধর্মীয়ভাবে প্রতিবন্ধকতার কোনো সুযোগ নেই।
দীর্ঘপরিক্রমায় একটি গোষ্ঠির অতি প্রাপ্তি এবং অপর একটি শ্রেণীর বঞ্চনার ধারাবাহিকতা থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন তবু আসুন আমরা কন্যাসন্তানের অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নির্যাতন ও বঞ্চনা প্রতিরোধে সচেষ্ট ও একতাবদ্ধ হই। কারণ তারা আমাদেরই কন্যা, জায়া, জননী, ভগ্নি।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

Calendar

January 2021
S M T W T F S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31  

http://jugapath.com