শহীদের রক্ত আর বঙ্গবন্ধুর রক্তের বাংলাদেশ

প্রকাশিত: ৯:২৪ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৪, ২০১৯

শহীদের রক্ত আর বঙ্গবন্ধুর রক্তের বাংলাদেশ


লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরী

বাংলাদেশের স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ ও বিজয় শুধুই এদেশের মুক্তিকামী জনতার চূড়ান্ত ফসল। বিজয়ের ৪৮ বছরের উৎসব ও উদযাপনে যখন গোটা দেশ তার স্বত্বার সন্ধানে নিবিড় ভাবে মগ্ন সেই মগ্ন চেতনায় চিড় ধরিয়ে আবারো দেশদ্রোহীদের ছবি উঠে এসেছে বাংলাদেশের সংবাদ পত্রের পাতায়। ১৪ ডিসেম্বরের শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত একটি পত্রিকার প্রথম পাতায় বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের ঘাতক কসাই কাদের মোল্লাকে শহীদ উপাধি দিয়ে পত্রিকাটি খবর ছাপিয়েছে। বিষয়টি চূড়ান্ত স্পর্শকাতর ও ঔদ্ধত্যপূর্ন। যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারের রায়ে ফাঁসি কার্যকর হবার ছয় বছর পর তাকে একটি জাতীয় পত্রিকা শহীদ হিসেবে চিহ্নিত করার দুঃসাহস বাংলাদেশকে অবশ্যই নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। এদেশে অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক বলয় এখনো সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে যা সাম্প্রতিক খবরের মাধ্যমে জনসমাজে স্পষ্ট হয়ে গেলো।

বঙ্গবন্ধু ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে জানতেন না তার দেশ বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করেছে মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মধ্য দিয়ে। সেদিন তিনি নির্জন মিয়াওয়ালী কারাগারে বন্দী। বিজয়ের আনন্দ কেমন ছিলো সেটা বঙ্গবন্ধু উপলব্ধি করতে পারেননি। তার জন্য ও একটি জাতির জন্য এটি একটি করুন ট্রাজেডি হিসেবেই বিবেচিত হবে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বয়ং নিজেই বিজয়ের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ ও বিজয় এজন্যই সারা বিশ্বে বিবেচিত হতে পারে মানবজাতির এক অনন্য দলিল হিসেবে। আর এখনই সময় বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে সারা বিশ্বে উপস্হাপন করার, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষনায় বিস্তৃত করা। যেমনটি প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে গবেষণা করা হয় আজোও।

এদেশে যারা এখনো স্বাধীনতার বিরোধিতা করে, যারা পাকিস্তান রাষ্ট্রের উষ্ণতা ভুলতে পারে না, যারা মুক্তিযুদ্ধের পরও একটি কনফেডারেশন রাষ্ট্রের বিনিসূতা নিয়ে ধ্যানমগ্ন ছিলো তারা অবশ্যই কোন না কোন রাজনৈতিক অথবা অরাজনৈতিক প্লাটফর্মে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে যদি এদেশের মানুষকে সত্যিকার অর্থে মুক্ত করতে হয় তাহলে অবশ্যই এই অপশক্তি নির্মূল করতে হবে। সুনির্দিষ্ট ভাবেই অসাম্প্রদায়িক শক্তিকে চিহ্নিত করে সেটা নির্মূলের দ্বায়িত্ব সরকারের।

শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে বিশ্বের বুকে নতুন করে পরিচিত করতে সামর্থ্য হয়েছেন কিন্তু এখনো সংখ্যাগরিষ্ঠত মানুষ জীবনযাপনের মূল স্রোতধারায় পৌছাতে সামর্থ্য লাভ করেনি। দীর্ঘদিন অপশাসনের ফলে শ্রেনী বৈষম্য ও শ্রেনী শোষন সামাজিক অবকাঠামোকে এমন এক স্হানে পৌছে দিয়েছিলো যে বহির্বিশ্ব বাংলাদেশকে দরিদ্র রাষ্ট্র হিসেবেই শুধু মূল্যায়ন করতো। ইতিমধ্যেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রতিটি শ্রেনী-পেশা-স্তরের মৌলিক পরিবর্তন সাধন করেছেন। বাংলাদেশ এখন ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করেছে। এদেশে যাতায়াত সুবিধা বৃদ্ধি পেয়েছে। কৃষি আকাশচুম্বি সফলতার দাবিদার। জ্বালানি ও বিদ্যুত খাতে অবিস্মরণীয় পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, গভীর সমুদ্র বন্দর, পারমানবিক শক্তির প্রয়োগ ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি পেয়েছে। শিক্ষার সুযোগ বেড়েছে। শেখ হাসিনাকে একটি বিষয় এখন ভাবতে হবে সেটা হলো বাংলাদেশের এই লক্ষ্য ও শুভযাত্রা যেনো অসাম্প্রদায়িক উন্মাদনা য় ভেস্তে না যায়। এদেশে এখনো মাদ্রাসা শিক্ষা প্রচলিত ও ধর্মীয় অনুভূতি আর্থসামাজিক পরিবেশে একটি প্রচলিত অধ্যায়। এদেশের কোটি কোটি মানুষের জীবন যাপনের ধারাবাহিকতাকে জাতীয় উন্নয়নের শক্তি হিসেবে ব্যবহার করে, মানবসম্পদকে মূল স্রোতধারায় পৌছাতে সামর্থ্য লাভ করার মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত সফলতা লাভ করাই বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য। এক্ষেত্রে অসাম্প্রদায়িক শক্তি একটি প্রধান সংকট। মূল সমস্যা।

আগামী বছর বাংলাদেশ প্রবেশ করতে যাচ্ছে মুজিব বর্ষে। মুজিব বর্ষে বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য থাকবে ভীষন ২০২১ বাস্তবায়নের। বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের রাষ্ট্র হিসেবে পরিনত হতে হবে এবছর। ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ অনেক ক্ষেত্রেই সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সক্ষম হয়েছে।

রাষ্ট্রের অনন্তকালের যাত্রায় শুধুই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অসাম্প্রদায়িক ভাবনাই হোক বাঙালীর মূল অঙ্গীকার। শহীদদের রক্ত ও বঙ্গবন্ধুর রক্তের বিনিময়ে স্বাধীন বাংলাদেশ হোক সকল ধর্ম-শ্রেণী-পেশা-গোষ্ঠীর সোনার বাংলা। অপশক্তি-অপশাসন-অসাম্প্রদায়িকতামুক্ত বাংলাদেশ। প্রতিষ্ঠিত হোক ন্যায়বিচার ও সত্য। দূর হোক অন্ধকার। বিজয়ের শুভেচ্ছা। জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু।

লেখক: সাংবাদিক