শিল্প সমৃদ্ধ-সোনার বাংলা বিনির্মানে বঙ্গবন্ধু’র ভাবনা

প্রকাশিত: ১০:৩০ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০২১

শিল্প সমৃদ্ধ-সোনার বাংলা বিনির্মানে বঙ্গবন্ধু’র ভাবনা

মোঃ জাহাঙ্গীর আলম

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বিজয়ীর বেশে ফিরে আসেন স্বাধীন বাংলাদেশে। নিজেকে নিয়োজিত করেন স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার কাজে। দেশের জনগণকে নিয়ে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় শুরু করেন অর্থনৈতিক মুক্তিলাভের সংগ্রাম। শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর সুদূরপ্রসারী চিন্তা ভাবনা থেকে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে অর্থনৈতিক বুনিয়াদ শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর জন্য কৃষি ও শিল্প বিল্পবে ঝাঁপিয়ে পরেন। একটি উন্নত শিল্প-সমৃদ্ধ দেশ গঠনে তাঁর ছিলো একটি স্বতন্ত্র ভাবনা। আর সেই ভাবনা থেকেই শিল্প ও শিল্পায়নের জন্য গ্রহণ করেন নানামুখী পরিকল্পনা। বঙ্গবন্ধুর সেই পরিকল্পনার ফলে দেশ আজ স্বল্পোন্নত দেশের কাতার থেকে উন্নীত হয়ে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে সামিল হয়েছে। বাংলাদেশ আজ টেকসই শিল্পায়নের দিকে ধাবিত। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ ২০৪১ সালে উন্নত দেশের মর্যাদা অর্জনের পথে অগ্রসরমান।

পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের জন্মলগ্ন থেকেই একচোখা পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাংলাদেশকে (তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তানকে) শুরু থেকেই বঞ্চিত করছিলো। এই বৈষম্যের বিষয়ে বঙ্গবন্ধু সর্বদা সচেতন ছিলেন । বঙ্গবন্ধু অনুধাবন করেছিলেন এই বৈষম্যের রাজনৈতিক ও সামাজিক মাত্রার পাশাপাশি অর্থনৈতিক মাত্রা ছিলো প্রবল। বিশেষ করে শিল্প-বাণিজ্যের বৈষম্য ছিলো চরম পর্যায়ে। আর সে কারণেই জাতির পিতা সে সময় পাকিস্তান সরকারের ‘ফেডারেল কন্ট্রোল অব ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাক্ট’ এর তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। তিনি মনে করতেন, এই আইনের মাধ্যমে শিল্প খাতের নিয়ন্ত্রণ প্রাদেশিক সরকারকে পাশ কাটিয়ে পুরোপুরি পশ্চিম পাকিস্তানের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। ১৯৫৩ থেকে ১৯৫৬ সময়কালে পশ্চিম পাকিস্তানের ১৫০টি বৃহৎ শিল্প ইউনিটের জন্য কেন্দ্রীয় সরকার ৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছিল। অন্যদিকে পূর্ব পাকিস্তানে ৪৭টি বৃহৎ শিল্প ইউনিটের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল মাত্র ২ কোটি টাকা। শেখ মুজিবুর রহমান এই ভয়াবহ বৈষম্যমূলক অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়ে এ দেশের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। তাই তিনি যখন পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক সরকারের শ্রম, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছিলেন, তখন সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন এ দেশের শিল্পের বিকাশের পরিবেশ নিশ্চিত করতে। প্রাদেশিক সরকারের বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী হিসেবে তাঁর প্রস্তাবনার সার-সংক্ষেপ ছিলো এ রকম: প্রাদেশিক সরকার আমদানির লাইসেন্স ইস্যু করার ক্ষমতা পাবে; পাট, তুলা ও তৈরি পোষাকের মতো শিল্পগুলোর নিয়ন্ত্রণ থাকবে প্রাদেশিক সরকারের হাতে; আমদানি-রপ্তানি প্রধান নিয়ন্ত্রকের একটি কার্যালয় স্থাপিত হবে পূর্ব পাকিস্তানে; সাপ্লাই এবং ডেভেলপমেন্ট ডিপার্টটমেন্টের মহাপরিচালকের একটি পৃথক কার্যালয় পূর্ব পাকিস্তানে স্থাপিত হবে; এবং শতকরা ৫০ ভাগ বৈদেশিক মুদ্রা যাবে পূর্ব পাকিস্তানে। তথ্যসূত্র: (বঙ্গবন্ধুর উন্নয়ন ভাবনা এবং আগামী দিনের বাংলাদেশ, ড. আতিউর রহমান, দৈনিক ইত্তেফাক, ২৬ মার্চ ২০১৯)

তৎকালিন পূর্ব পাকিস্তানের পশ্চাৎপদ অর্থনীতির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল রাজনৈতিক বৈষম্য এবং কৃষির উপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতা। এ প্রেক্ষাপটে শিল্পোন্নয়নের মাধ্যমে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার লক্ষ্যে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫৭ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকারের শ্রম, বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী থাকাকালে দেশের ক্ষুদ্র শিল্পবিকাশের জন্য তৎকালিন গণপরিষদে পূর্ব পাকিস্তানে ক্ষুদ্র শিল্প করপোরেশন (ইপসিক) প্রতিষ্ঠান বিল উত্থাপন করেন। যা আইন হিসেবে পাশ হয় ঐ বছর ১৪ মার্চ এবং কার্যকর হয় একই বছরের ৩০ মে। স্বাধীনতা উত্তরকালে ইপসিকের নাম পরির্বতন করে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) করা হয় (তথ্য সূত্র: বাংলা পিডিয়া)। বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া বিসিকের মাধ্যমে গ্রাম-গঞ্জে হাজার হাজার শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়েছে। জাতির পিতার এ সুদূরপ্রসারী উদ্যোগের জন্যই শিল্পখাত বর্তমানে জাতীয় অর্থনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। আজ দেশে শিল্পায়ন ও শিল্প খাতের টেকসই উন্নয়ন বিকাশে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর বাস্তবভিত্তিক ও ন্যয়সঙ্গত নীতি প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছি। বঙ্গবন্ধু নেওয়া উদ্যোগের ধারাবাহিকতার সরকারি ও বেসরকারি খাতে দক্ষতা ও গতিশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে একটি শিল্পসমৃদ্ধ উন্নত দেশ বিনির্মাণে শিল্প মন্ত্রণালয় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেননি, একটি সমৃদ্ধশালী জাতি গঠনে শিল্প-কলকারখানা স্থাপনের মাধ্যমে শিল্পায়ন বিকাশে অবদান রেখেছেন। একটি জাতিকে উন্নত সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে শিল্প-কারখানার যে বিকল্প নেই তা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু অনুধাবন করতে পেরেছিলেন  বলেই এ খাত সম্প্রসারণে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। দেশ স্বাধীনতার পরে তিনি জোর দিয়েছিলেন দেশের সর্বত্র ছোটো-বড়ো শিল্প গড়ে তোলা আর সেই সাথে উদ্যোক্তা তৈরি করা ওপর। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় দারিদ্র্য বিমোচনের লড়াইকে এগিয়ে নিয়ে যান বঙ্গবন্ধু। শিল্পায়নে ভূমি ব্যবস্থাপনায় আমূল সংস্কার, শিল্পবিকাশে নতুন নতুন উদ্যোগ গ্রহণ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের প্রণোদনা প্রদানসহ, কৃষির আধুনিকায়নে সমন্বিত কর্মসূচি গ্রহণ করেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে পুনর্গঠনে শিল্প বিকাশকে অন্যতম খাত হিসেবে গ্রহণ করেন। তাঁর দূরদর্শী চিন্তাভাবনার কারণে আমরা আজ মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদায় আর ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশের মর্যাদা অর্জনের পথে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চা শিল্পকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। স্বাধীনতার আগে বাংলাদেশ চা বোর্ডের প্রথম বাঙালি চেয়ারম্যান ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি বাংলাদেশ চা বোর্ডের তৃতীয় চেয়ারম্যান হিসেবে ৪ জুন ১৯৫৭ থেকে ২৩ অক্টোবর ১৯৫৮ পর্যন্ত প্রথম বাঙালি হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। তিনি মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকায় ৩টি প্লট নিয়ে চা বোর্ডের প্রধান কার্যালয় স্থাপন করেন। স্বাধীনতার পর বিধ্বস্ত চা শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত ও পুনর্বাসিত করেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৭২ হতে ১৯৭৪ সময়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু সরকার চা শিল্পকে সুদৃঢ় অবস্থানে আনয়নের লক্ষ্যে নগদ ভর্তুকি প্রদান করেন ও ভতুর্কি মূল্যে সার সরবরাহ করেন। তিনি বিধ্বস্ত চা কারখানাগুলোর উন্নয়নে ভারতের অর্থ সহায়তায় ৩০ লাখ রুপির চা যন্ত্রপাতি আমদানি করেন। জাতির পিতা চা বাগান মালিকদেরকে ১০০ বিঘা পর্যন্ত মালিকানা সংরক্ষণের অনুমতি দেন। এমনকি এদেশের চা চাষের উন্নয়নে চা গবেষণাকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি জানতেন গবেষণা ছাড়া চায়ের উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই তিনি আসামের টোকলাই চা গবেষণা কেন্দ্রের আদলে বাংলাদেশ চা গবেষণা কেন্দ্রের নাম পরিবর্তন করে একটি পূর্ণাঙ্গ গবেষণা ইনস্টিটিউটে রুপান্তরিত করেন। তাঁর এ দূরদর্শী সিদ্ধান্তে চা গবেষণা ইনস্টিটিউট আজ অন্যতম জাতীয় গবেষণা ইনস্টিটিউট। তথ্যসূত্র: (শিল্প সম্প্রসারণে বঙ্গবন্ধুর অবদান, একুশে টেলিভিশন, ২৯ জানুয়ারি ২০২০)
সকল পাকিস্তানি উদ্যোক্তা ও ব্যবস্থাপকরা তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর টাকা-পয়সা ও অন্যান্য উপকরণ সাথে করে নিয়ে চলে যাওয়ায় স্বাধীনতার পর পর বঙ্গবন্ধু বড়ো বড়ো ব্যাংক ও বীমা প্রতিষ্ঠান, পাট ও চিনিকল এবং টেক্সটাইল কারখানা রাষ্ট্রীয়করণ করেছিলেন। এর প্রাথমিক ফলাফল ছিলো সত্যিই চমকপ্রদ। স্বাধীনতার প্রথম বছরের মধ্যেই দেশের পাটকলগুলো তাদের সক্ষমতার ৫৬ শতাংশ উৎপাদন করতে শুরু করেছিলো। টেক্টটাইল মিল, কাগজ কল এবং সার কারখানাগুলোর জন্য এ অনুপাত বেড়ে দাঁড়িয়েছিলো যথাক্রমে ৬০ শতাংশ, ৬৯ শতাংশ এবং ৬২ শতাংশ। সবগুলো কারখানাতেই পাকিস্তান আমলের চেয়ে বেশি বেশি উৎপাদন শুরু হয়েছিল।
বঙ্গবন্ধুর মধ্যম ও দীর্ঘ-মেয়াদি পরিকল্পনা ছিল ব্যক্তি খাতের বিকাশের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করা। প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা এবং সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশের জাতীয় বাজেট প্রস্তাবনাগুলোর দিকে তাকালেই এর প্রমাণ মেলে। ১৯৭৫-৭৬ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় তৎকালিন অর্থমন্ত্রী ড. এ আর মল্লিক উল্লেখ করেন যে, ‘‘পুঁজি বিনিয়োগে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিকল্পে, সরকার চলতি অর্থবছরের শুরুতে বেসরকারি পুঁজি বিনিয়োগের ঊধ্বসীমা ২৫ লক্ষ হইতে তিন কোটি টাকায় উন্নীত করেন এবং বেসরকারিখাতে কয়েকটি নতুন শিল্প গড়িয়া তোলার অনুমতি দেওয়া হইয়াছে’’ (বাজেট বক্তৃতা, ১৯৭৫-৭৬, পৃ: ৫)। তাছাড়া বঙ্গবন্ধু সরকারের আমলেই পাকিস্তানিদের ফেলে যাওয়া ১৩৩টি শিল্প প্রতিষ্ঠান মালিকদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়। ৮২টি ব্যক্তিমালিকায় এবং ৫১টি সমবায়ের নিকট বিক্রি করা হয়। ফলে বোঝাই যাচ্ছে যে ‘ডিরেগুলেশন’-এর প্রথম পর্যায় শুরু হয় বঙ্গবন্ধুর আমলেই। তিনি প্রকৃত অর্থেই ছিলেন একজন বাস্তববাদী নীতি-নির্ধারক। তাই পরবর্তিতে নিশ্চিতভাবেই তিনি সামাজিক সুবিচারের বিষয়টি মাথায় রেখে অর্থনীতির উদারিকরণের আরও উদ্যোগ নিতেন। এ কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে বাস্তবভিত্তিক শিল্প নীতির আলোকে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার কাজে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের মহাসড়কে অগ্রসরমান। ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ এর বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে ২০৩১ সালের মধ্যে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশের মর্যাদা অর্জনের যে স্বপ্ন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের দেখিয়েছেন তা বাস্তবায়ন করতে বঙ্গবন্ধুর টেকসই শিল্পায়ন ভাবনাকে সামনে এনে এগিয়ে যেতে হবে। সে স্বপ্ন বাস্তবায়নে দলবল নির্বিশেষে সবাই একসাথে কাজ করতে হবে, তৈরি করতে হবে টেকসই শিল্পায়নভিত্তিক অর্থনীতি।