শিশির ভেজা ভোরে হাঁটবে এ গ্রহের মানুষ

প্রকাশিত: ১২:০৪ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ৯, ২০২০

শিশির ভেজা ভোরে হাঁটবে এ গ্রহের মানুষ

মোজাফফার বাবু

অনেক সময় লড়াইয়ে বিজয় অর্জন করার জন্য বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করতে হয়, কখনো আক্রমণত্মক কৌশল , রক্ষানাত্মক কৌশল । রাশিয়ার স্বৈরশাসক জারের সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বলা হয়েছিল Two step behind One step forward এ সব নির্ধারণ করে সমর বিশেষজ্ঞগণ ।

আজকে বৈশ্বিক মহামারীতে ক্ষত বিক্ষত সারা বিশ্ব, মানবকূল মানবতার জীবন যাপন করছে করোনা ভাইরাস সংক্রমণের। অনুন্নত দেশতো দূরের কথা উন্নত দেশের অবস্থা ত্রাহি ত্রাহি । আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পরিচালক তেদরেস আধানোম গাব্রেয়াসুর কর্ম কর্তাগন কতটুকু প্রস্তুত ছিল, আরেকটি বিষয় ভাবতে হবে মহামারী তো বলে কয়ে আসেনা, আজ নাস্তানাবুদ গোটা বিশ্ব ।

করোনাভাইরাস প্রথম আঘাত করে চিনের উহানে পর্যায় ক্রমে ইতালি ইরানের দক্ষিণকোরিয়া, যুক্তরাষ্ট,যুক্তরাজ্য সৌদি আরব আমিরাত ভিয়েতনাম পাকিস্তান ভারত সহ সারা বিশ্বে এই মহামারী ছোয়াচে ব্যাধি ঘাতক ভাইরাস ঘর সংসার তছনছ জীবন হীন প্রতিপন্ন করেছে। ঘাতক ভাইরাস সংক্রামিত করে প্রথম থেকে দ্বিতীয় সপ্তাহ আবার দ্বিতীয় তৃতীয় সপ্তাহ এ-র গতি বৃদ্ধি পায় জ্যামিতিক হারে, বিজ্ঞানীরা এর গতিরোধ করার জন্য ১৪ দিন ঘর থেকে বেরহবে না যার নাম কোয়ারেন্টাইন এই প্রক্রিয়াই জনসমাগম হয় না যার সুফল পেয়েছে চীন ও জাপান।

আমরা আমাদের আদি ইতিহাস পর্যাচলনা করি তাহলেই স্বচ্ছ ধারনা পাব এই বিশ্বমন্ডলে অনেক গ্রহ আছে। যেমন বুধ, বৃহস্পতি, শনি , মঙ্গল ইত্যাদি। আমরা যে গ্রহে বসবাস করি তাঁর বয়স হবে প্রায় সাড়ে চার শত কোটি বৎসর। তার নাম পৃথিবী ।বয়সের ভাড়ে পৃথিবী নুয়ে গেছে।এখন সে বয়স্ক বুড়ি।এই পৃথিবীর বুকে কত কিছুই না বিচরণ করেছে।যেমন ডাইনাসোর যার আরেক নাম টিরেনোরাস।লম্বা প্রায় ৫৮ হাত,গলা প্রায় ২৫-৩০ ফুট।ওজন প্রায় ১৭ হাজার কেজি।।এই ডাইনাসোরের শেষ পরিনতি আমরা দেখি।পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তন তথা জলাভূমি গুলো শুকিয়ে খাঁ খাঁ করতে লাগল।উত্তর দিক থেকে বইতে লাগলো হিম হাওয়া।সেই হাওয়ায় তৃণ বৃক্ষ মড়ক শুরু হলো।মাথা তুলে বিরাট পাথরের পাহাড়।ডাইনোসরের খাবার দাবারের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হলো।এতে দূরন্ত পরাক্রমশালীরা নিঃশেষ হয়ে গেল।পরে রইল কঙ্কাল ফসিল।উত্তর শিয়র থেকে বইতে থাকা শুকনো বাতাসের আর ঠান্ডার কারনে জলবায়ুর পরিবর্তনে লক্ষ বছরের পুরনো ডাইনোসরের রামরাজত্বের অবসান ঘটলো।
তেমনি পৃথিবীর বুকে আজ করোনার ছোবল। করোনা বিভিন্ন নামে বিভিন্ন ভাবে পৃথিবীর বুকে বিভিন্ন ভাবে আসছে সে বিষয়ে যদি আমরা দেখি ৪০০০ বছর পুর্বে লোক সংখ্যা ছিল ৫০ লক্ষ।একবিংশ শতাব্দীতে এসে জনসংখ্যা লাগামহীন ভাবে বেড়ে প্রায় ৭০০ কোটিতে দাড়ায়।ঘনবসতি গিজ গিজ জনসংখ্যায় অনেক জায়গায় মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করে।রোগ বালাই বেশী ছড়ায়।প্রাকৃতিক দুর্যোগ কম হয় না।
প্রথম মানব সভ্যতার বিকাশ ঘটে খৃষ্টপূরব ৭০০০ হইতে ১০০০০ অব্দে উত্তর আফ্রিকায় ও পশ্চিম এশিয়ায়। মানব সমাজ জানতে পারলো উত্তর আফ্রিকার নীল নদ এশিয়ার দাজলা ও ফোরাত চীনের হোয়াং হো নদীর তীর আলোয় আলোয় ভরে উঠেছিল
সভ্যতার বিকাশের সাথে সাথে একে অপরের সন্নিকটে আসতে শুরু করল।নৌ যোগাযোগের মাধ্যমে একেক ভৌগোলিক পরিবেশে তারা সমুদ্রের পাড়ি দিতে লাগল।সভ্যতার ক্রমবিকাশের সঙ্গে সঙ্গে আলোর মধ্যে বিভিন্ন প্রকার প্রতিকূল মহামারী সম্মুখীন হতে হল।মানব সমাজ এক জায়গাই বন্দী থাকলোনা ক্ষেত্রের আয়তন বৃদ্ধি পেল।,যখন নৌ যোগাযোগ হল তখন ইউরোপ, আমেরিকা, এশিয়া সকল জায়গায় আঞ্চলিক, ভৌগোলিকে এক রকম মহামারী দেখা দিল।১৪৯৩ -১৪৯৪ সালে ফরাসি স্পেনীয় যুদ্ধে বহু মানুষের শরীরে দানা দানা বেঁধে সিফিলিস রোগের কারনে দুঃসহ জীবন যাপন করে।আবার ১৪৯৩ সালে শুকর বাহিত সোয়াইন ফ্লুর সর্দি জ্বরে বহুলোক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।।১৫১৮ সালে গুটিবসন্তে হিসপানিওয়ালার ও আরাওয়াক বহুলোক মারা যায়।১৫২১ সালে স্পেনীয় দখলদা কর্তেসের মাধ্যমে মেক্সিকোতে প্রায় ৩ লাখ লোক মারা যায়।
১৮১২ সালে জুন মাসে নেপোলিয়ন বোনাপার্টের আগ্রাসী যুদ্ধে বা জবর দখলের লক্ষে সমগ্র সৈন্য রাশিয়ার মস্কো পর্যন্ত চলে আসে, দেখে মানব শূন্য নগরী তারাঅবস্থানরত ৫ সম্পাহে টাইফাস মহা দুর্যোগে প্রায় ৬লাখ সৈন্য মহামারীতে মারা যায়।এছাড়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে কলেরায় বহুমানুষ মারা যায়।

ঐতিহাসিক ভাবে দেখতে পারি বিশ্ব নিখিল পৃথিবী নামক গ্রহে করোনা ভাইরাস অন্যান্য ভাইরাস এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের কারনে ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়েছে।

বিভিন্ন রকম সমস্যার সম্মুখীন হয়েও মানব সমাজ থেমে থাকেনি সেই অতীতে পাথর কেটে ধারালো অস্ত্র আগুনের ব্যবহার শেখার ফলে তার আর পিছনে ফিরে যেতে হয়নি , পশুদের বস করা নদীর স্রোতে নৌকায় পাল খাটিয়ে তর তর করে এগিয়ে যাওয়া বাতাসে ভর করে উড়োজাহাজ চেপে আকাশ জয় করা উত্তর মেরু থেকে দক্ষিন মেরু সম্পর্কে বিস্তারিত জানা মৃত্যুর পরে স্মৃতি ধরে রাখার জন্য পিরামিড তৈরী, জীবনকে তিলোত্তমা করার জন্য গয়না গাঁটি খাট পালং ইত্যাদি , সভ্যতার আরো ক্রমবিকাশে বিজ্ঞানের জয়যাত্রায় চাঁদে মানুষের অবতরণ, কৃষ্ণগহ্বর, সুপারসনিক প্লেন আবিষ্কার । মোবাইল, ল্যাপটপ, Video Call satellite, Twitter- বিজ্ঞানের বরযাত্রার শেষ নাই । সেই বিজ্ঞানকে বৃদ্ধ আঙ্গুল দেখিয়ে, ঘাতক বীর পরিক্রমায় আসে করোনাভাইরাস।

তার কাছে জাত ,পা্‌ত , ধর্ম্ ,বর্ন নেই। রাজা ,মহারাজা , ধনী , গরীব ।নেই দয়া ,মায়া ,আকুতির কোন মূল্য । সারা বিশ্ব কে তটস্থ করে এক গোলার্ধ থেকে আরেক গোলার্ধে ঘুরছে । মানুষের রক্তের সুধা পান করা এর প্রধান কাজ । মানুষ ভয়ে থরকম্প ,কত না লকডাউন, মাস্ক , একজন থেকে আর একজন ৩ মিটার দূরে, সেনিটাইজার দিয়ে হাত ধোঁওয়া , তারপরেও এই সাধের পৃথিবী ছেড়ে প্রেমিক, প্রেমিকা, স্বামী ,স্ত্রী , সন্তান চলে যাচ্ছে। বড়ই পরিতাপের ব্যাপার , কেউ কারো শেষ বিদায় ও দিতে পারছে না । এ যেন একটা মরণ ভাইরাস । সারা বিশ্বের মানুষ আজ বাঁচার তাগিদে বন্দী অবস্থায় জীবন যাপন করছে । কেউ কারো বিপদে কাছে যেতে পারছে না । যদি তার নিজের জীবনের প্রদীপ নিভে যায় ।সারা বিশ্ব কে আতঙ্কের ভিতর ফেলে করোনা ভাইরাস দাপটের মধ্যে রক্ত চুষে বেড়াচ্ছে ।

করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় শুধু সরকার প্রশাসনের ভাবলেই হবে না ,দল,মত,জাত,পাত সকলের সম্মলিত প্রচেষ্টায় এই বৈশ্বিক মহামারি রুখতে হবে ।

আমরা আশাবাদী মানুষ ,আশায় বাঁধি ঘর । ঘাত প্রতিঘাতের মধ্যেই মানবজাতি চলার পথ , রাষ্ট্র সংঘ কলেরা যক্ষার মত করোনা ভাইরাস ভ্যাকসিন আবিষ্কার হবেই । যার তৎপরতা চিকিৎসা বোদ্ধারা কাজ শুরু করেছেন ।

প্রেমিক , প্রেমিকা, সন্তান তার বাবা মাকে আবেগ ঘন ধর্মীয় অনুশাসনের মাধ্যমে চিরবিদায় দিতে পারবে । এই প্রত্যাশা সকলের । আমাদের আতঙ্কের ভয় কাটিয়ে বিজ্ঞান মুখ থুবড় থেকে বেরিয়ে আসবে । সাথে সাথে মানবজাতি অন্ধকার থেকে আলোর মিছিলে সামিল হবে ।

জয় হোক মানবতার । জয় হোক মানবের । করোনা ভাইরাস থেকে মুক্তি পাক বিশ্বের সকল মানুষ । পরিশেষে সুর্যের আলো করবে চিক চিক । তৃণ শিশির ভেজা ভোরে হাঁটবে এ গ্রহের মানুষ এই হোক আমাদের প্রত্যাশা ।

ছড়িয়ে দিন