শিলঙে রবীন্দ্রনাথ

প্রকাশিত: ৯:৪৭ পূর্বাহ্ণ, জুন ১৩, ২০১৮

শিলঙে রবীন্দ্রনাথ

উপমা দাশগুপ্ত

১৯১৯ সাল। রবীন্দ্রনাথের তখন দেশবিদেশে গগনচুম্বী খ্যাতি। অনুক্ষণ কাজ নিয়ে ব্যস্ত তিনি। এক বছর আগে স্থাপিত হয়েছে তাঁর স্বপ্নের ‘বিশ্বভারতী’, বিশ্বভারতীর জন্য অর্থ সংগ্রহ আর অধ্যাপনার পাশাপাশি পুরোদমে চলছে কাব্যচর্চা আর লেখালেখি। বিশ্রাম নেবার কোনো সুযোগ নেই কবির। এর মধ্যে এলো পূজার ছুটি। ছুটি যদিও বা মিললো, অবকাশ মিললো না। কাজের চাপে ছুটির দু’সপ্তাহ শান্তিনিকেতনে থাকতে হলো তাঁকে। অবশেষে ৯ অক্টোবর মধ্যরাতে বোলপুর থেকে ক্লান্ত বিধ্বস্ত অবস্থায় জোড়াসাঁকোর বাড়িতে এসে ঢুকলেন তিনি। শান্তিনিকেতন থেকে জোড়াসাঁকো-সর্বত্র লোকের ভিড়। তাই পরের দিনই ছুটলেন শিলঙে, উদ্দেশ্য অজ্ঞতাবাস। আসলে কবি তখন চাইছিলেন জনারণ্যের বাইরে নির্জন কোনো জায়গা; লোকচক্ষুর অন্তরালে, যেখানে চুটির বাক সময়টুকু আপন মনে নিমগ্ন থাকা যায়। এদিক থেকে বিচার করলে স্থান নির্বাচনে রবীন্দ্রনাথ ভুল করেননি। ১৯১০-এ তাঁর শিলঙ প্রবাস অন্তত সেই সাক্ষ্যই দেয়।
শিলঙে এসে রবীন্দ্রনাথ উঠেছিলেন একটি ভাড়াবাড়িতে। রিলবং যেতে জিগজ্যাগ রোডের প্রথম বাঁকে ছোট্ট স্রোতস্বিনী নদীর ধারে অনেকখানি জমিতে দাঁড়িয়ে থাকা এ-বাড়ির নাম ‘ব্র“কসাইড’। চারদিকে পাইন আর দেবদারু গাছের ঘন আবেষ্টনের মধ্যে এ যেন এক নিঝুম দ্বীপ। এ-বাড়িতে কবির সঙ্গে ছিলেন রথীন্দ্রনাথ, প্রতিমাদেবী, দীনু ঠাকুর ও তাঁর স্ত্রী কমলা দেবী। ১৯১৯-এ শিলঙে কবির দিনগুলি কেটেছে নিরিবিলিতে, যেমনটি তিনি চেয়েছিলেন। লেখালেখি করেছেন সামান্য। দু’একটি ছোট কথিকা আর কিছু ইংরেজি তর্জমা। বড়ো কোনো লেখায় হাত দেননি। বিশ্রাম নিয়েই কাটিয়েছেন শিলঙের দিনগুলি। নোবেলজয়ী বিশ্বনন্দিত কবির উপস্থিতি কিন্তু শিলঙবাসীর মনে কোনো সাড়া জাগায়নি। তাকে কাছে পেয়েও কেনো সাহিত্য সভা বা সংবর্ধনা আয়োজিত হয়নি। অবিশ্বাস্য হলেও একথা সত্যি। শিলঙবাসীর এ-ধরনের নিরুত্তাপ আচরণের নেপথ্যে কারণ ছিলো বৈকি! শিলং তখন চীফ কমিশনার শাসিত আসাম প্রদেশের রাজধানী। সীমিত জনসংখ্যার এ-পাহাড়ে ইংরেজ রাজকর্মচারীদের প্রচণ্ড প্রতাপ। স্থানীয় বাঙালি সরকারি কর্মচারীরা তাদের দাপটে সর্বক্ষণ তটস্থ। বেশিরভাগ বাঙালি শনিবারে সিলেট চলে যান, সোমবার এসে অফিস করেন। সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চার নামগন্ধ নেই। ইংরেজ রাজকর্মচারীরা ব্যস্ত থাকেন শিলঙ ক্লাবে গলফ খেলা আর মদ্যপানে। খাসিয়ারা ডুবে থাকে তাদের নিজেদের জগতে। অন্যদিকে ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গন তখন উত্তপ্ত। ঔপনিবেশিক ইংরেজরা কোমর বেঁধে দমননীতি চালাতে মত্ত। রাজনীতির সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের প্রত্যক্ষ সংস্পর্শ না থাকলেও তার সংবেদনশীল কবিচিত্ত সব ঘটনাতেই আন্দোলিত হয়। তাই জালিয়ানওয়ালাবাগে সংঘটিত নারকীয় হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে স্বেচ্ছায় ত্যাগ করছেন ইংরেজের দেওয়া ‘নাইটহুড’ খেতাব। প্রকাশ্যে ক্ষোভ জানিয়েছেন শ্রীমতি অ্যানি বেসান্টকে কারারুদ্ধ করায়। তারও আগে ১৯১৭’র জাতীয় কংগ্রেসের কলকাতা অধিবেশেনে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গান গেয়ে এসেছেন। সব মিলিয়ে, বিশেষত ‘স্যার’ উপাধি ত্যাগ করায় ইংরেজরা তখন তাঁর ওপর দারুণ ক্ষুব্ধ। সুতরাং ইংরেজ শাসিত শিলঙ পাহাড়ের বাসিন্দারা ইংজেদের রোষানলে পড়ার ভয়ে রবীন্দ্রনাথকে কাছে পেয়েও কোনা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেননি। তার সম্মানে আয়োজন করেননি কোনো পাবলিক ফাংশন। রবীন্দ্রনাথের অবশ্য তাতে কেনো ভ্রƒক্ষেপ নেই। প্রথম পদার্পণেই তাঁর ভালো লেগেছিলো শিলঙ পাহাড়। সে ভালো লাগার বর্ণনা রয়েছে ‘শিলঙের চিঠি’ নামক কবিতায়।

‘গর্মি যখন ছুটল না আর পাখার হাওয়া শরবতে,
ঠাণ্ডা হতে দৌড়ে এলুম শিলঙ নামক পর্বতে।
এখানে খুব লাগল ভালো গাছের ফাঁকে চন্দ্রোদয়
আর ভালো এই হাওয়ায় যখন পাইন পাতার গন্ধ বয়।
বেশ আছি এই বনে বনে যখন তখন ফুল তুলি
নাম না জানা পাখি নাচে, শিস দিয়ে যায় বুলবুলি।
ভালো লাগে আলো ছায়ার নানারকম আঁকাকাটা,
দিব্যি দেখায় শৈলবুকে শস্য ক্ষেত্রের থাক কাটা
ভালো লাগে রৌদ্র যখন পড়ে মেঘের ফন্দিতে,
রবির সঙ্গে ইন্দ্র মেলেন নীল-সোনালীর সন্ধিতে।

১৯২৩ সালে দ্বিতীয়বারের মতো শিলঙ সফরকালে রবীন্দ্রনাথ এ-কবিতাটি লেখেন। রিলবং-এ ‘জিৎভূমি’ নামক বাড়িতে বসে লেখা এ-কবিতাটি পরে ‘পূরবী’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভূক্ত হয়। শিলঙের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, আবহাওয়া, উপভোগ্য বিষয়সমূহের বর্ণনায় কবিতাটি অনবদ্য। রবীন্দ্রনাথ পর্যটক ছিলেন না। ঘুরে ঘুরে প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখার নেশাও তাঁর ছিলো না। আর বয়সও তখন ৬২, ভ্রমণের জন্যেও অনুকূল নয়। জিৎভূমিতে থাকাকালে তিনি ‘যক্ষপুরী’ নামে একটি নাটকও লিখেছিলেন। পরবর্তীকালে এ-নাটকটি ‘রক্ত করবী’ নামে শুধু বাংলা নয়, বিশ্ব নাট্যসাহিত্যে এক অনন্য সৃষ্টি। নিরালায় লেখার উদ্দেশ্যেই এবারে তিনি শিলঙ এসেছিলেন। তাঁর ইচ্ছা যে পূর্ণ হয়েছে, এ অসামান্য কবিতা আর নাটকটিই তার প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত।
১৯২৭ সালে ৬৬ বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ শেষবারের মতো শিলঙ আসেন। তাঁর গুণমুগ্ধ এক ভক্ত আহমেদাবাদের ধনী ব্যবসায়ী অম্বালাল সরাভাইয়ের উদ্যোগে ও ব্যবস্থায় তিনি এবার সপরিবারে শিলং কাটিয়ে যান দীর্ঘ দুইমাস। এ সময় কার্সিয়ং থেকে শিল্পী নন্দলাল বসু কবির জন্য চিত্রিত পত্রপট উপহার পাঠান। শিল্পীর পত্রপটের প্রত্যুত্তরে কবি শিলঙ থেকে ‘শুকসারা’ ও ‘দেবদারু’ নামে কবিতা লিখে পাঠান। কবিতা দুটির মধ্যে শিলঙের প্রভাব সুস্পষ্ট। এছাড়াও ‘নতুন’ ও ‘সুখময়’ নামে দুইটি কবিতা এ সময় তিনি লিখেছিলেন। মূলত লেখালেখির মধ্যেই কেটেছে তাঁর তৃতীয় শিলঙ প্রবাসের দিনগুলি। এ-যাত্রা কবির অন্যতম সফরসঙ্গী প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের ‘রবিজীবনী’ থেকে জানা যায়: অম্বালালদের বাড়ি ছাড়া খুব একটা বাইরে কবি যাননি। একদিন খাসিয়া নৃত্য আর ময়ূরভঞ্জের রাণীর সঙ্গে সামাজিক সাক্ষাত যাওয়া ছাড়া তাঁকে খুব বেশি বাড়ির বাইরে যেতে দেখা যায়নি। তবে শিলঙের বর্ষীয়ান বাসিন্দাদের কাছ থেকে জানা গেছে একটি মজার গল্প। ১৯২৭ সালে রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্যে উৎসাহিত কিছু শিলঙবাসী তরুণ তাঁকে ‘চিরকুমার সভা’ অভিনয় করে দেখাতে চায়। তাদের পীড়াপীড়িতে কবিকে রাজি হতে হয়। তবে শর্ত ছিল ‘চিরকুমার সভা’র গানগুলো শেখাবেন দিনু ঠাকুর। তরুণরা মহাখুশি। মহড়া শুরু হলো। দিনু ঠাকুর দরদ দিয়ে গান শেখালেন। নির্দিষ্টদিনে ‘কুইন্টন হলে’ নাটক মঞ্চস্থ হলো। কিন্তু একি! নাটকের শুরু থেকে রবীন্দ্রনাথ উস্খুস করেছেন, মাঝে মধ্যে ফিসফিস করে দিনু ঠাকুরকে কি যেন বলছেন। নাটক দেখায় মন নেই একদম। অল্পক্ষণ বাদে পেট ব্যথার অজুহাতে হল ছেড়ে চলেও এলেন। রহস্যটা কি? পরে দিনু ঠাকুর আসল রহস্য ফাঁস করে দেন। কবি নাকি তাঁকে বলেছিলেন, ‘ওহে দিনু, গোঁফ কামানো পুরুষগুলো শাড়ির আড়ালে আমার নারীচরিত্রগুলো যে দুর্দশা ভোগ করছে, তা তো আমি আর সইতে পারছি না।’ এ-জন্যই উদ্যোক্তাদের কাছে মার্জনা চেয়ে তাঁর তড়িঘড়ি প্রস্থান।
রবীন্দ্রনাথ মোট তিনবার শিলঙ এসেছিলেন। নিঃসন্দেহে শিলঙ পাহাড় তাঁর সমৃদ্ধতম স্মৃতির অন্যতম। এই সুখময় স্মৃতির অন্যতম ফসল ‘শেষের কবিতা’ উপন্যাস, যা আমরা পেয়েছি বেশ পরে এবং যেখানে শিলঙ পাহাড়ের জয়জয়কার।